07/01/2018
শুভ জন্মদিনে সংগীতের সম্রাট এ আর রহমানকে শুভেচ্ছা ও ভালবাসা।
ভারতীয় সংগীতের জন্য এ আর রহমান শুধুই একটি নাম নয়। তিনি নিজের ভিশন ও প্যাশন দিয়ে ভারতীয় সংগীতশিল্পকে আমূল পাল্টে দিয়েছেন এবং নিজেকে ভারতীয় সংগীতের মুখপাত্রে পরিণত করেছেন। বিশ্বের অন্যতম একজন মিউজিশিয়ান হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
জিতেছেন অসংখ্য পুরস্কার। এর মধ্যে রয়েছে, দুটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড, দুটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড, একটি করে বাফটা ও গোল্ডেন গ্লোব, চারটি জাতীয় পুরস্কার, ১৫টি ফিল্ম ফেয়ার ও ১৩টি দক্ষিণ ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার।
জন্মের পর তার নাম রাখা হয়েছিল এ এস দিলীপ কুমার। পরে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার বাবা আর কে শেখর ছিলেন একজন সংগীত পরিচালক। তিনি তামিল ও মালায়লাম চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করতেন। তার মায়ের নাম কস্তুরি (মুসলিম হওয়ার পর করিমা বেগম)।
এ আর রহমান কি-বোর্ড, পিয়ানো, সিনথেসাইজার, হারমোনিয়াম এবং গিটারসহ বেশকিছু সংগীত যন্ত্রে তার রয়েছে অসাধারণ দক্ষতা। তবে বিশেষ করে সিনথেসাইজারে তার অন্যরকম আসক্তি।
পরিবার থেকেই সংগীতের হাতেখড়ি হয়েছে রহমানের। বাবার সঙ্গে বিভিন্ন রেকর্ডিং স্টুডিওতে যাতায়াত ছিল ছোট্ট রহমানের। ১১ বছর বয়সে বাবার বন্ধু মালায়লাম কম্পোজার এম কে অর্জুনানের অর্কেস্ট্রা বাজানোর সুযোগ পান।
খুব তাড়াতাড়িই সে সময়ের প্রখ্যাত মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে বাজানোর অভিজ্ঞতা হয়। এমনকী জাকির হোসেন, কুন্নাকুদি বিদ্যানাথান এবং এল শঙ্করের সঙ্গে বিদেশে বেশক’টি ট্যুরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তার। এছাড়া ছোটবেলায় বন্ধু মিউজিশিয়ান শিবামানির সঙ্গে জন অ্যান্থনি, সুরেশ পিটার, জোজো এবং রাজাকে নিয়ে ‘রুট’ নামে একটি ব্যান্ড দল গঠন করেন।
মাত্র ৯ বছর বয়সে রহমানের বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর অভিভাবকহীন হওয়ার পাশাপাশি সংসারে আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়। সে সময় তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে ভূমিকা পালন করে বাবার সংগীত যন্ত্রগুলো। এই যন্ত্রগুলো ভাড়া দিয়েই পরবর্তীতে বেশ কিছুদিন তাদের সংসার চলে।
বাবার মৃত্যুর পর দক্ষিণ ভারতের সেরা কম্পোজার ইলাইয়ারাজা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে রহমানকে তার কি-বোর্ডিস্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেন। সে সময় ইলাইয়ারাজার টিমের লিড কি-বোর্ড প্লেয়ার ভিজি ম্যানুয়াল তাকে জিঙ্গেলে (বিজ্ঞাপনের মিউজিক) ক্যারিয়ার আরম্ভ করার পরামর্শ দেন।
১৯৮৪ সালে রহমানের ছোট বোন (এ আর রেহানা) প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক চিকিৎসক এবং কবিরাজ দেখানোর পরও তিনি সুস্থ হচ্ছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে তার মা আজমীর শরীফে মানত করেন। ১৯৮৮ সালে আল্লাহর রহমতে একজন মুসলিম পীরের সাহায্যে তার অসুস্থ বোন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে উঠলে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আসে এবং সপরিবারে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এসময় তার নাম রাখা হয় আল্লাহ রাখা রহমান বা সংক্ষেপে এ আর রহমান।
