28/12/2025
#এক চিমটে সিঁদুর
কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী
অধ্যায় ৮ — ফিরে দেখা
বছর পেরিয়ে গেছে প্রায় সাতটি।
সময় তার নিজের নিয়মে অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।
অরিন্দম এখন শহরের এক নামী বিজ্ঞাপন সংস্থায় ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর,
চোখে চশমা, মুখে পরিণত নীরবতা।
অন্যদিকে মেঘলা এখন এক মাধ্যমিক স্কুলের বাংলা শিক্ষিকা—
ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসায় ঘেরা,
কিন্তু নিজের ভিতর গভীরে লুকিয়ে রাখা এক শূন্যতা নিয়ে বেঁচে আছে।
🏫 এক অদ্ভুত দিন
সেই দিনটা ছিল এক সাহিত্য উৎসবের।
কলকাতার এক নামী স্কুলে আয়োজন—
“সমসাময়িক বাংলা গল্প ও কবিতা” নিয়ে।
অরিন্দমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল অতিথি বক্তা হিসেবে,
আর মেঘলাকে শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে।
কেউ জানত না,
এই অনুষ্ঠানে সময়ের চাকা ঘুরে যাবে নিঃশব্দে।
🎤 প্রথম দেখা
অডিটোরিয়ামে আলো ম্লান।
অরিন্দম মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিচ্ছে—
কীভাবে ভালোবাসা, স্মৃতি আর সময়ের মধ্যে
সৃষ্টিশীলতা জন্ম নেয়।
মেঘলা তখন দর্শকসারিতে বসে,
কিন্তু বক্তার কণ্ঠ শুনেই তার বুক কেঁপে উঠল।
এই কণ্ঠ সে চেনে—
বছরের পর বছর কেটে গেলেও,
এই সুর, এই থেমে থেমে বলা শব্দগুলো ভুলে থাকা যায় না।
অরিন্দমও বক্তৃতার মাঝেই হঠাৎ চোখে পড়ল এক মুখ—
সেই পরিচিত নরম চোখদুটি,
যা একদিন নদীর ধারে বসে তার দিকে তাকিয়েছিল।
তার গলা শুকিয়ে গেল,
কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য।
🌦️ অনুষ্ঠান শেষে
ভিড় কমে এলে করিডরে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা।
অরিন্দম ধীরে ধীরে এগিয়ে এল তার দিকে।
বহু বছর পর চোখে চোখ পড়ল—
না কোনো উচ্ছ্বাস, না কান্না—
শুধু এক নিঃশব্দ শান্তি।
মেঘলা মৃদু গলায় বলল,
“তুমি বদলে গেছ।”
অরিন্দম হেসে বলল,
“তুইও।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর অরিন্দম বলল,
“তুই ভালো আছিস?”
“ভালো,” মেঘলা উত্তর দিল,
কিন্তু চোখের কোণে যেন একটা পুরনো নদী বইছে এখনও।
☕ এক কাপ চা
তারা কাছের এক কফি শপে বসল।
কথা হলো সাধারণ— কাজ, শহর, জীবন।
তবু প্রতিটি শব্দের ভেতরে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য অনুচ্চারিত বাক্য।
অরিন্দম বলল,
“তুই এখনও লিখিস?”
মেঘলা মৃদু হাসল,
“লিখি। তবে কারও কাছে পাঠাই না।”
অরিন্দমের চোখে নরম হাসি,
“আমিও।”
দুজনেই হেসে উঠল একসঙ্গে।
হাসির মাঝেই যেন ফিরে এল সেই কলেজের দিনগুলো—
নদীর ধারে বসা, চাঁদের আলোয় কথা বলা,
এক চিমটে সিঁদুরের প্রতিশ্রুতি।
💔 মেঘলার সত্য
কফির শেষ চুমুকে মেঘলা শান্ত কণ্ঠে বলল,
“অরিন্দম, আমি বিয়ে করিনি।
মা-বাবা চেয়েছিল, কিন্তু পারিনি।
কোনও সম্পর্কে যেতেও ভয় লেগেছে।
কারণ জানি, আমার ভিতর এখনও কেউ আছে।”
অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আমিও কাউকে বিয়ে করিনি, মেঘলা।
আমি ভেবেছিলাম, যদি সত্যিই ভালোবাসা থাকে,
তবে সময়ও সেটা মুছে দিতে পারবে না।”
দুজনেই চুপ।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে হালকা, জানালার কাঁচে ফোঁটা ফোঁটা জল।
🌧️ সেই এক চিমটে সিঁদুর
মেঘলা ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট শিশি বের করল—
পুরনো, কিন্তু অটুট।
“তুই চিনতে পারবি এটা?”
অরিন্দম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
“তুই এখনও রেখেছিস?”
“হ্যাঁ,” মেঘলা বলল,
“কারণ এটা শুধু সিঁদুর নয়, এটা ছিল আমার সাহসের প্রতীক।”
অরিন্দমের চোখ ভিজে উঠল।
“তুই জানিস, আমি এখনও সেই ঘাটে যাই,
যেখানে প্রথম তোর কপালে আলো পড়েছিল।”
🌙 বিদায়বেলা, আবার দেখা হবে?
চা শেষ।
বাইরে বৃষ্টি থেমেছে।
মেঘলা দাঁড়াল, ব্যাগ কাঁধে নিল।
অরিন্দম শান্তভাবে বলল,
“এইবার হারিয়ে যাস না, মেঘলা।”
মেঘলা হেসে বলল,
“না অরিন্দম, এইবার যদি হারাইও,
তোর লেখার পাতায় খুঁজে নিস।”
বেরিয়ে গেল সে,
বাতাসে তার চুল উড়ছিল,
আর অরিন্দম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল—
এক চিমটে সিঁদুরের মতো সূর্যাস্তের রঙ ঢেকে যাচ্ছে শহরটাকে।