07/08/2020
-অমল ও বৃষ্টির গল্প-
বৃষ্টির দিনে যখন বৃষ্টির ফোঁটা গুলো মাটিতে পড়ে, তখন তার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকা যায়। বৃষ্টির ফোঁটা গুলো অনেকটা আমাদের একঘেয়ে জীবনের মতন, পুরোটাই একঘেয়ে কিন্তু কিছু তারতম্য আছে। বৃষ্টির ফোঁটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অমল কিছু একটা ভাবছিল। ভাবছিলো যে এই মাসটা কবে শেষ হবে। এইভাবে ভাবতে ভাবতেই বৃষ্টির ফোঁটার জ্যামিতিক আকার অমলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলো, বৃষ্টি বলার চেষ্টা করছিলো হয়তো যে তোমার চাওয়া পাওয়া সবই তোমার গণ্ডির মধ্যে, তাদেরকে স্পর্শ করতে পারো, আবার অনেক কে স্পর্শ করা তো দূরে থাক তাদের কাছেও যেতে পারো না, কিন্তু আমাকে তো তুমি ছুঁতে পারো, আমি তো মাঝে মাঝেই তোমার শরীরের রক্ত চলাচল অনুভব করতে পারি, আমি যখন তোমার গা বেয়ে গড়িয়ে পরি, তোমার চিবুক ভিজিয়ে দি, যখন তোমার সারা শরীরে এক রোমাঞ্চকর শিহরণ জাগিয়ে তুলি, তখন তুমি অন্যমনস্ক হয়ে আমার কথা ভাবো না?
অমল ভাবে বৃষ্টির কথা, কিন্তু বৃষ্টি যখন মাটিতে পড়ে চুরমার হয়ে যায়, তখন অমলের শিহরণ ও বাস্তবের মাটিতে আছাড় খেতে থাকে।অমল খুব ভালো লেখে কিন্তু এখন সেইভাবে ওর আর লেখা হয়ে ওঠে না, ও ভাবে যখন লেখালিখি করতো তখন হয়তো এই শিহরণ নিয়ে পাতার পর পাতা ভরিয়ে দিতে পারতো, বৃষ্টিকে জীবন্ত করে তুলতে পারতো। প্রায় দু মাস হলো অমলের চাকরি নেই।একটা টুর এবং ট্র্যাভেল এজেন্সিতে অমল প্রায় বারো বছর হোল কাজ করছে, ভালোই চলছিলো ব্যবসা, ওর কাজ ছিল লোকজনদের বোঝানো কোন প্যাকেজ নিলে ভালো করে ঘোরা যাবে এবং কোথায় কোথায় এখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এইসব।এই করে অমলের প্রচুর জায়গার নাম, মুখস্থ হয়ে গেছিলো। অনায়াসে ও যেকোনো লোককে খুব সহজেই কব্জা করে নিতে পারতো, বুঝিয়ে দিতো যে এই ট্যুর এবং ট্র্যাভেল এজেন্সি এর সাথে গেলে কি কি সুবিধা উপভোগ করার সুযোগ আসবে। অমল চাকরির শুরুতে এই ধরনের চাকরি করতে চায়নি, কারন ও বরাবরই একটু মুখচোরা প্রকৃতির।কথা বলতে পারতো না ঠিক করে, কিন্তু লেখার সময় বৃষ্টির জলের মতই শব্দের ফুলঝুরি ছুটত এবং যখনই কোন পেন নিয়ে বসতো,কাগজের পাতা খস খস আর্তনাদ করতে করতে অমলের মনের ভাব ফুটিয়ে তুলত।
কলেজে পড়াকালীন বেশ কয়েকটা পত্র পত্রিকাতে ও লেখা দিতো, কিছু লিটিল ম্যাগাজিন ওর লেখা ছাপায় কিন্তু বেশিরভাগ জায়গাতেই দলা দলি, পা চাটা চাটি এইসব চলতো, এখনও চলে। তাই অমল আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ভাস্কর চক্রবর্তি এর সাথে অমলের খুব আলাপ করার খুব ইচ্ছে ছিলো,ভেবেছিলো জিজ্ঞেস করবে সুপর্ণা কি ওনার কল্পনা?, অমল যখনই লিখতে বসে ওকে এক ধরনের অস্তিত্বের সঙ্কট ঘিরে ধরে। চরিত্র গুলো সামাজিক , রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন, তাদের কোন দায় নেই সমাজ এবং দেশের কাছে। কারন দেশ বা রাষ্ট্র সেই সব চরিত্রদের কোন যায়গা দেয়না।
