Golper Asore. গল্পের আসরে।

Golper Asore. গল্পের আসরে। যারা গল্প শুনতে ভালোবাসেন তাদের জন‍্য

28/12/2025

#এক চিমটে সিঁদুর
কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

অধ্যায় ৮ — ফিরে দেখা

বছর পেরিয়ে গেছে প্রায় সাতটি।
সময় তার নিজের নিয়মে অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।
অরিন্দম এখন শহরের এক নামী বিজ্ঞাপন সংস্থায় ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর,
চোখে চশমা, মুখে পরিণত নীরবতা।
অন্যদিকে মেঘলা এখন এক মাধ্যমিক স্কুলের বাংলা শিক্ষিকা—
ছাত্রছাত্রীদের ভালোবাসায় ঘেরা,
কিন্তু নিজের ভিতর গভীরে লুকিয়ে রাখা এক শূন্যতা নিয়ে বেঁচে আছে।

🏫 এক অদ্ভুত দিন

সেই দিনটা ছিল এক সাহিত্য উৎসবের।
কলকাতার এক নামী স্কুলে আয়োজন—
“সমসাময়িক বাংলা গল্প ও কবিতা” নিয়ে।
অরিন্দমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল অতিথি বক্তা হিসেবে,
আর মেঘলাকে শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে।

কেউ জানত না,
এই অনুষ্ঠানে সময়ের চাকা ঘুরে যাবে নিঃশব্দে।

🎤 প্রথম দেখা

অডিটোরিয়ামে আলো ম্লান।
অরিন্দম মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিচ্ছে—
কীভাবে ভালোবাসা, স্মৃতি আর সময়ের মধ্যে
সৃষ্টিশীলতা জন্ম নেয়।

মেঘলা তখন দর্শকসারিতে বসে,
কিন্তু বক্তার কণ্ঠ শুনেই তার বুক কেঁপে উঠল।
এই কণ্ঠ সে চেনে—
বছরের পর বছর কেটে গেলেও,
এই সুর, এই থেমে থেমে বলা শব্দগুলো ভুলে থাকা যায় না।

অরিন্দমও বক্তৃতার মাঝেই হঠাৎ চোখে পড়ল এক মুখ—
সেই পরিচিত নরম চোখদুটি,
যা একদিন নদীর ধারে বসে তার দিকে তাকিয়েছিল।
তার গলা শুকিয়ে গেল,
কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য।

🌦️ অনুষ্ঠান শেষে

ভিড় কমে এলে করিডরে দাঁড়িয়ে ছিল মেঘলা।
অরিন্দম ধীরে ধীরে এগিয়ে এল তার দিকে।
বহু বছর পর চোখে চোখ পড়ল—
না কোনো উচ্ছ্বাস, না কান্না—
শুধু এক নিঃশব্দ শান্তি।

মেঘলা মৃদু গলায় বলল,
“তুমি বদলে গেছ।”
অরিন্দম হেসে বলল,
“তুইও।”

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর অরিন্দম বলল,
“তুই ভালো আছিস?”
“ভালো,” মেঘলা উত্তর দিল,
কিন্তু চোখের কোণে যেন একটা পুরনো নদী বইছে এখনও।

☕ এক কাপ চা

তারা কাছের এক কফি শপে বসল।
কথা হলো সাধারণ— কাজ, শহর, জীবন।
তবু প্রতিটি শব্দের ভেতরে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য অনুচ্চারিত বাক্য।

অরিন্দম বলল,
“তুই এখনও লিখিস?”
মেঘলা মৃদু হাসল,
“লিখি। তবে কারও কাছে পাঠাই না।”

অরিন্দমের চোখে নরম হাসি,
“আমিও।”

দুজনেই হেসে উঠল একসঙ্গে।
হাসির মাঝেই যেন ফিরে এল সেই কলেজের দিনগুলো—
নদীর ধারে বসা, চাঁদের আলোয় কথা বলা,
এক চিমটে সিঁদুরের প্রতিশ্রুতি।

💔 মেঘলার সত্য

কফির শেষ চুমুকে মেঘলা শান্ত কণ্ঠে বলল,
“অরিন্দম, আমি বিয়ে করিনি।
মা-বাবা চেয়েছিল, কিন্তু পারিনি।
কোনও সম্পর্কে যেতেও ভয় লেগেছে।
কারণ জানি, আমার ভিতর এখনও কেউ আছে।”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আমিও কাউকে বিয়ে করিনি, মেঘলা।
আমি ভেবেছিলাম, যদি সত্যিই ভালোবাসা থাকে,
তবে সময়ও সেটা মুছে দিতে পারবে না।”

দুজনেই চুপ।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে হালকা, জানালার কাঁচে ফোঁটা ফোঁটা জল।

🌧️ সেই এক চিমটে সিঁদুর

মেঘলা ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট শিশি বের করল—
পুরনো, কিন্তু অটুট।
“তুই চিনতে পারবি এটা?”

অরিন্দম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
“তুই এখনও রেখেছিস?”

“হ্যাঁ,” মেঘলা বলল,
“কারণ এটা শুধু সিঁদুর নয়, এটা ছিল আমার সাহসের প্রতীক।”

অরিন্দমের চোখ ভিজে উঠল।
“তুই জানিস, আমি এখনও সেই ঘাটে যাই,
যেখানে প্রথম তোর কপালে আলো পড়েছিল।”

🌙 বিদায়বেলা, আবার দেখা হবে?

চা শেষ।
বাইরে বৃষ্টি থেমেছে।
মেঘলা দাঁড়াল, ব্যাগ কাঁধে নিল।
অরিন্দম শান্তভাবে বলল,
“এইবার হারিয়ে যাস না, মেঘলা।”

মেঘলা হেসে বলল,
“না অরিন্দম, এইবার যদি হারাইও,
তোর লেখার পাতায় খুঁজে নিস।”

বেরিয়ে গেল সে,
বাতাসে তার চুল উড়ছিল,
আর অরিন্দম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল—
এক চিমটে সিঁদুরের মতো সূর্যাস্তের রঙ ঢেকে যাচ্ছে শহরটাকে।

 #এক চিমটে সিঁদুরকলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তীঅধ্যায় ৭ — অপেক্ষার দিনগুলোবছর ঘুরে গেল।ঋতু বদলালো, শহরের গাছপালা পাল্টে গেল,ক...
21/12/2025

