30/11/2022
বিশ্বকাপে প্রথম বারের মতো খেলোয়াড়রা ব্যবহার করছেন ‘ফিফা প্লেয়ার অ্যাপ’
এবারের বিশ্বকাপ উপলক্ষে প্রতিটা স্টেডিয়ামেই উন্নত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়েছে ফিফা। ফলে যেকোনো সন্দেহ বা বিতর্কের মুহূর্তে রেফারিদের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হচ্ছে।
আর প্রিয় দলের খেলার শ্বাসরুদ্ধকর অংশগুলি আরো সূক্ষ্মভাবে দেখতে পারছেন দর্শকরাও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, মেশিন লার্নিং, ক্যামেরা এবং সেন্সর এর মতো বিভিন্ন প্রযুক্তির সমন্বয়েই গড়ে তোলা হয়েছে এই সিস্টেম।
এর মাধ্যমে প্রতিটা ম্যাচ থেকে প্রচুর পরিমাণ ডেটা সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে খেলা শেষেই কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ তথ্যের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে না।
প্রতিটা ম্যাচে অংশ নেয়া খেলোয়াড়দের ব্যাপারে সংগ্রহ করা ডেটা যাতে খেলোয়াড়দের কাজে লাগে, সেই ব্যবস্থা করেছে ফিফা। এজন্যে সংগঠনটি শুধুমাত্র খেলোয়াড়দের ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করেছে ‘ফিফা প্লেয়ার অ্যাপ’ নামের বিশেষ একটি মোবাইল অ্যাপ।
এবারের বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই অ্যাপের সাহায্যে কাতার বিশ্বকাপে অংশ নেয়া সব দেশের প্রতিটা খেলোয়াড়ই নিজেদের পারফর্মেন্স এর মূল্যায়ন করতে পারছেন।
ফিফার ‘ভিশন ২০২০-২০২৩’ এর লক্ষ্য অনুসারে, ফুটবল খেলা এবং খেলোয়াড়দের মান উন্নত করে তোলার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন সব উপায় নিয়ে কাজ করবে সংগঠনটি। এরই ধারাবাহিকতায়, অভিজ্ঞ এবং পেশাদার খেলোয়াড়দের পরামর্শের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে ‘ফিফা প্লেয়ার অ্যাপ’।
অ্যাপটি তৈরিতে ‘ফিফপ্রো’ নামের পেশাদার ফুটবলারদের একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে মিলে কাজ করেছে ফিফা। সংগঠনটির সঙ্গে সারা বিশ্বের প্রায় ৬৫,০০০ পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড় যুক্ত।
এই অ্যাপ তৈরির আগে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের ওপর জরিপ করা হয়েছে এবং নেওয়া হয়েছে তাদের সাক্ষাৎকার। দেখা গেছে যে, খেলোয়াড়রা তাদের পারফর্মেন্স সংক্রান্ত ডেটার ব্যাপারে জানতে খুবই আগ্রহী। এবং নিজেদের ব্যাপারে সংগ্রহ করা এসব ডেটা তারা সহজেই হাতে পেতে চান তাদের এই চাহিদাই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে ‘ফিফা প্লেয়ার অ্যাপ’ এর মাধ্যমে।
প্রতিটা ম্যাচের পর পরই স্মার্টফোন থেকে এই অ্যাপে ঢুকে নিজেদের ব্যক্তিগত পারফর্মেন্স সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য হাতে পাচ্ছেন খেলোয়াড়রা। ‘ফিফা প্লেয়ার অ্যাপ’ দিয়ে তারা কয়েক ধরনের ডেটা দেখতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে:
# অ্যানহান্সড ফুটবল ডেটা মেট্রিকস
প্রতিটি খেলোয়াড়ের পারফর্মেন্স এর মাধ্যমে ম্যাচে কী প্রভাব পড়লো, সে বিষয়ে সংগ্রহ করা ডেটা বিশ্লেষণ করে অ্যাপে দেখানো হয়। ফুটবল পারফর্মেন্স এর ওপর প্রশিক্ষিত একদল বিশ্লেষক এই ডেটা তৈরি করেন। আর এজন্য মাঠে থাকা ক্যামেরা, সেন্সর এবং অ্যালগরিদম নির্ভর ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেন তারা।
যেমন, এ ধরনের ডেটার মাধ্যমে একজন খেলোয়াড় জানতে পারেন খেলার কোন কোন মুহূর্তে তিনি বিপক্ষ দলের কাছ থেকে বল নেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। অথবা কখন তাদের দল বিপক্ষ দলের ডিফেন্স পার হয়ে এগিয়ে গিয়েছিল কিংবা প্রতিপক্ষের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছিল।
খেলোয়াড়দের এসব পদক্ষেপ হিসাব করা হয় ফিফা থেকে নির্ধারিত ফুটবল সংক্রান্ত বিভিন্ন সংজ্ঞার মাধ্যমে, যাকে বলা হয় ‘ফিফা ফুটবল ল্যাঙ্গুয়েজ’।
# ফিজিকাল পারফর্মেন্স মেট্রিকস
খেলা চলাকালীন প্রতিটা খেলোয়াড়কেই যাতে ট্র্যাক করা যায়, সেজন্যে সব স্টেডিয়ামে একাধিক ক্যামেরা সহ নিখুঁত ট্র্যাকিং সিস্টেম রয়েছে। এর মাধ্যমে খেলোয়াড়দের শারীরিক পারফর্মেন্স সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করা হয়। খেলোয়াড়রা এসব তথ্য নিজেদের স্মার্টফোন থেকেই অ্যাকসেস করতে পারেন।
