21/07/2022
কোনো এক রাজপুত্রের কাহিনী তোমায় শোনাতে চাচ্ছি। তবে সে রাজপুত্তুরের নাম কী ছিল, তা বলব না। শুধুই তাঁর জীবনী নিয়ে কিছু কথা বলব। তিনি ছিলেন পারস্যের অধিবাসী। বাস করতেন ইস্পাহান নগরের জাই গ্রামে। এলাকার প্রধান জমিদার ছিলেন তাঁর বাবা। বাবা তাঁকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, এক পলকের জন্যেও চোখের আড়াল হতে দিতেন না। আটকে রাখতেন বাড়িতে। পারিবারিকভাবে তাঁরা ছিলেন অগ্নিপূজারি। তাঁদের গ্রামে বিশাল যে অগ্নিকুণ্ডটি ছিল, সেটির প্রধান রক্ষক ছিলেন তাঁর বাবা। বাবার অবর্তমানে প্রধান রক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। তিনি সে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন আপন-মনে।
একবার তাঁর বাবার প্রাসাদের বাইরের খামারে কিছু কাজ পড়ে যায়। বাবা নিজে যেতে না পারে তাঁকেই খামারের কাজে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। বাবার আদেশ পেয়ে তিনি বের হলেন খামারের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে এক গির্জার সন্ধান পান। বেশ আগ্রহ নিয়ে উকি দেন গির্জার ভেতরে। শুনতে পান খ্রিষ্টানদের প্রার্থনার আওয়াজ। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “এখানে কী হচ্ছে?' তারা বলে, “এরা খ্রিষ্টান। প্রার্থনা করছে।'
ওদের কথা শুনে তিনি গির্জার ভেতরে প্রবেশ করেন। বসে যান সেখানে। প্রার্থনার দৃশ্য দেখতে থাকেন। খ্রিষ্টানদের প্রার্থনা তাকে এতটাই মুগ্ধ করে যে, কোনদিক দিয়ে সূর্য ডুবে যায়, তিনি খেয়ালই করেননি। সেদিন আর খামারে যাওয়া হলো না তাঁর। সন্ধে পর্যন্ত আটকে গেলেন সেখানেই। ততক্ষণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বাবা তাঁকে খোঁজার জন্যে লোক পাঠিয়েছেন চতুর্দিকে। সন্ধের কিছুক্ষণ পর তিনি বাসায় ফেরেন। সন্তানকে কাছে পেয়ে তাঁর বাবা জিজ্ঞেস করেন, “কোথায় ছিলে তুমি? আমি তো তোমার চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম!”
জবাবে তিনি বলেন, “বাবা! আমি কিছু লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। ওরা ছিল খ্রিষ্টান। তাদের উপাসনা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তারা কিভাবে কী করছে—সেটা দেখার জন্যে বসে গিয়েছিলাম ওখানে।”
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে পিতা হকচকিয়ে গেলেন। বললেন, 'ছেলে আমার তোমার বাপ-দাদার দ্বীন ওদের দ্বীনের চেয়ে উত্তম।'
তিনি বললেন, 'না। আল্লাহর শপথ! আমাদের দ্বীন তাদের দ্বীনের চেয়ে উত্তম নয়। তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা আল্লাহর গোলামি করে। তাঁকে ডাকে এবং তাঁরই উপাসনা করে। আর আমরা! আমরা তো আগুনের উপাসনা করি। যা আমরা নিজের হাতে জ্বালাই, আর আমরা দেখভাল ছেড়ে দিলে তা নিভে যায়।”