#এক চিমটে সিঁদুর

কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

অধ্যায় ৭ — অপেক্ষার দিনগুলো

বছর ঘুরে গেল।
ঋতু বদলালো, শহরের গাছপালা পাল্টে গেল,
কিন্তু অরিন্দম আর মেঘলার জীবনে যেন সময় স্থির হয়ে রইল সেই ট্রেনের বাঁশির ধ্বনিতে।

মেঘলা এখন গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে।
বাইরের এক স্কুলে শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েছে—
শিশুদের মুখে হাসি দেখে নিজের কষ্টগুলো ঢেকে রাখে।
তবু মাঝে মাঝে যখন বাচ্চারা “ভালোবাসা মানে কী, মিস?” জিজ্ঞেস করে,
তার চোখে জল এসে যায়।

অরিন্দম meanwhile চাকরি পেয়েছে কলকাতায়,
একটি ছোট বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করে—
কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় অফিসের পরও যায় সেই পুরনো ঘাটে,
যেখানে বাতাসে এখনও মেঘলার হাসির প্রতিধ্বনি ভাসে।

🌅 সময়ের দূরত্ব

তাদের মধ্যে আর কোনো সরাসরি যোগাযোগ নেই।
শুধু একবার এক বন্ধুর মাধ্যমে খবর এল—
“মেঘলা এখন শহরের বাইরে থাকে, বেশ ভালো আছে।”
অরিন্দম শুনে মৃদু হেসেছিল,
কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার বুক কেঁপে উঠেছিল—
“ভালো আছে” কথাটা মাঝে মাঝে যতটা শান্ত শোনায়,
তার ভিতরে ততটাই কান্না লুকিয়ে থাকে।

মেঘলাও মাঝে মাঝে অরিন্দমকে স্বপ্নে দেখে—
সেই নদীর ধারে, সেই দৃষ্টিতে।
ঘুম ভাঙার পর মনে হয়,
এই পৃথিবীতে কিছু সম্পর্ক আছে যেগুলো শুধু অপেক্ষার জন্যই জন্মায়।

💭 এক চিঠি, না পাঠানো

এক রাতে অরিন্দম টেবিলের সামনে বসে লিখল—

“মেঘলা,
আমি ভাবি, যদি তুই আজ ফিরে আসিস,
আমি কিছু বলব না, শুধু চুপ করে বসব পাশে।
তোর নীরবতাটাই আমার ভাষা হয়ে গেছে।

আমি তোর জন্য কিছুই করতে পারিনি,
কিন্তু একটা প্রতিশ্রুতি আজও রেখেছি—
অন্য কারও চোখে কখনও তোর মতো খুঁজে দেখি না।”

সে চিঠিটা ভাঁজ করে রাখল টেবিলের ড্রয়ারে—
যেখানে ইতিমধ্যে জমে আছে বছরের পর বছর লেখা কিন্তু না-পাঠানো চিঠি।

🌾 মেঘলার দিনলিপি

মেঘলারও জীবন থেমে থাকেনি।
তার মা এখন অসুস্থ, বাবার মুখে ক্লান্তি।
মাঝে মাঝে নিজের কক্ষে জানালার ধারে বসে সে সেই শিশিটা খুলে দেখে।
সিঁদুরটা শুকিয়ে গেছে, কিন্তু রঙ এখনও টকটকে লাল।

সে লিখে রাখে—

“অরিন্দম,
হয়তো আমরা কখনও এক হব না,
কিন্তু তুই আমার প্রতিদিনের ভেতরে আছিস—
যেন হৃদয়ের ভিতর স্থির হয়ে থাকা এক স্পন্দন।”

🌧️ বৃষ্টির দিনে স্মৃতি

একদিন বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি নামল ঝুমঝুম করে।
স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, শিশুরা দৌড়ে বেরিয়ে গেছে বাড়ির পথে।
মেঘলা ছাতাটা খুলে বেরোতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল—
একটা পরিচিত গান কোথা থেকে যেন ভেসে এল...
অরিন্দমের পছন্দের পুরনো রবীন্দ্রসঙ্গীত —
“তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম।”

সে হাসল মৃদু, আর মনে মনে বলল—
“তুই তো আছিসই।”

🔔 নতুন জীবনের আভাস

অরিন্দমের অফিসে একদিন নতুন সহকর্মী যোগ দিল—
সুন্দর, প্রাণবন্ত এক মেয়ে— অনন্যা।
সে অরিন্দমের একাগ্রতা দেখে অবাক,
কিন্তু বুঝতে পারল না কেন এই মানুষটা
সবসময় নিজের ভিতরে একটা নীরবতা বয়ে বেড়ায়।

অনন্যা একদিন জিজ্ঞেস করল,
“তুমি এত চুপচাপ কেন?”
অরিন্দম মৃদু হাসল,
“কিছু সম্পর্ক আছে, যেগুলো কখনও শেষ হয় না,
তাই নতুন করে কিছু শুরু করতে পারি না।”

🌙 অধ্যায়ের শেষ

রাতে অরিন্দম ঘাটে গিয়ে বসে থাকল একা।
নদীর ওপারে আলো জ্বলছে,
জলে ভাসছে চাঁদের প্রতিচ্ছবি।
সে জানাল—
“মেঘলা, আমি অপেক্ষা করছি।
সময়ের শেষে, হয়তো আবার দেখা হবে।”

মেঘলাও ঠিক সেই সময় দূরের এক শহরে
তার ডায়েরি বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল—
“অরিন্দম, আমি এখনও তোর চিঠির পাতায় বেঁচে আছি।”

 #এক চিমটে সিঁদুরকলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তীঅধ্যায় ৬ — চিঠির পাতায় লুকোনো ভালোবাসাসময় বয়ে গেল নীরবে।মেঘলার চলে যাওয়ার পর অ...
07/12/2025

#এক চিমটে সিঁদুর

কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

অধ্যায় ৬ — চিঠির পাতায় লুকোনো ভালোবাসা

সময় বয়ে গেল নীরবে।
মেঘলার চলে যাওয়ার পর অরিন্দমের দিনগুলো যেন হয়ে উঠল শূন্য নদীর মতো।
কলেজ শেষ হলো, বন্ধুরা আলাদা পথে পা বাড়াল,
কিন্তু অরিন্দমের মনে রয়ে গেল কেবল একটিই নাম— মেঘলা।

মেঘলা এখন কলকাতার বাইরে, মায়ের এক আত্মীয়ের বাড়িতে।
সেখানে শহরের কোলাহল নেই,
কেবল জানালার ধারে এক টুকরো আকাশ,
আর এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা।

