16/05/2026
গুজরাটের একটি হোটেলে রুম সার্ভিস , ক্লিনার এর কাজ করে সাগর মণ্ডল। মাস শেষে হাতে আসে প্রায় ১৫ হাজার। সেখানেই তার বাবা মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডলও কাজ করেন। মা সুষমা মণ্ডল কর্মরত কাছেই একটি হাসপাতালে। সংসারের চাকা ঘোরাতে গুজরাটে পরিযায়ী জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গেই লড়াই ই হলো তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী।
আজ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। আজ সকালেও সাগর নিজের কাজেই ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ ফোনে খবর আসে যে সে রাজ্যের মেধাতালিকায় নবম স্থান অধিকার করেছে। কয়েক মুহূর্ত সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না, এটাও কি সম্ভব!!! যখন ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছিল ফোনের ওপার থেকে তার গলাটা অবাক আর অপ্রস্তুত শোনাচ্ছিল। যেনো সবটা তখনও ধাতস্থ হয়ে উঠতে পারেনি। ছেলেটা বেমালুম বললে, “রাজ্যে র্যাঙ্ক করব কোনওদিন ভাবিনি। শুধু ভালো রেজাল্ট করার জন্য পড়াশোনা করেছি।” উচ্চমাধ্যমিকে ৪৮৮ পেয়েছে ছেলেটা।
সংবাদ মাধ্যমেই শুনলাম, এর আগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৬৪৬ নম্বর পেয়ে ও কালনা মহারাজা হাই স্কুলে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেছে সাগর। টিউশন দেবার ক্ষমতা তার পরিযায়ী বাপ মায়ের নেই। তাই শিক্ষকরা এগিয়ে এসেছিলেন।এই যে প্রতিদিন এত অভিযোগের পাহাড় গড়ে তুলি সমাজ কে নিয়ে, মানুষ কে নিয়ে, তাদের মধ্যে ই কিছু মানুষ আজ ও আছেন যারা অর্ধেক ফি নিয়ে, বা বিনামূল্যে মেধাবী গরীব ছাত্র দের বছরের পর বছর পড়িয়ে চলেছেন। হয়তো তাদের জন্য ই আজও পৃথিবী টা ধ্বংস হয়ে যায়নি । মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট তো হলো, কিন্তু পড়াশোনা চলবে কি করে? তাই মাধ্যমিকের পর সে একাই গ্রামের বাড়িতে থেকেছে। হাত পুড়িয়ে নিজে দুবেলা দুটো সেদ্ধ ভাত খেয়ে থেকেছে, লক্ষ্য একটাই। আইপিএস হতে হবে। দিল্লিতে গিয়ে কোচিং করার ইচ্ছাও ছিল প্রিপারেশন এর জন্য। কিন্তু সেই অভাব, তার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি আবার সেই অর্থাভাব ই । শেষ পর্যন্ত আর উপায় কি, তাই গুজরাটে ফিরে গিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ায় এবং হোটেলে কাজ শুরু করে।
এর আগেও সারা জীবন এমন অনেক ছাত্র ছাত্রী দের জীবন গাথা শুনেছি, দেখেছি যাদের জীবনের সাথে এদের বড় মিল। সন্ধ্যে বেলায় মেয়ে কে পড়ানোর সময় গল্প টা বললাম। কিন্তু গল্পটা বোধ হয় ও গল্প ভেবেই শুনে গেলো, অনুধাবন কত খানি করলো সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রাখি। আসলে মা ছোটবেলায় একটা কথা বলত, যাদের বেশি থাকে তাদের কাজ করার ইচ্ছে টা জন্মায় না। এখন যখন আমি নিজে মা হয়েছি , তখন সেই কথা টার মর্ম হাড়ে হাড়ে বুঝি। এরা ছোট থেকে চাওয়ার আগে দুহাত ভরে জিনিস পেয়েছে, মুখ ফুটে বলার আগে সামনে কাজ হয়ে যেতে দেখেছে তাই এদের কাছে সাগর রা নিতান্তই একটা চটকদার গল্প হয়েই রয়ে যাবে।
তবে মন থেকে প্রার্থনা করি আশীর্বাদ করি সাগর, এবং সেই সব বাচ্চাদের যারা লড়াই টা চালিয়ে যাচ্ছো এখনো। এগিয়ে চলো। আমরা তোমাদের কে শিরদাঁড়া সোজা করে, বুক ফুলিয়ে এই ডুবন্ত দেশের হাল টাকে শক্ত হাতে ধরতে দেখতে চাই। তোমার দেশ ধুঁকছে, আমার দেশ ধুঁকছে। আর একটু খানি পথ, দৌড় থামিও না।
#নিবেদিতা