27/04/2020
Mehdi Morshed Chowdhury
সংখ্যা ও গণিতে কোভিড-১৯।
মানুষ তার আশেপাশের প্রকৃতিকে বোঝার জন্য ব্যবহার করে বিজ্ঞান আর সে বিজ্ঞান কে প্রকাশ করার ভাষা হল গণিত। গণিত এর শুরু যদি বলি তবে বলতে হয় বিজ্ঞান এর প্রথাগত চর্চার আগে মানুষ গণিতের ব্যবহার শুরু করে।
গণিত এর সাথে মানুষের সম্পর্ক তখন থেকে যখন মানুষ তার নিজের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য উতপাদন শুরু করে। তাকে হিসেব করতে হয় কি পরিমান খাদ্য তার কাছে মজুদ আছে সে খাদ্য তার কত দিনের খোরাক যোগাবে। এরপর মানুষ খাদ্য উতপাদনে যখন ঋতুরাজির খোজখবর রাখার প্রয়োজন অনুভব করে তখন থেকে শুরু বিজ্ঞানের। বলা যেতে পারে প্রাচীনকালের যে তারকারাজির গল্প তা সেই সময়কার বৈজ্ঞানিক গবেষণা মাত্র। এইজন্যে তাদের বোকা বলা চলে না। বরং সে সময়কার মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে নানা গল্প ফেদেছিলো বলে কিছু কৌতূহলী মানুষের মনে প্রশ্ন এসেছিলো এই বিশ্ব কিভাবে চলে। আর তার ফলশ্রুতিতে বিজ্ঞান আজ এতদূর। আমরা এখন কৃষ্ণগহ্বরের ছবি দেখতে পাই।
তো যেখানে ছিলাম। গণিত। এই গণিত দিয়ে বিজ্ঞানের সকল আবিষ্কারকে প্রকাশ করা যায়। আইনস্টাইন যখন থিওরি অফ রিলেটিভেটি এর তত্ত্বরূপ প্রকাশ করেন, তখন তৎকালীন বিজ্ঞান মহল তাকে বলেন তিনি যেন তার তত্ত্বের গাণিতিক প্রমাণ দেন। কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সঠিকতা যাচাই প্রথম খাতা কলমে অংক কষে দেখাতে হয়। তারপর চলে পরীক্ষা নিরীক্ষা। গণিত শুধু পদার্থবিজ্ঞান কিংবা রসায়নে সীমাবদ্ধ নয়, এর ব্যপ্তি আছে জীববিজ্ঞানেও।
কোভিড-১৯ বর্তমানে পুরো পৃথিবীকে কাবু করে রাখা ভয়াবহ সংক্রামক ব্যধি। যা নভেল কোরনাভাইরাস নামক ভাইরাসের সংক্রমনে হয়। এই ভাইরাসটি মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি করার মাধ্যমে আক্রমন করে।
কোভিড-১৯ চীনে প্রকাশ পাওয়ার পর যখন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য রক্ষা সংগঠনের নজরে আসে তখন থেকেই নানাপ্রকার হিসেব নিকেশের শুরু হয় নির্ধারন করা হয় অনেক স্থিতিমাপ।
যখন এরকম কোন ভারাইস এর সংক্রমন শুরু হয় তখন তখন স্বাস্থ্য রক্ষার বড় বড সংগঠন গুলো অনেক স্থিতিমাপ নির্ধারন করে।
যেমন ইনকিউবেশন পিরিয়ড। এর মানে হলো কোন একটা রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার কতদিন পর রোগের লক্ষণ গুলো প্রকাশ পাবে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোন ব্যক্তি আক্রান্ত কিনা তা বোঝার জন্য তাকে কতদিন পর্যবেক্ষনে রাখা প্রয়োজন। কোভিড-১৯ এর জন্য এর মান হল ১৪ দিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন স্থিতিমাপ গুলোর মধ্যে একটি হল আর-নট বা সংক্রমন হার। এটি হলো কোন একটা রোগ একজন থেকে কতজনের মধ্যে ছড়ায় তার মান। এর দ্বারা বোঝা যায় সংক্রমন মহামারী আকার ধারন করবে কিনা।
আর-নট এর মান যত বেশি রোগের ভয়াবহতা তত বেশি। WHO জানুয়ারির ২৩ তারিখ এ নির্ধারন করে কোভিড-১৯ এর আর-নট মান ১.৪ থেকে ২.৫ এর মধ্যে।
এর মানে একজন কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ব্যক্তি ১ এর বেশি সুস্থ ব্যক্তিকে এই রোগে সংক্রমিত করতে পারে। এই মান দিয়ে ধারনা করা যায় কোন একটা এলাকায় একজন ব্যক্তি আক্রান্ত হলে নির্দিষ্ট সময় পরে কত জন ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারে। এবং তা মহামারী হিসেবে বিবেচিত হবে কিনা। সময় এর সাথে সাথে আর-নট এর মান বাড়তে বা কমতে পারে। বাড়ার মানে হল সংক্রমনের হার বেড়ে গিয়েছে এবং কমে যাওয়ার মানে হলো সংক্রমনের হার কমে গিয়েছে এবং ভাইরাস এর সংক্রমন আপাতত বিলীন হওয়ার দিকে।
যখন সারস, মারস ইত্যাদি মহামারি রোগের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল তখনো আর-নট নির্ণয় করা হয়েছিল।
