28/12/2025
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের শান্ত শহর বালুরঘাট। আত্রেই নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা প্রমোদ সি. ধারা ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি মনে করতেন ব্যবসার সার্থকতা ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে নয়, বরং মানুষের মুখে ফোটানো হাসিতে। যখন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিশ্বায়ন আর মুনাফার ইঁদুর দৌড় শুরু হয়েছে, প্রমোদ তখন মগ্ন ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভাবনায়।
১৯৯০ সাল। দীর্ঘ বিভাজনের পর উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একীভূত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি আলি আবদুল্লাহ সালেহ্র নেতৃত্বে নতুন স্বপ্নের বুনন চলছে দেশটিতে। কিন্তু আরবের সেই তপ্ত মরুর বুকে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ালো জলকষ্ট। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ জলস্তরের আশঙ্কাজনক পতন, ইয়েমেন তখন এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখে।
এই খবর যখন প্রমোদ বাবু পড়ছিলেন, তখন তাঁর মনে পড়ে গেল ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আর. ভেঙ্কটরমন-এর একটি ভাষণের কথা। রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, "প্রযুক্তি যেন কেবল ধনীর বিলাসিতা না হয়ে দরিদ্রের বাঁচার রসদ হয়।" এই দর্শনই প্রমোদ বাবুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
সীমিত সঞ্চয় আর অদম্য জেদ নিয়ে প্রমোদ বাবু গড়ে তুললেন তাঁর স্বপ্নের প্রজেক্ট—“জলধারা”। তাঁর লক্ষ্য ছিল আকাশকুসুম নয়, বরং অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। ইয়েমেনের শুষ্ক জনপদে ২৪ ঘণ্টা বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না, ইয়েমেনের লোনা জলকে পানযোগ্য করার জন্য তিনি তরুণ ইঞ্জিনিয়ার ও বিজ্ঞানীদের নিয়ে তৈরি করলেন বিশেষ 'সোলার-পাওয়ারড ডিস্যালিনেশন ইউনিট'। বালুরঘাট থেকে সানার (ইয়েমেনের রাজধানী) দূরত্ব হাজার হাজার মাইল। লজিস্টিকস এবং পরিবহণ খরচ ছিল আকাশচুম্বী। কোনো কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়াই তিনি তাঁর জীবনের সমস্ত পুঁজি এই প্রকল্পে লাগিয়ে দেন। প্রমোদ বাবু বিশ্বাস করতেন, কেবল দান করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। তাই তিনি ইয়েমেনের স্থানীয় যুবকদের শেখালেন কীভাবে এই প্ল্যান্ট রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। “জলধারা” কেবল একটি জল সরবরাহকারী সংস্থা রইল না, এটি হয়ে উঠল একটি সামাজিক উদ্যোগ। লোহিত সাগরের নোনা জল যখন “জলধারা”-এর প্রযুক্তিতে বিশুদ্ধ হয়ে ইয়েমেনি নাগরিকদের তৃষ্ণা মেটাতে শুরু করল।
“জলধারা” প্রমাণ করে উদ্দেশ্যকে সামনে রাখলে ব্যবসা দেশ বদলাতে পারে। মানবতাই যখন পথপ্রদর্শক, সাফল্য আপনিই আসে। আজ “জলধারা” কেবল একটি নাম নয়, এটি ভারত ও ইয়েমেনের বন্ধুত্বের এক নীরব সাক্ষী। বালুরঘাটের অলিগলি থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ আন্তর্জাতিক মানবিক মঞ্চে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রমোদ বাবু দেখিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বমানের সমাধান দেওয়ার জন্য বহুজাতিক সংস্থা হওয়ার প্রয়োজন নেই, কেবল একটি বড় হৃদয় আর সৎ উদ্দেশ্যই যথেষ্ট।