বিভিন্ন গতিতে খেলোয়াড়রা কতটা দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, অ্যাপের মাধ্যমে তা জানা যায়। অ্যাপে দেখা যায় ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে খেলোয়াড় কতক্ষণ খেলেছেন কিংবা ম্যাচ চলাকালীন তার সর্বোচ্চ গতি কত ছিল। এছাড়া সম্পূর্ণ মাঠের কোন জায়গায় তাদের অবস্থান বেশি ছিল, সেটাও দেখা যায় ‘হিট ম্যাপ’ এর সাহায্যে।
# অ্যানহান্সড ফুটবল ইন্টেলিজেন্স মেট্রিকস
‘ফুটবল পারফর্মেন্স অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনসাইটস টিম’ নামে বিশেষজ্ঞদের একটি দল এই ডেটা তৈরি করেন। এজন্য তারা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অ্যানালাইজ বা বিশ্লেষণ করেন ম্যাচ চলাকালীন সময়ে ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি সংগ্রহ করা বিভিন্ন তথ্য।
এতে চমৎকার সব উপায়ে ম্যাচ সংক্রান্ত বিভিন্ন ডেটা তুলে ধরা হয়। যেমন, সময়ের সাথে সাথে খেলা কীভাবে এগিয়েছে, কোন মুহূর্তে খেলার গতি পাল্টে গিয়েছে, কোন কোন মুহূর্তে এবং মাঠের কোন কোন জায়গায় খেলোয়াড়ের পায়ে বল ছিল কিংবা পায়ে বল থাকার সময় প্রতিপক্ষ থেকে কেমন চাপ এসেছে, এমন অনেক কিছুই দেখা যায় এই অ্যাপে।
এরপর ক্যামেরায় ধারণ করা ম্যাচের ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে এসব ডেটার সমন্বয় আনা হয়। এতে করে খেলোয়াড়রা বিভিন্ন ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল থেকে তাদের নিজদের পারফর্মেন্স এর উল্লেখযোগ্য প্রতিটা মুহূর্তই খুব ভালোভাবে দেখতে পারেন।
এছাড়াও বিশ্বকাপের প্রতিটা ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেই অনেক ফটোগ্রাফ বা ছবি তোলা হয়। ক্যামেরায় বন্দি প্রত্যেক খেলোয়াড়ের এসব ছবিই পরে তারা নিজেদের অ্যাপে দেখতে পারেন। চাইলে সরাসরি অ্যাপ থেকেই তারা ম্যাচের পরিসংখ্যানসহ এসব ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারেন। অথবা সেভ করে রাখতে পারেন নিজেদের ডিভাইসে।
বিশ্বকাপের জন্য কাতারে পৌঁছানোর পরেই খেলোয়াড়দের সবাইকে 'ফিফা প্লেয়ার অ্যাপ' এর ডাউনলোড লিংক এবং ব্যবহারের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এর আগে গতবছর 'ফিফা আরব কাপ' চলাকালীন বিভিন্ন দলের খেলোয়াড়দের পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করতে দেয়া হয়েছিল এই অ্যাপ। তখন এই অ্যাপের কার্যকারিতা প্রমাণিত হওয়ার পরেই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সব দেশের খেলোয়াড়দের জন্য এই অ্যাপ উন্মুক্ত করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এর আগ পর্যন্ত শুধুমাত্র দলীয় পারফর্মেন্স সংক্রান্ত তথ্যই জাতীয় দলকে জানানো হতো। এবারই প্রথম বারের মতো প্রত্যেক খেলোয়াড় আলাদা ভাবে নিজের খেলা আর পারফর্মেন্স এর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য হাতে পাচ্ছেন। ফিফার 'ফুটবল টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন' বিভাগের পরিচালক ইয়োহানেস হলজমুলার এর মতে, এভাবেই ফিফা খেলোয়াড়দের কেন্দ্র করে উন্নয়ন আনছে। এবং মূলত মাঠে যারা খেলছেন, তাদের অভিজ্ঞতা আরো ভালো করে তুলতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করছে।
তথ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে খেলোয়াড়দের। বিদ্যমান আইন অনুসারে ফুটবল খেলোয়াড়রা যাতে তাদের ডেটা সংরক্ষণ এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত অধিকারের ব্যাপারে জানতে ও বুঝতে পারেন, সেজন্যে ফিফা এবং ফিফপ্রো একসঙ্গে কাজ করছে।
খেলোয়াড়দের পারফর্মেন্স সংক্রান্ত তথ্যসহ এ ধরনের অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের একটি মানদণ্ড তৈরি করার চেষ্টা করছে এ দুটি সংগঠন। এজন্য তারা ‘চার্টার অফ প্লেয়ার ডেটা রাইটস’ বা ‘খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত তথ্যের অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণাপত্র’ তৈরি করেছে এবং এর উন্নতির জন্য কাজ করছে। তাদের বিশ্বাস, এর মাধ্যমে খেলোয়াড়রা তাদের তথ্য অধিকার সম্পর্কে আরো স্বচ্ছভাবে জানতে ও বুঝতে পারবে।
‘ফিফপ্রো’র সাধারণ সম্পাদকের মতে, ভবিষ্যতে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত তথ্য কাজে লাগিয়ে তাদের স্বাস্থ্য, পারফর্মেন্স, খেলায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ম্যাচ চলাকালীন তাদের অভিজ্ঞতাসহ অনেক কিছুই আরো উন্নত করার চেষ্টা করা হবে।
আশা করা হচ্ছে, পুরুষ এবং নারী সহ ফিফার অধীনে থাকা সব খেলোয়াড়ই সময়ের সাথে সাথে এই অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।