Golper Asore. গল্পের আসরে।

Golper Asore. গল্পের আসরে। যারা গল্প শুনতে ভালোবাসেন তাদের জন‍্য

নকশীকাঁথার মাঠলেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তীপদ্মা পারের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—রামনগর। সবুজ ধানের খেত, বাঁশঝাড়ের ছায়া আর মেঠো প...
03/09/2026

নকশীকাঁথার মাঠ
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

পদ্মা পারের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—রামনগর। সবুজ ধানের খেত, বাঁশঝাড়ের ছায়া আর মেঠো পথের আঁকাবাঁকা হাঁটা পথ নিয়ে গ্রামটি যেন এক রূপকথার জগৎ।
সেই রূপকথার দুই মূল চরিত্র ছিল রূপাই আর সাজু।

গায়ের রঙ তার কাঁচা সোনালী না হলেও রূপাইয়ের একটা নিজস্ব রূপ ছিল। কোঁকড়ানো চুল, দীর্ঘ সুগঠিত দেহ আর একজোড়া ধারালো চোখ।
বাঁশিতে যখন সে ফুঁ দিত, বাঁশের গাঁট থেকে যেন মিষ্টি সুরের বন্যা ভেসে আসত। গান গাওয়ায়, লাঠি খেলায় আর ঘর-গৃহস্থালির কাজে তার জুড়ি মেলা ভার।
অন্যদিকে পাশের গাঁয়ের রূপবতী মেয়ে সাজু—যার চোখ দুটো যেন রূপোর থালার মতো ঝলমলে, ডাগর আর করুণ। তার হাত ছিল নিখুঁত আলপনা আর সুঁচ-সুতো দিয়ে সেলাইয়ের জাদুতে ভরপুর।

গাঁয়ের বৈশাখী মেলায় দুজনের প্রথম দেখা। লাঠি খেলার আসরে রূপাইয়ের অদম্য তেজ আর বিজয়ের হাসি সাজুর কচি মনে প্রথম তোলপাড় তুলেছিল।
আর সেই ভিড়ের মাঝে রূপাইয়ের চোখে পড়েছিল লাল মেঘের সায়ার মাঝখান থেকে উঁকি দেওয়া সাজুর লজ্জারাঙা মুখখানি। প্রেম কোনো শর্ত মানে না;
চোখের দেখাতেই দুই হৃদয় একে অপরের বাঁধনে বাঁধা পড়েছিল।

গ্রামের মুরুব্বিদের হাত ধরে ধুমধাম করে রূপাই আর সাজুর বিয়ে হলো। রূপাইয়ের ছোট্ট কুঁড়েঘর যেন হঠাৎ স্বর্গপুরী হয়ে উঠল।
সাজুর রান্নাঘরের হাঁড়ির মিষ্টি চালের গন্ধ আর ঘরের কোণে তার আঁকা আলপনা দেখে রূপাইয়ের মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ যেন তার এই ছোট ভিটেতেই এসে জমা হয়েছে।
সারাদিন মাঠে কাজ করে সন্ধ্যায় ফিরে রূপাই যখন দরজায় দাঁড়াত, সাজু তাজা তুলসী পাতার সুবাস আর পানের বাটা নিয়ে হাজির হতো। এক অদ্ভুত মায়ায় গাঁথা চলছিল তাদের দিন।

কিন্তু পল্লীগ্রামের সুখের দিন বেশিদিন স্থায়ী হয় না। ঝড়ের কালো মেঘ নেমে এলো প্রতিবেশী গাঁয়ের সঙ্গে সীমানা ও কাশের জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব ঘিরে।

সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। পাশের গাঁয়ের লোক রূপাইদের জমির ধান জোর করে কেটে নিতে এসেছে শুনে রূপাইয়ের রক্ত গরম হয়ে উঠল। সাজুর নিষেধ,
তার ভেজা চোখের জল রূপাইকে আটকাতে পারল না। হাতের শক্ত কাঁচা বাঁশের লাঠিটি তুলে নিয়ে রূপাই অন্য চাষীদের সাথে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে গেল মাঠে।

পরদিন ভোরে যখন ভোরের লাল আলো ফুটে উঠল, মাঠে পাওয়া গেল রক্তের লাল ছোপ। পাশের গাঁয়ের বেশ কিছু লোক রক্তা-রক্তি কাণ্ডে মারাত্মক আহত হলো,
একজন মারাও গেল। কায়দা মতো পুলিশের গাড়ি গ্রামের মুখে ঢুকতেই বাকি পুরুষদের সাথে রূপাইকেও বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়তে হলো—পলাতক আসামীর মতো বন-জঙ্গল আর অচেনা পথের উদ্দেশ্যে।

যাওয়ার আগে রূপাই একবারের জন্য হলেও অন্ধকারে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সাজুর দু'হাত চেপে ধরে কেবল বলেছিল, "সাজু, আমি ফিরে আসব। এই অন্ধকার কাটলেই আমি আবার তোমার কাছে ফিরে আসব।"

কিন্তু সেই রাত শেষ হলেও রূপাই আর ফিরে এলো না। দিন যায়, মাস যায়, ঋতু বদলায়। বর্ষায় ছাদের খড় গলে জল পড়ে, শীতে কুয়াশার চাঁদর পুরো গাঁ ঢেকে দেয়—কিন্তু রূপাইয়ের দেখা মেলে না।

স্বামীর অপেক্ষায় সাজুর দিনগুলো যেন একেকটা পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠল। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সাজু দিনরাত ঘরের বারান্দায় বসে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকত। তার ডাগর চোখ দুটো কান্নার জলে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

একদিন সাজুর মা তার হাতে একটি সাদা সূতি কাপড়ের থান আর হরেক রঙের সুতো তুলে দিলেন। বললেন, "মা সাজু, তোর ভেতরের এই না বলা কান্নাগুলোকে তুই সুতোর মাঝে ধরে রাখ।"

সাজু শুরু করল এক অদ্ভুত রূপকথা সেলাই করা। সে কোনো সাধারণ কাঁথা বুনছিল না, সে বুনছিল তার আর রূপাইয়ের জীবনের সমস্ত স্মৃতি ও ব্যথার ইতিহাস।

কাঁথার প্রথম কোণে সে লাল ও সবুজ সুতো দিয়ে সেলাই করল তাদের প্রথম দেখার সেই মেলা, রূপাইয়ের হাতের বাশি আর তার লাঠি খেলার দৃশ্য। মাঝখানের অংশজুড়ে সে সেলাই করল তাদের বিয়ের বাদ্যি, শুভদৃষ্টি আর কনের সাজ। তারপর কাঁথার নিচের দিকে কালচে সুতো দিয়ে বুনে দিল সেই অমাবস্যার কালো রাত, লাঠালাঠির রক্ত আর রূপাইয়ের চলে যাওয়ার নির্জন পথ।

একটি করে ফোঁড় উঠত, আর সাজুর চোখের এক ফোঁটা জল সেই সুতোর ওপরে ঝরে পড়ত। চোখের জলে ভেজা আর বেদনায় বোনা সেই কাঁথাটি দিনে দিনে রূপ নিল এক অপূর্ব ‘নকশীকাঁথা’য়।

বছর ঘুরে যায়। সাজুর শরীর ক্ষয়ে ক্ষয়ে কঙ্কালসার হতে লাগল। তার রূপের দীপ্তি হারিয়ে গিয়ে সেখানে ঠাঁই নিল এক অদ্ভুত উদাসীনতা। জীবনের শেষ আলোটুকু যখন নিভে আসার মুখে, সাজু তার বৃদ্ধা মাকে কাছে ডাকল।

