18/08/2026
সফলতা বলতে আপনি কী বোঝেন? ভালো রেজাল্ট, একটা ভালো চাকরি, বেশি আয়, নিজের বাড়ি, প্রতিষ্ঠিত জীবন? অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের সালাত শেষে এমন তিনটি জিনিস চেয়ে দু‘আ করতেন, যেগুলো ঠিক হলে মানুষের দুনিয়া আর আখিরাত দুটোই বদলে যেতে পারে।
আমরা সকাল শুরু করি অনেক হিসাব নিয়ে। আজকের examটা ভালো হোক, interviewটা হয়ে যাক, business এ sale আসুক, salary বাড়ুক, একটা ভালো সুযোগ আসুক। কখনো ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নিয়ে দেখি কে কোথায় পৌঁছে গেছে, তারপর নিজের জীবনটা মাপতে শুরু করি। কিন্তু নবী ﷺ ফজরের সালাত শেষে যে দু‘আটি করতেন, সেখানে শুধু “সফলতা” চাওয়া হয়নি; সফল জীবনের ভেতরের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস চাওয়া হয়েছে।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ‘ইলমান নাফি‘আন, ওয়া রিযকান ত্বইয়্যিবান, ওয়া ‘আমালান মুতাকাব্বালান।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র ও উত্তম রিযিক এবং কবুলযোগ্য আমল চাই।
সুনান ইবন মাজাহ, ৯২৫
একটা বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার রাখা ভালো। হাদিসে এই দু‘আটির নাম “সফলতার দু‘আ” দেওয়া হয়নি। উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের সালাত শেষে এই দু‘আ করতেন। তবে দু‘আটির অর্থ এত ব্যাপক যে এটাকে সফল জীবনের জন্য অত্যন্ত সুন্দর একটি দু‘আ হিসেবে আমরা বুঝতে পারি।
খেয়াল করুন, তিনি শুধু জ্ঞান চাননি। চেয়েছেন উপকারী জ্ঞান। কারণ অনেক কিছু জানা যায়, কিন্তু সব জানা মানুষের জীবন বদলায় না। আপনার degree থাকতে পারে, certificate থাকতে পারে, শত শত ইসলামিক lecture save করা থাকতে পারে, অনেক আয়াত হাদিস জানা থাকতে পারে। কিন্তু সেই জ্ঞান যদি সিদ্ধান্ত বদলায় না, চরিত্র নরম করে না, হারাম থেকে সরায় না, মানুষের হক বুঝতে শেখায় না, আল্লাহর কাছে নিয়ে যায় না, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই জ্ঞান আমার কতটা উপকার করল?
আল্লাহ নবী ﷺ কে শিখিয়েছেন, “বলুন, হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন।”
সূরা ত্বা হা, ২০:১১৪
তাই শুধু “আরও জানতে চাই” নয়, মাঝে মাঝে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, আমি যা জানছি, সেটা কি আমাকে বদলাচ্ছে? গীবত হারাম জানার পর আমার জিহ্বা একটু থেমেছে? হালাল হারাম earning সম্পর্কে জানার পর আমার সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন এসেছে? সালাতের গুরুত্ব জানার পর আমার সময়সূচিতে সালাতের জায়গা বদলেছে? রাসূলুল্লাহ ﷺ উপকারী জ্ঞান চাইতে এবং উপকারহীন জ্ঞান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেও শিখিয়েছেন।
সুনান ইবন মাজাহ, ৩৮৪৩
তারপর দু‘আয় আসে “রিযকান ত্বইয়্যিবান”, পবিত্র ও উত্তম রিযিক। আমরা রিযিক চাইলে সাধারণত পরিমাণটা আগে দেখি। কত salary? কত profit? মাসে কত আয়? Business কত বড় হলো? কিন্তু এই দু‘আ আমাদের প্রশ্নটা একটু বদলে দেয়, কত পেলাম, তার আগে কীভাবে পেলাম?
একজন মানুষ মাসে অনেক আয় করছেন, কিন্তু সেই টাকার জন্য এমন কাজ করতে হচ্ছে যেটা নিয়ে রাতে নিজের ভেতরেই অস্বস্তি হয়। আরেকজন হয়তো কম আয় করেন, কিন্তু নিজের earning নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে ভয় লাগে না। শুধু সংখ্যার দিকে তাকালে প্রথমজনকে বেশি successful মনে হতে পারে। কিন্তু নবী ﷺ আমাদের এমন রিযিক চাইতে শিখিয়েছেন যা ত্বইয়্যিব, অর্থাৎ ভালো ও পবিত্র। এখানে সফলতা শুধু account balance নয়, রিযিকের উৎসটাও সফলতার অংশ।
এই একটা শব্দই career decision বদলে দিতে পারে। Job offer এলো, salary অসাধারণ। শুধু “কত?” নয়, “কাজটা কী?” প্রশ্নটাও আসবে। Business বাড়ছে, কিন্তু customer পেতে মিথ্যা বলতে হচ্ছে কি না, কারও হক নষ্ট হচ্ছে কি না, haram কিছু ঢুকে যাচ্ছে কি না, সেটাও দেখতে হবে। কারণ আমরা এমন income চাই না, যা বাড়তে বাড়তে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়ও বাড়িয়ে দেয়।
তারপর দু‘আর তৃতীয় অংশ: “ওয়া ‘আমালান মুতাকাব্বালান”, কবুলযোগ্য আমল।
এই জায়গাটা খুব গভীর। আমরা কত আমল করেছি, সেটা গুনতে পারি। কিন্তু কোনটা আল্লাহ কবুল করেছেন, সেটা দেখতে পাই না। আপনি নামাজ পড়লেন, সদকা করলেন, কাউকে দ্বীন শেখালেন, ইসলামিক post লিখলেন, মানুষের উপকার করলেন। বাইরে থেকে সবকিছু সুন্দর। কিন্তু একজন মুমিনের ভয় এখানেই, আমি করলাম ঠিকই, কিন্তু কবুল হলো তো?