প্রথম দিকে সে চুপচাপ ছিল।
কিন্তু একদিন নিজের আলমারির কোণে রাখা ব্যাগ খুলে পেল সেই কাঁচের শিশি—
ভেতরে এক চিমটে সিঁদুর।
তখনই তার মনে হলো— অরিন্দমের কথা না লিখলে সে পাগল হয়ে যাবে।

📜 প্রথম চিঠি — মেঘলার লেখা

“অরিন্দম,
জানিস, এখানে সন্ধ্যার সময় আকাশটা কেমন হয়?
একেবারে তোর চোখের মতো— শান্ত, অথচ গভীর।
তোর দেওয়া সিঁদুরটা আমি এখনও রাখি।
মাঝে মাঝে খুলি, দেখি, আর মনে হয় তুই পাশে আছিস।
জানিস, তুই বলেছিলি— ভয় পেও, কিন্তু থেমো না।
আমি এখন ভয় পাই না, শুধু অপেক্ষা করি।
— মেঘলা।”

চিঠিটা মেঘলা পোস্টে দিল না।
সে রেখে দিল নিজের ডায়েরির পাতায়,
যেন মন খুলে বলা একটা গোপন প্রার্থনা।

অন্যদিকে, অরিন্দমও প্রায় প্রতিদিন লিখত—
কিন্তু সে-ও পাঠাত না।
তারা দুজনেই যেন একে অপরের জন্য লিখছিল,
না পাঠিয়েও যেন পৌঁছে যাচ্ছিল সেই কথাগুলো—
হাওয়ার সঙ্গে, নদীর ধারে, রাতের তারার আলোয়।

🌙 অরিন্দমের লেখা একটি চিঠি

“মেঘলা,
তুই কি জানিস, প্রতিদিন কলেজ থেকে ফিরলে আমি সেই পুরনো ঘাটে যাই।
তোর হেসে ওঠার প্রতিধ্বনি এখনও শুনি জলে।
আমার বন্ধুরা বলে আমি বদলে গেছি।
আসলে আমি শুধু থেমে গেছি—
যেদিন তুই চলে গেছিলি, সেই দিনটাই আমার সময় থেমে গেছে।
— অরিন্দম।”

🕯️ সময় এগিয়ে চলে…

মাসের পর মাস কেটে গেল।
চিঠিগুলো জমতে লাগল— দুজনেরই নিজের গোপন বাক্সে।
ভালোবাসা যেন আর দেখা নয়,
একটা অনুভূতি হয়ে গেছে— অক্ষরের ফাঁকে ফাঁকে বেঁচে থাকা এক জীবন।

কখনও মেঘলা লিখত—

“আজ বৃষ্টি পড়ছিল, জানলা খুলে দিইনি।
ভেবেছি, যদি হাওয়ার সঙ্গে তোর গন্ধ আসে, আমি ভেঙে পড়ব।”

আর অরিন্দম লিখত—

“তুই যেখানে আছিস, সেখানে যদি আকাশটা একটু নীল হয়,
জেনে নিস, আমি সেদিন হাসছি।”

✉️ একদিনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা

এক সকালে মেঘলা ডাকপিয়নের হাতে পেল একটা খাম।
ভেতরে কোনো প্রেরকের নাম নেই— শুধু লেখা,
“তোর জন্য, এক চিমটে সিঁদুর।”

মেঘলা খাম খুলে দেখল—
একটা ছোট লাল কাগজ, তাতে অরিন্দমের হাতের লেখা—

“ভালোবাসা দূরত্ব মানে না,
শুধু অপেক্ষা শেখায়।
আমি এখনও সেই ঘাটে যাই—
যেদিন তুই ফিরবি, সেদিন এই চিঠিগুলো তোর হাতে দেব।”

মেঘলার চোখ ভিজে গেল।
হাতে চিঠি, টেবিলের কোণে সেই শিশি সিঁদুর,
আর জানালার বাইরে শরতের আকাশ—
সবকিছু যেন এক অদ্ভুত আলোয় মিশে গেল।

রাতের দিকে সে নিজের ডায়েরিতে লিখল—

“ভালোবাসা কাগজে লেখা হয় না,
তা লিখে যায় সময়ের পাতায়।
আমি আজ বুঝলাম,
অরিন্দমকে হারিয়ে নয়,
তাকে অনুভব করেই বাঁচা যায়।”

 #এক চিমটে সিঁদুরকলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তীঅধ্যায় ৫ — বিদায়বেলার সিঁদুরসেদিন আকাশটা যেন একেবারেই মেঘলার মতো ছিল—আধো-অন্ধক...
01/12/2025

#এক চিমটে সিঁদুর

কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

অধ্যায় ৫ — বিদায়বেলার সিঁদুর

সেদিন আকাশটা যেন একেবারেই মেঘলার মতো ছিল—
আধো-অন্ধকার, ঝড়ের আগে স্থির,
মনে হচ্ছিল কিছু একটা শেষ হতে যাচ্ছে।

কলেজে গিয়েও মেঘলা আর অরিন্দম দেখা করেনি।
একটা অদৃশ্য দেওয়াল দাঁড়িয়ে গেছে তাদের মাঝে—
বাবার রাগ, সমাজের কটূকথা, আর ভবিষ্যতের ভয়।

অরিন্দম প্রতিদিন নদীর ঘাটে যেত,
যেখান থেকে একসময় তারা একসঙ্গে সূর্যাস্ত দেখত।
এখন সেই জায়গাটা যেন হয়ে গেছে এক নীরব সাক্ষী,
ভালোবাসার, কান্নার, আর অপূর্ণতার।

🌧️ এক বিকেল — বিদায়ের দিন

মেঘলার বাবা ঠিক করেছেন,
সে পড়াশোনা শেষ করে কলকাতার বাইরে আত্মীয়ের বাড়ি যাবে কিছুদিনের জন্য।
অরিন্দম খবরটা শুনে ছুটে এল শেষবারের মতো দেখা করতে।

স্টেশনের ছোট্ট প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে মেঘলা তাকিয়ে আছে দূরের দিকে,
বৃষ্টি নামছে হালকা, কুয়াশা ভিজে দিচ্ছে চোখের কোণা।
হাতে তার ছোট ব্যাগ, গলায় মা দেওয়া সোনার চেইন,
আর মনের ভেতর কাঁপতে থাকা হাজারটা প্রশ্ন।

হঠাৎ ভিড়ের মধ্য থেকে অরিন্দমের কণ্ঠ—
“মেঘলা!”
সে ঘুরে তাকাল—
অরিন্দম ভিজে শার্টে, চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে ছুটে এল তার দিকে।

মেঘলার চোখে জল গড়িয়ে পড়ল।
“তুই এখানে কেন এসেছিস, অরিন্দম? সবাই দেখবে!”

