Golper Asore. গল্পের আসরে।

Golper Asore. গল্পের আসরে। যারা গল্প শুনতে ভালোবাসেন তাদের জন‍্য

৮০তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা এই মাটি শুধু আমাদের দেশ নয়, এ আমাদের ভালোবাসা, আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়।অসংখ্য মানুষের...
15/08/2026

৮০তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা
এই মাটি শুধু আমাদের দেশ নয়, এ আমাদের ভালোবাসা, আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়।
অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও আত্মবলিদানের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতাকে হৃদয়ে ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

চলুন, ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে গড়ে তুলি আরও শক্তিশালী, সুন্দর ও গর্বের ভারত। ❤️🇮🇳

জয় হিন্দ!
স্বাধীনতা দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা।

26/07/2026

রাত জাগা পূর্ণিমার চাঁদ
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

সেদিন ছিল আশ্বিনের শেষ পূর্ণিমা। গ্রামের মানুষ একে বলে ‘কোজাগরী’।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে দেবী লক্ষ্মী এসে ঘরে ঘরে ডাকেন—“কো জাগর্তি?”
অর্থাৎ, “কে জেগে আছো?” যারা জেগে থাকে, তাদের নাকি ভাগ্য খুলে যায়।

কিন্তু রূপসা গ্রামের বৃদ্ধ অবিনাশবাবুর কাছে এই রাত জাগার মানে কোনো ধনসম্পদের লোভ ছিল না।
তাঁর কাছে এই রাতটা ছিল এক টুকরো স্মৃতির কোলাজ আর এক অদ্ভুত একাকীত্বের উৎসব।

নিঃসঙ্গতার আঙিনায় একলা আলো

অবিনাশবাবুর বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। এককালের নামকরা স্কুলের হেডমাস্টার মশাই এখন একেবারেই একা।
ছেলে সপরিবারে বহু দূরে, প্রবাসে ব্যস্ত। এক বছর আগে তাঁর সহধর্মিণী উমাও তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন না-ফেরার দেশে।
বিশাল পুরোনো জমিদারী ধাঁচের বাড়িটায় এখন শুধু অবিনাশবাবু আর তাঁর ছায়া।

সেদিন সন্ধে থেকেই আকাশে চাঁদের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। রাত যত গভীর হতে লাগল, চাঁদের আলো যেন আরও তীব্র,
আরও মায়াবী হয়ে উঠতে শুরু করল। অবিনাশবাবু তাঁর দোতলার চিলতে বারান্দায় এসে একটা পুরোনো আরামকেদারায় বসলেন।
তাঁর হাতে এক কাপ জুঁই ফুলের গন্ধ ছড়ানো লিকার চা।

বারান্দা থেকে পুরো গ্রামটা দেখা যায়। আলো-আঁধারির খেলায় চেনা গাছপালাগুলোকে কেমন যেন অচেনা রূপকথা বলে মনে হচ্ছিল।
বাঁশঝাড়ের মাথা ফুঁড়ে ওঠা পূর্ণিমার চাঁদটা যেন আজ রাতে একটু বেশিই বড়ো, একটু বেশিই উজ্জ্বল।

"কী রে অবিনাশ, আজও ঘুমোলি না?"

হঠাৎ অবিনাশবাবুর মনে হলো, ফিসফিস করে বাতাস যেন উমার গলায় এই কথাটাই বলে গেল।
উমা বেঁচে থাকতে প্রতি পূর্ণিমায় দুজনে এই বারান্দায় এসে বসতেন। উমা ভালোবাসতেন চাঁদের
আলোয় রূপোলী হয়ে যাওয়া শিউলি গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে, আর অবিনাশবাবু ভালোবাসতেন
উমার মুখের ওপর পড়া সেই চাঁদের আলোর খেলা দেখতে।

মাঝরাতের চেনা অতিথি

রাত যখন প্রায় বারোটা, চারপাশ নিঝুম। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর দূরে কোনো এক
নিশাচর পাখির ডানা ঝাপটানির শব্দ। ঠিক এমন সময় অবিনাশবাবু খেয়াল করলেন, বাড়ির সামনের
উঠোনে একটা ছোটো অবয়ব নড়াচড়া করছে।

চোখে চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে ভালো করে তাকালেন তিনি। ওমা, এ তো নীলু! পাড়ার খেটে খাওয়া
দিনমজুর কানাইয়ের দশ বছরের ছেলেটা। হাতে একটা ছেঁড়া প্লাস্টিকের থলি নিয়ে সে উঠোনের শিউলি
গাছটার নিচে নিচু হয়ে কী যেন খুঁজছে।

অবিনাশবাবু ওপর থেকেই মৃদু গলায় ডাকলেন, "নীলু? এত রাতে এখানে কী করছিস রে বাবা?"

নীলু চমকে ওপরে তাকাল। চাঁদের আলোয় তার নিষ্পাপ মুখটা চকচক করে উঠল। সে একটু লজ্জিত হয়ে বলল,
"দাদুভাই, মা বলেছিল কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে নাকি চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাওয়া শিউলি ফুল দিয়ে পুজো দিলে
সব দুঃখ দূর হয়ে যায়। মার খুব জ্বর দাদুভাই, তিনদিন ধরে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। তাই ভাবলাম..."

অবিনাশবাবুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। তিনি তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলেন। সদর দরজা খুলে উঠোনে এসে দাঁড়ালেন।

চাঁদের আলোয় ভাগ করে নেওয়া ওম

চাঁদের আলোয় তখন পুরো উঠোনটা যেন সাদা মখমলের চাদর দিয়ে ঢাকা। অবিনাশবাবু নীলুর মাথায় হাত রাখলেন।

"শুধু ফুল নিয়ে গেলে মা ভালো হয়ে যাবে? ডাক্তার দেখানো হয়েছে?" অবিনাশবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
নীলু মাথা নিচু করে বলল, "বাবা তো শহরে গেছে কাজের খোঁজে, এখনও ফেরেনি। পয়সা নেই দাদুভাই।"

অবিনাশবাবু আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। ঘরের ভেতর থেকে নিজের চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিলেন,
আলমারি থেকে কিছু টাকা আর উমার রেখে যাওয়া কিছু জরুরি ওষুধ নিলেন। তারপর নীলুর হাত ধরে বললেন, "চল, তোর মার কাছে যাই।"

মাঝরাতে শান্ত, নিস্তব্ধ গ্রামের পথ ধরে হেঁটে চলেছেন এক বৃদ্ধ আর এক শিশু। আর মাথার ওপর থেকে ‘রাত জাগা পূর্ণিমার চাঁদ’
তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। চাঁদের সেই স্নিগ্ধ আলো যেন আজ শুধু সৌন্দর্য ছড়াচ্ছিল না, ছড়াচ্ছিল এক অদ্ভুত অভয়বাণী।

এক নতুন ভোরের অপেক্ষা

কানাইয়ের কুঁড়েঘরে যখন তাঁরা পৌঁছালেন, নীলুর মা তখন জ্বরে কাঁপছিলেন। অবিনাশবাবু পরম মমতায় তাঁর মাথায় হাত রাখলেন।
ওষুধ খাওয়ালেন, মাথায় জলপট্টি দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। নীলুকে বললেন, "ভয় পাস না রে, তোর মা ঠিক হয়ে যাবে। কাল সকালেই
আমি শহরের বড়ো ডাক্তারবাবুকে নিয়ে আসব।"

সারারাত অবিনাশবাবু সেই কুঁড়েঘরের দাওয়ায় বসে কাটালেন। তাঁর চোখ থেকে ঘুম উধাও। কিন্তু আজ তাঁর এই রাত জাগার
মধ্যে কোনো একাকীত্ব ছিল না, ছিল না কোনো হাহাকার।

ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করেছে, চাঁদের আলো তখন মলিন হয়ে আসছে। অবিনাশবাবু আকাশের দিকে তাকালেন।
পশ্চিম আকাশে বিদায়ী চাঁদটা যেন উমার মতোই চওড়া হাসিতে তাঁকে আশীর্বাদ করে বিদায় নিচ্ছে।

অবিনাশবাবু বুঝলেন, রাত জাগা পূর্ণিমার চাঁদ শুধু একলা মানুষের সঙ্গী নয়, সে আসলে ভালোবাসার, সেবার এবং ত্যাগের এক নীরব সাক্ষী।

অজানা পথে হেঁটে চলেছি তুমি আমিলেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তীমেঠো পথটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে এক ঘন অরণ...
05/07/2026

অজানা পথে হেঁটে চলেছি তুমি আমি
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

মেঠো পথটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে এক ঘন অরণ্য।
কোনো সরকারি মানচিত্রে এই বনের অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। দুপুরের চড়া আলোও এখানে এসে কেমন যেন ম্লান,
রহস্যময় সবুজ আভায় রূপ নিয়েছে।

আমি আর তুমি—দুজনে দাঁড়িয়ে আছি সেই মোহনায়। আমাদের পিঠে দুটো ভারী ব্যাকপ্যাক,
আর চোখে একরাশ ক্লান্তি মেশানো কৌতূহল। আমরা কেউ জানি না এই পথ কোথায় শেষ হয়েছে,
কিংবা আদেও এর কোনো শেষ আছে কি না। শুধু এটুকু জানি, চেনা শহরের চেনা কোলাহল,
নিয়মের বেড়াজাল আর কৃত্রিমতার দেয়াল ভেঙে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়েছি এক অজানা উদ্দেশ্যে।

অচেনার মুখোমুখি

"এখনো সময় আছে, ফিরে যাবে?" আমি তোমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলাম।

তুমি তোমার চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক করে বসিয়ে নিলে। তোমার চোখে তখন ভয়ের চেয়ে জেদ বেশি।
আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বললে, "যে পথের শেষ জানা থাকে, সেখানে রোমাঞ্চ কোথায়? চলো, অচেনাকেই আজ চিনে নেওয়া যাক।"

আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। শুকনো পাতার ওপর আমাদের পায়ের 'মচমচ' শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
চারপাশটা অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে কোনো অচেনা পাখির ডাক সেই নীরবতা ভেঙে দিচ্ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা কত কী যে কথা বলছিলাম! সেইসব কথা, যা শহরের ব্যস্ততায় কখনো বলাই হয়ে ওঠেনি।
আমরা আমাদের ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, মাঝরাতের গোপন ভয়, আর ভবিষ্যতের ধোঁয়াটে ভাবনার কথাগুলো একে
একে উজার করে দিচ্ছিলাম এই নির্জন প্রকৃতির কাছে। পথ যত এগোচ্ছিল, আমাদের ভেতরের জড়তাগুলোও যেন ঠিক ততটাই হালকা হয়ে আসছিল।

ঝড়ের পূর্বাভাস ও এক অদ্ভুত আশ্রয়

বিকেলের দিকে আকাশের মুখ ভার হলো। বনের ভেতরের আলো আরও কমে এলো। মেঘের ডাক জানান দিচ্ছিল—এক তুমুল বৃষ্টি ধেয়ে আসছে।
আমাদের কাছে কোনো তাঁবু ছিল না, তাই মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই খোঁজা জরুরি হয়ে পড়ল।