ভগবানে অমল বিশ্বাস করেনা, কিন্তু বিধবা মায়ের জন্য ডান হাতে একটা মাদুলি পড়তে হয়েছে, যেটাকে ও এখনই ছিঁড়ে ফেলে দিতে চাইছে। বৃষ্টি থেমে গেছে,ওর মা ওকে মনে করিয়ে দেয় যে একবার ওকে বেরতে হবে বাজার করতে নাহলে রান্না করার মতন কিছু নেই বাড়িতে। অমল ভাবে আত্মহত্যা করে নিলে ক্যামোন হয়? কোন রোজগার নেই ,কয়েকদিন পরেই টাকা পয়সার ভাঁড়ার ও শেষ হয়ে যাবে, তখন ও কি করবে ওর বিধবা মাকে নিয়ে?। ও ভাবে মানুষ তো এক সময় না এক সময় নিজেই মারা যাবে তাহলে এই অর্থহীন জীবনের মানে কি? এই রোজকার দুঃখ কষ্টের মানে কি? তার থেকে বরং মৃত্যুই আমার পরিসমাপ্তি হোক, নিজের জন্মানো হয়তো নিয়ন্ত্রন করা যায়না, কিন্তু নিজের মৃত্যুকে নিজের ইচ্ছে মতন নিজের জীবনে ডেকে আনা যায়।
কলেজে থাকতে অমল কামুর কিছু লেখা পড়েছিলো, সেইসব পড়ার পর ওর মনে হয়েছিলো যে আমাদেরকে এই অ্যাবসারড জীবন নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে, সুইসাইড কোন সমাধান নয়। অমলের কামুর কথা মনে পরে গেলো,ওর আস্তে আস্তে নবারুনের কথা মনে পড়লো, যে নুনু কামান নিয়ে যুদ্ধ ঘোষণার কথা বলেছিলো। ওর মনে আছে ভাসান গল্পটা পড়ার পরে, ও এখনও পাগল দেখলে খুব ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে ওদের, ওদের তাকানো লক্ষ্য করে। তাহলে কি অমল পাগল হয়ে যাচ্ছে? অমল বুঝতে পারেনা, এই সব চিন্তা ভির করে আসতেই ও খ্যেলা করে ও একটা ভুল রাস্তায় চলে এসেছে, এই রাস্তাটা এর আগে দেখেনি কখনও। ও দেখতে পায় রাস্তার দু ধারে কোন দোকান নেই, শুধুই বাড়ি, অথচ বাড়ি গুলোর জানলা দরজা বলে কিছু নেই। তিন তলা চারতলা পুরোটাই সাদা রঙ করা, ও সেই রাস্তা টা থেকে বেরোনোর চেষ্টা করে কিন্তু যতবার মোড় ঘোরে ঠিক ততবারই আবার একই যায়গায় ফেরত চলে আসে। পকেটে হাত দিয়ে দেখে মোবাইল ফোন টাও নিয়ে বেরয়নি এবং হাতে কোন বাজারের থলে ও নেই, অমল ভাবে তাহলে ওর মা যে বলল বাজার করে আনতে! মা ভাত চাপিয়েছিল উনুনে, শাড়ির আঁচল দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে ফ্যান গালছিলো। এর পরে অমলের কিছু মনে নেই।
অমল বুঝতে পারেনা এটা কোন দিন, ও কি আদেও স্বপ্ন দেখছে? বৃষ্টির সাথে ওর শেষ কথোপকথন হয়, ওরা একে অপরকে প্রেম নিবেদন করে,কিন্তু তারপরের স্মৃতিটা ঝাপসা হতে থাকে। ওই সাদা সাদা বাড়ি গুলোর একটা চোখ আছে, অমল বেশ ভালো বোঝে ওর দিকে বাড়ি গুলো তাকিয়ে আছে। অমল আস্তে আস্তে বোবা হয়ে যায়, মুখ দিয়ে মা বলে চেঁচাতে গিয়ে গলা আঁটকে যায়। পেটের ভিতর থেকে সব কিছু বেড়িয়ে আসে। স্পাইর্যাল এর মতন বমি করতে থাকে অমল। উঠে দাঁড়ায়, ওকে এখান থেকে বেরতেই হবে ।আকাশে ছাই রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ, একটা গুমোট ভাব অমলকে জড়িয়ে ধরতে শুরু করে ।ওর মনে হতে থাকে ওর গলার কাছটা কিরকম শুকিয়ে আসছে, হাত দিতেই অমল শিউরে ওঠে। নিজের হাতের দিকে তাকায়, আবার নিজের গলায় হাত দিতেই ওর নিজের অবস্থান সম্পর্কে অনুভব করতে পারে। ওর হটাত করেই মনে পরে যায় কালকে বিকেলে একটা ও নাইলনের দড়ি জোগাড় করে রেখেছিলো,নাইলনের দড়িই ওর গলায় দাগ বসিয়েছে। এই সময় ছাই রঙা আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে, অমল ভিজতে থাকে।
সৌসে।