ইবরাহিম ও ইসমাঈল আলাইহিমাস সালাম কা‘বার ভিত্তি নির্মাণ করছিলেন। এমন মহৎ কাজের মাঝেও তাঁরা নিশ্চিন্ত হয়ে বলেননি, “এত বড় কাজ করছি, নিশ্চয়ই কবুল।” বরং দু‘আ করেছিলেন:
“হে আমাদের রব, আমাদের কাছ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
সূরা আল বাকারা, ২:১২৭
এটা আমলের দিকে তাকানোর ভাষাই বদলে দেয়। শুধু “আজ কত পৃষ্ঠা কুরআন পড়লাম?” নয়, “কী নিয়তে পড়লাম?” শুধু “কত টাকা সদকা করলাম?” নয়, “মানুষকে দেখানোর ইচ্ছা ঢুকে গেল কি?” শুধু “কত দ্বীনি কাজ করছি?” নয়, “ইয়া আল্লাহ, আপনি কি এগুলো আমার কাছ থেকে গ্রহণ করবেন?”
এখন দু‘আটির তিনটি অংশ পাশাপাশি রাখুন। যে জ্ঞান আমাকে উপকার করবে। যে রিযিক আমাকে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে ঠেলে দেবে না। আর যে আমল শুধু করা হবে না, আল্লাহর কাছে কবুলও হবে।
তখন বুঝবেন, এটাকে শুধু exam pass, job পাওয়া বা business success এর “দু‘আ” বানিয়ে ফেললে এর সৌন্দর্যের অনেকটাই হারিয়ে যায়। একজন student বলবে, “ইয়া আল্লাহ, শুধু GPA নয়, এমন জ্ঞান দিন যা আমার কাজে লাগবে।” একজন চাকরিজীবী বলবে, “শুধু promotion নয়, আমার earning পবিত্র রাখুন।” একজন দ্বীনের কাজ করা মানুষ বলবে, “শুধু মানুষের praise নয়, আমার কাজটা আপনি কবুল করুন।”
হয়তো আপনি এখন পড়াশোনা নিয়ে confused। কী পড়বেন, কোন subject নেবেন, ভবিষ্যৎ কোথায় যাবে বুঝতে পারছেন না। বলুন, “‘ইলমান নাফি‘আন।” শুধু তথ্য নয়, উপকারী জ্ঞান চাই।
হয়তো চাকরি নেই। অথবা চাকরি আছে, কিন্তু earning নিয়ে অস্বস্তি। বলুন, “রিযকান ত্বইয়্যিবান।” শুধু টাকা নয়, এমন রিযিক চাই যার পাশে দাঁড়িয়ে “কিন্তু…” বলতে হবে না।
হয়তো অনেক আমল করছেন, কিন্তু নিজের নিয়ত নিয়ে ভয় হয়। কখনো রিয়া ঢুকে যায়, কখনো গাফিলতি। বলুন, “‘আমালান মুতাকাব্বালান।” ইয়া আল্লাহ, আমার সামান্য আমলটুকুও আপনি কবুল করুন।
আমরা সাধারণত বলি, “ইয়া আল্লাহ, আমাকে সফল করুন।” এই দু‘আ যেন সফলতার প্রত্যেক অংশের পাশে একটা filter বসিয়ে দেয়:
জ্ঞান হোক, কিন্তু উপকারী।
রিযিক হোক, কিন্তু পবিত্র।
আমল হোক, কিন্তু কবুলযোগ্য।
তারপর success এর সংজ্ঞা বদলে যায়। মানুষ আপনাকে কত successful ভাবছে, সেটাই আর একমাত্র প্রশ্ন থাকে না। প্রশ্ন হয়, আল্লাহর কাছে আমার জীবন কোন দিকে যাচ্ছে?
হয়তো আপনার পরিচিত একজন আপনার চেয়ে বেশি আয় করছেন। আরেকজনের degree বেশি। আরেকজন অনেক বেশি ইসলামিক কাজ করছেন। তুলনা করতে করতে মন খারাপ হওয়ার আগে এই তিনটি শব্দ মনে করুন, নাফি‘আন, ত্বইয়্যিবান, মুতাকাব্বালান। বাইরে থেকে পরিমাণ দেখা যায়, কিন্তু উপকার, পবিত্রতা আর কবুল হওয়া আমরা দেখতে পাই না।
তাই আগামী ফজরের সালামের পর তাড়াহুড়ো করে উঠে যাওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড বসুন। দু‘আটি ধীরে বলুন। শুধু মুখে নয়, অর্থটাও মনে রাখুন:
“ইয়া আল্লাহ, আজ আমি যা শিখব তা যেন আমার উপকার করে। যা উপার্জন করব তা যেন পবিত্র হয়। আর যা ভালো কাজ করব, আপনি যেন তা কবুল করেন।”
হয়তো এই তিনটি চাওয়া আপনার পুরো দিনের direction বদলে দিতে পারে।
আল্লাহ আমাদের এমন জ্ঞান দিন যা আমাদের উপকার করে এবং তাঁর কাছে নিয়ে যায়। এমন রিযিক দিন যার উৎস পবিত্র। এমন আমল করার তাওফিক দিন যা মানুষের চোখে বড় হওয়ার আগেই তাঁর কাছে কবুল হয়ে যায়। আমিন।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━