১৯৮৭ সালে রহমান মনি রত্নমের নজরে আসেন। রত্নম তার তামিল ‘রোজা’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার সুযোগ দেন রহমানকে। এরপর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এ আর রহমানকে। 'রোজা' নির্মাণের সময়ই চিত্রনাট্যকার সন্তোষ শিবান মালায়লাম চলচ্চিত্র ‘যোধা’তে এ আর রহমানকে চুক্তিবদ্ধ করেন। এটি মুক্তি পায় ১৯৯২ সালে। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পরই জীবনের মোড় ঘুরে যায় এ আর রহমানের। ‘রোজা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জয় করেন ন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডে সেরা সংগীত পরিচালকের পুরস্কার।
১৯৯৭ সালে উপহার দিয়েছেন ‘বন্দে মাতরম’র মতো মাইলস্টোন অ্যালবাম। এই অ্যালবামটি শুধু ভারতে তখন বিক্রি হয়েছিল ১.২ কোটি পিস। চলচ্চিত্রের বাইরে কোনো অ্যালবাম ভারতে এটি প্রথম এতোটা ব্যবসাসফল হয়। এছাড়া তিনি ভারতের ধ্রুপদ সংগীত নিয়ে ‘জন গণ মন’ মিউজিক ভিডিও বের করেন যাতে ভারতের সেরা শিল্পীরা পারফর্ম করেন।
১৯৯৯ সালে জার্মানির মিউনিখে মাইকেল জ্যাকসনের কনসার্টে কোরিওগ্রাফার শোবানা এবং প্রভুদেবার সঙ্গে কাজ করেছেন রহমান। অন্যদিকে ২০০৯ সালের ২৪ নভেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে হোয়াইট হাউসে কনসার্ট করেছেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমন্ত্রণে ডিনারে অংশ নেন। তাছাড়া ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’র পরিচালক ড্যানি বয়েলের আয়োজনে একটি পাঞ্জাবি গানের কম্পোজিশন করে দেন। ২০১২ সালে ডিসেম্বরে শেখর কাপুরের সঙ্গে মিলে ‘কিয়ুকি’ নামে একটি সোশ্যাল ওয়েবসাইট তৈরি করেন।
এত কিছুর মধ্যেও মানবতার জন্য কাজ করে চলেছেন এ মিউজিশিয়ান। ২০০৪ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের স্টপ টিবি প্রজেক্টের গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হয়েছিলেন তিনি। ২০০৪ সালে সুনামি আক্রান্ত এতিম শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং চেন্নাইয়ের উদ্বাস্তু নারীদের নিয়ে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘দ্য বেনিয়ান’র জন্য থিম সং কম্পোজ করেন।
এ আর রহমানের কাজের জন্য তাকে ‘মাদ্রাজের মোজার্ট’ বলা হয়। তামিল ভক্তরা তাকে ‘মিউজিকের ঝড়’ বা ‘সংগীতের ঝড়’ উপাধিতে ভূষিত করেন। অন্যদিকে ২০০৯ সালে ‘টাইমস ম্যাগাজিন’ তাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ২০১১ সালে লন্ডনের ওয়ার্ল্ড মিউজিক ম্যাগাজিনে তাকে ‘ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মিউজিক আইকনদের মধ্যে একজন’ বলে অভিহিত করা হয়। এছাড়া তিনিই প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ভারতীয়; যিনি দু’টি অস্কার জিতেছেন।
এ আর (আল্লাহ রাখা) রহমান ১৯৬৭ সালের আজকের দিনে (৬ জানুয়ারি) ভারতের মাদ্রাজে জন্মগ্রহণ করেন।