"ঐ দেখো!" তুমি আঙুল উঁচিয়ে দেখালে।

গাছের আড়ালে একটা পুরোনো, প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হওয়া পাথরের তৈরি প্রাচীন মন্দির বা কোনো কোয়ার্টার্স দাঁড়িয়ে আছে।
দেয়াল বেয়ে উঠেছে বুনো লতাগুল্ম। আমরা আর দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে তার বারান্দায় আশ্রয় নিলাম। ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল।

ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি পড়ছে, আর আমরা দুজনে সেই প্রাচীন বারান্দায় বসে আছি গা ঘেঁষে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল, তাই আমি ব্যাগ থেকে
একটা হালকা চাদর বের করে আমাদের দুজনের গায়ে জড়িয়ে দিলাম।

"জানিস," তুমি আমার কাঁধে মাথা রেখে বললে, "শহরে থাকলে এই বৃষ্টি দেখে হয়তো আমরা জ্যামের কথা ভাবতাম,
কিংবা অফিসের জানলা দিয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাতাম। কিন্তু আজ এই অজানা জায়গায় বৃষ্টিটা কত সুন্দর লাগছে, তাই না?"

আমি শুধু হাসলাম। তোমার ভেজা চুলের সুবাস আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছিল তখন।
পকেট থেকে বিস্কুটের প্যাকেট বার করে আমরা ভাগ করে খেলাম। সেই সাধারণ বিস্কুটটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার মনে হচ্ছিল।

নতুন সকালের আলো

রাতটা কাটল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বনের নিশাচর প্রাণীদের ডাক, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ—সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ।
কিন্তু আমরা দুজনে একসঙ্গে ছিলাম বলে ভয়টা ছুঁতে পারেনি।

পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন বনের রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বৃষ্টির পর গাছগুলো যেন আরও সবুজ, আরও সতেজ হয়ে উঠেছে।
পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে মাটিতে, ঠিক যেন সোনার গুঁড়ো ছড়ানো রয়েছে।

আমরা আবার আমাদের যাত্রা শুরু করলাম। পথটা এবার পাহাড়ি চড়াই-উতরাইয়ের দিকে এগোতে লাগল।
কোথাও পাথর টপকে যেতে হচ্ছে, কোথাও আবার বুনো ফুলের ঝোপ সরিয়ে পথ করে নিতে হচ্ছে। হাত ধরাধরি করে
আমরা একে অপরকে টেনে তুলছিলাম। যেখানে আমি ক্লান্ত হচ্ছিলাম, সেখানে তুমি আমাকে শক্তি দিচ্ছিলে
আর যেখানে তুমি থমকে দাঁড়াচ্ছিলে, সেখানে আমি তোমার ভরসা হচ্ছিলাম।

গন্তব্যহীন যাত্রার আনন্দ

দুপুরের দিকে আমরা এসে পৌঁছালাম এক পাহাড়ের চূড়ায়। সেখান থেকে নিচের দিকে তাকাতেই আমাদের চোখ জুড়িয়ে গেল।
বহুদূরে একটা পাহাড়ি নদী এঁকেবেঁকে চলে গেছে, আর চারিদিকে শুধু সবুজ পাহাড়ের ঢেউ। কোনো কোলাহল নেই, কোনো দূষণ নেই—শুধু এক পরম শান্তি।

আমরা বুঝতে পারলাম, এই পথটার হয়তো কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। কিন্তু এই যে পথ চলার আনন্দ,
প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজেদের আরও গভীরভাবে চিনতে পারা, এটাই তো আসল প্রাপ্তি।

তুমি আমার দিকে তাকিয়ে হাত দুটো ছড়িয়ে দিলে। মুক্ত বাতাস তোমার চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছিল। তুমি বললে, "আমরা বোধহয় পথ হারিয়ে ফেলেছি, তাই না?"

আমি তোমার হাতটা আবার নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম। দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বললাম, "হ্যাঁ, হয়তো হারিয়েছি।
কিন্তু এই অজানা পথে তোমার সাথে হারিয়ে যাওয়ার মাঝেই আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। এই পথ যেখানেই নিয়ে যাক না কেন, আমি হাঁটতে রাজি।"

আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এক অজানা পথে, এক নতুন সকালের দিকে—তুমি আর আমি, পাশাপাশি, একদম মুখোমুখি।

29/06/2026

আমার একলা আকাশ
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

‘আমার একলা আকাশ’— কথাটা নীলিমা বহু বছর ধরে নিজের ডায়রির পাতায় লিখে আসছে।
কিন্তু আজ যখন সে বহুতল আবাসনটার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিকেলের ম্লান হয়ে আসা রোদ্দুরটার দিকে তাকিয়ে আছে,
শব্দ তিনটে তার বুকে পাথরের মতো ভারী ঠেকল।

নীলিমা আর অনিমেষের বিয়ের বয়স কুড়ি বছর। ছেলে অনির্বাণ গত বছরই পড়াশোনার জন্য জার্মানি চলে গেছে।
ঘরটা খালি হওয়ার পর থেকেই নীলিমার ভেতরের একাকীত্বটা যেন আরও জাঁকিয়ে বসেছে। অনিমেষ কর্পোরেট
জগতের এক মস্ত বড়ো কর্মকর্তা। সকাল ন’টায় ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে বের হয়, ফেরে সেই রাত দশটায়। নীলিমার
দিন কাটে এক বিশাল, নিঃশব্দ ফ্ল্যাটে— চারটে দেওয়াল আর স্মৃতিদের সাথে কথা বলে।

একলা ঘরের সুর

নীলিমা একসময় খুব ভালো সেতার বাজাত। বিয়ের প্রথম কয়েক বছর অনিমেষ আগ্রহ নিয়ে শুনত,
প্রশংসা করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনিমেষের ব্যস্ততা বাড়ল, আর নীলিমার সেতারটা একটা সুন্দর
কাপড়ে ঢাকা পড়ে আলমারির মাথায় উঠে গেল।

