07/09/2026
সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন। সূর্যাস্তের রক্তিম আলো তখন মেঘালয়ের পাহাড়ঘেরা সুরমা নদীর শান্ত জলে এক মায়াবী আভা তৈরি করেছে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছেন এক মহাপুরুষ—তাঁর দীর্ঘকায় গড়ন, মুখে শান্ত কিন্তু তেজস্বী হাসি, আর চোখে এক অপার্থিব স্থিরতা। তিনি হযরত শাহজালাল (র:)। পাশে দাঁড়ানো তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী ও ভাগ্নে শাহ পরান (র:)।
শ্রীহট্ট—যাকে আজকের দিনে আমরা সিলেট বলি—তৎকালীন সময়ে ছিল এক প্রাচীন ও রূপকথাঘেরা জনপদ। চতুর্দিক সবুজ পাহাড়, থইথই হাওড় আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই জনপদ শাসন করতেন রাজা গৌরগোবিন্দ। রাজপ্রাসাদের চারপাশে ছিল কঠোর নিয়ম, প্রজা শোষণের নির্মম গল্প এবং সাধারণ মানুষের ওপর অমানুষিক অত্যাচার। বিশেষ করে, নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস পালন করার কোনো স্বাধীনতা ছিল না সাধারণ মানুষের।
ঠিক এমন এক সময়েই ইয়েমেন থেকে আসা সূফি সাধক হযরত শাহজালাল (র:) তাঁর ৩৬০ জন সফরসঙ্গী বা দরবেশ নিয়ে পা রেখেছিলেন এই শ্রীহট্টের মাটিতে।
গল্পটি শুরু হয়েছিল অনেক দূরে, মধ্যপ্রাচ্যে। হযরত শাহজালাল (র:)-এর মামা সৈয়দ আহমদ কবীর (র:) তাঁকে একমুঠো মাটি দিয়ে বলেছিলেন, "পৃথিবীর যেখানে ঘুরে এই মাটির রঙ, গন্ধ আর স্বাদ হুবহু মিলে যাবে, বুঝে নিবে সেটাই তোমার আধ্যাত্মিক সাধনা ও ত্যাগের স্থান।"
দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে, নদী-নালা অতিক্রম করে শাহজালাল (র:) যখন সিলেটের মাটিতে পা রাখলেন, তখন তাঁর সঙ্গীরা সেই মাটি পরীক্ষা করে দেখলেন। মাটির গন্ধ শুকতেই সবার চোখ আনন্দে ছলছল করে উঠল—ইয়েমেনের সেই একমুঠো মাটির সাথে সিলেটের মাটির গন্ধ আর স্বাদ হুবহু মিলে গেছে! শাহজালাল (র:) মুচকি হেসে সুরমার তীরের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এটাই সেই জায়গা।"
তবে সিলেটের বুকে প্রবেশ করা এত সহজ ছিল না। প্রচলিত আছে, রাজা গৌরগোবিন্দ সুরমা নদীতে কোনো খেয়া নৌকা চলাচল করতে দিতেন না, যাতে শাহজালাল (র:) ও তাঁর সঙ্গীরা নদী পার হতে না পারেন। কিন্তু সত্যের পথ তো নদী বা জলের বাঁধনে আটকে থাকে না। হযরত শাহজালাল (র:) তাঁর সঙ্গে থাকা 'জায়নামাজ' সুরমার বিস্তৃত জলের ওপর বিছিয়ে দিলেন। ৩৬০ আউলিয়াকে সাথে নিয়ে সেই জায়নামাজে চড়েই তারা অলৌকিক উপায়ে সুরমা নদী পার হয়ে সিলেটের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন।
নদী পার হয়ে তিনি সুরমার উত্তর তীরে অবস্থান নেন এবং আযান দেন। বলা হয়ে থাকে, সেই আযানের ধ্বনিতে রাজা গৌরগোবিন্দর অহংকারের উঁচু প্রাসাদ আর দুর্গ কেঁপে উঠেছিল। অত্যাচারী রাজার সব কৌশল ও ক্ষমতার দম্ভ একে একে ধুলোয় মিশে যায়, আর সিলেটে সূচিত হয় এক নতুন ভোরের—শান্তি, সাম্য আর মানবিকতার ভোর।
শ্রীহট্ট নাম বদলে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে পীর-আউলিয়ার পুণ্যভূমি 'সিলেট'। শাহজালাল (র:) তাঁর সঙ্গীদের সিলেটের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দেন, যাতে তারা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন এবং ইসলামের সাম্য ও শান্তির শিক্ষা ছড়াতে পারেন।
আজ শত শত বছর পরও সিলেটের বাতাসে যেন সেই আধ্যাত্মিক সুর ভেসে বেড়ায়। সিলেটের হৃদয়বিন্দুতে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হযরত শাহজালাল (র:)-এর মাজার শরীফ।
জালালী কবুতর: মাজার প্রাঙ্গণে পা রাখলেই চোখে পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে নীল-ধূসর রঙের কবুতর, যা 'জালালী কবুতর' নামে পরিচিত। বলা হয়, হযরত শাহজালাল (র:) যখন সিলেটে আসছিলেন, তখন নিজামের দরবার থেকে তাঁকে এক জোড়া কবুতর উপহার দেওয়া হয়েছিল। আজকের হাজার হাজার কবুতর সেই এক জোড়া কবুতরেরই বংশধর।
গজারি মাছ: মাজারের বিশাল দিঘিতে শান্ত হয়ে সাঁতরে বেড়ায় বড় বড় গজারি মাছ। ভক্তরা দরদ দিয়ে তাদের খাবার খাইয়ে দেয়, যা এই দরগাহর অন্যতম এক রহস্যময় সৌন্দর্য।
ঝরনা ও কূপ: মাজারের পাশেই রয়েছে একটি অলৌকিক ঝরনা, যার পানি অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়।
হযরত শাহজালাল (র:) কেবল একজন ধর্মীয় প্রচারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এক অনন্য রূপকার। তাঁর উপস্থিতিতে সিলেটের পাহাড়, চা বাগান, সুরমার জল আর সাধারণ মানুষের জীবনধারা এক পবিত্র সুতোয় গেঁথে গিয়েছিল।
আজও কোনো পর্যটক বা দর্শনার্থী যখন সিলেটের মাটিতে পা রাখেন, উঁচু-নিচু চা বাগানের সবুজ পাতার গন্ধ আর সুরমা নদীর বয়ে চলার শব্দের সাথে সাথে তারা অনুভব করেন সেই ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমির এক অদ্ভুত, প্রশান্তময় ছোঁয়া। সিলেট আর শাহজালাল (র:)—এই দুই নাম যেন ইতিহাস আর বিশ্বাসের এক অমর মহাকাব্য।