অরিন্দম শান্ত গলায় বলল,
“দেখুক। আজ আমি ভয় পাব না।”
তার কণ্ঠে কাঁপন, কিন্তু চোখে আলো।

মেঘলা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে যেন একসঙ্গে রাগ, কান্না, আর ভালোবাসা মিশে গেছে।

অরিন্দম বলল,
“তুই যদি এখন চলে যাস, হয়তো আমরা আর কোনোদিন দেখা পাব না।
কিন্তু আমি একটা কথা রেখে যেতে চাই।”

সে নিজের পকেট থেকে একটা ছোট্ট কাঁচের শিশি বের করল—
ভেতরে লাল সিঁদুর।

মেঘলা অবাক,
“অরিন্দম… এটা কেন?”

অরিন্দম মৃদু হেসে বলল,
“তুই বলেছিলি, এক চিমটে সিঁদুর মানেই সব শেষ নয়।
আজ আমি সেটা তোর কপালে পরাচ্ছি না।
এই সিঁদুরটা তুই রাখবি— প্রতিশ্রুতি হিসেবে।
যেদিন তুই ভয় ছাড়া ভালোবাসতে পারবি,
সেদিন নিজের হাতে কপালে দিস।”

ট্রেনের বাঁশি বাজল।
মেঘলা কিছু বলতে চাইল, পারল না।
অরিন্দম তার হাতের তালুতে শিশিটা রেখে পিছিয়ে গেল।
চোখে তখন শুধু নীরব বৃষ্টি।

ট্রেন ছাড়ল ধীরে ধীরে—
চাকার শব্দে হারিয়ে গেল তাদের কথাগুলো।
অরিন্দম দাঁড়িয়ে রইল প্ল্যাটফর্মে,
আর মেঘলা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখল তাকে ক্রমে ছোট হতে হতে মিলিয়ে যেতে।

তার বুকের ভেতর শব্দ উঠল—

“ভালোবাসা মানে কখনো কখনো বিদায় নেওয়ার সাহস।”

সে পকেট থেকে সিঁদুরের শিশিটা বের করে দেখল—
এক চিমটে লাল রঙ,
যেন তার হৃদয়ের এক টুকরো আগুন হয়ে জ্বলছে।

রাতের ট্রেনে মেঘলা লিখল তার ডায়েরিতে—

“আজ অরিন্দমের চোখে আমি ভয় নয়, ভালোবাসা দেখেছি।
বিদায় হয়তো শেষ নয়।
হয়তো এ শুধু এক নতুন অপেক্ষার শুরু।”

 #এক চিমটে সিঁদুরকলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তীঅধ্যায় ৪ — ভালোবাসা নাকি ভয়শরতের সেই বিকেলের “বিয়ে খেলা”–র পরকলেজের বাতাসে এক ...
11/11/2025

#এক চিমটে সিঁদুর

কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

অধ্যায় ৪ — ভালোবাসা নাকি ভয়

শরতের সেই বিকেলের “বিয়ে খেলা”–র পর
কলেজের বাতাসে এক অদ্ভুত গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল।
বন্ধুদের ফিসফাস, ক্লাসে দৃষ্টি, হাসির ভেতর লুকোনো ইঙ্গিত—
সবকিছুই যেন আলাদা করে ফেলল অরিন্দম আর মেঘলাকে বাকিদের থেকে।

প্রথমে দুজনেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে মেঘলার মনে জমতে লাগল ভয়—
এই সম্পর্ক, এই সিঁদুরের দাগটা যদি সত্যিই অন্যরা ভুল বোঝে?

সেদিন বিকেলে তারা কলেজের পর নদীর ধারে বসেছিল।
আকাশে হালকা মেঘ, গাছের ডালে বসে শালিক ডাকছে।
মেঘলা নীরব।
অরিন্দম পাশে বসে বলল,
“তুই কথা বলছিস না কেন?”
মেঘলা মৃদু গলায় বলল,
“আমরা কি ঠিক করছি, অরিন্দম?”

অরিন্দম চমকে তাকাল,
“মানে?”
“মানে… এই সম্পর্কটা। আমরা তো এখনো ছাত্রছাত্রী।
মানুষ কী বলবে? আমার পরিবার, তোর পরিবার— কেউ মেনে নেবে না।”

অরিন্দম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ভালোবাসা যদি ভয় পায়, তবে কি সে ভালোবাসা থাকে?”
মেঘলা বলল,
“থাকে… কিন্তু হয়তো বাঁচতে পারে না।”

নীরবতা।
নদীর হাওয়া দুজনের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছিল,
তবু মনে হচ্ছিল, সময় যেন থেমে গেছে।

অরিন্দম বলল,
“তুই জানিস মেঘলা, আমি ছোটবেলা থেকেই সত্যি ভালোবাসতে ভয় পেতাম।
কারণ আমার মা-বাবা সারাজীবন একে অপরের মধ্যে ভালোবাসা খুঁজে পাননি।
তাদের সংসার ছিল শুধু রীতি আর দায়িত্ব।
আমি ভেবেছিলাম, যদি ভালোবাসি, সেটা যেন সত্যি হয়।
যেন মিথ্যে বা ভয়ের মধ্যে না আটকে যায়।”

মেঘলা চুপ করে শুনছিল।
তার চোখে জল এসে গেল।
“তুই যদি এমন করে বলিস, আমি ভয় পাই আরও…
কারণ আমি জানি, সত্যি ভালোবাসা যত গভীর হয়, তত কষ্টও দেয়।”

সেদিন সন্ধ্যায় মেঘলা বাড়ি ফিরে গেল চুপচাপ।
মায়ের চোখে সন্দেহ, বাবার মুখে রাগ।
পাড়ার কারও মুখে নাকি শোনা গেছে— “ও মেয়ে নাকি এক ছেলের সঙ্গে বিয়ের অভিনয় করেছিল!”

রাতে বাবার কণ্ঠ গর্জে উঠল,
“এ কী শিক্ষা নিচ্ছিস কলেজে?
মেয়েদের নাম ডুবিয়ে দিবি?”
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“বাবা, ওটা শুধু একটা নাটক ছিল…”
“নাটক নয়, এটা লজ্জা!”