সেদিন ছিল নীলিমার পঁয়তাল্লিশতম জন্মদিন। অনিমেষ সকালে তাড়াহুড়ো করে বেরনোর সময় কপালে
একটা আলতো চুমু খেয়ে বলল, "হ্যাপি বার্থডে নীলু! আজ একটা খুব ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে, ফিরতে দেরি হবে।
তুমি নিজের মতো করে একটু সেলিব্রেট করে নিও।"

নিজের মতো করে সেলিব্রেট করা! নীলিমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। চুলে দু-একটা রুপোলি রেখা,
চোখের কোণে হালকা ক্লান্তির ভাঁজ। সে ভাবল, আজ সে নিজেই নিজের একলা আকাশটাকে একটু রাঙিয়ে তুলবে।

বিকেলের দিকে আলমারির ওপর থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে সেতারটা নামাল সে। বহু বছর পর তার আঙুলগুলো তারের
ওপর পড়তেই একটা চেনা শিহরন খেলে গেল। সে সুর সাধতে বসল। রাগ 'ইমন'-এর চেনা তানগুলো যখন ঘরের
কোণে ভেসে বেড়াতে লাগল, নীলিমার মনে হলো সে যেন বহু বছর পর প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারছে।

এক নতুন বসন্তের খোঁজ

পরদিন নীলিমা একটা বড় সিদ্ধান্ত নিল। সে তার একলা আকাশটাকে শুধু বিষণ্ণতার মেঘ দিয়ে ঢেকে রাখবে না।
সে পাড়ার একটা সমাজসেবী সংস্থায় যোগাযোগ করল, যেখানে অনাথ বাচ্চাদের গান ও মিউজিক শেখানো হয়।

প্রথম দিন যখন নীলিমা সেখানে গেল, আট-দশটা বাচ্চা তাকে ঘিরে ধরল। তাদের চোখে এক অদ্ভুত খিদে— ভালোবাসার খিদে,
সুরের খিদে। নীলিমা যখন তাদের সামনে সেতারের তারে প্রথম ঝংকার তুলল, বাচ্চাগুলোর চোখগুলো বিস্ময়ে চকচক করে উঠল।

ছয় বছরের একটা ছোট্ট মেয়ে, নাম তার মিনি। সে গুটিগুটি পায়ে নীলিমার কাছে এসে বলল, "দিদিমণি, তুমি আমাকে এই সুরটা শেখাবে?
আমার না খুব একা লাগে রাতে, এই সুরটা শুনলে মনে হয় মা পাশে বসে আছে।"

মিনির কথা শুনে নীলিমার চোখে জল এসে গেল। সে বুঝল, একা শুধু সে নয়; এই পৃথিবীতে
কত শত একলা আকাশ ছড়িয়ে আছে, যারা একটুখানি আলোর খোঁজ করছে।

মেঘ কেটে রোদ

দেখতে দেখতে ছ’টা মাস কেটে গেল। নীলিমার রুটিন এখন বদলে গেছে। দুপুর হলেই সে সেতার কাঁধে বেরিয়ে পড়ে।
তার চারপাশের চেনা বিষণ্ণতা কেটে গেছে, এখন তার মুখে সবসময় একটা তৃপ্তির হাসি লেগে থাকে।

একদিন রাতে অনিমেষ ড্রইংরুমে বসে কফি খাচ্ছিল। নীলিমা তখন গুনগুন করে একটা সুর ভাঁজছিল।
অনিমেষ হঠাৎ বলল, "জানো নীলু, অনেকদিন পর তোমাকে এত খুশি দেখছি। অনির্বাণ চলে যাওয়ার পর
আমি খুব চিন্তায় ছিলাম তোমাকে নিয়ে। কিন্তু ইদানীং তোমার মধ্যে একটা অন্যরকম এনার্জি দেখতে পাচ্ছি।"

নীলিমা হাসল। সে অনিমেষের পাশে বসে তার হাতটা ধরে বলল, "আমি আসলে আমার একলা আকাশটাকে চিনতে পেরেছি, অনিমেষ।
এতদিন ভাবতাম তুমি ব্যস্ত, ছেলে দূরে, তাই আমার আকাশটা শূন্য। কিন্তু এখন বুঝেছি, আকাশের কাজই হলো নিজেকে মেলে ধরা।
আমি আমার সেই শূন্য আকাশে সুরের পাখি উড়িয়ে দিয়েছি।"

অনিমেষ অবাক হয়ে নীলিমার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, তার স্ত্রী নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের জগৎ খুঁজে নিয়েছে।
সে নীলিমার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "আমাকে মাফ করে দিও নীলু, আমি তোমাকে সময় দিতে পারিনি।
কিন্তু আমি খুব গর্বিত তোমার জন্য।"

মুক্তির আকাশ

আজ রবীন্দ্রসদনে সেই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের একটা অনুষ্ঠান। নীলিমা আর তার এক ঝাঁক বাচ্চা মঞ্চে বসেছে।
ব্যাকড্রপে বড় বড় অক্ষরে লেখা— 'আমার একলা আকাশ'।

নীলিমা যখন সেতারে শেষ তানটা তুলল আর বাচ্চাগুলো সমবেত কণ্ঠে গেয়ে উঠল, তখন অডিটোরিয়াম হাততালিতে ফেটে পড়ল।
দর্শকদের প্রথম সারিতে বসে অনিমেষ দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে, তার চোখে জল।

অনুষ্ঠান শেষে নীলিমা যখন গ্রিনরুমের জানলা দিয়ে রাতের খোলা আকাশের দিকে তাকাল, তখন আর তার নিজেকে একলা মনে হলো না।
আজ তার আকাশটা আর খাঁচায় বন্দি নয়; তা আজ সুরের ডানায় ভর করে মুক্ত, বিশাল আর আলোয় আলোকময়।

