19/07/2026
আমি যখন এসএসএসি পরীক্ষা দেই তখন পুরা সিলেটজুড়ে মাত্র ৬৮ জন এপ্লাস পেয়েছিলো সেই ৬৮ জনের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। এইচএসসিতেও হাতে গোণা। যাই হোক, আজকে সিলেটে এপ্লাস পায় লাখের উপর। গোল্ডেনের দৌড়ে এপ্লাসেরই সিট মিলে না, বাকিদের হিসাব ত গোনার বাইরে। হাসিনা সরকার এসে শিক্ষাব্যবস্থার যে বেহাল দশা করেছিলো সেটার শেষ পেরেক ঠুকেছিলো টাকলা নাহিদ! সৃজনশীল নামক আরেক উপদ্রব, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগী ও অনীহা এবং কোচিং সেন্টার নির্ভর অটোপাস মুখস্ত বিদ্যার ধাপে নিয়ে যায়। যদিও জাফর ইকবাল স্যারের আইডিয়া ছিলো কিন্তু তাকে বাদ দিয়েই সেই চিন্তার বাস্তবায়ন করে পলাতক সরকার। বেচারা!
অন্যদিকে বইয়ের লেখক থেকে শুরু করে পাঠসূচির আমূল পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মনোবল ও দক্ষতাকে গুড়িয়ে দেয়।
আপনি ওদের বইগুলো হাতে নিলে দেখতে পাবেন আমাদের আমলে পড়াশোনায় থাকা চ্যাপ্টারগুলোকে ওলটপালট করে ফেলেছে। বাংলা ১ম পত্রের বইতে আমরা যেসব কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়েছি কিংবা বাংলা ২য় পত্র বইটি হাতে নিলে নতুন বানান ও পাঠসূচির বিষয়বস্তুতে চোখ বুলানোর পর আপনি ওই বইটি ছুড়ে ফেলে দিবেন আমি নিশ্চিত। কারণ বইয়ের লেখকের নামটাও আপনার জানা নেই। এদের হাতে লেখা। পোলাপান নীরঞ্জন অধিকারী স্যারের বইয়ের চেয়ে বেশি পড়ে সিওর সাকসেস! ওরা এক্ষেত্রে মার্কেটিং এ সফল।
এই তো গেলো বাংলা এর কথা। ইংরেজি পড়ানো হচ্ছে স্কুলে, কলেজে, ভর্তি পরীক্ষায় সব খানে পোলাপানকে Parts of Speech, Transformation of English বা Tense ধরেন। দেখেন কী উত্তর দেয়। বায়োলজি বলেন কিংবা ফিজিক্স বা সমাজ অথবা ধর্মশিক্ষা কোনো সাবজেক্টের প্রশ্ন করলে বড়জোর ৫টা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে। কারণটা হচ্ছে তারা স্কুলে যা শুনে বা পড়ে বা পড়ানো হয় তা তাদের মগজে ঢুকে না। ঢুকে প্রাইভেট পড়তে গেলে থুক্কু, প্রাইভেটে স্যারের দেওয়া সাজেশনের দাপটে। আদতে প্রাইভেটে পড়ার চেয়ে প্রেমটাই বেশি চলে আরকি!
পরীক্ষার হলে নকল করে, হাতের ব্যান্ডেজ থেকে শুরু করে হলের বেঞ্চ, দেয়াল, টয়লেটের দেয়াল, জুতার ভেতরে, মোজার ভেতরে, পকেটে নকল বা টোকা নিয়ে ঢুকে না হাতেগোণা পাবেন। বন্ধুর দেখে দেখে, স্যারকে জিজ্ঞেস করে বা পুরা এমসিকিউ সবাই মিলে মতামতের ভিত্তিতে পূরণ করে তারপর এপ্লাস আসে। খাতায় কী লিখে সেটা নিজেও কতজন জানে সেটাও একটা প্রশ্ন!
