03/09/2026
নকশীকাঁথার মাঠ
লেখক - প্রশান্ত চক্রবর্ত্তী
পদ্মা পারের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—রামনগর। সবুজ ধানের খেত, বাঁশঝাড়ের ছায়া আর মেঠো পথের আঁকাবাঁকা হাঁটা পথ নিয়ে গ্রামটি যেন এক রূপকথার জগৎ।
সেই রূপকথার দুই মূল চরিত্র ছিল রূপাই আর সাজু।
গায়ের রঙ তার কাঁচা সোনালী না হলেও রূপাইয়ের একটা নিজস্ব রূপ ছিল। কোঁকড়ানো চুল, দীর্ঘ সুগঠিত দেহ আর একজোড়া ধারালো চোখ।
বাঁশিতে যখন সে ফুঁ দিত, বাঁশের গাঁট থেকে যেন মিষ্টি সুরের বন্যা ভেসে আসত। গান গাওয়ায়, লাঠি খেলায় আর ঘর-গৃহস্থালির কাজে তার জুড়ি মেলা ভার।
অন্যদিকে পাশের গাঁয়ের রূপবতী মেয়ে সাজু—যার চোখ দুটো যেন রূপোর থালার মতো ঝলমলে, ডাগর আর করুণ। তার হাত ছিল নিখুঁত আলপনা আর সুঁচ-সুতো দিয়ে সেলাইয়ের জাদুতে ভরপুর।
গাঁয়ের বৈশাখী মেলায় দুজনের প্রথম দেখা। লাঠি খেলার আসরে রূপাইয়ের অদম্য তেজ আর বিজয়ের হাসি সাজুর কচি মনে প্রথম তোলপাড় তুলেছিল।
আর সেই ভিড়ের মাঝে রূপাইয়ের চোখে পড়েছিল লাল মেঘের সায়ার মাঝখান থেকে উঁকি দেওয়া সাজুর লজ্জারাঙা মুখখানি। প্রেম কোনো শর্ত মানে না;
চোখের দেখাতেই দুই হৃদয় একে অপরের বাঁধনে বাঁধা পড়েছিল।
গ্রামের মুরুব্বিদের হাত ধরে ধুমধাম করে রূপাই আর সাজুর বিয়ে হলো। রূপাইয়ের ছোট্ট কুঁড়েঘর যেন হঠাৎ স্বর্গপুরী হয়ে উঠল।
সাজুর রান্নাঘরের হাঁড়ির মিষ্টি চালের গন্ধ আর ঘরের কোণে তার আঁকা আলপনা দেখে রূপাইয়ের মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত সুখ যেন তার এই ছোট ভিটেতেই এসে জমা হয়েছে।
সারাদিন মাঠে কাজ করে সন্ধ্যায় ফিরে রূপাই যখন দরজায় দাঁড়াত, সাজু তাজা তুলসী পাতার সুবাস আর পানের বাটা নিয়ে হাজির হতো। এক অদ্ভুত মায়ায় গাঁথা চলছিল তাদের দিন।
কিন্তু পল্লীগ্রামের সুখের দিন বেশিদিন স্থায়ী হয় না। ঝড়ের কালো মেঘ নেমে এলো প্রতিবেশী গাঁয়ের সঙ্গে সীমানা ও কাশের জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব ঘিরে।
সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। পাশের গাঁয়ের লোক রূপাইদের জমির ধান জোর করে কেটে নিতে এসেছে শুনে রূপাইয়ের রক্ত গরম হয়ে উঠল। সাজুর নিষেধ,
তার ভেজা চোখের জল রূপাইকে আটকাতে পারল না। হাতের শক্ত কাঁচা বাঁশের লাঠিটি তুলে নিয়ে রূপাই অন্য চাষীদের সাথে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে গেল মাঠে।
পরদিন ভোরে যখন ভোরের লাল আলো ফুটে উঠল, মাঠে পাওয়া গেল রক্তের লাল ছোপ। পাশের গাঁয়ের বেশ কিছু লোক রক্তা-রক্তি কাণ্ডে মারাত্মক আহত হলো,
একজন মারাও গেল। কায়দা মতো পুলিশের গাড়ি গ্রামের মুখে ঢুকতেই বাকি পুরুষদের সাথে রূপাইকেও বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়তে হলো—পলাতক আসামীর মতো বন-জঙ্গল আর অচেনা পথের উদ্দেশ্যে।
যাওয়ার আগে রূপাই একবারের জন্য হলেও অন্ধকারে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সাজুর দু'হাত চেপে ধরে কেবল বলেছিল, "সাজু, আমি ফিরে আসব। এই অন্ধকার কাটলেই আমি আবার তোমার কাছে ফিরে আসব।"
কিন্তু সেই রাত শেষ হলেও রূপাই আর ফিরে এলো না। দিন যায়, মাস যায়, ঋতু বদলায়। বর্ষায় ছাদের খড় গলে জল পড়ে, শীতে কুয়াশার চাঁদর পুরো গাঁ ঢেকে দেয়—কিন্তু রূপাইয়ের দেখা মেলে না।
স্বামীর অপেক্ষায় সাজুর দিনগুলো যেন একেকটা পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠল। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সাজু দিনরাত ঘরের বারান্দায় বসে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকত। তার ডাগর চোখ দুটো কান্নার জলে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