পুত্রের মুখে এ কথা শুনে পিতা যারপরনাই বিস্মিত হলেন। পুত্রকে হারানোর ভয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিলেন তিনি। শেকল লাগিয়ে দিলেন ছেলের পায়ে। বন্দি করে রাখলেন বাসায়। বাবার ভয়ে বন্দি-জীবনই বেছে নিতে হলো তাঁকে। কিছুদিন পর বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে খ্রিষ্টানদের কাছে একটি লোক পাঠালেন। উদ্দেশ্য— খ্রিষ্টানদের দ্বীনের উৎস সম্পর্কে জানা। লোকটি এসে জবাব দিল, ‘তাদের দ্বীনের উৎস শামে।' তিনি লোকটিকে বললেন, “শাম থেকে লোক এলে আমাকে জানাবে।'
সিরিয়া, ইরান, ফিলিস্তিন-সহ বিস্তৃত ভূমিকে শাম বলা হয়। এই শামেই রয়েছে আমাদের প্রথম কিবলা বায়তুল মাকদিস। নবি ﷺ এই শামের জন্যে কল্যাণের দুআ করেছেন বহুবার। কিছুদিন পর শাম থেকে কজন লোক এল। এই খবরটা পৌঁছানো হলো তাঁর কাছে। তিনি পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকলেন। যখন শামের লোকজন কাজকর্ম শেষ করে ফিরে যাচ্ছিল, তখন তিনি বাবার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গেলেন ওদের সাথে। সফর করতে করতে অবশেষে পৌঁছলেন শামে।
শামে পৌঁছে খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে জানার জন্যে ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। সফরসঙ্গীদের মধ্য থেকে একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, “খ্রিষ্টধর্মের সর্বোত্তম ব্যক্তি কে?' তারা। একটি গির্জার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, 'এই গির্জাবাসী পাদরি।' তিনি তার কাছে। গিয়ে বলেন, "আমার একান্ত ইচ্ছে—আপনার সাথে এ গির্জায় থেকে আল্লাহর উপাসনা করব। আর আপনার কাছ থেকে উপকারী জ্ঞান শিখবো।"
পাদরি রাজি হলেন তাঁর প্রস্তাবে। মানুষ পাদরিকে ভালো মানুষ হিসেবে জানত। কিন্তু বাস্তবে সে ছিল অত্যন্ত লোভী। তিনি এ অবস্থা থেকে অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। ঘৃণা জন্মাতে লাগল তাঁর মনে। কিছুদিন পর পাদরি মারা গেলেন। লোকজন ওকে দাফন করতে এল। তিনি বললেন, 'এ তো একটি খারাপ লোক। সে লোকদেরকে দান-খয়রাতের নির্দেশ দিত ঠিক, কিন্তু নিজে তা করত না। সে লোকজনকে ভালো কাজের নির্দেশ দিত, কিন্তু তলে-তলে আবার নিজেই খারাপ কাজ করে বেড়াত। তোমাদের দান-সদাকার টাকাগুলো অভাবীদের না দিয়ে নিজের কাছেই রেখে দিত।'
লোকজন খেপে গেল তাঁর কথায়। তারা প্রমাণ চাইল। তিনি বললেন, “আমি তোমাদেরকে তার জমা-করা সম্পদ বের করে দেখাচ্ছি।” তিনি পাদরির লুকোনো সাতটি পাত্র বের করে দেখালেন। সেখানে অনেক সোনা-রূপা জমা করা ছিল। লোকজন এ দৃশ্য দেখে তাদের ভুল বুঝতে পারল। দাফন না করে তারা শূলিতে চড়াল পাদরির লাশ। এরপর রাগে-ক্ষোভে সে লাশের ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করল।
ওই পাদরি মারা যাওয়ার পর আরেকজন পাদরি নিয়োগ দেওয়া হলো। তিনি সে পাদরির ভক্ত হয়ে গেলেন। একটা সময় নতুন পাদরির জীবন আয়ু ঘনিয়ে এল। নতুন পাদরি যখন মারা যাচ্ছিল, তখন তিনি শিয়রে বসে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি দেখতে পাচ্ছেন, মৃত্যু আপনার সামনে হাজির। আল্লাহর শপথ! আমি আপনাকে সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবেসেছি। এখন আমাকে কী কী কাজ করার আদেশ দিচ্ছেন? কার কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন?'