জীর্ণ কণ্ঠে সাজু বলল, "মা, আমার এই কাঁথা বুনন শেষ হয়েছে। আমি জানি, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। আমি মরে গেলে এই নকশীকাঁথাটি আমার গায়ের ওপর জড়িয়ে আমাকে সেই মাঠের ধারে সমাহিত কোরো—যে মাঠে আমার রূপাই হারিয়ে গিয়েছিল। যদি কোনোদিন সে ফিরে আসে, এই কাঁথা দেখলেই সে বুঝবে, তার সাজু কীভাবে প্রতিটা মুহূর্তে তার জন্য অপেক্ষা করেছিল।"

তার কিছুদিনের মধ্যেই সাজু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। গ্রামের মানুষ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সাজুর শেষ ইচ্ছা পূরণ করল। মাঠের এক কোণে, একাকী শেওড়া গাছের ছায়ায় সাজুকে কবর দেওয়া হলো এবং তার গায়ের ওপর মেলে দেওয়া হলো সেই গভীর ভালোবাসা আর বেদনায় বোনা নকশীকাঁথাটি।

কালক্রমে সেই কাঁথা মাটিতে মিশে গেল, কবরের ওপর গজিয়ে উঠল সবুজ ঘাস আর বুনো ফুল। কিন্তু গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, সাজুর আত্মা চিরকাল ধরে সেই মাঠের পাহারা দিচ্ছে।

বহু বছর পর, এক শীতের রাতে গ্রামের পথ ধরে এক বৃদ্ধ ও জীর্ণ সাজের পথিক এসে দাঁড়াল সেই মাঠের কোণে। মাথাভর্তি ধোলাই চুল, চোখে ছানি এবং হাত দুটো কাঁপছে। লোকটি আর কেউ নয়—অনুতাপ আর কষ্টের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ফিরে আসা বৃদ্ধ রূপাই।

মাঠের ধারের সেই চেনা কবরের কাছে এসে রূপাই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। মাটির গায়ে হাত রেখে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার চোখের জল শুকিয়ে যাওয়া মাটিকে ভিজিয়ে দিল।
রূপাই অনুভব করতে পারল, মাটির নিচ থেকেও যেন সাজুর ভালোবাসার সেই টুংটাং সুর আর কাঁথার সুতোর উষ্ণতা ভেসে আসছে।

পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ মাঠে এসে দেখল, সাজুর কবরের ওপর নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে রূপাইয়ের দেহ। জীবনের সব বিচ্ছেদ পেরিয়ে মৃত্যুর ওপারে অবশেষে তারা দুজন এক হয়েছে।

সেই থেকে গ্রামের মানুষ ওই বিশাল মাঠটিকে আর কোনো সাধারণ নাম দিল না। গভীর বেদনাবিধুর ভালোবাসার স্মারক হিসেবে তারা সেই মাঠের নাম রাখল "নকশীকাঁথার মাঠ"।

হেমন্তের রাতে বাতাস যখন সেই মাঠের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, আজও যেন বাঁশের বাঁশির করুণ সুর আর নকশীকাঁথার সুতোর ফোঁড়ের মতো এক নীরব প্রেমের গুঞ্জন ভেসে আসে।

ভালোবাসার মরীচিকালেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী নগরের কোলাহল ছাড়িয়ে নদীর ধারে পুরোনো বটগাছটার নিচে যখন আবির এসে দাঁড়াল, তখন...
31/08/2026

ভালোবাসার মরীচিকা
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

নগরের কোলাহল ছাড়িয়ে নদীর ধারে পুরোনো বটগাছটার নিচে যখন আবির এসে দাঁড়াল,
তখন গোধূলির লাল আলোয় শান্ত জল ঝিলমিল করছে। স্থানটা তাদের দুজনের খুব পরিচিত।
কত শত দিন এখানে তারা বসে থেকেছে, ভবিষ্যতের ক্যানভাসে এঁকেছে যৌথ জীবনের রঙ। আজও তিশা আসবে বলেছে।
কিন্তু আবিরের বুকের ভেতর আজ আর আগের মতো উত্তেজনার শিহরণ নেই, সেখানে জমছে এক অজানা বিষাদের কুয়াশা।

আবির আর তিশার সম্পর্কটা ছিল রূপকথার মতো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন থেকে তাদের পথ চলা শুরু।
আবির ছিল স্বভাবসিদ্ধ শান্ত, ভাবুক আর কিছুটা অন্তর্মুখী। সাহিত্য ও ছবির জগতে তার বসবাস। অন্যদিকে তিশা ছিল প্রানবন্ত,
উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং কিছুটা বাস্তববাদী। ভিন্ন দুটি জগতের মানুষ হয়েও দুজন দুজনকে ভালোবেসেছিল গভীর আবেগে। আবির ভাবত,
ভালোবাসাই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য, বাকি সব অনিত্য। তিশাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল তার স্বপ্নের নিজস্ব নিখিল।

কিন্তু সম্পর্কের বয়স যত বাড়তে লাগল, স্বপ্নের গায়ে বাস্তবতার আঁচড় কাটতে শুরু করল।
পড়ালেখা শেষ করে আবির যখন একটা ছোট প্রকাশনা সংস্থায় নিজের ভালোলাগার কাজটা বেছে নিল, তিশার দৃষ্টি তখন কর্পোরেট জগতের উঁচুতলায়।
তিশা চাইত জাঁকজমকপূর্ণ জীবন, সামাজিক প্রতিষ্ঠা আর দ্রুত সাফল্য। আবিরের সহজ-সরল জীবনযাপন তিশার কাছে দিন দিন মনে হতে লাগল স্থবিরতা।

শুরু হলো প্রচ্ছন্ন দূরত্ব। মেসেজে উত্তর পাওয়ার সময় দীর্ঘ হতে লাগল, ফোনের ওপাশের কণ্ঠে নেমে এল এক ধরনের যান্ত্রিক শীতলতা।
আবির ভেবেছিল হয়তো কাজের চাপ, কিন্তু মানুষ তো ভুল বুঝতে চায় না যখন তার হৃদয়ের গভীরে আগুনের আঁচ লাগে।
তিশার সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন বন্ধু, ব্যয়বহুল রেস্তোরাঁর ছবি আর পরিবর্তনশীল কথাবার্তা আবিরকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তিশা অন্য এক আকাশের খোঁজে ডানা মেলেছে।

আজ অনেক দিন পর তিশা নিজে থেকে ডেকেছে। আবির নদীর জলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দূরে বাঁশঝাড়ের পেছনে সূর্যটা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে।

"অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ?"