এরপর আলোচনা করা যাক সিএফআর নিয়ে। সিএফআর এর পুরো রূপ হোল কেস ফ্যাটালিটি রেট বা রেশিও। এর হিসব করা হয় কোন একটা নির্দিষ্ট তারিখ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ভাগ ঐ তারিখ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়ে ফেরত যাওয়া রোগীর সংখ্যা ও মৃতের সংখ্যা গুন একশ। এই স্থিতিমাপের মাধ্যমে বোঝা যায় এই রোগে আক্রান্ত রোগীর শতকরা কত ভাগ সুস্থ হতে পারবে। এই আলোচনাটি প্রস্তুতের সময় কোভিড -১৯ এর সিএফআর হচ্ছে শতকরা ২০ ভাগ। সিএফআর দিয়ে রোগ নিরাময়ের বিশ্লেষণ ও করা হয়। যেমন কোন রোগের সম্ভাব্য প্রতিষেধক পরীক্ষণের সময় দেখা হয় টিকা প্রয়োগের ফলে পরীক্ষারত জীবে সিএফআর কমেছে কিনা। এর ফলে নিশ্চিত হওয়া যায় আবিষ্কারকরা সঠিক পথে এগুচ্ছেন কিনা।
মহামারী ছড়িয়ে পড়লে রোগের সংক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিভিন্ন বয়স এর গোত্রের রোগীর চার্ট বানানো হয়। এই চার্টে থাকে কোন গ্রুপে সংক্রমণ বেশি, কোন গ্রুপ সুস্থ হচ্ছে দ্রুত, কোন গ্রুপের ক্ষেত্রে মৃত্যু হার বেশি। এর ফলে কোন এলাকার চিকিৎসা ব্যবস্থা কোথায় কিরূপ কর্ম পরিকল্পনা করে দ্রুত সেবা প্রদান করবে তা নির্ধারন করতে পারে।
এবার দুটো বৃত্তচাপের গল্প বলা যাক। চিত্রে যে উঁচু বৃত্তচাপটি দেখা যাচ্ছে এটি হলো মহামারীর ভয়ংকর রূপ। প্রতিরোধ ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে রোগীর সংখ্যা এত বেড়ে যায় যা কোন একটা অঞ্চল বা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তা আর সামাল দিতে পারে না। ফলে রোগীর সংখ্যা অল্প সময়ে অনেক বেড়ে যায়, এবং মৃতের সংখ্যাও বেড়ে যায়। যেমনটা কোভিড-১৯ সংক্রমণের শুরুর দিকে ঘটেছিলো চীনে। বর্তমানে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইউকে, ইউএসএ এই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আবার দ্রুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামের মত দেশে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি মৃতের সংখ্যাও কম। তাদের বৃত্তচাপটা ছোট থাকায় যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের সকলের চিকিৎসা নিশ্চিত হচ্ছে। উপরুন্ত অতিরিক্ত ঢালু বৃত্তচাপের কারণে ইউরোপের দেশগুলোতে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে।
কোভিড -১৯ এর কোন প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয় নি, প্রতিরোধ করা তাই একান্ত জরুরি। প্রতিরোধ এর উপায় গুলো হলো
১) নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, বিশেষ করে বাহিরে গেলে বা অন্যরা স্পর্শ করে এমন বস্তু স্পর্শ করলে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। এবং হাত ধোয়ার সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে ভালো করে ঘষে হাত ধোঁয়া।
২) অপরিষ্কার হাতে চোখ, নাক ও মুখে স্পর্শ না করা।
৩) হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় একবার ব্যবহারযোগ্য টিস্যু ব্যবহার করা এবং তা ব্যবহারের পর সঠিকভাবে ময়লাফেলার স্থানে ফেলা। যদি টিস্যু বা রুমাল না থাকে তবে হাতের কনুই ভাজ করে তার মাঝখানে কাশি দেয়া।
৪) সামাজিক দূরূত্ব বজায়ে রাখা। কাউকে অসুস্থ মনে হলে তার কাছ থেকে ১ মিটার বা ৩ ফিট দূরত্ব বজায় রাখা।
৫) নিজে অসুস্থ হলে নিজ থেকে অন্যদের সাথে দূরত্ব বজায় রাখা।
৬) গুজবে কান না দেয়া।
কোভিড-১৯ এখন আমাদের দেশে সংক্ষিপ্ত আকারে সংক্রমণ করেছে, এই মুহুর্তে আমরা যদি সঠিক ভাবে তা প্রতিরোধ করি তবে আমাদের পক্ষে এর প্রতিকার সম্ভব। কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে বলাই যা প্রতিরোধই এর সর্বোতকৃষ্ট প্রতিকার। কোন প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট বক্সে তা লিখতে পারেন.