একদিন সাজুর মা তার হাতে একটি সাদা সূতি কাপড়ের থান আর হরেক রঙের সুতো তুলে দিলেন। বললেন, "মা সাজু, তোর ভেতরের এই না বলা কান্নাগুলোকে তুই সুতোর মাঝে ধরে রাখ।"
সাজু শুরু করল এক অদ্ভুত রূপকথা সেলাই করা। সে কোনো সাধারণ কাঁথা বুনছিল না, সে বুনছিল তার আর রূপাইয়ের জীবনের সমস্ত স্মৃতি ও ব্যথার ইতিহাস।
কাঁথার প্রথম কোণে সে লাল ও সবুজ সুতো দিয়ে সেলাই করল তাদের প্রথম দেখার সেই মেলা, রূপাইয়ের হাতের বাশি আর তার লাঠি খেলার দৃশ্য। মাঝখানের অংশজুড়ে সে সেলাই করল তাদের বিয়ের বাদ্যি, শুভদৃষ্টি আর কনের সাজ। তারপর কাঁথার নিচের দিকে কালচে সুতো দিয়ে বুনে দিল সেই অমাবস্যার কালো রাত, লাঠালাঠির রক্ত আর রূপাইয়ের চলে যাওয়ার নির্জন পথ।
একটি করে ফোঁড় উঠত, আর সাজুর চোখের এক ফোঁটা জল সেই সুতোর ওপরে ঝরে পড়ত। চোখের জলে ভেজা আর বেদনায় বোনা সেই কাঁথাটি দিনে দিনে রূপ নিল এক অপূর্ব ‘নকশীকাঁথা’য়।
বছর ঘুরে যায়। সাজুর শরীর ক্ষয়ে ক্ষয়ে কঙ্কালসার হতে লাগল। তার রূপের দীপ্তি হারিয়ে গিয়ে সেখানে ঠাঁই নিল এক অদ্ভুত উদাসীনতা। জীবনের শেষ আলোটুকু যখন নিভে আসার মুখে, সাজু তার বৃদ্ধা মাকে কাছে ডাকল।
জীর্ণ কণ্ঠে সাজু বলল, "মা, আমার এই কাঁথা বুনন শেষ হয়েছে। আমি জানি, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না। আমি মরে গেলে এই নকশীকাঁথাটি আমার গায়ের ওপর জড়িয়ে আমাকে সেই মাঠের ধারে সমাহিত কোরো—যে মাঠে আমার রূপাই হারিয়ে গিয়েছিল। যদি কোনোদিন সে ফিরে আসে, এই কাঁথা দেখলেই সে বুঝবে, তার সাজু কীভাবে প্রতিটা মুহূর্তে তার জন্য অপেক্ষা করেছিল।"
তার কিছুদিনের মধ্যেই সাজু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। গ্রামের মানুষ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সাজুর শেষ ইচ্ছা পূরণ করল। মাঠের এক কোণে, একাকী শেওড়া গাছের ছায়ায় সাজুকে কবর দেওয়া হলো এবং তার গায়ের ওপর মেলে দেওয়া হলো সেই গভীর ভালোবাসা আর বেদনায় বোনা নকশীকাঁথাটি।
কালক্রমে সেই কাঁথা মাটিতে মিশে গেল, কবরের ওপর গজিয়ে উঠল সবুজ ঘাস আর বুনো ফুল। কিন্তু গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, সাজুর আত্মা চিরকাল ধরে সেই মাঠের পাহারা দিচ্ছে।
বহু বছর পর, এক শীতের রাতে গ্রামের পথ ধরে এক বৃদ্ধ ও জীর্ণ সাজের পথিক এসে দাঁড়াল সেই মাঠের কোণে। মাথাভর্তি ধোলাই চুল, চোখে ছানি এবং হাত দুটো কাঁপছে। লোকটি আর কেউ নয়—অনুতাপ আর কষ্টের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ফিরে আসা বৃদ্ধ রূপাই।
মাঠের ধারের সেই চেনা কবরের কাছে এসে রূপাই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। মাটির গায়ে হাত রেখে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার চোখের জল শুকিয়ে যাওয়া মাটিকে ভিজিয়ে দিল।
রূপাই অনুভব করতে পারল, মাটির নিচ থেকেও যেন সাজুর ভালোবাসার সেই টুংটাং সুর আর কাঁথার সুতোর উষ্ণতা ভেসে আসছে।
পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ মাঠে এসে দেখল, সাজুর কবরের ওপর নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে রূপাইয়ের দেহ। জীবনের সব বিচ্ছেদ পেরিয়ে মৃত্যুর ওপারে অবশেষে তারা দুজন এক হয়েছে।
সেই থেকে গ্রামের মানুষ ওই বিশাল মাঠটিকে আর কোনো সাধারণ নাম দিল না। গভীর বেদনাবিধুর ভালোবাসার স্মারক হিসেবে তারা সেই মাঠের নাম রাখল "নকশীকাঁথার মাঠ"।
হেমন্তের রাতে বাতাস যখন সেই মাঠের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, আজও যেন বাঁশের বাঁশির করুণ সুর আর নকশীকাঁথার সুতোর ফোঁড়ের মতো এক নীরব প্রেমের গুঞ্জন ভেসে আসে।