পিছন থেকে তিশার পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল। আবির ঘুরে দাঁড়াল। তিশাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যে আগের সেই মায়াময় স্পর্শটা অনুপস্থিত।
সেখানে এখন এক ধরনের কেতাবি আভিজাত্য।

"না, এই তো কিছুক্ষণ হলো," আবির মৃদু হেসে বলল।

দুজন বটগাছের বাঁধানো বেদিতে পাশাপাশি বসল। মাঝখানে বেশ কিছুটা শূন্যস্থান—যে শূন্যস্থানটা গত কয়েক মাসে অজান্তেই তৈরি হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। নদীর ওপার থেকে বাতাস এসে তিশার চুল উড়িয়ে দিয়ে গেল।

"আবির, আমাদের কিছু কথা বলা দরকার," নীরবতা ভাঙল তিশা। তার গলায় কোনো দ্বিধা নেই, বরং এক কঠিন স্পষ্টতা।

"বলো, শুনছি।"

"আমরা দুজনে হয়তো ভুল পথে হাঁটছি," তিশা সরাসরি আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। "আমাদের ভাবনা, আমাদের লক্ষ্য,
জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছুই আলাদা। আমি যে জীবনটা চাই, তুমি সেখানে স্বাচ্ছন্দ্য নও। আর তুমি যে বৃত্তে বাস করো, আমি সেখানে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছি না।"

আবির শান্ত হয়ে শুনছিল। সে জানত এই কথাটা একদিন আসবে, তবু শুনলে বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে যায়। "তুমি কি বলতে চাইছ তিশা?"

"আমি স্কলারশিপ পেয়ে বাইরে যাচ্ছি, আবির। আগামী মাসেই ফ্লাইট। আর... আমি মনে করি আমাদের এখানেই থামা উচিত।
এই সম্পর্কটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া মানে দুজনকেই কষ্ট দেওয়া।"

আবির নদীর দিকে মুখ ফেরাল। মরীচিকার মতো যা কিছু সে এত দিন ধরে আঁকড়ে ধরেছিল, তা একনিমেষে বালির প্রাসাদের মতো ভেঙে পড়ছে।
যে ভালোবাসাকে সে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি মনে করত, তা আজ তিশার কাছে কেবল একটা ভুলের তকমা পেল।

"তিশা, ভালোবাসা কি শুধু সব মিলের হিসেব? কিছু অমিল নিয়ে কি বাঁচা যায় না? আমি তো কখনো তোমার উড়ালে বাধা হইনি," আবিরের কণ্ঠে তীব্র করুণতা।

তিশা এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, "ভালোবাসা দিয়ে পেটের ক্ষুধা মেটে না, আবির। স্বপ্নেরও একটা দাম থাকে। আমি বাস্তবকে চিনি।
তুমি যাকে ভালোবাসা বলছ, তা হয়তো একটা মরীচিকা—যা দূর থেকে সত্য মনে হয়, কিন্তু কাছে গেলে কিছুই থাকে না।"

তিশার এই শেষ বাক্যটা আবিরের কাণে বার বার বাজতে লাগল—'ভালোবাসার মরীচিকা'।

তিশা উঠে দাঁড়াল। তার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। হয়তো সে অন্য কারও হাত ধরে বা অন্য কোনো স্বপ্নের পেছনে ছুটবে।
"ভালো থেকো, আবির। আশা করি তুমি একদিন আমাকে বুঝতে পারবে।"

তিশা হেঁটে চলে গেল। তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল সন্ধ্যার অন্ধকারে। আবির একা বসে রইল সেই বটগাছের নিচে।
অন্ধকার ঘন হয়ে নেমে এসেছে নদীর তীরে।

সে হাতের মুঠোয় নদী তীরের কিছু ভিজে বালি তুলে নিল। আঙুলের ফাঁক দিয়ে বালিগুলো ঝরে পড়তে লাগল জলস্রোতে।
আবির বুঝল, তিশা ভুল বলেনি। এক তরফা আবেগ আর কল্পনার ওপর ভর করে যে প্রাসাদ সে গড়েছিল, তা সত্যিই এক মরীচিকা ছিল।
মরীচিকা যেমন মরুভূমির তৃষ্ণার্ত পথিককে জলের মিথ্যা আশা দিয়ে টেনে নিয়ে যায়, তেমনি এই রূপকথার ভালোবাসাও তাকে জীবনের
কঠিন সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল।

চোখের একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল শুকনো মাটিতে। তবে এই জলের ভেতর কোনো ক্ষোভ ছিল না,
ছিল এক কঠিন সত্যকে মেনে নেওয়ার প্রশান্তি। আবির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মরীচিকার মোহ কেটে গেছে। এখন তাকে নিজের বাস্তবে ফিরতে হবে,
একা হলেও নিজের পথে হাঁটতে হবে। নদীর বাতাস তাকে ছুঁয়ে গেল—যেন নতুন এক ভোরের বার্তা নিয়ে।

৮০তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা এই মাটি শুধু আমাদের দেশ নয়, এ আমাদের ভালোবাসা, আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়।অসংখ্য মানুষের...
15/08/2026

৮০তম স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা
এই মাটি শুধু আমাদের দেশ নয়, এ আমাদের ভালোবাসা, আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়।
অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও আত্মবলিদানের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বাধীনতাকে হৃদয়ে ধারণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

চলুন, ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে গড়ে তুলি আরও শক্তিশালী, সুন্দর ও গর্বের ভারত। ❤️🇮🇳

জয় হিন্দ!
স্বাধীনতা দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা।

26/07/2026

রাত জাগা পূর্ণিমার চাঁদ
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

সেদিন ছিল আশ্বিনের শেষ পূর্ণিমা। গ্রামের মানুষ একে বলে ‘কোজাগরী’।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে দেবী লক্ষ্মী এসে ঘরে ঘরে ডাকেন—“কো জাগর্তি?”
অর্থাৎ, “কে জেগে আছো?” যারা জেগে থাকে, তাদের নাকি ভাগ্য খুলে যায়।

কিন্তু রূপসা গ্রামের বৃদ্ধ অবিনাশবাবুর কাছে এই রাত জাগার মানে কোনো ধনসম্পদের লোভ ছিল না।
তাঁর কাছে এই রাতটা ছিল এক টুকরো স্মৃতির কোলাজ আর এক অদ্ভুত একাকীত্বের উৎসব।

নিঃসঙ্গতার আঙিনায় একলা আলো

অবিনাশবাবুর বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই। এককালের নামকরা স্কুলের হেডমাস্টার মশাই এখন একেবারেই একা।
ছেলে সপরিবারে বহু দূরে, প্রবাসে ব্যস্ত। এক বছর আগে তাঁর সহধর্মিণী উমাও তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন না-ফেরার দেশে।
বিশাল পুরোনো জমিদারী ধাঁচের বাড়িটায় এখন শুধু অবিনাশবাবু আর তাঁর ছায়া।

সেদিন সন্ধে থেকেই আকাশে চাঁদের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। রাত যত গভীর হতে লাগল, চাঁদের আলো যেন আরও তীব্র,
আরও মায়াবী হয়ে উঠতে শুরু করল। অবিনাশবাবু তাঁর দোতলার চিলতে বারান্দায় এসে একটা পুরোনো আরামকেদারায় বসলেন।
তাঁর হাতে এক কাপ জুঁই ফুলের গন্ধ ছড়ানো লিকার চা।

বারান্দা থেকে পুরো গ্রামটা দেখা যায়। আলো-আঁধারির খেলায় চেনা গাছপালাগুলোকে কেমন যেন অচেনা রূপকথা বলে মনে হচ্ছিল।
বাঁশঝাড়ের মাথা ফুঁড়ে ওঠা পূর্ণিমার চাঁদটা যেন আজ রাতে একটু বেশিই বড়ো, একটু বেশিই উজ্জ্বল।

"কী রে অবিনাশ, আজও ঘুমোলি না?"