নতুন পাদরি বললেন, “বৎস! আল্লাহর শপথ! আমি কেবল একজনকেই চিনি, যিনি মসুলে থাকেন। তার কাছে যাও। সেখানে গেলে দেখবে—তার অবস্থাও আমার মতোই।”
নতুন পাদরি মারা যাওয়ার পর মসুলে এসে উপস্থিত হলেন তিনি। একসময় মসুলের পাদরি জীবন সায়াহ্নে চলে এল। তিনি তাকে সে কথাই জিজ্ঞেস করলেন, যা শামের পাদরিকে করেছিলেন। জবাবে মসুলের পাদরি বলেন, ‘বৎস! আল্লাহর শপথ! আমি কেবল একজনকেই চিনি, যিনি নাসীবাইন এলাকায় থাকেন। তার অবস্থাও আমার মতোই। তার কাছে যাও।’
মসুলের পাদরি মারা গেলে তিনি নাসীবাইন পৌঁছলেন। সেখানকার পাদরির স গ্রহণ করলেন। নাসীবাইনের পাদরি যখন মারা যাচ্ছিলেন, তখন তিনি তাকে একই কথা বলেন, যা অনান্য পাদরিদের বলেছিলেন। তার কথা শুনে পাদরি তাঁ বাইজান্টাইন রাজ্যের আম্মুরিয়্যা এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। পাদরিকে দাফন করে তিনি আম্মুরিয়ায় পৌঁছান।
সেখানকার পাদরির শিষ্য হয়ে যান। সেখানে তিনি কিছু অর্থ সম্পদ জমা করেন। ভেড়ার একটি ছোট্ট পাল ও কয়েকটি গাভীর মালিক বনে যান। আম্মুরিয়ার পাদরির মৃত্যু ঘনিয়ে এলে তিনি তার কাছেও উপদেশ চান।
পাদরি বলেন, "বৎস! আল্লাহর শপথ! আমার মতো আর কোনো ব্যক্তি আছে বঙ্গে আমার জানা নেই, যার কাছে তুমি যেতে পারো। তবে সময় খুব কাছাকাছি এসে গিয়েছে। আল-হারাম থেকে একজন নবি প্রেরণ করা হবে। অগ্নেয়শিলা গঠিত দুই অঞ্চলের মাঝামাঝি এলাকায় তিনি হিজরত করবেন। যে অঞ্চলের মাটি হবে কিছুটা লবণাক্ত ও খেজুর গাছবহুল। তার মধ্যে কিছু স্পষ্ট নিদর্শন থাকবে। তাঁর দু-কাঁধের মধ্যে থাকবে নবুওয়াতের সীলমোহর। তিনি উপহার গ্রহণ করবেন, কিন্তু সদাকা গ্রহণ করবেন না। সেই অঞ্চলে যাবার সামর্থ্য থাকলে চলে যাও। কারণ তাঁর আগমনের সময় খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।'
কিছুদিন পর আরব ব্যবসায়ীদের একটি কাফেলার সাথে দেখা হয় তাঁর। নিজের ভেড়া ও গাভীর পালের বিনিময়ে তাঁকে আরবে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। প্রস্তাবে রাজি হয় ওরা। কিন্তু আল-কুরা উপত্যকায় এসে ব্যবসায়ীরা গাদ্দারি করে বসে। দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয় তাঁকে। কিনে নেয় এক ইহুদি। এরপর তাঁকে মদীনায় আনা হয়। তিনি সেখানে খেজুর গাছ দেখতে পান। খেজুর গাছ থেকে তাঁর মনে খুশির ঢেউ উঠতে থাকে। তিনি বুঝতে পারেন—এটাই সে শহর, যার সম্পর্কে আন্মূরিয়্যার পাদরি তাঁকে বলেছিলেন। তিনি মনিবের অধীনে দাসত্বের জীবন কাটাতে থাকেন। অপেক্ষা করতে থাকেন, কখন তাঁর সাথে সেই মহাপুরুষের সাক্ষাৎ হবে।
একদিন তিনি খেজুর বাগানে কাজ করছিলেন। গাছের ওপর ওঠে খেজুর নামাচ্ছিলেন। হঠাৎ শুনতে পেলেন তাঁর মনিবের এক চাচাতো ভাই বলছেন, “আল্লাহ বানূ কাইলা গোত্রকে শায়েস্তা করুন। তারা এখন মক্কা থেকে আগত এক ব্যক্তির চারপাশে জড়ো হয়েছে। তাদের ধারণা সে একজন নবি।' এ কথা শুনে তাঁর অন্তরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন—এ ব্যক্তিটাই কি সেই মহাপুরুষ? তা হলে কী সব প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে? আমি কি সত্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি? চিন্তাগুলো তাঁর মনে এতটাই ঢেউ খেলতে থাকল যে, গাছ থেকে পড়ে যাবার উপক্রম হলো। তিনি দ্রুত নেমে এসে মনিবের চাচাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “উনি কে? আমাকে একটু তাঁর সম্পর্কে খুলে বলবেন?"