নিখোঁজ আমিলেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী"নিখোঁজ আমি"—এই কথাটি মনের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা আর রহস্যের জন্ম দেয়। নিখোঁজ হওয়...
14/06/2026

নিখোঁজ আমি

লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

"নিখোঁজ আমি"—এই কথাটি মনের ভেতর একটা অদ্ভুত
শূন্যতা আর রহস্যের জন্ম দেয়। নিখোঁজ হওয়া মানেই তো শুধু সশরীরে হারিয়ে যাওয়া নয়,
কখনো কখনো নিজের চেনা শহরের ভিড়ে, নিজেরই তৈরি করা গোলকধাঁধায় মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

একটি অচেনা সকাল
সকাল সাড়ে সাতটা। অ্যালার্মের কর্কশ আওয়াজে অর্কর যখন ঘুম ভাঙল,
তখন বাইরের আকাশটা বেশ মেঘলা। প্রতিদিনের মতো আজও টেবিলে চায়ের কাপটা থাকার কথা ছিল,
কিন্তু ঘরটা অদ্ভুত রকমের নিঝুম। অর্ক বিছানা ছেড়ে উঠে ড্রয়িংরুমে গেল। কোথাও কেউ নেই।
তার স্ত্রী অনন্যা বা দশ বছরের মেয়ে পিউ—কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই।

রান্নাঘরে গিয়ে দেখল কাল রাতের ধুয়ে রাখা বাসনগুলো যেমনকার তেমনই পড়ে আছে।
অর্ক একটু অবাক হলো। অনন্যা এত বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর মানুষ নয়। সে বেডরুমে ফিরে গিয়ে অনন্যার ফোনে রিং করল।
ড্রয়ারের ভেতর থেকেই ফোনটা বেজে উঠল। অনন্যা ফোন ফেলেই চলে গেছে?

অর্ক আলমারিটা খুলল। অনন্যার প্রিয় শাড়িগুলো, পিউয়ের স্কুলের ব্যাগ—সব যথাস্থানে আছে।
আলমারির লকারও অক্ষত। তার মানে তারা স্বেচ্ছায় কোথাও যায়নি। অর্কর বুকের ভেতরটা হঠাৎ
একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে ফ্ল্যাটের দারোয়ান রামসিংকে
জিজ্ঞেস করল, "রামসিং, বৌদি আর পিউকে সকালে বেরোতে দেখেছ?"

রামসিং খৈনি ডলতে ডলতে অবাক হয়ে অর্কর দিকে তাকাল। তারপর বলল, "কৌন বৌদি অর্কবাবু?
আপ তো ইয়ে ফ্ল্যাট মে আকেলে হি রেহতে হ্যায়। তিন সাল সে দেখ রহা হুঁ আপকো।"

রামসিংয়ের কথা শুনে অর্কর মাথার ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে রইল।
রামসিং রসিকতা করছে? কিন্তু রামসিংয়ের চোখে কোনো কৌতুকের আভাস নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত করুণা মিশ্রিত দৃষ্টি।

মুছে যাওয়া অতীত
অর্ক মরিয়া হয়ে ওপরে ছুটে এল। ড্রয়ার থেকে অনন্যার ফোনটা বের করল।
পাসকোড দিয়ে লক খুলতেই তার হাত কাঁপতে লাগল। ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে কোনো 'অনন্যা' বা 'মা' বলে নম্বর নেই।
গ্যালারি খুলতেই অর্কর মাথা ঘুরতে লাগল। সেখানে অজস্র ছবি, কিন্তু প্রতিটা ছবিতে শুধু অর্ক একাই দাঁড়িয়ে আছে।
তাজমহলের সামনে, পাহাড়ে, রেস্তোরাঁয়—যেসব জায়গায় সে অনন্যা আর পিউকে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে আজ ছবিতে সে সম্পূর্ণ একা।
অনন্যার হাসিমুখ কিংবা পিউয়ের দুষ্টুমি ভরা চোখগুলো ছবি থেকে কেউ যেন নিখুঁতভাবে মুছে দিয়েছে।

"এটা অসম্ভব! আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি!" অর্ক চিৎকার করে উঠল।

সে তার ল্যাপটপটা খুলল। অর্ক পেশায় একজন গ্রাফিক ডিজাইনার। সে তার কাজের ফোল্ডারগুলো খুঁজতে লাগল।
গত মাসেই সে পিউয়ের জন্মদিনের একটা সুন্দর কোলাজ তৈরি করেছিল।
ফোল্ডারটা খুলতেই দেখল, সেখানে শুধু একটা প্লেইন ব্যাকগ্রাউন্ড পড়ে আছে, কোনো মানুষের ছবি নেই।

পাগলের মতো অর্ক তার শ্বশুরবাড়িতে ফোন করল। অনন্যার ভাই ফোন ধরতেই অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"শুভদীপ, অনন্যা আর পিউকে খুঁজে পাচ্ছি না। ওরা কি তোমাদের ওখানে গেছে? রামসিং বলছে আমি নাকি একা থাকি!"

ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। তারপর শুভদীপ বলল, "ভাই সাহেব, আপনি কি কোনো ভুল নম্বরে ফোন করেছেন?
আমি শুভদীপ ঠিকই, কিন্তু আমার অনন্যা নামে কোনো বোন নেই। আর আপনি কে?"

