13/06/2016
বিজ্ঞান শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ কমে যাওয়ার জন্য স্কুল সমূহে বিজ্ঞান পাঠদান পদ্ধতি এবং ল্যাবের জীর্ণ দশা অন্যতম কারণ। বিভাগীয় শহরের কিছু নামকরা সরকারি স্কুল এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিছু ব্যয়বহুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য স্কুলসমূহে বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থা অত্যন্ত করুণ। শিক্ষকরা যেখানে বিজ্ঞানের ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ তৈরি করতে উৎসাহ প্রদান করবেন, সেখানে অনেক স্কুলে তাঁরাই ছাত্রছাত্রীদের মনে বিজ্ঞানের ব্যাপারে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। আমার এক বন্ধুর বোন গত বছর নবম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পর কোন বিভাগ নিবে সে ব্যাপারে পরামর্শ নেয়ার জন্য তার স্কুলের এক শিক্ষকের কাছে যায়। শিক্ষক তাকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে মানা করে, কারণ হিসেবে বলে বিজ্ঞান অনেক কঠিন তাই সে ভালো করবে না। যদিও, আমি জানি সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত। আমার বন্ধু পরে আমার কাছে এই কথা বলার পর আমি বললাম তার বোনকে কিছুদিন বিজ্ঞানের ক্লাস করতে হয়ত ভাল লাগলে সে নিজেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার আগ্রহ পাবে। কিন্তু বিধিবাম, দুয়েকটি ক্লাস করার পরই তার কান্নাকাটি করার মত অবস্থা এবং সে মনে করল তার দ্বারা আর কোন কিছু করা সম্ভব হলেও বিজ্ঞান পড়া সম্ভব না। অতঃপর সে এখন বাণিজ্য বিভাগের ছাত্রী।
বর্তমানে অধিকাংশ স্কুলে, বিজ্ঞানের শিক্ষকরা বিজ্ঞান শুধু গতানুগতিকভাবে পড়াচ্ছেন কিন্তু বিজ্ঞানের ধারণাসমূহ ছাত্রছাত্রীদের কাছে সহজ, প্রাণবন্ত ও মজার করে তুলতে পারছেন না। একদিন পড়া দাগিয়ে দেয়া এবং পরের দিন পড়া আদায় করার মধ্যেই অনেকের শিক্ষকতা জীবন সীমাবদ্ধ। আবার অনেকেই আছেন ক্লাসে রিডিং পড়ান এবং পড়েন। এরমধ্যে যেসকল শিক্ষক ভালো বিজ্ঞান জানেন, তাদের কিছু অংশ ক্লাসে ভালো পড়ান না বরং আরও জানতে হলে তার কাছে প্রাইভেট পড়তে আসতে বলেন। আর্থিকভাবে সচ্ছলরাই তখন শুধু এই সুযোগ নিতে পারেন। যেসকল বিজ্ঞানের শিক্ষকদের কাছে তেমন কেউ প্রাইভেট পড়ে না, তাদের অস্ত্র হল পরীক্ষার নাম্বার। ব্যাবহারিক পরীক্ষায় নাম্বার কমিয়ে দেয়ার এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁর পড়ানো বিষয়ে ফেল করানোর ভয় দেখিয়ে তাঁরা ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করেন।
বিজ্ঞান হল হাতে কলমে শিক্ষা এবং যার জন্য একটি ভাল ল্যাব আবশ্যক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বিএফএফ এর গবেষণা এলাকায় দেখা যায়, প্রায় ৭৯% স্কুলে ল্যাব নেই। যেসব স্কুলে ল্যাব আছে, তাদের অধিকাংশেই ভালো পরিবেশ ও যন্ত্রপাতি নেই। ভাল ল্যাব সমৃদ্ধ স্কুলের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি। আমার মনে পড়ে আমি যখন প্রথম স্কুলের ল্যাবে সরল দোলকের ব্যাবহারিক করতে যাই, আমি বুঝতে পারিনি এটি যে একটি ল্যাব। চারিদিকে মাকড়শার জাল, ধুলোবালি, বদ্ধ এবং গুমট একটি পরিবেশের কারনে আমি মনে করেছিলাম এটি স্টোর রুম।
মাধ্যমিক পর্যায় অনেক কষ্টে অতিক্রম করলেও উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিভাগ পরিবর্তন করে। উচ্চ মাধ্যমিকের দীর্ঘ সিলেবাস কিন্তু তাঁর তুলনায় সময় কম থাকায় প্রায় সব কলেজেই ক্লাসে সিলেবাস শেষ করা হয় না। ছাত্রছাত্রীদের তাই বাধ্য হয়ে প্রাইভেটে বা কোচিংয়ে পড়তে হয়। কোন একটি বিষয়ে যদি মাসে ২০০০ টাকা করে খরচ হয় এবং একজন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীকে যদি ন্যূনতম ৩ টি বিষয় পড়তে হয়, তাঁর মাসে শুধু প্রাইভেট বা কোচিং বাবদ খরচ হয় ৬০০০ টাকা। যা, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিশাল অঙ্ক। এছাড়া, প্রাকটিকাল ও অন্যান্য খরচ তো আছেই।
উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় দেখা যায়, বিজ্ঞান বিভাগ হতে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিজ্ঞানের মূলধারা বা ফলিতধারার কোন বিষয় ব্যতীত অন্য কোন বিষয় বিশেষ করে বি. বি. এ. বিভিন্ন বিষয়ে পড়তে আগ্রহ বোধ করে। এখনকার শিক্ষার্থীরা গবেষণা বা বিজ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল কাজ করার চেয়ে কোর্ট টাই পরে এ. সি. রুমের অফিসে রুটিন কাজ করতে বেশী পছন্দ করে বলে মনে হয়। যারা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় তারা দেখে সাধ আর সাধ্যর বিশাল ফারাক। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাখাতে অপ্রতুল বরাদ্দ, ল্যাবরেটরির গ্লাসঅয়ার ও কেমিক্যাল কেনার টাকার স্বল্পতা এবং শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস না নেয়া অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণাবিমুখ করে তোলে। বিজ্ঞান শিক্ষা উপকরণের মূল্যও প্রতিবন্ধকতার আরেকটি কারণ। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের অন্য বিভাগ হতে শিক্ষা উপকরণের জন্য প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যায় করতে হয়। আর, ছাত্ররাজনীতির অস্থির অবস্থা ও সেশনজট তো আছেই। কয়েকমাস আগে একটি দৈনিক পত্রিকার রিপোর্টে দেখেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে নাকি ২০% এরও কম শিক্ষক আছেন যারা সমানতালে শিক্ষকতা ও গবেষণাকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। এটি আসলেই উচ্চশিক্ষায় গবেষণাভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চার জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি। বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পরেও অনেক শিক্ষার্থী আমাদের দেশে বিজ্ঞানভিত্তিক চাকুরীর সুযোগ কম থাকায় চলে যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক পদসমূহে।
হ্যান্ডবুক অব রিসার্চ ইন সায়েন্স এডুকেশন, রিসার্চ ইন এশিয়া, ভলিউম ৪- এ বাংলাদেশে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমে যাওয়াকে আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে জানানো হয়, মাধ্যমিক পর্যায়ে শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ২৬ শতাংশ। আর গ্রামে এ হার ১৫ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকে শহরে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ২০ শতাংশের মতো। গ্রামে এ হার ১০ শতাংশেরও কম। এভাবে, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পরবর্তী প্রতিটি পর্যায়ে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী কমায় শেষ পর্যন্ত ঠিক কত শতাংশ শিক্ষার্থী বিজ্ঞানের কর্মকাণ্ড সমূহে অবদান রাখছে তাই এখন গবেষণার বিষয় হতে পারে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে, আমরা আবেদ চৌধুরী, মাকসুদুল হক, জামাল নজরুল ইসলাম এবং দেশ ও বিদেশে কর্মরত আমাদের দেশের কৃতি বিজ্ঞানীদের ছাড়িয়ে যাওয়া তো দূরে থাক, তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারব কিনা শঙ্কা হয়।