মেঘলার বুক ফেটে গেল।
সে জানত, এই কথার পেছনে যতটা রাগ, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়।
সমাজের ভয়।

পরদিন মেঘলা কলেজে গেল না।
অরিন্দম অনেক খুঁজল,
শেষে বিকেলে তার বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
মেঘলা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখল তাকে— ভিজে, একা, চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

তাদের চোখ একবার মিলল।
তখনই হয়তো দুজনেই বুঝল—
ভালোবাসা মানে শুধু আনন্দ নয়,
ভালোবাসা মানে ভয়কে জয়ের সাহসও।

মেঘলা জানালার ফাঁক দিয়ে একটুখানি হাসল,
আর অরিন্দম মাথা নেড়ে মৃদু গলায় বলল,
“আমি অপেক্ষা করব, যতদিন লাগে।”

রাতের অন্ধকারে মেঘলা তার ডায়েরিতে লিখল—

“আজ বুঝলাম, ভালোবাসা ভয়কে হারাতে শেখায় না।
সে শুধু বলে — ভয় পেও, কিন্তু থেমো না।”

 #এক চিমটে সিঁদুরকলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তীঅধ্যায় ৩ — খেলা না বাস্তবশরতের দুপুর।কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চল...
02/11/2025

#এক চিমটে সিঁদুর

কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

অধ্যায় ৩ — খেলা না বাস্তব

শরতের দুপুর।
কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে।
মাঠের পাশে মঞ্চ সাজানো হচ্ছে, ব্যানার লাগানো, রঙিন পতাকা উড়ছে হাওয়ায়।
চারিদিকে হাসি–আড্ডা, ছেলেমেয়েদের কোলাহল।

মেঘলা তখন বন্ধুদের সঙ্গে বসে প্রপস সাজাচ্ছিল।
তার মুখে একরাশ আলো —
অরিন্দম দূর থেকে তাকিয়ে ভাবল,
“এই মেয়েটার হাসিটা যেন রোদে ভেজা চাঁদের মতো।”

বিকেলে কলেজে এক মজার খেলার আয়োজন হলো — “মেক–বেলিভ ওয়েডিং”।
বন্ধুরা মজার ছলে বলল,
“এক জোড়া ছেলে–মেয়ে বানিয়ে বিয়ে সাজাতে হবে, নাটক হিসেবে!”

সবার নাম উঠল লটারিতে।
শেষে ঘোষক যখন বলল—
“বর হবেন অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়, কনে — মেঘলা সেন।”
চারদিক হেসে উঠল।

মেঘলা প্রথমে বলল,
“না না, আমি পারব না, এমন নাটক…”
কিন্তু বন্ধুদের হাসিঠাট্টায় শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল সে।

🎭 বিয়ের মঞ্চ

মঞ্চের এক কোণে সাজানো হলো ছোট্ট মন্দিরের মতো সেট,
সামনে ফুলের মালা, প্রদীপ, লাল ওড়না আর এক বাটি সিঁদুর —
সবই সাজানো নাটকের অংশ হিসেবেই।

অরিন্দম পরেছে সাদা পাঞ্জাবি, মেঘলা পরে এসেছে লাল বেনারসি-ছোঁয়া শাড়ি,
চুলে গাঁদা ফুলের মালা।
পুরো কলেজ যেন থেমে গেল — হাসির মাঝেও এক অদ্ভুত নীরবতা।

বন্ধুরা মজা করে বলল,
“এখন বর কপালে সিঁদুর দেবে, তারপর ‘হ্যাঁ’ বলবে!”

অরিন্দমের হাতে তখন এক চিমটে সিঁদুর।
মেঘলা হেসে বলল,
“এটা শুধু নাটক, ঠিক আছে?”
অরিন্দম তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ… নাটকই তো…”

কিন্তু তার চোখে তখন অন্য কিছু ঝিলমিল করছে—
গভীর, অনিশ্চিত, অথচ অদ্ভুত সত্য।

সে ধীরে ধীরে হাত তুলল,
মেঘলার কপালের মাঝখানে ছুঁইয়ে দিল এক চিমটে সিঁদুর।

চারপাশে হইচই, করতালির শব্দ, হাসি–ঠাট্টা।
কিন্তু সেই মুহূর্তে সময় যেন থেমে গেল।
অরিন্দমের চোখে জল, মেঘলার চোখে কাঁপুনি।

“এইটুকুই যদি একদিন সত্যি হয়ে যায়?”
— অরিন্দম মৃদু স্বরে বলল।
“খেলা না বাস্তব?” — মেঘলা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
অরিন্দমের উত্তর এলো না।

রাত হয়ে গেছে।
সবার বাড়ি ফেরা।
মেঘলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখল —
তার কপালে এখনো হালকা লালচে দাগ,
যেটা বারবার মুছে ফেলতে চেয়েও মুছে গেল না।

সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল নিজের প্রতিফলনের দিকে।
মনে মনে বলল,
“এটা যদি খেলা হয়… তবে কেন এত সত্যি লাগে?”

অন্যদিকে অরিন্দম নিজের ডায়েরিতে লিখল—

“আজ মেঘলার কপালে এক চিমটে সিঁদুর ছুঁইয়ে বুঝলাম,
আমি হয়তো খেলার নিয়ম মানিনি—
আমি একটুখানি সত্যি করে ফেলেছি।”

পরদিন কলেজে কেউ কিছু বলেনি,
তবু চারদিকের বাতাসে এক নরম গুজব ভেসে বেড়াচ্ছিল—
“অরিন্দম আর মেঘলা, নাকি শুধু নাটকে নয়… বাস্তবেও কিছু আছে।”

মেঘলা লজ্জা পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল,
কিন্তু তার চোখের গভীরে অরিন্দম বুঝে নিল,
খেলা আর বাস্তবের সীমারেখা আজ মিলেমিশে গেছে।

 #এক চিমটে সিঁদুরকলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তীঅধ্যায় ২ — চোখে চোখে কথাপরদিন কলেজে আকাশ পরিষ্কার।বৃষ্টির ধোঁয়া মুছে গিয়ে চারদ...
24/10/2025

#এক চিমটে সিঁদুর

কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

অধ্যায় ২ — চোখে চোখে কথা

পরদিন কলেজে আকাশ পরিষ্কার।
বৃষ্টির ধোঁয়া মুছে গিয়ে চারদিক ঝকঝকে রোদে ভরে উঠেছে।
মেঘলা সিঁড়ির ধাপে বসে দুপুরের রোদে খাতায় কিছু লিখছে।
তার চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে, মুখে লেগে আছে বৃষ্টির রাতের হাসি।