তিনি দাস ছিলেন, তাই তাঁর কথা শুনে লোকটি রেগে গেলেন। কষে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন তাঁর গালে। ভুরু কুঁচকে জবাব দিলেন, 'এ দিয়ে তোর কী? যা! নিজের কাজে যা।'
দিন গড়িয়ে সন্ধে হলো। তিনি কিছু খেজুর হাতে রওনা হলেন সেই ব্যক্তিটির সাথে দেখা করা জন্যে, যার কথা মনিবের মনিবের চাচাতো ভাই বলছিল। সে মহাপুরুষের কাছে গিয়ে বললেন, 'শুনলাম—আপনি একজন ভালো মানুষ। আর আপনার সাথে কিছু সাথি আছে যাঁরা এ এলাকায় অপরিচিত। আমার কাছে কিছু সদাকার খেজুর আছে। মনে হলো এ অঞ্চলে আপনারাই হলেন এর হকদার। এই হলো খেজুর। এখান থেকে কিছু খান।'
তাঁর কথা শুনে সেই মহাপুরুষ হাত গুটিয়ে নিলেন। সাথিদের ডেকে বললেন, “তোমরা খাও।' তিনি মনে মনে ভাবলেন–আম্মুরিয়্যার পাদরি তাঁকে মহাপুরুষের যেসব গুণ বলেছিলেন, তার একটা পাওয়া গেল। এই ভেবে তিনি দ্রুত ফিরে গেলেন মনিবের বাড়িতে। খানিক সময় পর নিজের জমানো কিছু খাবার হাতে আবারও মহাপুরুষের কাছে গেলেন। বললেন, 'একটু আগে দেখলাম, আপনি সদাকার জিনিস খান না। এটি উপহার। সদাকা নয়। এখান থেকে কিছু খান।' মহাপুরুষটি সে খাবার থেকে খানিকটা খেলেন এবং তাঁর সাথিদেরকেও দিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি ভাবলেন—আন্মূরিয়্যার পাদরির দেওয়া দুটো বৈশিষ্ট্য মিলে গেল। সেদিনকার মতো ফিরে এলেন তিনি।
দিন কয়েক পর আবার সে মহাপুরুষের কাছে গেলেন কথা বলার জন্যে। দেখতে পেলেন, সে মহাপুরুষটি একটি লাশের পেছন পেছন যাচ্ছিলেন। তিনি চক্কর দিতে লাগলেন তাঁর পাশে। এ দৃশ্য দেখে সেই মহাপুরুষ বুঝে ফেললেন—তিনি কী খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তিনি তাঁর গায়ের চাদর নামিয়ে ফেললেন। এতে করে দু-কাঁধের মধ্যিখানের সীলমোহর স্পষ্ট হলো। তা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি। অবশ্য এ কান্না দুঃখের কান্না নয়। এতদিন পর তিনি সত্যকে খুঁজে পেয়েছেন, এ কান্না ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি তা খুঁজে পেয়েছেন, যা তিনি হয়ে হয়ে খুঁজেছেন। তিনি সে মহাপুরুষকে খুঁজে পেয়েছেন, যার জন্যে অপেক্ষা করেছেন বছরের পর বছর।
প্রিন্স হয়েও দাসত্বের জীবন মেনে নিয়েছেন যার জন্যে, আজ তার সামনে তিনি। এ দৃশ্যের প্রকৃত রূপটা আমি আমার লেখায় ফুটিয়ে তুলতে পারব না। সে সাধ্যি আমার নেই। তবে এই মুহূর্তে দু-লাইন অখাদ্য কবিতা মনে পড়ছে, সেইট উল্লেখ করছি :
বহু দেশ ঘুরে, বহু ক্লেশ পরে,
খুঁজে পেলেন তারে;
হৃদয় পটে, ভাবনার তটে,
রেখেছিলেন যাবে।
হায়াত বাড়াও, দেখা করাও,
প্রভু হে দয়াময়–
এ প্রার্থনার পরে, দিনমান ভরে,
করিয়াছি অনুনয়।
ভাসিয়াছে মনে, ক্ষণে ক্ষণে,
তাঁহার বদনখানি;
অশ্রু সে তো, গড়িয়েছে কত,
কেবলি আমি জানি।
সে মহামানবেরে, মদীনার পরে,
আজি করিলেম দরশন;
হিয়ার মাঝারে, বহিছে সজোরে,
চির-নির্মল সমীরণ।
একবার মানচিত্রটা হাতে নাও, এরপর দেখো— কোথায় পারস্য, আর কোথায় মদীনা। কতটা দূরত্ব এই শহর দুটোর মধ্যে। আর সে সময় তো দ্রুতগামী যানবাহনও। ছিল না আমাদের মতো। গম্ভব্য পথে ছিল সীমাহীন প্রতিকূলতা। এতকিছুর পরেও, মাইলের পর মাইল সফর করেছেন তিনি। যাঁর জীবন কেটেছে রাজকীয় মহলে, বাদশাহি হালতে, তিনিই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন। সত্যের আলোকিত পথ খুঁজে বেড়িয়েছে দেশ হতে দেশান্তরে। তিনি ছিলেন এমনই বীরপুরুষ, যিনি সত্যের কাছে আসার জন্যে বাজি রেখেছেন নিজের জীবন। আসলে বীরপুরুষরা এমনই হয়। প্রতিবন্ধকতা তাঁদের গতিপথ কখনো রুদ্ধ করতে পারে না।