হঠাৎ অবিনাশবাবুর মনে হলো, ফিসফিস করে বাতাস যেন উমার গলায় এই কথাটাই বলে গেল।
উমা বেঁচে থাকতে প্রতি পূর্ণিমায় দুজনে এই বারান্দায় এসে বসতেন। উমা ভালোবাসতেন চাঁদের
আলোয় রূপোলী হয়ে যাওয়া শিউলি গাছের দিকে তাকিয়ে থাকতে, আর অবিনাশবাবু ভালোবাসতেন
উমার মুখের ওপর পড়া সেই চাঁদের আলোর খেলা দেখতে।

মাঝরাতের চেনা অতিথি

রাত যখন প্রায় বারোটা, চারপাশ নিঝুম। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক আর দূরে কোনো এক
নিশাচর পাখির ডানা ঝাপটানির শব্দ। ঠিক এমন সময় অবিনাশবাবু খেয়াল করলেন, বাড়ির সামনের
উঠোনে একটা ছোটো অবয়ব নড়াচড়া করছে।

চোখে চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে ভালো করে তাকালেন তিনি। ওমা, এ তো নীলু! পাড়ার খেটে খাওয়া
দিনমজুর কানাইয়ের দশ বছরের ছেলেটা। হাতে একটা ছেঁড়া প্লাস্টিকের থলি নিয়ে সে উঠোনের শিউলি
গাছটার নিচে নিচু হয়ে কী যেন খুঁজছে।

অবিনাশবাবু ওপর থেকেই মৃদু গলায় ডাকলেন, "নীলু? এত রাতে এখানে কী করছিস রে বাবা?"

নীলু চমকে ওপরে তাকাল। চাঁদের আলোয় তার নিষ্পাপ মুখটা চকচক করে উঠল। সে একটু লজ্জিত হয়ে বলল,
"দাদুভাই, মা বলেছিল কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে নাকি চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাওয়া শিউলি ফুল দিয়ে পুজো দিলে
সব দুঃখ দূর হয়ে যায়। মার খুব জ্বর দাদুভাই, তিনদিন ধরে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। তাই ভাবলাম..."

অবিনাশবাবুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। তিনি তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলেন। সদর দরজা খুলে উঠোনে এসে দাঁড়ালেন।

চাঁদের আলোয় ভাগ করে নেওয়া ওম

চাঁদের আলোয় তখন পুরো উঠোনটা যেন সাদা মখমলের চাদর দিয়ে ঢাকা। অবিনাশবাবু নীলুর মাথায় হাত রাখলেন।

"শুধু ফুল নিয়ে গেলে মা ভালো হয়ে যাবে? ডাক্তার দেখানো হয়েছে?" অবিনাশবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
নীলু মাথা নিচু করে বলল, "বাবা তো শহরে গেছে কাজের খোঁজে, এখনও ফেরেনি। পয়সা নেই দাদুভাই।"

অবিনাশবাবু আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না। ঘরের ভেতর থেকে নিজের চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিলেন,
আলমারি থেকে কিছু টাকা আর উমার রেখে যাওয়া কিছু জরুরি ওষুধ নিলেন। তারপর নীলুর হাত ধরে বললেন, "চল, তোর মার কাছে যাই।"

মাঝরাতে শান্ত, নিস্তব্ধ গ্রামের পথ ধরে হেঁটে চলেছেন এক বৃদ্ধ আর এক শিশু। আর মাথার ওপর থেকে ‘রাত জাগা পূর্ণিমার চাঁদ’
তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। চাঁদের সেই স্নিগ্ধ আলো যেন আজ শুধু সৌন্দর্য ছড়াচ্ছিল না, ছড়াচ্ছিল এক অদ্ভুত অভয়বাণী।

এক নতুন ভোরের অপেক্ষা

কানাইয়ের কুঁড়েঘরে যখন তাঁরা পৌঁছালেন, নীলুর মা তখন জ্বরে কাঁপছিলেন। অবিনাশবাবু পরম মমতায় তাঁর মাথায় হাত রাখলেন।
ওষুধ খাওয়ালেন, মাথায় জলপট্টি দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। নীলুকে বললেন, "ভয় পাস না রে, তোর মা ঠিক হয়ে যাবে। কাল সকালেই
আমি শহরের বড়ো ডাক্তারবাবুকে নিয়ে আসব।"

সারারাত অবিনাশবাবু সেই কুঁড়েঘরের দাওয়ায় বসে কাটালেন। তাঁর চোখ থেকে ঘুম উধাও। কিন্তু আজ তাঁর এই রাত জাগার
মধ্যে কোনো একাকীত্ব ছিল না, ছিল না কোনো হাহাকার।

ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করেছে, চাঁদের আলো তখন মলিন হয়ে আসছে। অবিনাশবাবু আকাশের দিকে তাকালেন।
পশ্চিম আকাশে বিদায়ী চাঁদটা যেন উমার মতোই চওড়া হাসিতে তাঁকে আশীর্বাদ করে বিদায় নিচ্ছে।

অবিনাশবাবু বুঝলেন, রাত জাগা পূর্ণিমার চাঁদ শুধু একলা মানুষের সঙ্গী নয়, সে আসলে ভালোবাসার, সেবার এবং ত্যাগের এক নীরব সাক্ষী।

অজানা পথে হেঁটে চলেছি তুমি আমিলেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তীমেঠো পথটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে এক ঘন অরণ...
05/07/2026

অজানা পথে হেঁটে চলেছি তুমি আমি
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

মেঠো পথটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে এক ঘন অরণ্য।
কোনো সরকারি মানচিত্রে এই বনের অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। দুপুরের চড়া আলোও এখানে এসে কেমন যেন ম্লান,
রহস্যময় সবুজ আভায় রূপ নিয়েছে।

আমি আর তুমি—দুজনে দাঁড়িয়ে আছি সেই মোহনায়। আমাদের পিঠে দুটো ভারী ব্যাকপ্যাক,
আর চোখে একরাশ ক্লান্তি মেশানো কৌতূহল। আমরা কেউ জানি না এই পথ কোথায় শেষ হয়েছে,
কিংবা আদেও এর কোনো শেষ আছে কি না। শুধু এটুকু জানি, চেনা শহরের চেনা কোলাহল,
নিয়মের বেড়াজাল আর কৃত্রিমতার দেয়াল ভেঙে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়েছি এক অজানা উদ্দেশ্যে।

অচেনার মুখোমুখি

"এখনো সময় আছে, ফিরে যাবে?" আমি তোমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলাম।

তুমি তোমার চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক করে বসিয়ে নিলে। তোমার চোখে তখন ভয়ের চেয়ে জেদ বেশি।
আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বললে, "যে পথের শেষ জানা থাকে, সেখানে রোমাঞ্চ কোথায়? চলো, অচেনাকেই আজ চিনে নেওয়া যাক।"

আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। শুকনো পাতার ওপর আমাদের পায়ের 'মচমচ' শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
চারপাশটা অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে কোনো অচেনা পাখির ডাক সেই নীরবতা ভেঙে দিচ্ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা কত কী যে কথা বলছিলাম! সেইসব কথা, যা শহরের ব্যস্ততায় কখনো বলাই হয়ে ওঠেনি।
আমরা আমাদের ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, মাঝরাতের গোপন ভয়, আর ভবিষ্যতের ধোঁয়াটে ভাবনার কথাগুলো একে
একে উজার করে দিচ্ছিলাম এই নির্জন প্রকৃতির কাছে। পথ যত এগোচ্ছিল, আমাদের ভেতরের জড়তাগুলোও যেন ঠিক ততটাই হালকা হয়ে আসছিল।