তাই এখনই সচেতন হবার সময়। বিজ্ঞান শিক্ষাকে কিভাবে জনপ্রিয় করা তোলা যায় তা নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দ্রুত আলোচনা করা উচিত কারণ বিশ্ব দরবারে শীর্ষ অবস্থানে পৌছাতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি সাধন হল প্রথম এবং প্রধান শর্ত। দরকার হলে, এই ব্যাপারে সকল পর্যায়ের শিক্ষক প্রতিনিধি, শিক্ষা বিষয়ক গবেষক ও সুশীল সমাজের সাথেও আলোচনা হতে পারে। শুধু আলোচনা করলেই চলবে না, তা দ্রুত বাস্তবায়নও করতে হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে যেখানে একজন শিক্ষার্থীর বিজ্ঞানে হাতেখড়ি হয়, সেখানেই অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। দক্ষ বিজ্ঞান শিক্ষক এবং মানসম্মত ল্যাব বিজ্ঞান শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে। সরকারের উচিত শিক্ষকতা পেশায় সুযোগ -সুবিধা বৃদ্ধি করা যাতে মেধাবীরা এই পেশায় আকৃষ্ট হয়। যারা শিক্ষার্থীদের মনে বিজ্ঞানের ভয় তৈরি করার বদলে বিজ্ঞান বিষয়ে উৎসাহ তৈরি করতে পারবে। মানসম্মত ল্যাব তৈরি করতে সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করা যায়। প্রত্যেক জেলা শহরে নিয়মিত বিজ্ঞান মেলা, বিজ্ঞান-বিষয়ক সম্মেলন আয়োজন এবং পুরস্কার প্রদান, দেশের সেরা বিজ্ঞানী ও গবেষকদের স্কুল পরিদর্শনে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান চর্চায় উদ্বুদ্ধকরণ করা গেলে এই সমস্যা অনেকটুকু কমে আসবে বলে আমার মনে হয়। এছাড়া, বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমসমূহও এই ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে আমাদের দেশি চ্যানেলসমূহে বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান অনেক কম। এই অনুষ্ঠানের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় বিজ্ঞান সংক্রান্ত একটি চ্যানেল থাকলে, যাতে অন্তত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর বিজ্ঞানের পাঠদান সংক্রান্ত অনুষ্ঠান থাকবে। আমার মনে হয় সরকার এই ধরনের চ্যানেল খুললে বাড়তি সুযোগ সুবিধা দেয়ার ঘোষণা দিলে অনেকেই এগিয়ে আসবে।
কোন একটি দেশের আশা ভরসা হল তার তরুণ প্রজন্ম। আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জনে তরুণ প্রজন্মের অবদান আজও স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তাদের আন্দোলন ও আত্মত্যাগে আমরা মাতৃভাষা পেয়েছি, স্বাধীনতা যুদ্ধেও তরুণরা অসীম সাহসিকতা নিয়ে অংশগ্রহণ করেছে, এরপর স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশের মাটিতে গণতন্ত্রের সূর্যোদয়ের জন্যও শহীদ নূর হোসেনের কাছে আমরা চিরঋণী। ঠিক তেমনি আজ বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশে নানা প্রতিবন্ধকতা ও সুযোগ সুবিধার অভাব থাকলেও আমাদের অর্জনও কিন্তু কম নয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা নাসার রবোটিকস প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে, এ বছর আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে ১ টি রৌপ্য ও ২ টি ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে, ইউটিউব এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যেও ছিলেন একজন বাংলাদেশি তরুণ। এছাড়াও দেশে ও দেশের বাহিরে অনেক গবেষণাগারে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত সুনাম ও দাপটের সাথে কাজ করছে।
আমাদের তরুণ প্রজন্ম যে প্রতিভায় ভরপুর তাতে কোন সন্দেহ নেই। এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও তারা আজ বিশ্ব জয় করছে। আমাদের কিছু ভালো ও যুগোপযুগি পদক্ষেপ তরুণদের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে এই অর্জনকে আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারে এবং বাংলাদেশ হতে পারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষিণ এশিয়া বা এশিয়ার সেরা একটি দেশ। আমরা তো আশাবাদী হতেই পারি। নাকি ?