ওদিকে কয়েক লিজেন্ড আছে কোন সাবজেক্ট এর পরীক্ষা সেটাই তারা জানে না। আরেকদল পড়তে পড়তে কী পড়েছে, মুখস্ত করে না বুঝেই শুধু উগড়ে দেয়। ফলে পাস, ১ম স্থান এসব আসলেও বড়জোর ঐ পরীক্ষার সময় পর্যন্ত তা মুখস্ত।
ফলে আমরা যেভাবে ছুটি গল্পের ফটিক বা ফিনাইলের গঠন, কিংবা বায়োলজিতে বুঝে বুঝে পড়েছি। বেশির ভাগই পরীক্ষার আগের রাত বা কোচিং এ আসা প্রশ্নের উত্তর বা শর্ট সাজেশন দিয়েই তারা প্রিপারেশন নিচ্ছে।
নতুন যুগে এখন আর পড়ার বই লাগে না৷ মোবাইলই বই। ইউটিউবই স্কুল আর চ্যাটজিপিটি শিক্ষক। ফলে মা-বাবাদের কাছে গিয়ে ডেকে নিয়ে পড়াশোনা করানোর অভ্যাসটাও দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।
স্কুলের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে কী বলব! বাচ্চাদের ভর্তি পরীক্ষা নাকি বাবা-মায়েরা ভর্তি হবেন সেটাই এখন বড় চিন্তা। ছোট ছোট বাচ্চাগুলোকে লাইব্রেরির ব্যবসা বাড়ানোর ফায়দালুটার একটা উপকরণ হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে। বইয়ের স্তুপে কাধের ব্যাগ ভার। দিনশেষে ওরা আসলে শিখছেটা কী? আদৌ বাবা মায়ের শ্রম, টাকা ঢালাটা সার্থক হচ্ছে ছেলেমেয়েদের পড়শোনার পেছনে যা ইনভেস্ট তা কি কাজে আসলো?
পোলাপান কথায় কথায় আন্দোলনে নামছে, টিকটকে নষ্টামি করছে, প্রাইভেটে আসক্ত হচ্ছে, মোবাইল-ফেসবুকে গালাগালির, ট্রল মিমস, শিক্ষক বড়দেরকে তোয়াক্কা না করা। কী একটা নেক্সট জেনারেশন রেখে যাচ্ছি আমরা টের কি পাচ্ছি? একদিকে ডিগ্রিধারী অন্যদিকে বিবেকহীন একরোখা ও জেদি। সবাই না কিন্তু বেশিরভাগই এমন।
পরীক্ষার হলে যেতে দেরি হলে তাদের গেট আটকে দেয়! দারোয়ানের এতো পাওয়ার কীভাবে আসে? পরীক্ষার টাইম টেবিল বড় নাকি পরীক্ষা দিতে পারাটা বড়। কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে ততক্ষণ পর্যন্ত ঢুকতে পারবে যতক্ষণ পরীক্ষা চলবে। দারওয়ান ঢুকতে দিবে না কেন?
আমার বুঝে আসে না, পদত্যাগ বা বরখাস্ত এর দাবি পোলাপান করবে বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যান, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তদারকির দায়িত্ব যাদের ছিলো, যারা প্রশ্ন নির্বাচন করবে এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির।
ওরা দাবি করছে শিক্ষামন্ত্রীর।
গাছ নষ্ট সেটা দেখে না, ফল নিয়ে পড়ে আছে!
শিক্ষামন্ত্রী কীভাবে জানবে যে প্রশ্ন কী করা হয়েছে। কবের হয়েছে? প্রতিটা ধাপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বেতনভুক্ত কর্মকর্তা আছে। এদের কাজটা কী?
বোর্ড পরীক্ষার সাথে জড়িত মাথা থেকে শুরু করে তলা পর্যন্ত সবগুলোকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
হাসিনা পালিয়েছে, কয়জন নিচু লেভেল বা পরিচালক এর চাকরি গেছে? সব তো ১৬ বছর ধরে বহালরাই বসে আছে। শিক্ষামন্ত্রী পাল্টালেই কী আর না পাল্টালেই কী?
পড়ার বইটাই তো ঠিক না। হাসিনার লেখা কবিতা পড়ে আমার সন্তান মেট্রিক-ইন্টার দিবে? বাংলা ১ম পত্র বইটা হাতে নিয়ে দেখেছেন কেউ?