ঝড়ের পূর্বাভাস ও এক অদ্ভুত আশ্রয়

বিকেলের দিকে আকাশের মুখ ভার হলো। বনের ভেতরের আলো আরও কমে এলো। মেঘের ডাক জানান দিচ্ছিল—এক তুমুল বৃষ্টি ধেয়ে আসছে।
আমাদের কাছে কোনো তাঁবু ছিল না, তাই মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই খোঁজা জরুরি হয়ে পড়ল।

"ঐ দেখো!" তুমি আঙুল উঁচিয়ে দেখালে।

গাছের আড়ালে একটা পুরোনো, প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হওয়া পাথরের তৈরি প্রাচীন মন্দির বা কোনো কোয়ার্টার্স দাঁড়িয়ে আছে।
দেয়াল বেয়ে উঠেছে বুনো লতাগুল্ম। আমরা আর দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে তার বারান্দায় আশ্রয় নিলাম। ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল।

ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি পড়ছে, আর আমরা দুজনে সেই প্রাচীন বারান্দায় বসে আছি গা ঘেঁষে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল, তাই আমি ব্যাগ থেকে
একটা হালকা চাদর বের করে আমাদের দুজনের গায়ে জড়িয়ে দিলাম।

"জানিস," তুমি আমার কাঁধে মাথা রেখে বললে, "শহরে থাকলে এই বৃষ্টি দেখে হয়তো আমরা জ্যামের কথা ভাবতাম,
কিংবা অফিসের জানলা দিয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাতাম। কিন্তু আজ এই অজানা জায়গায় বৃষ্টিটা কত সুন্দর লাগছে, তাই না?"

আমি শুধু হাসলাম। তোমার ভেজা চুলের সুবাস আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছিল তখন।
পকেট থেকে বিস্কুটের প্যাকেট বার করে আমরা ভাগ করে খেলাম। সেই সাধারণ বিস্কুটটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার মনে হচ্ছিল।

নতুন সকালের আলো

রাতটা কাটল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বনের নিশাচর প্রাণীদের ডাক, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ—সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ।
কিন্তু আমরা দুজনে একসঙ্গে ছিলাম বলে ভয়টা ছুঁতে পারেনি।

পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন বনের রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বৃষ্টির পর গাছগুলো যেন আরও সবুজ, আরও সতেজ হয়ে উঠেছে।
পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে মাটিতে, ঠিক যেন সোনার গুঁড়ো ছড়ানো রয়েছে।

আমরা আবার আমাদের যাত্রা শুরু করলাম। পথটা এবার পাহাড়ি চড়াই-উতরাইয়ের দিকে এগোতে লাগল।
কোথাও পাথর টপকে যেতে হচ্ছে, কোথাও আবার বুনো ফুলের ঝোপ সরিয়ে পথ করে নিতে হচ্ছে। হাত ধরাধরি করে
আমরা একে অপরকে টেনে তুলছিলাম। যেখানে আমি ক্লান্ত হচ্ছিলাম, সেখানে তুমি আমাকে শক্তি দিচ্ছিলে
আর যেখানে তুমি থমকে দাঁড়াচ্ছিলে, সেখানে আমি তোমার ভরসা হচ্ছিলাম।

গন্তব্যহীন যাত্রার আনন্দ

দুপুরের দিকে আমরা এসে পৌঁছালাম এক পাহাড়ের চূড়ায়। সেখান থেকে নিচের দিকে তাকাতেই আমাদের চোখ জুড়িয়ে গেল।
বহুদূরে একটা পাহাড়ি নদী এঁকেবেঁকে চলে গেছে, আর চারিদিকে শুধু সবুজ পাহাড়ের ঢেউ। কোনো কোলাহল নেই, কোনো দূষণ নেই—শুধু এক পরম শান্তি।

আমরা বুঝতে পারলাম, এই পথটার হয়তো কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। কিন্তু এই যে পথ চলার আনন্দ,
প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজেদের আরও গভীরভাবে চিনতে পারা, এটাই তো আসল প্রাপ্তি।

তুমি আমার দিকে তাকিয়ে হাত দুটো ছড়িয়ে দিলে। মুক্ত বাতাস তোমার চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছিল। তুমি বললে, "আমরা বোধহয় পথ হারিয়ে ফেলেছি, তাই না?"

আমি তোমার হাতটা আবার নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম। দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বললাম, "হ্যাঁ, হয়তো হারিয়েছি।
কিন্তু এই অজানা পথে তোমার সাথে হারিয়ে যাওয়ার মাঝেই আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। এই পথ যেখানেই নিয়ে যাক না কেন, আমি হাঁটতে রাজি।"

আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এক অজানা পথে, এক নতুন সকালের দিকে—তুমি আর আমি, পাশাপাশি, একদম মুখোমুখি।

29/06/2026

আমার একলা আকাশ
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

‘আমার একলা আকাশ’— কথাটা নীলিমা বহু বছর ধরে নিজের ডায়রির পাতায় লিখে আসছে।
কিন্তু আজ যখন সে বহুতল আবাসনটার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিকেলের ম্লান হয়ে আসা রোদ্দুরটার দিকে তাকিয়ে আছে,
শব্দ তিনটে তার বুকে পাথরের মতো ভারী ঠেকল।

নীলিমা আর অনিমেষের বিয়ের বয়স কুড়ি বছর। ছেলে অনির্বাণ গত বছরই পড়াশোনার জন্য জার্মানি চলে গেছে।
ঘরটা খালি হওয়ার পর থেকেই নীলিমার ভেতরের একাকীত্বটা যেন আরও জাঁকিয়ে বসেছে। অনিমেষ কর্পোরেট
জগতের এক মস্ত বড়ো কর্মকর্তা। সকাল ন’টায় ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে বের হয়, ফেরে সেই রাত দশটায়। নীলিমার
দিন কাটে এক বিশাল, নিঃশব্দ ফ্ল্যাটে— চারটে দেওয়াল আর স্মৃতিদের সাথে কথা বলে।

একলা ঘরের সুর

নীলিমা একসময় খুব ভালো সেতার বাজাত। বিয়ের প্রথম কয়েক বছর অনিমেষ আগ্রহ নিয়ে শুনত,
প্রশংসা করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অনিমেষের ব্যস্ততা বাড়ল, আর নীলিমার সেতারটা একটা সুন্দর
কাপড়ে ঢাকা পড়ে আলমারির মাথায় উঠে গেল।

সেদিন ছিল নীলিমার পঁয়তাল্লিশতম জন্মদিন। অনিমেষ সকালে তাড়াহুড়ো করে বেরনোর সময় কপালে
একটা আলতো চুমু খেয়ে বলল, "হ্যাপি বার্থডে নীলু! আজ একটা খুব ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে, ফিরতে দেরি হবে।
তুমি নিজের মতো করে একটু সেলিব্রেট করে নিও।"

নিজের মতো করে সেলিব্রেট করা! নীলিমা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। চুলে দু-একটা রুপোলি রেখা,
চোখের কোণে হালকা ক্লান্তির ভাঁজ। সে ভাবল, আজ সে নিজেই নিজের একলা আকাশটাকে একটু রাঙিয়ে তুলবে।