হঠাৎ পাশ থেকে এক ছায়া এসে পড়ল তার খাতায়।
চোখ তুলে দেখে— অরিন্দম দাঁড়িয়ে আছে, গিটারের ব্যাগ কাঁধে, ঠোঁটে সেই চেনা অস্থির হাসি।

“কাল তুই চলে গেলি হুট করে। আমি ভাবলাম, হয়তো রাগ করেছিস।”
মেঘলা মৃদু হাসল,
“না রাগ নয়। হঠাৎ বৃষ্টি থেমে গেল, তাই…”
অরিন্দম বলল,
“তবু মনে হচ্ছিল বৃষ্টির সঙ্গে তোর চলে যাওয়া ঠিক হল না।”

মেঘলা তাকিয়ে রইল।
কথাগুলোর মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা সে শুনে ফেলল মনে মনে—
আবেগ। যত্ন। টান।

সেদিন থেকে তাদের দেখা হতে লাগল বারবার।
লাইব্রেরিতে, ক্যান্টিনে, রোদে ফ্যাকাসে বেঞ্চে বসে।
অরিন্দম কবিতা লিখত, মেঘলা পড়ত।
দুজনের মধ্যে গড়ে উঠছিল এক অদৃশ্য বন্ধন।

এক বিকেলে গঙ্গার ধারে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে সবাই গিয়েছিল পিকনিকে।
আকাশে নীল রোদ, বাতাসে গন্ধে মাখা কাশফুল।
অরিন্দম গিটার হাতে গান ধরল—

“তোর চোখে যত কথা আছে,
সব আমি শুনে ফেলেছি…”

মেঘলা তার পাশে বসে ছিল,
চুপচাপ শুনছিল, চোখের কোণে একরাশ নরম আলো।
তার মনে হচ্ছিল— এই মানুষটার চোখে এমন কিছু আছে,
যা শব্দে বলা যায় না, কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে যায়।

গান শেষ হতেই মেঘলা বলল,
“তুমি সবসময় এমন করে গাও?”
অরিন্দম হেসে বলল,
“না, সবার জন্য নয়। শুধু যার চোখে গল্প লুকিয়ে থাকে… তার জন্য।”

তাদের মধ্যে নেমে এলো নীরবতা।
শুধু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল গিটার আর নদীর সুর।
মেঘলা তার খাতার পাতা উল্টে লিখল—
“কখন যেন গান শুনতে শুনতে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম।”

দিন কেটে যাচ্ছিল।
বন্ধুরা মজা করে বলত, “তোমাদের চোখে চোখে কিছু আছে রে!”
অরিন্দম হেসে উড়িয়ে দিত,
কিন্তু মেঘলার চোখে তখন লজ্জা আর আলো একসঙ্গে ঝলমল করত।

একদিন ক্লাস শেষে তারা হাঁটছিল মাঠের ধারে।
সূর্য ডুবছে, আকাশ লালচে।
অরিন্দম হঠাৎ থেমে বলল,
“তোর চোখে একটা অদ্ভুত আলো আছে মেঘলা। যেন চুপচাপ ভালোবাসা বলতে চায়।”

মেঘলা চমকে উঠে বলল,
“চোখে চোখে কথা বলা যায় নাকি?”
অরিন্দম ধীরে হাসল,
“যখন কথা বলার দরকার হয় না, তখন চোখই সব বলে দেয়।”

তারপর দুজনেই হাঁটতে লাগল—
একই ছায়ায়, একই নীরবতায়।
পেছনে সূর্য অস্ত গেল,
আর সামনে ফুটে উঠল ভালোবাসার প্রথম সন্ধ্যা।

সেই রাতে মেঘলা ঘরে একা বসে, বাতি নিভিয়ে খাতায় লিখল—

“আজ বুঝলাম, প্রেম মানে শুধু কথা নয়।
কখনও কখনও, চোখের দৃষ্টিতেই জন্ম নেয় এক মহাকাব্য।”

 #এক চিমটে সিঁদুরকলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তীঅধ্যায় ১ — প্রথম দেখাকলেজের ফ্রেশার্স ডে।সকাল থেকেই আকাশটা ধূসর, যেন নিজের মনও...
22/10/2025

#এক চিমটে সিঁদুর

কলমে - প্রশান্ত চক্রবর্তী

অধ্যায় ১ — প্রথম দেখা

কলেজের ফ্রেশার্স ডে।
সকাল থেকেই আকাশটা ধূসর, যেন নিজের মনও জানে আজ নতুন কিছু ঘটতে চলেছে।
বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ পড়ে চলেছে পুরোনো ইটের দেওয়ালে, আর চারদিক ভিজে উঠেছে সজল গন্ধে।

গান, হাসি, চিৎকার—
সব মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাসটা এক উৎসবের রঙে রাঙানো।

প্রথম বর্ষের ছাত্রী মেঘলা সেন মঞ্চের পাশে বসে আছে, কোঁকড়ানো চুলের গোছা ভিজে লেগে গেছে গালে।
লাল কুর্তি আর সাদা ওড়না— সরল, তবু যেন অন্যরকম দীপ্তি।
তার হাতে একখানা ছোটো নোটবুক — তাতে হয়তো কবিতার খসড়া, কিংবা নিজের মনের কথা।

হঠাৎ ঘোষণার শব্দ ভেসে এলো—
“এবার গান পরিবেশন করবেন অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়, দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।”

স্টেজে উঠল এক ছেলেটি।
গলার পাশে কালো গিটার, মুখে একরাশ আত্মবিশ্বাসের হাসি।
চোখে সেই দুরন্ত দৃষ্টি— যেন কারও চোখ খুঁজে ফিরছে।

গিটার বাজতে শুরু করল —
বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিলেমিশে যেন সুরটা জীবন্ত হয়ে উঠল।

“আকাশের কোলে রোদ হেসেছে,
তোর চোখে মেঘ জমেছে,
বল না, মেঘলা, কেন এমন হলো আজ…”

মেঘলা হকচকিয়ে উঠল।
গানটার নাম তারই নাম — “মেঘলা”!
সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ছেলেটির দিকে।
অরিন্দমের চোখ তখন মঞ্চের আলো পেরিয়ে সোজা এসে পড়েছে তার চোখে।