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি করতে হলে যা যা করা দরকার-
১) ৯০ দশকের বইগুলো আবার ফিরিয়ে আনা
২) সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল করা
৩) ১-৪ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের বইয়ের সংখ্যা কমানো।
৪) যেসব পরীক্ষার্থী নানা ছুতায় পড়াশোনা বাদ দিয়ে আন্দোলন, দাবি এসবে যুক্ত হবে, উস্কানীমূলক বক্তব্য দিবে এদের পরীক্ষার নাম্বার থেকে ২০মার্ক কেটে নেওয়া হবে।
৫) সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল, প্রধানশিক্ষক, অধ্যক্ষকে শোকজ করা হবে। কারণ তিনি তার শিক্ষার্থীদেরকে মূল্যবোধ শেখাতে ব্যর্থ। তাকে জবাবদিহির আওতায় আনলে শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামা বন্ধ।
৬) পরীক্ষায় দেরিতে আসা শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারবে। দারওয়ান গেট আটকে দিতে পারবে না। যে দারওয়ান এই কাজ করবে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে।
৭) শিক্ষকরা ক্লাসে কী শেখাচ্ছেন, নৈতিক শিক্ষা, মূল্যবোধ ও মুখস্তবিদ্যা থেকে সরে এসে নান্দনিকভাবে পড়াশোনা শেখাচ্ছেন কি না সেটা নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
৮) প্রাইভেট, কোচিং নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।
৯) কোন সরকারি শিক্ষক বাসায় নিয়ে কোচিং করাতে পারবে না। যা পড়াবে সেটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শেষ।
১০) কোন ক্লাসে, ২০জনের অধিক পরীক্ষায় ফেল করলে সেই শিক্ষককে জরিমানার আওতায় আনতে হবে।
১১) যার ক্লাসের ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী ভালো রেজাল্ট করবে সেই শিক্ষককে বেস্ট টিচার হিসেবে সম্মানীবাড়ানোসহ আখ্যায়িত করা হোক। এতে শিক্ষাদানের মান বেড়ে যাবে।
১২) গ্রাজুয়েট বেকার, বাংলাসহ অন্যান্য অখ্যাত সাবজেক্টের অনার্স মাস্টার্স পাস করা গ্রাজুয়েটদেরকে তাদের গ্রাম, জেলা, উপজেলা, থানা বা ইউনিয়ন ভিত্তিক স্কুলগুলোতে বিসিএস ছাড়াই নিয়োগ দিতে পারলে বেকারত্ব কমবে, শিক্ষক শুন্যপদ পূরণ হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
১৩) শিক্ষকদের ট্রেনিং করায় একটা প্রতিষ্ঠান আছে। ওটার কী কাজ আজো জানি না। জানলে সৃজনশীল পরীক্ষার প্রশ্নের মান এতো নিচু কীভাবে হয়? ওটার নজরদারি বাড়ানো ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।
১৪) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে স্মার্ট করতে হবে। ডিভাইজ ভিত্তিক। সরকারি স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে এটেডেন্স নিতে যে সময় শিক্ষকেরা ব্যয় করেন সেটা প্রতিটা স্কুলে বন্ধ করতে হবে। চেক ইন ও চেক আউট ডিভাইস বসানো উচিত। যেগুলো আমরা প্রাইভেট ভার্সিটিতে দেখি।
১৫) সরকারি স্কুল, কলেজে ফিজিক্স, ক্যামিস্ট্রি ল্যাবের মান এতো নিম্নমানের যে, শিক্ষার্থীরা ২৫ মার্ক ২৫ এ পেলেও তারা জেনে প্রেকটিক্যাল করে এই ফুল মার্ক পাচ্ছে না। সবাই জানে লিখলেই পাস। ফলে ল্যাব থাকা না থাকার কোনো পার্থক্য নেই।
১৬) প্রতিটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেন্টালকাউন্সিল সেল ও এন্টিডিপ্রেশন কর্নার থাকা উচিত। যেখানে পড়াশোনার চাপ, সুইসাইডের টেন্ডেন্সি ও মেন্টাল, ফিজিক্যাল হ্যাসেনমেন্ট বা ডিপ্রেশনে পড়লে যাতে শিক্ষার্থীরা মানসিক ও শারিরীকভাবে সুস্থ থাকে সে বিষয়ে কাউন্সিলিং নিতে পারবে। এতে ডিপ্রেশন, রিলেশন ব্রেকাপ ও রেজাল্ট এর কারণে সুইসাইড করা কমবে।
১৭) পরীক্ষা খাতা যারা দেখবে এবং যারা প্রশ্ন করবে, ছাপাবে, তদারকি করবে তাদেরকে জবাবদিহি ও কড়া নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
১৮) কথায় কথায় যেকোনো ইস্যুতে শিক্ষামন্ত্রীকে এট্যাক বা মিডিয়ার সামনে না এনে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের জবানবন্দি বা মতামত নিতে হবে। তাহলে মানুষ চেইন অফ কমান্ড বা স্তরে স্তরে অফিসার লেভেল আছে সেটা জানতে পারবে। যার যার দায়িত্ব সে সে আপডেট করবে।
শিক্ষার সংস্কার জরুরি।
#বাশু #শিক্ষা_সংস্কার