বিকেলের দিকে আলমারির ওপর থেকে ধুলোবালি ঝেড়ে সেতারটা নামাল সে। বহু বছর পর তার আঙুলগুলো তারের
ওপর পড়তেই একটা চেনা শিহরন খেলে গেল। সে সুর সাধতে বসল। রাগ 'ইমন'-এর চেনা তানগুলো যখন ঘরের
কোণে ভেসে বেড়াতে লাগল, নীলিমার মনে হলো সে যেন বহু বছর পর প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারছে।

এক নতুন বসন্তের খোঁজ

পরদিন নীলিমা একটা বড় সিদ্ধান্ত নিল। সে তার একলা আকাশটাকে শুধু বিষণ্ণতার মেঘ দিয়ে ঢেকে রাখবে না।
সে পাড়ার একটা সমাজসেবী সংস্থায় যোগাযোগ করল, যেখানে অনাথ বাচ্চাদের গান ও মিউজিক শেখানো হয়।

প্রথম দিন যখন নীলিমা সেখানে গেল, আট-দশটা বাচ্চা তাকে ঘিরে ধরল। তাদের চোখে এক অদ্ভুত খিদে— ভালোবাসার খিদে,
সুরের খিদে। নীলিমা যখন তাদের সামনে সেতারের তারে প্রথম ঝংকার তুলল, বাচ্চাগুলোর চোখগুলো বিস্ময়ে চকচক করে উঠল।

ছয় বছরের একটা ছোট্ট মেয়ে, নাম তার মিনি। সে গুটিগুটি পায়ে নীলিমার কাছে এসে বলল, "দিদিমণি, তুমি আমাকে এই সুরটা শেখাবে?
আমার না খুব একা লাগে রাতে, এই সুরটা শুনলে মনে হয় মা পাশে বসে আছে।"

মিনির কথা শুনে নীলিমার চোখে জল এসে গেল। সে বুঝল, একা শুধু সে নয়; এই পৃথিবীতে
কত শত একলা আকাশ ছড়িয়ে আছে, যারা একটুখানি আলোর খোঁজ করছে।

মেঘ কেটে রোদ

দেখতে দেখতে ছ’টা মাস কেটে গেল। নীলিমার রুটিন এখন বদলে গেছে। দুপুর হলেই সে সেতার কাঁধে বেরিয়ে পড়ে।
তার চারপাশের চেনা বিষণ্ণতা কেটে গেছে, এখন তার মুখে সবসময় একটা তৃপ্তির হাসি লেগে থাকে।

একদিন রাতে অনিমেষ ড্রইংরুমে বসে কফি খাচ্ছিল। নীলিমা তখন গুনগুন করে একটা সুর ভাঁজছিল।
অনিমেষ হঠাৎ বলল, "জানো নীলু, অনেকদিন পর তোমাকে এত খুশি দেখছি। অনির্বাণ চলে যাওয়ার পর
আমি খুব চিন্তায় ছিলাম তোমাকে নিয়ে। কিন্তু ইদানীং তোমার মধ্যে একটা অন্যরকম এনার্জি দেখতে পাচ্ছি।"

নীলিমা হাসল। সে অনিমেষের পাশে বসে তার হাতটা ধরে বলল, "আমি আসলে আমার একলা আকাশটাকে চিনতে পেরেছি, অনিমেষ।
এতদিন ভাবতাম তুমি ব্যস্ত, ছেলে দূরে, তাই আমার আকাশটা শূন্য। কিন্তু এখন বুঝেছি, আকাশের কাজই হলো নিজেকে মেলে ধরা।
আমি আমার সেই শূন্য আকাশে সুরের পাখি উড়িয়ে দিয়েছি।"

অনিমেষ অবাক হয়ে নীলিমার দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, তার স্ত্রী নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের জগৎ খুঁজে নিয়েছে।
সে নীলিমার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, "আমাকে মাফ করে দিও নীলু, আমি তোমাকে সময় দিতে পারিনি।
কিন্তু আমি খুব গর্বিত তোমার জন্য।"

মুক্তির আকাশ

আজ রবীন্দ্রসদনে সেই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের একটা অনুষ্ঠান। নীলিমা আর তার এক ঝাঁক বাচ্চা মঞ্চে বসেছে।
ব্যাকড্রপে বড় বড় অক্ষরে লেখা— 'আমার একলা আকাশ'।

নীলিমা যখন সেতারে শেষ তানটা তুলল আর বাচ্চাগুলো সমবেত কণ্ঠে গেয়ে উঠল, তখন অডিটোরিয়াম হাততালিতে ফেটে পড়ল।
দর্শকদের প্রথম সারিতে বসে অনিমেষ দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে, তার চোখে জল।

অনুষ্ঠান শেষে নীলিমা যখন গ্রিনরুমের জানলা দিয়ে রাতের খোলা আকাশের দিকে তাকাল, তখন আর তার নিজেকে একলা মনে হলো না।
আজ তার আকাশটা আর খাঁচায় বন্দি নয়; তা আজ সুরের ডানায় ভর করে মুক্ত, বিশাল আর আলোয় আলোকময়।

নিখোঁজ আমিলেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী"নিখোঁজ আমি"—এই কথাটি মনের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা আর রহস্যের জন্ম দেয়। নিখোঁজ হওয়...
14/06/2026

নিখোঁজ আমি

লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

"নিখোঁজ আমি"—এই কথাটি মনের ভেতর একটা অদ্ভুত
শূন্যতা আর রহস্যের জন্ম দেয়। নিখোঁজ হওয়া মানেই তো শুধু সশরীরে হারিয়ে যাওয়া নয়,
কখনো কখনো নিজের চেনা শহরের ভিড়ে, নিজেরই তৈরি করা গোলকধাঁধায় মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে।

একটি অচেনা সকাল
সকাল সাড়ে সাতটা। অ্যালার্মের কর্কশ আওয়াজে অর্কর যখন ঘুম ভাঙল,
তখন বাইরের আকাশটা বেশ মেঘলা। প্রতিদিনের মতো আজও টেবিলে চায়ের কাপটা থাকার কথা ছিল,
কিন্তু ঘরটা অদ্ভুত রকমের নিঝুম। অর্ক বিছানা ছেড়ে উঠে ড্রয়িংরুমে গেল। কোথাও কেউ নেই।
তার স্ত্রী অনন্যা বা দশ বছরের মেয়ে পিউ—কারো কোনো সাড়া শব্দ নেই।

রান্নাঘরে গিয়ে দেখল কাল রাতের ধুয়ে রাখা বাসনগুলো যেমনকার তেমনই পড়ে আছে।
অর্ক একটু অবাক হলো। অনন্যা এত বেলা পর্যন্ত ঘুমানোর মানুষ নয়। সে বেডরুমে ফিরে গিয়ে অনন্যার ফোনে রিং করল।
ড্রয়ারের ভেতর থেকেই ফোনটা বেজে উঠল। অনন্যা ফোন ফেলেই চলে গেছে?

অর্ক আলমারিটা খুলল। অনন্যার প্রিয় শাড়িগুলো, পিউয়ের স্কুলের ব্যাগ—সব যথাস্থানে আছে।
আলমারির লকারও অক্ষত। তার মানে তারা স্বেচ্ছায় কোথাও যায়নি। অর্কর বুকের ভেতরটা হঠাৎ
একটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে তাড়াহুড়ো করে নিচে নেমে ফ্ল্যাটের দারোয়ান রামসিংকে
জিজ্ঞেস করল, "রামসিং, বৌদি আর পিউকে সকালে বেরোতে দেখেছ?"