লাইনটা কেটে গেল। অর্ক ধপ করে চেয়ারটায় বসে পড়ল। তার চারপাশের চেনা
পৃথিবীটা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এক চরম অচেনা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

দেওয়ালে পিঠ

অর্ক নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। যদি সবাই তাকে অস্বীকার করে,
তবে সে আইনের সাহায্য নেবে। সে সোজাসুজি থানায় হাজির হলো।
ডিউটি অফিসার সায়ন্তনবাবু অর্কর বিবরণ শুনে একটা ডায়েরি বের করলেন।

"আপনার নাম অর্ক সেনগুপ্ত? বয়স চৌত্রিশ?" সায়ন্তনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
"হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার স্ত্রী আর মেয়ে আজ সকাল থেকে নিখোঁজ।"
সায়ন্তনবাবু কম্পিউটারে কিছু একটা টাইপ করলেন। তারপর চশমাটা নাক থেকে
নামিয়ে অর্কর দিকে তাকালেন। "মিঃ সেনগুপ্ত, আমাদের সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী আপনার বিয়েই হয়নি।
আপনি অবিবাহিত। আর আজ থেকে ঠিক এক সপ্তাহ আগে আপনার ফ্ল্যাটের মালিক থানায় একটা জিডি করেছিলেন যে আপনি নিখোঁজ।"

অর্ক স্তম্ভিত হয়ে গেল। "আমি নিখোঁজ? আমি তো আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি!"

"সেটাই তো আশ্চর্যের," সায়ন্তনবাবু গম্ভীর গলায় বললেন। "রেকর্ড বলছে অর্ক সেনগুপ্ত
গত সাতদিন ধরে নিখোঁজ। আর আপনি যাকে স্ত্রী-কন্যা বলছেন, তাদের কোনো অস্তিত্বই এই পৃথিবীতে নেই।
আপনি কি কোনো মানসিক অবসাদে ভুগছেন?"

অর্ক আর সেখানে দাঁড়াল না। সে থানা থেকে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এল। রাস্তাঘাটে চেনা মানুষগুলো
তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছে। চেনা শহরটা তাকে এক লহমায় পর করে দিয়েছে।

আয়নার মুখোমুখি
বিকেলের দিকে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অর্ক তার ফ্ল্যাটে ফিরে এল। ঘরটা এখন আরো বেশি অন্ধকার,
আরো বেশি নিঃসঙ্গ ঠেকছে। সে বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিল। তারপর যখন আয়নার দিকে তাকাল,
তখন তার হৃদপিণ্ডটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

আয়নায় কোনো প্রতিবিম্ব নেই!

সে হাত বাড়িয়ে আয়নাটা ছুঁল। কাচটা ঠান্ডা, কিন্তু সেখানে অর্কর অবয়ব দেখা যাচ্ছে না।
অর্ক বুঝতে পারল, নিখোঁজ আসলে অনন্যা বা পিউ হয়নি। নিখোঁজ হয়ে গেছে সে নিজে।

সে ড্রয়িংরুমের টেবিলে এসে বসল। টেবিলে একটা ধুলো জমা ডায়েরি পড়ে থাকতে দেখল,
যেটা সে আগে কখনো খেয়াল করেনি। ডায়েরিটা খুলতেই অর্কর নিজের হাতের লেখা ভেসে উঠল।
পাতাগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে অর্কর চোখের সামনে এক নির্মম সত্য উন্মোচিত হতে লাগল।

ডায়েরির পাতায় লেখা:

"আজ তিন বছর হলো অনন্যা আর পিউ একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
এই ফাঁকা ফ্ল্যাটে আমি আর নিতে পারছি না। প্রতিদিন গ্রাফিক্সে মানুষের ছবি এডিট করতে করতে ভাবি,
ইশ! যদি নিজের জীবনটাকেও এডিট করা যেত। যদি একটা কাল্পনিক দুনিয়া তৈরি করে সেখানে অনন্যা আর পিউকে বাঁচিয়ে রাখা যেত..."

সত্যের আলো
স্মৃতির অবরুদ্ধ কপাটটা এক ঝটকায় খুলে গেল। অর্কর মনে পড়ল তিন বছর আগের
সেই অভিশপ্ত রাতের কথা। এক লরিতে ধাক্কা লেগে তার সাজানো সংসার শেষ হয়ে গিয়েছিল।
অর্ক সেই ধাক্কা সামলাতে পারেনি। সে তীব্র মানসিক অবসাদে চলে গিয়েছিল। নিজের একাকিত্ব ঢাকতে সে
নিজের মনের ভেতর এক অবাস্তব সমান্তরাল পৃথিবী তৈরি করেছিল, যেখানে অনন্যা আর পিউ বেঁচে ছিল।
সে প্রতিদিন সকালে উঠে অবাস্তব অনন্যার সাথে কথা বলত, পিউকে স্কুলে পাঠানোর অভিনয় করত।

আর আজ? ডাক্তারদের দেওয়া কড়া ওষুধ আর চিকিৎসার ফলে তার মনের সেই কাল্পনিক জগৎটা ভেঙে
চুরমার হয়ে গেছে। তার মন আজ সত্যকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
তাই অনন্যা আর পিউ তার জীবন থেকে চিরতরে 'নিখোঁজ' হয়ে গেছে।

কিন্তু আয়নায় তার নিজের ছবি দেখা যাচ্ছিল না কেন?