দুজনেই হাসল —
একটু লাজুক, একটু নির্ভরহীন, কিন্তু অদ্ভুত এক আকর্ষণে ভরা সেই হাসি।
বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছে, যেন প্রকৃতিও সাক্ষী হতে চাইছে সেই প্রথম দেখা।

গান শেষ হতেই করতালির ঝড় উঠল।
কিন্তু অরিন্দমের দৃষ্টি থামল না,
আর মেঘলার বুকের ভেতর যেন কাঁপছে এক অজানা ধ্বনি—
“এই মানুষটা… আমার জীবনে কিছু ঘটাতে চলেছে।”

বিকেলে যখন কলেজ ছুটি হলো, তখনও আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা।
মেঘলা একা হেঁটে যাচ্ছিল গেটের দিকে।
হঠাৎ বৃষ্টি ঝমঝম করে নামল।
ছুটোছুটি শুরু হলো চারদিকে,
কিন্তু কেউ তাকে ছাতা দিল না— কেবল এক কণ্ঠস্বর বলল,
“এই নাও, ভাগ করে নাও।”

অরিন্দম দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক তার পাশে, নীল ছাতাটা তার দু’জনের মাথার উপর।
মেঘলার চোখে জল, বৃষ্টির না প্রেমের — বোঝা গেল না।
সে মৃদু হেসে বলল,
“তোমার গানটা খুব সুন্দর ছিল…”
অরিন্দম জবাব দিল,
“গানটা তোমার জন্যই লিখেছি।”

দুজনেই চুপ হয়ে গেল।
ছাতার নিচে নেমে এলো নিঃশব্দ এক সংলাপ,
যেখানে শব্দের চেয়ে চোখ কথা বলছিল বেশি।

বৃষ্টি থেমে গেল,
সূর্যের আলো ছুঁয়ে গেল কলেজের লালচে দেওয়াল।
মেঘলার চুলের ডগায় ঝুলে থাকা একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল —
অরিন্দমের হাতে।
সে থেমে বলল,
“হয়তো আজকেই শুরু হলো… আমাদের গল্প।”

আর মেঘলা মনে মনে বলল,
“হ্যাঁ, আজ… প্রথম দেখা।”

 #চাঁদের হাসি বাধ ভেঙেছে....শরতের শেষ বিকেল। আকাশে হালকা সোনালি আলো, নদীর ধারে কাশফুল দুলছে বাতাসে। দূরে বাঁশির সুরে যেন...
13/10/2025

#চাঁদের হাসি বাধ ভেঙেছে....

শরতের শেষ বিকেল। আকাশে হালকা সোনালি আলো, নদীর ধারে কাশফুল দুলছে বাতাসে। দূরে বাঁশির সুরে যেন মিশে আছে এক চিরচেনা সঙ্গীত — আর তাতেই ভেসে এলো তারা।

তারা, ছোট শহরের মেয়ে, কলেজে পড়ে। প্রতিদিন বিকেলে নদীর ধারে এসে বসে, একটা পুরনো ডায়েরি নিয়ে। আজও এসেছে। ডায়েরির পাতায় লিখছে—
“চাঁদের হাসি আজ কেন যেন অন্যরকম লাগছে... মনে হচ্ছে কেউ আমার মনের সব কথা জানে।”

ঠিক তখনই পেছন থেকে এক কণ্ঠ ভেসে এলো —
“চাঁদ হাসছে, কারণ কেউ আজ খুব সুন্দর কিছু লিখছে!”

তারা চমকে তাকিয়ে দেখল অর্ণবকে — কলেজেরই এক ছেলেটা, সবসময় হাসিখুশি, কিন্তু চোখে যেন অদ্ভুত গভীরতা।

“তুমি আবার এখানে?” — তারা একটু বিরক্ত গলায় বলল।
অর্ণব হেসে উত্তর দিল — “চাঁদের আলো দেখতে এলাম... আর তুমি তো আছই, আলোর চেয়ে কম নও।”

তারা কিছু না বলে ডায়েরি বন্ধ করল। নদীর জলে তখন চাঁদের প্রতিচ্ছবি পড়েছে — যেন কেউ জলে মিশিয়ে দিয়েছে সাদা রুপোর হাসি।

অর্ণব বলল, “তুমি জানো, আজ পূর্ণিমা। বলা হয়, আজ চাঁদের হাসি সব বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে।”
তারা মৃদু হেসে বলল, “বাঁধ ভাঙলে তো সব ভেসে যায়!”
“সব নয়,” অর্ণব বলল, “কখনও কখনও ভেসে আসে ভালোবাসা।”

তাদের চোখে চোখ পড়ল। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। শুধু নদীর ঢেউ, কাশফুলের শব্দ আর দূরের মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি মিলেমিশে যেন এক অদ্ভুত সুরে বেজে উঠল।

তারা ফিসফিস করে বলল, “তুমি সবসময় এমন কথা বলো কেন?”
অর্ণব ধীরে ধীরে উত্তর দিল, “কারণ তোমার চোখে আমি চাঁদের আলো দেখি... আর আজ সেই আলো বাধ ভেঙেছে।”

চুপচাপ নেমে এলো রাত। নদীর ওপরে ভেসে থাকা চাঁদ যেন তাদের আশীর্বাদ করছে। অর্ণবের হাত আলতো করে ছুঁয়ে দিল তারার হাত। সে আর সরিয়ে নিল না।

চাঁদের আলোয় তারা দু’জন বসে রইল—
কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, কোনো শপথ নয়, শুধু নিঃশব্দে একে অপরের উপস্থিতি।

চাঁদের হাসি সত্যিই আজ বাধ ভেঙেছে—
জল ভরেছে নদীতে, ভালোবাসা ভরেছে দুই হৃদয়ে।

 #“নৌকাভ্রমণ ও চরের রহস্য”কলমে : প্রশান্ত চক্রবর্তী বর্ষাকাল এলেই গ্রামবাংলা হয়ে ওঠে জলে ভরা স্বপ্নপুরী। মাঠ, পথ, খাল, ব...
08/10/2025

#“নৌকাভ্রমণ ও চরের রহস্য”

কলমে : প্রশান্ত চক্রবর্তী

বর্ষাকাল এলেই গ্রামবাংলা হয়ে ওঠে জলে ভরা স্বপ্নপুরী। মাঠ, পথ, খাল, বিল — সবই পানিতে মিশে একাকার। ঠিক এমন সময়েই শহর থেকে শিহাব এসেছিল তার দাদুর বাড়ি, গ্রাম গন্ধভরা সেই ছোট্ট জনপদে। সে ক্লাস সিক্সে পড়ে, শহরের কংক্রিটের জঙ্গল থেকে হঠাৎ করে এসে গ্রামের এই জলজ পৃথিবীতে পড়ে একেবারে মুগ্ধ।

দাদু তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। একদিন দুপুরে খেতে বসে দাদু বললেন,
"শিহাব, তোর জন্য একটা চমক আছে। আজ বিকেলে চল, তোর জীবনের প্রথম নৌকা ভ্রমণে নিয়ে যাবো। তবে শুধু ভ্রমণ না, একটা রহস্যময় চরেও যাবো—ওই চরে আজও কেউ রাতে থাকতে সাহস পায় না।"

শিহাবের চোখ ছানাবড়া। রহস্য? চর? সে তো রীতিমতো রোমাঞ্চে কাঁপতে লাগল!

