05/07/2026
অজানা পথে হেঁটে চলেছি তুমি আমি
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী
মেঠো পথটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে শুরু হয়েছে এক ঘন অরণ্য।
কোনো সরকারি মানচিত্রে এই বনের অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। দুপুরের চড়া আলোও এখানে এসে কেমন যেন ম্লান,
রহস্যময় সবুজ আভায় রূপ নিয়েছে।
আমি আর তুমি—দুজনে দাঁড়িয়ে আছি সেই মোহনায়। আমাদের পিঠে দুটো ভারী ব্যাকপ্যাক,
আর চোখে একরাশ ক্লান্তি মেশানো কৌতূহল। আমরা কেউ জানি না এই পথ কোথায় শেষ হয়েছে,
কিংবা আদেও এর কোনো শেষ আছে কি না। শুধু এটুকু জানি, চেনা শহরের চেনা কোলাহল,
নিয়মের বেড়াজাল আর কৃত্রিমতার দেয়াল ভেঙে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়েছি এক অজানা উদ্দেশ্যে।
অচেনার মুখোমুখি
"এখনো সময় আছে, ফিরে যাবে?" আমি তোমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলাম।
তুমি তোমার চশমাটা নাকের ওপর ঠিকঠাক করে বসিয়ে নিলে। তোমার চোখে তখন ভয়ের চেয়ে জেদ বেশি।
আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বললে, "যে পথের শেষ জানা থাকে, সেখানে রোমাঞ্চ কোথায়? চলো, অচেনাকেই আজ চিনে নেওয়া যাক।"
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। শুকনো পাতার ওপর আমাদের পায়ের 'মচমচ' শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
চারপাশটা অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে কোনো অচেনা পাখির ডাক সেই নীরবতা ভেঙে দিচ্ছিল।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা কত কী যে কথা বলছিলাম! সেইসব কথা, যা শহরের ব্যস্ততায় কখনো বলাই হয়ে ওঠেনি।
আমরা আমাদের ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, মাঝরাতের গোপন ভয়, আর ভবিষ্যতের ধোঁয়াটে ভাবনার কথাগুলো একে
একে উজার করে দিচ্ছিলাম এই নির্জন প্রকৃতির কাছে। পথ যত এগোচ্ছিল, আমাদের ভেতরের জড়তাগুলোও যেন ঠিক ততটাই হালকা হয়ে আসছিল।
ঝড়ের পূর্বাভাস ও এক অদ্ভুত আশ্রয়
বিকেলের দিকে আকাশের মুখ ভার হলো। বনের ভেতরের আলো আরও কমে এলো। মেঘের ডাক জানান দিচ্ছিল—এক তুমুল বৃষ্টি ধেয়ে আসছে।
আমাদের কাছে কোনো তাঁবু ছিল না, তাই মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই খোঁজা জরুরি হয়ে পড়ল।
"ঐ দেখো!" তুমি আঙুল উঁচিয়ে দেখালে।
গাছের আড়ালে একটা পুরোনো, প্রায় ধ্বংসাবশেষে পরিণত হওয়া পাথরের তৈরি প্রাচীন মন্দির বা কোনো কোয়ার্টার্স দাঁড়িয়ে আছে।
দেয়াল বেয়ে উঠেছে বুনো লতাগুল্ম। আমরা আর দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে তার বারান্দায় আশ্রয় নিলাম। ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল।
ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি পড়ছে, আর আমরা দুজনে সেই প্রাচীন বারান্দায় বসে আছি গা ঘেঁষে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল, তাই আমি ব্যাগ থেকে
একটা হালকা চাদর বের করে আমাদের দুজনের গায়ে জড়িয়ে দিলাম।
"জানিস," তুমি আমার কাঁধে মাথা রেখে বললে, "শহরে থাকলে এই বৃষ্টি দেখে হয়তো আমরা জ্যামের কথা ভাবতাম,
কিংবা অফিসের জানলা দিয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাতাম। কিন্তু আজ এই অজানা জায়গায় বৃষ্টিটা কত সুন্দর লাগছে, তাই না?"
আমি শুধু হাসলাম। তোমার ভেজা চুলের সুবাস আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছিল তখন।
পকেট থেকে বিস্কুটের প্যাকেট বার করে আমরা ভাগ করে খেলাম। সেই সাধারণ বিস্কুটটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার মনে হচ্ছিল।
নতুন সকালের আলো
রাতটা কাটল এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বনের নিশাচর প্রাণীদের ডাক, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ—সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ।
কিন্তু আমরা দুজনে একসঙ্গে ছিলাম বলে ভয়টা ছুঁতে পারেনি।
পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল, তখন বনের রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বৃষ্টির পর গাছগুলো যেন আরও সবুজ, আরও সতেজ হয়ে উঠেছে।
পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে মাটিতে, ঠিক যেন সোনার গুঁড়ো ছড়ানো রয়েছে।
আমরা আবার আমাদের যাত্রা শুরু করলাম। পথটা এবার পাহাড়ি চড়াই-উতরাইয়ের দিকে এগোতে লাগল।
কোথাও পাথর টপকে যেতে হচ্ছে, কোথাও আবার বুনো ফুলের ঝোপ সরিয়ে পথ করে নিতে হচ্ছে। হাত ধরাধরি করে
আমরা একে অপরকে টেনে তুলছিলাম। যেখানে আমি ক্লান্ত হচ্ছিলাম, সেখানে তুমি আমাকে শক্তি দিচ্ছিলে
আর যেখানে তুমি থমকে দাঁড়াচ্ছিলে, সেখানে আমি তোমার ভরসা হচ্ছিলাম।
গন্তব্যহীন যাত্রার আনন্দ
দুপুরের দিকে আমরা এসে পৌঁছালাম এক পাহাড়ের চূড়ায়। সেখান থেকে নিচের দিকে তাকাতেই আমাদের চোখ জুড়িয়ে গেল।
বহুদূরে একটা পাহাড়ি নদী এঁকেবেঁকে চলে গেছে, আর চারিদিকে শুধু সবুজ পাহাড়ের ঢেউ। কোনো কোলাহল নেই, কোনো দূষণ নেই—শুধু এক পরম শান্তি।
আমরা বুঝতে পারলাম, এই পথটার হয়তো কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। কিন্তু এই যে পথ চলার আনন্দ,
প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজেদের আরও গভীরভাবে চিনতে পারা, এটাই তো আসল প্রাপ্তি।
তুমি আমার দিকে তাকিয়ে হাত দুটো ছড়িয়ে দিলে। মুক্ত বাতাস তোমার চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছিল। তুমি বললে, "আমরা বোধহয় পথ হারিয়ে ফেলেছি, তাই না?"
আমি তোমার হাতটা আবার নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম। দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে বললাম, "হ্যাঁ, হয়তো হারিয়েছি।
কিন্তু এই অজানা পথে তোমার সাথে হারিয়ে যাওয়ার মাঝেই আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। এই পথ যেখানেই নিয়ে যাক না কেন, আমি হাঁটতে রাজি।"
আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এক অজানা পথে, এক নতুন সকালের দিকে—তুমি আর আমি, পাশাপাশি, একদম মুখোমুখি।