অর্ক এবার বুঝতে পারল। গত তিন বছর ধরে সে নিজের আসল অস্তিত্বকে
লুকিয়ে রেখেছিল এক মিথ্যে অভিনয়ের আড়ালে। সে নিজে এতকাল নিখোঁজ
ছিল তার নিজেরই চেতনার আড়ালে।

জানলার বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অর্ক ডায়েরিটা বন্ধ করল। সে এবার আয়নার সামনে গিয়ে আবার দাঁড়াল।
এবার কাচের আবছা অন্ধকারে একটা অবয়ব ফুটে উঠল—একটু রোগা, চোখের নিচে কালি পড়া, কিন্তু বাস্তব একটা মানুষ।
অর্ক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার। অনন্যা আর পিউ আর কখনো ফিরবে না,
কিন্তু আজ থেকে অর্ক আর নিখোঁজ নয়। সে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে, এক নির্মম কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর বুকে।

কৃষ্ণচূড়া ফুল ও অনুরাধার গল্প।লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী    রোদ-ঝলসানো বৈশাখের দুপুরে চারপাশ যখন খাঁ খাঁ করত, তখন অনুর...
12/06/2026

কৃষ্ণচূড়া ফুল ও অনুরাধার গল্প।
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

রোদ-ঝলসানো বৈশাখের দুপুরে চারপাশ যখন খাঁ খাঁ করত,
তখন অনুরাধার জানালার বাইরে ঠিক যেন একটা আগুন লেগে যেত। রক্তিম আগুন।
ওদের বাড়ির ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ।
বৈশাখ আসতেই সবুজ পাতা ছাপিয়ে সেখানে অলৌকিক লাল রঙের মেলা বসত।

অনুরাধার জীবনটা কৃষ্ণচূড়ার চেয়ে একদম আলাদা ছিল।
সে শান্ত, চশমার আড়ালে চোখ লুকিয়ে রাখা এক চড়ুই পাখির মতো মেয়ে।
ভিড় এড়িয়ে চলা, গুটিয়ে থাকাটাই ছিল তার স্বভাব। অথচ, তার মনের ভেতরের ক্যানভাসটা ছিল কৃষ্ণচূড়ার মতোই রঙিন।
সে ডায়েরির পাতায় কবিতা লিখত, ক্যানভাসে রঙ ছড়াত, কিন্তু সেসব দেখার বা বোঝার মতো কেউ ছিল না।

সবাই তাকে বলত, "মেয়েটা বড্ড ফ্যাকাশে, কোনো তেজ নেই।"
একদিন বিকেলে চারদিক কালো করে হুড়মুড়িয়ে এলো কালবৈশাখী ঝড়। একটা শান্তির স্পর্শ দিয়ে গেল শহরের বুকে।

ঝড় থামলে অনুরাধা তার চেনা জানালায় এসে দাঁড়াল। বাইরে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
ঝড়ের দাপটে কৃষ্ণচূড়ার অজস্র লাল ফুল ঝরে পড়ে রাস্তাটাকে যেন একটা লাল গালিচায় পরিণত করেছে।
আর সেই চত্বরে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক পরম যত্নে মাটি থেকে আস্ত কিছু ফুল কুড়িয়ে নিচ্ছেন।

অনুরাধা নিচে নেমে গেল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "দাদু, এত ঝরা ফুল দিয়ে কী করবেন?"
বৃদ্ধ হেসে অনুরাধার দিকে তাকালেন। বললেন, "মা রে, লোকে ভাবে ঝরে গেছে মানেই বুঝি শেষ। কিন্তু এই কৃষ্ণচূড়া যখন ঝরে পড়ে,
তখনও সে চারপাশটাকে সুন্দর করে দিয়ে যায়। এর ঝরে যাওয়ার মধ্যেও একটা অদ্ভুত অহংকার আছে, একটা তেজ আছে। কৃষ্ণচূড়া কখনো মলিন হতে জানে না।"
বৃদ্ধের কথাগুলো অনুরাধার বুকের গভীরে কোথায় যেন গিয়ে লাগল। সে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই তো! পায়ের নিচে পিষে যাওয়ার পরেও ফুলগুলোর লাল রঙ যেন একটুও কমেনি।

সেই বিকেলের পর থেকে অনুরাধার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেল। সে ভাবল,
সে কেন নিজেকে গুটিয়ে রাখবে? জীবনের ঝড়-ঝাপটা তো আসবেই, কিন্তু কৃষ্ণচূড়ার মতো তাকেও নিজের ভেতরের রঙটা বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
রাতে সেই বৃদ্ধের কথা গুলো আবার মনে পড়লো। এবার সে মনস্থির করলো নিজেকে বদলাতে হবে। নতুন ভোরে সে এক নতুন জীবন শুরু করবে।

পরদিন সে তার ডায়েরির পাতা থেকে কবিতাগুলো বের করল।
নিজের আঁকা ছবিগুলো নিয়ে শহরের একটা ছোট প্রদর্শনীতে অংশ নিল। মানুষ অবাক হয়ে দেখল, যে মেয়েটাকে তারা 'ফ্যাকাশে' ভাবত, তার ভেতরের জগতটা কতটা রঙিন!
কয়েক বছর পর, অনুরাধা যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তখন সে আর সেই চশমা পরা, ভয়ে গুটিয়ে থাকা মেয়েটি নয়। এখন তার পরনে থাকে লাল শাড়ি, চোখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।

আজও বৈশাখ এসেছে। অনুরাধা তার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। কৃষ্ণচূড়া গাছটা একইভাবে লালে লাল হয়ে হাসছে।
অনুরাধা একটা হাত বাড়িয়ে দিল জানালার বাইরে। বাতাস এসে একটা টকটকে লাল কৃষ্ণচূড়া ফুল তার হাতের তালুতে ফেলে দিল।

অনুরাধা হাসল। সে বুঝতে পেরেছে, কৃষ্ণচূড়া শুধু একটা ফুল নয়—ওটা আসলে নিজের শর্তে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখার একটা মন্ত্র।

22/04/2026

বৈশাখে প্রেমের নতুন শুরু
কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

বৈশাখী দুপুরের তপ্ত হাওয়ায় যখন চারিদিক খাঁ খাঁ করছে, ঠিক তখনই অনেক বছর পর নীলাদ্রি আর মালিনীর দেখা হলো।
গন্তব্য সেই পুরনো কফি হাউস, যেখানে একসময় তাদের বিকেলের আড্ডাগুলো শেষ হতে চাইত না।