রামসিং খৈনি ডলতে ডলতে অবাক হয়ে অর্কর দিকে তাকাল। তারপর বলল, "কৌন বৌদি অর্কবাবু?
আপ তো ইয়ে ফ্ল্যাট মে আকেলে হি রেহতে হ্যায়। তিন সাল সে দেখ রহা হুঁ আপকো।"

রামসিংয়ের কথা শুনে অর্কর মাথার ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে রইল।
রামসিং রসিকতা করছে? কিন্তু রামসিংয়ের চোখে কোনো কৌতুকের আভাস নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত করুণা মিশ্রিত দৃষ্টি।

মুছে যাওয়া অতীত
অর্ক মরিয়া হয়ে ওপরে ছুটে এল। ড্রয়ার থেকে অনন্যার ফোনটা বের করল।
পাসকোড দিয়ে লক খুলতেই তার হাত কাঁপতে লাগল। ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে কোনো 'অনন্যা' বা 'মা' বলে নম্বর নেই।
গ্যালারি খুলতেই অর্কর মাথা ঘুরতে লাগল। সেখানে অজস্র ছবি, কিন্তু প্রতিটা ছবিতে শুধু অর্ক একাই দাঁড়িয়ে আছে।
তাজমহলের সামনে, পাহাড়ে, রেস্তোরাঁয়—যেসব জায়গায় সে অনন্যা আর পিউকে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে আজ ছবিতে সে সম্পূর্ণ একা।
অনন্যার হাসিমুখ কিংবা পিউয়ের দুষ্টুমি ভরা চোখগুলো ছবি থেকে কেউ যেন নিখুঁতভাবে মুছে দিয়েছে।

"এটা অসম্ভব! আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি!" অর্ক চিৎকার করে উঠল।

সে তার ল্যাপটপটা খুলল। অর্ক পেশায় একজন গ্রাফিক ডিজাইনার। সে তার কাজের ফোল্ডারগুলো খুঁজতে লাগল।
গত মাসেই সে পিউয়ের জন্মদিনের একটা সুন্দর কোলাজ তৈরি করেছিল।
ফোল্ডারটা খুলতেই দেখল, সেখানে শুধু একটা প্লেইন ব্যাকগ্রাউন্ড পড়ে আছে, কোনো মানুষের ছবি নেই।

পাগলের মতো অর্ক তার শ্বশুরবাড়িতে ফোন করল। অনন্যার ভাই ফোন ধরতেই অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
"শুভদীপ, অনন্যা আর পিউকে খুঁজে পাচ্ছি না। ওরা কি তোমাদের ওখানে গেছে? রামসিং বলছে আমি নাকি একা থাকি!"

ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। তারপর শুভদীপ বলল, "ভাই সাহেব, আপনি কি কোনো ভুল নম্বরে ফোন করেছেন?
আমি শুভদীপ ঠিকই, কিন্তু আমার অনন্যা নামে কোনো বোন নেই। আর আপনি কে?"

লাইনটা কেটে গেল। অর্ক ধপ করে চেয়ারটায় বসে পড়ল। তার চারপাশের চেনা
পৃথিবীটা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এক চরম অচেনা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

দেওয়ালে পিঠ

অর্ক নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। যদি সবাই তাকে অস্বীকার করে,
তবে সে আইনের সাহায্য নেবে। সে সোজাসুজি থানায় হাজির হলো।
ডিউটি অফিসার সায়ন্তনবাবু অর্কর বিবরণ শুনে একটা ডায়েরি বের করলেন।

"আপনার নাম অর্ক সেনগুপ্ত? বয়স চৌত্রিশ?" সায়ন্তনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
"হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমার স্ত্রী আর মেয়ে আজ সকাল থেকে নিখোঁজ।"
সায়ন্তনবাবু কম্পিউটারে কিছু একটা টাইপ করলেন। তারপর চশমাটা নাক থেকে
নামিয়ে অর্কর দিকে তাকালেন। "মিঃ সেনগুপ্ত, আমাদের সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী আপনার বিয়েই হয়নি।
আপনি অবিবাহিত। আর আজ থেকে ঠিক এক সপ্তাহ আগে আপনার ফ্ল্যাটের মালিক থানায় একটা জিডি করেছিলেন যে আপনি নিখোঁজ।"

অর্ক স্তম্ভিত হয়ে গেল। "আমি নিখোঁজ? আমি তো আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি!"

"সেটাই তো আশ্চর্যের," সায়ন্তনবাবু গম্ভীর গলায় বললেন। "রেকর্ড বলছে অর্ক সেনগুপ্ত
গত সাতদিন ধরে নিখোঁজ। আর আপনি যাকে স্ত্রী-কন্যা বলছেন, তাদের কোনো অস্তিত্বই এই পৃথিবীতে নেই।
আপনি কি কোনো মানসিক অবসাদে ভুগছেন?"

অর্ক আর সেখানে দাঁড়াল না। সে থানা থেকে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এল। রাস্তাঘাটে চেনা মানুষগুলো
তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছে। চেনা শহরটা তাকে এক লহমায় পর করে দিয়েছে।

আয়নার মুখোমুখি
বিকেলের দিকে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অর্ক তার ফ্ল্যাটে ফিরে এল। ঘরটা এখন আরো বেশি অন্ধকার,
আরো বেশি নিঃসঙ্গ ঠেকছে। সে বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিল। তারপর যখন আয়নার দিকে তাকাল,
তখন তার হৃদপিণ্ডটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

আয়নায় কোনো প্রতিবিম্ব নেই!

সে হাত বাড়িয়ে আয়নাটা ছুঁল। কাচটা ঠান্ডা, কিন্তু সেখানে অর্কর অবয়ব দেখা যাচ্ছে না।
অর্ক বুঝতে পারল, নিখোঁজ আসলে অনন্যা বা পিউ হয়নি। নিখোঁজ হয়ে গেছে সে নিজে।

সে ড্রয়িংরুমের টেবিলে এসে বসল। টেবিলে একটা ধুলো জমা ডায়েরি পড়ে থাকতে দেখল,
যেটা সে আগে কখনো খেয়াল করেনি। ডায়েরিটা খুলতেই অর্কর নিজের হাতের লেখা ভেসে উঠল।
পাতাগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে অর্কর চোখের সামনে এক নির্মম সত্য উন্মোচিত হতে লাগল।

ডায়েরির পাতায় লেখা:

"আজ তিন বছর হলো অনন্যা আর পিউ একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
এই ফাঁকা ফ্ল্যাটে আমি আর নিতে পারছি না। প্রতিদিন গ্রাফিক্সে মানুষের ছবি এডিট করতে করতে ভাবি,
ইশ! যদি নিজের জীবনটাকেও এডিট করা যেত। যদি একটা কাল্পনিক দুনিয়া তৈরি করে সেখানে অনন্যা আর পিউকে বাঁচিয়ে রাখা যেত..."