অভিযান শুরু

বিকেলে নৌকা তৈরি হলো। বাঁশ ও শাল গাছের কাঠে তৈরি, মাঝারি সাইজের একটুখানি ডিঙি নৌকা। সঙ্গে পাটাতনে কিছু শুকনো খাবার, টর্চ, একটি লাঠি আর দাদুর পুরনো রেডিও। মাঝি ছিলো কাশেম কাকা, গ্রামে যার গল্পের ভাণ্ডার শেষ নেই।

নৌকা রওনা দিলো বিলের ভেতর দিয়ে। পানির গায়ে সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে। কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে সাদা বক পাখি, ডুব দিয়ে উঠছে পানকৌড়ি।

হঠাৎই শিহাবের চোখে পড়ল পানির ওপর ভেসে থাকা একটা পুরনো ঘড়ি।
"দাদু, এটা কী?"
দাদু নীরব। কাশেম কাকা একটু গম্ভীর মুখে বললেন,
"এই রাস্তায় মাঝে মাঝে অদ্ভুত জিনিস ভেসে আসে। কেউ বলে চরে কেউ মরেছে, কেউ বলে গুপ্তধন আছে।"

রহস্যময় চর

প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা পৌঁছাল সেই রহস্যময় চরে। চরটা বেশ বড়, কিন্তু গাছপালা ছড়ানো, অনেকটা পরিত্যক্ত। একটা পুরনো, পরিত্যক্ত ঘরের ধ্বংসাবশেষ এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
শিহাব অবাক হয়ে চারদিক দেখতে লাগল। বাতাস যেন এখানে অন্যরকম, একটু ভারি, একটু গা ছমছমে।

“এই চরে একসময় লোক বসবাস করতো,” দাদু বললেন। “কিন্তু ১৫ বছর আগে এক রাতে হঠাৎ পুরো গ্রাম ছেড়ে সবাই চলে যায়। কেন? কেউ জানে না। কেউ বলে ভূত আছে, কেউ বলে সোনা-দানা লুকানো আছে।”

শিহাব কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল ভাঙা ঘরের দিকে। হঠাৎ সে দেখল, ঘরের ভেতরে একটা কাঠের বাক্স, আধা মাটি চাপা অবস্থায়। সে দাদুকে ডাকল। দাদু ও কাশেম কাকা এসে বাক্সটা টেনে তুললেন। খুলতেই দেখা গেল পুরনো কিছু কাগজ, মানচিত্রের মতো দেখতে। সঙ্গে একটি পিতলের তালা দেওয়া ছোট্ট কৌটো।

“এটা তো অনেক দিনের পুরনো,” দাদু ফিসফিস করে বললেন।

রহস্য উন্মোচন

মানচিত্রে দেখা যাচ্ছে—এই চর ছাড়াও আশেপাশে আরও কিছু জায়গা চিহ্নিত করা। এক জায়গায় লেখা — “নীলকুঠির নিচে রহস্য আছে।”

“এটা তো পাশের গ্রাম নীলপুরের সেই পুরনো নীলকুঠি!” কাশেম কাকা বললেন।

এ যেন এক নতুন রহস্যের দুয়ার। শিহাবের চোখে রোমাঞ্চ আর কৌতূহলের ঝলক। সে দাদুকে বলল,
“দাদু, আমাদের ওই নীলকুঠিতেও যেতে হবে। এটাতে কিছু একটা আছে... আমি নিশ্চিত!”

দাদু হেসে বললেন, “দেখি বাবা, তুই যদি রাজি থাকিস, পরদিনই যাওয়া যাবে।”

ফেরার পথে বিপদ

চর থেকে ফেরার সময় হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এলো। নদীর বুকে দুলতে লাগলো বাতাস, বৃষ্টি নেমে এলো ঝমঝমিয়ে। নৌকা দুলতে লাগল, ঢেউয়ে এক সময় নৌকা প্রায় উল্টে যায়। শিহাব আঁকড়ে ধরেছে দাদুকে।
দাদু সাহস দিয়ে বললেন, “ভয় পাস না। নদী আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছে।”

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল নদীর মাঝখানে একটা বড় পাথরের মতো কিছু — কাশেম কাকা বলে উঠলেন, “ওটা কি নাকি মানুষ দাঁড়িয়ে আছে?”

শিহাব তাকিয়ে দেখল — সত্যিই কেউ দাঁড়িয়ে আছে পানির মাঝে। কিন্তু এরপর চোখের পলকেই সে অদৃশ্য।

নৌকা যখন গ্রামের ঘাটে পৌঁছল, তখন রাত। চারদিকে নীরবতা, কিন্তু শিহাবের মনে তখনো গুঞ্জন করছে সেই রহস্যের ডাক।

শেষ টুকু

রাতে বিছানায় শুয়ে শিহাব ভাবছিল—চরের সেই মানচিত্র, সেই পুরনো ঘড়ি, আর নদীর মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছায়ামূর্তি কি নিছক কাকতালীয়? নাকি সবকিছুরই যোগসূত্র আছে?

দাদু এসে পাশে বসে বললেন,
“তুই যদি চাস, আমরা রহস্যটা খুঁজে বের করবো। কিন্তু মনে রাখিস—নদী, চর, প্রকৃতি—ওদের নিজের ভাষা আছে। তা বোঝার জন্য চাই ধৈর্য আর মন।”

শিহাব মুচকি হেসে বলল,
“আমি তৈরি, দাদু।”

02/10/2025

#শুভ বিজয়া দশমী

Address

Garia, Boral
Kolkata
7000103

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Golper Asore. গল্পের আসরে। posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Golper Asore. গল্পের আসরে।:

Share