নীলাদ্রি লক্ষ্য করল, মালিনী আজও সেই আকাশী রঙের জামদানি পরেছে। ঠিক যেমনটা সে পহেলা বৈশাখের দিন পরতে ভালোবাসত।
মালিনীর চোখে সেই পরিচিত চঞ্চলতা, তবে তাতে মিশে আছে কিছুটা অভিজ্ঞতা আর গাম্ভীর্য।

প্রথম অধ্যায়: মেঘের আনাগোনা
কফি হাউসের জানলার ধারে বসে নীলাদ্রি বলল, "এখনও সেই বৈশাখী সাজেই আছ দেখছি।"

মালিনী স্মিত হেসে জবাব দিল, "কিছু অভ্যেস পাল্টানো যায় না, নীল। ক্যালেন্ডার বদলায়,
কিন্তু বৈশাখের সেই গন্ধটা তো একই থাকে। সেই ঝোড়ো হাওয়া, ধুলোবালি আর তারপর এক পশলা বৃষ্টির অপেক্ষা।"

তাদের কথোপকথন এগোতে লাগল স্মৃতির সরণি বেয়ে। কলেজ জীবনের সেই বৈশাখী মেলা,
ভিড়ের মাঝে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়, আর শেষে এক ভাঁড় চা ভাগ করে নেওয়া—সবই যেন জীবন্ত হয়ে উঠল।

কিন্তু সেই গল্পের মাঝপথে হঠাৎ ছেদ পড়েছিল কর্মসূত্রে নীলাদ্রির বিদেশে চলে যাওয়ায়। কোনো বিদায়বেলা ছিল না, ছিল শুধু একরাশ না বলা কথা।

দ্বিতীয় অধ্যায়: কালবৈশাখীর সংকেত
বিকেলের আকাশটা হঠাৎ গুমোট হয়ে এল। কফি হাউসের জানলার বাইরে ধুলো উড়তে শুরু করেছে। দোকানদাররা ব্যস্ত হয়ে সাটার নামাতে লাগল।
নীলাদ্রি দেখল, মালিনী অপলক দৃষ্টিতে জানলার বাইরে তাকিয়ে আছে।

"কী ভাবছ?" নীলাদ্রি নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করল।

মালিনী মুখ ফিরিয়ে বলল, "ভাবছি, প্রকৃতিও আমাদের মতো। এতটা উত্তাপ জমিয়ে রাখে শুধু এক মুহূর্তের কালবৈশাখীর জন্য। সব ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে নিতে চায়।"

হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় জানলার পর্দাগুলো নেচে উঠল। চারপাশ অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। তারপরই শুরু হলো সেই কাঙ্ক্ষিত গর্জন।
মেঘের ডাক আর বিদ্যুতের চমকানিতে শহরটা যেন থমকে গেল।

তৃতীয় অধ্যায়: ভেজা মাটির টান
বৃষ্টি নামল মুষলধারে। রাস্তার ধুলোর সোঁদা গন্ধ উঠে এল দোতলার বারান্দা অবধি। নীলাদ্রি আর মালিনী উঠে দাঁড়াল।
তারা আর কফির টেবিলটিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইল না। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই এক পশলা বৃষ্টির ছাঁট তাদের ভিজিয়ে দিল।

নীলাদ্রি হঠাৎ মালিনীর হাতটা আলতো করে ধরল। অনেক বছর পর এই স্পর্শ। মালিনী হাত সরিয়ে নিল না, বরং আরও একটু শক্ত করে ধরল।

"সেদিন কেন চলে গিয়েছিলে কিছু না বলে?" মালিনীর গলায় এক অভিমানী সুর।

নীলাদ্রি বৃষ্টির শব্দের মাঝেই বলল, "ভয় ছিল। নিজেকে প্রমাণ করার লড়াইয়ে তোমায় হারাতে চাইনি,
কিন্তু লড়াইটা লড়তে গিয়েই তোমায় দূরে সরিয়ে ফেলেছিলাম। এই বৈশাখ সাক্ষী থাক, এবার আর পালানোর জায়গা নেই।"

উপসংহার: নতুন বছরের শুরু
বৃষ্টি থামলে শহরটা এক অদ্ভুত শান্ত রূপ নিল। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো আয়নার মতো জলমগ্ন রাস্তায় প্রতিফলিত হচ্ছে।
মালিনী তার চোখের কোণের জল মুছে হেসে বলল, "বৈশাখ শুধু ঝড়ের নাম নয় নীল, বৈশাখ হলো পুরনোকে মুছে নতুন করে শুরু করার নাম।"

তারা দুজনে কফি হাউস থেকে নিচে নেমে এল। নতুন বছরের প্রথম মাস, ধোয়া মোছা পরিষ্কার রাস্তা, আর এক নতুন প্রতিশ্রুতির গন্ধ বাতাসে।
কালবৈশাখী শুধু ধুলোই ওড়ায় না, মাঝে মাঝে মনের ওপর জমে থাকা দীর্ঘদিনের ধুলোবালিও পরিষ্কার করে দিয়ে যায়।

বাঙালির প্রেম তো অনেকটা এই বৈশাখের মতোই—প্রবল দহন, তারপর আকস্মিক ঝড়, আর শেষে এক বুক প্রশান্তি নিয়ে আসা অঝোর বৃষ্টি।
তারা হাঁটতে লাগল সামনের দিকে, যেখানে এক নতুন গল্পের শুরু অপেক্ষা করছে।

Address

Garia, Boral
Kolkata
7000103

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Golper Asore. গল্পের আসরে। posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Golper Asore. গল্পের আসরে।:

Shortcuts

Share