সত্যের আলো
স্মৃতির অবরুদ্ধ কপাটটা এক ঝটকায় খুলে গেল। অর্কর মনে পড়ল তিন বছর আগের
সেই অভিশপ্ত রাতের কথা। এক লরিতে ধাক্কা লেগে তার সাজানো সংসার শেষ হয়ে গিয়েছিল।
অর্ক সেই ধাক্কা সামলাতে পারেনি। সে তীব্র মানসিক অবসাদে চলে গিয়েছিল। নিজের একাকিত্ব ঢাকতে সে
নিজের মনের ভেতর এক অবাস্তব সমান্তরাল পৃথিবী তৈরি করেছিল, যেখানে অনন্যা আর পিউ বেঁচে ছিল।
সে প্রতিদিন সকালে উঠে অবাস্তব অনন্যার সাথে কথা বলত, পিউকে স্কুলে পাঠানোর অভিনয় করত।

আর আজ? ডাক্তারদের দেওয়া কড়া ওষুধ আর চিকিৎসার ফলে তার মনের সেই কাল্পনিক জগৎটা ভেঙে
চুরমার হয়ে গেছে। তার মন আজ সত্যকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
তাই অনন্যা আর পিউ তার জীবন থেকে চিরতরে 'নিখোঁজ' হয়ে গেছে।

কিন্তু আয়নায় তার নিজের ছবি দেখা যাচ্ছিল না কেন?

অর্ক এবার বুঝতে পারল। গত তিন বছর ধরে সে নিজের আসল অস্তিত্বকে
লুকিয়ে রেখেছিল এক মিথ্যে অভিনয়ের আড়ালে। সে নিজে এতকাল নিখোঁজ
ছিল তার নিজেরই চেতনার আড়ালে।

জানলার বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অর্ক ডায়েরিটা বন্ধ করল। সে এবার আয়নার সামনে গিয়ে আবার দাঁড়াল।
এবার কাচের আবছা অন্ধকারে একটা অবয়ব ফুটে উঠল—একটু রোগা, চোখের নিচে কালি পড়া, কিন্তু বাস্তব একটা মানুষ।
অর্ক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখ থেকে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার। অনন্যা আর পিউ আর কখনো ফিরবে না,
কিন্তু আজ থেকে অর্ক আর নিখোঁজ নয়। সে নিজেকে খুঁজে পেয়েছে, এক নির্মম কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর বুকে।

কৃষ্ণচূড়া ফুল ও অনুরাধার গল্প।লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী    রোদ-ঝলসানো বৈশাখের দুপুরে চারপাশ যখন খাঁ খাঁ করত, তখন অনুর...
12/06/2026

কৃষ্ণচূড়া ফুল ও অনুরাধার গল্প।
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী

রোদ-ঝলসানো বৈশাখের দুপুরে চারপাশ যখন খাঁ খাঁ করত,
তখন অনুরাধার জানালার বাইরে ঠিক যেন একটা আগুন লেগে যেত। রক্তিম আগুন।
ওদের বাড়ির ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল এক বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ।
বৈশাখ আসতেই সবুজ পাতা ছাপিয়ে সেখানে অলৌকিক লাল রঙের মেলা বসত।

অনুরাধার জীবনটা কৃষ্ণচূড়ার চেয়ে একদম আলাদা ছিল।
সে শান্ত, চশমার আড়ালে চোখ লুকিয়ে রাখা এক চড়ুই পাখির মতো মেয়ে।
ভিড় এড়িয়ে চলা, গুটিয়ে থাকাটাই ছিল তার স্বভাব। অথচ, তার মনের ভেতরের ক্যানভাসটা ছিল কৃষ্ণচূড়ার মতোই রঙিন।
সে ডায়েরির পাতায় কবিতা লিখত, ক্যানভাসে রঙ ছড়াত, কিন্তু সেসব দেখার বা বোঝার মতো কেউ ছিল না।

সবাই তাকে বলত, "মেয়েটা বড্ড ফ্যাকাশে, কোনো তেজ নেই।"
একদিন বিকেলে চারদিক কালো করে হুড়মুড়িয়ে এলো কালবৈশাখী ঝড়। একটা শান্তির স্পর্শ দিয়ে গেল শহরের বুকে।

ঝড় থামলে অনুরাধা তার চেনা জানালায় এসে দাঁড়াল। বাইরে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
ঝড়ের দাপটে কৃষ্ণচূড়ার অজস্র লাল ফুল ঝরে পড়ে রাস্তাটাকে যেন একটা লাল গালিচায় পরিণত করেছে।
আর সেই চত্বরে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক পরম যত্নে মাটি থেকে আস্ত কিছু ফুল কুড়িয়ে নিচ্ছেন।

অনুরাধা নিচে নেমে গেল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "দাদু, এত ঝরা ফুল দিয়ে কী করবেন?"
বৃদ্ধ হেসে অনুরাধার দিকে তাকালেন। বললেন, "মা রে, লোকে ভাবে ঝরে গেছে মানেই বুঝি শেষ। কিন্তু এই কৃষ্ণচূড়া যখন ঝরে পড়ে,
তখনও সে চারপাশটাকে সুন্দর করে দিয়ে যায়। এর ঝরে যাওয়ার মধ্যেও একটা অদ্ভুত অহংকার আছে, একটা তেজ আছে। কৃষ্ণচূড়া কখনো মলিন হতে জানে না।"
বৃদ্ধের কথাগুলো অনুরাধার বুকের গভীরে কোথায় যেন গিয়ে লাগল। সে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই তো! পায়ের নিচে পিষে যাওয়ার পরেও ফুলগুলোর লাল রঙ যেন একটুও কমেনি।

সেই বিকেলের পর থেকে অনুরাধার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেল। সে ভাবল,
সে কেন নিজেকে গুটিয়ে রাখবে? জীবনের ঝড়-ঝাপটা তো আসবেই, কিন্তু কৃষ্ণচূড়ার মতো তাকেও নিজের ভেতরের রঙটা বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
রাতে সেই বৃদ্ধের কথা গুলো আবার মনে পড়লো। এবার সে মনস্থির করলো নিজেকে বদলাতে হবে। নতুন ভোরে সে এক নতুন জীবন শুরু করবে।

পরদিন সে তার ডায়েরির পাতা থেকে কবিতাগুলো বের করল।
নিজের আঁকা ছবিগুলো নিয়ে শহরের একটা ছোট প্রদর্শনীতে অংশ নিল। মানুষ অবাক হয়ে দেখল, যে মেয়েটাকে তারা 'ফ্যাকাশে' ভাবত, তার ভেতরের জগতটা কতটা রঙিন!
কয়েক বছর পর, অনুরাধা যখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তখন সে আর সেই চশমা পরা, ভয়ে গুটিয়ে থাকা মেয়েটি নয়। এখন তার পরনে থাকে লাল শাড়ি, চোখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।

আজও বৈশাখ এসেছে। অনুরাধা তার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। কৃষ্ণচূড়া গাছটা একইভাবে লালে লাল হয়ে হাসছে।
অনুরাধা একটা হাত বাড়িয়ে দিল জানালার বাইরে। বাতাস এসে একটা টকটকে লাল কৃষ্ণচূড়া ফুল তার হাতের তালুতে ফেলে দিল।

অনুরাধা হাসল। সে বুঝতে পেরেছে, কৃষ্ণচূড়া শুধু একটা ফুল নয়—ওটা আসলে নিজের শর্তে, মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখার একটা মন্ত্র।

Address

Garia, Boral
Kolkata
7000103

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Golper Asore. গল্পের আসরে। posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Golper Asore. গল্পের আসরে।:

Shortcuts

Share