তিনি দ্রুত সে মহাপুরুষের কাছে গেলেন। উপুড় হয়ে নবুওয়তের সীলমোহরে চুমো খেলেন। বুঝতে পারলেন—এ মহাপুরুষই তিনি, যাঁর আগমনের কথা পাদরি তাঁকে জানিয়েছিলেন। ইনিই হলেন আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ। তাঁর হৃদয় শিহরিত হলো। দাড়ি ভিজে গেল চোখের জলে। তাঁর কান্না দেখে আল্লাহর রাসূল ﷺ বললেন, 'সালমান! এদিকে এসো।'
এই যা! বলেই ফেললাম—তাঁর নামটা।
কী আর করার। আমি যার কাহিনী তোমায় শুনাচ্ছি, তাঁর নাম সালমান। সালমান ফারিসি। যিনি সত্যকে আলিঙ্গন করার জন্যে রাজকীয় জীবন পরিত্যাগ করেছেন। সত্যের স্বাদ আস্বাদন করার জন্যে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছে। সত্যকে খুঁজতে খুঁজতে মাইলের-পর-মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন। ক্লান্তি যাঁকে স্পর্শ করেনি। যিনি বিরতিহীন ছুটেছেন। ছুটেছেন সত্যের পথে।
নবিজির কাছে সব ঘটনা তিনি খুলে বললেন। সাহাবিরা বিস্মিত হলেন তাঁর ত্যাগের কথা শুনে। বিশাল মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হলো তাঁকে। মুক্তি পেয়ে তিনি নবিজির কাছে চলে এলেন। সে থেকে মৃত্যু অবধি সত্যের ওপর অটল ছিলেন। শেষমেশ সত্যের জন্যে জীবন উৎসর্গ করে এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। [01]
তুমি সেদিন আমায় “কাছে আসার সাহসী গল্প' শুনিয়েছিলে। ওই যে, ক্লোজ আপের কাছে আসার সাহসী গল্প, মনে পড়েছে? তুমি যখন প্রেমিক-প্রেমিকার যিনার গল্পকে ‘কাছে আসার গল্প' বলে চালিয়ে দিচ্ছিলে, বড্ড মাথা ধরছিল আমার। কিন্তু কিছুই বলিনি তখন। এখন বলছি—প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে কোনো নারীকে ভালোবেসে যাওয়ার নাম 'কাছে আসা' নয়। রবের দিকে ফিরে আসার নাম 'কাছে আসা'। সত্যকে আলিঙ্গন করার নাম 'কাছে আসা'। সত্যকে আপন করে পাওয়ার নাম ‘কাছে আসা’। আমি জানি, প্রকৃত কাছে আসার স্বাদ তুমি অনুভব করোনি। কারণ তুমি কখনো সত্যকে আলিঙ্গন করতে চাওনি। হ্যাঁ, সত্যিই চাওনি।
আল্লাহ তাআলা তোমাকে পাঠিয়েছিলেন মুসলিম ঘরে। সত্য সব সময় তোমার হাতছানি দিয়ে ডেকেছে। তোমাকে আলিঙ্গন করতে চেয়েছে। কিন্তু তুমি। কখনো সেটা উপলব্ধি করতে চাওনি। তুমি যে ভুল পথের পথিক, এটা কখনো বোঝার চেষ্টা করেছিলে? আমি যখন বোঝাতে চেয়েছি, এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছ।
আচ্ছা, এত কিসের অহংকার তোমার?
তোমার বাবা কি সালমানের বাবার চেয়েও বড় জমিদার?
সালমানের চেয়েও কি বেশি আদরের লালিত হয়েছ তুমি?
তবে এত দাম্ভিকতা কোথা থেকে আসে?
সালমানরা যদি কষ্টের-পর-কষ্ট করে সত্যকে খুঁজে নিতে পারে, তবে তুমি কেন সত্যকে মেনে নিতে পারবে না? তুমি তো পারিবারিকভাবেই সত্যকে পেয়েছ। তবুও তুমি বেখেয়াল, উদাসীন!
আমি জানি না, আর কবে তুমি ফিরে আসবে।
বিশ্বাস করো, আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে তোমায় বেশি পরিশ্রম করতে হবে না। মাইলের-পর-মাইলে সফর করতে হবে না সালমানের মতো। উত্তপ্ত বালুতে তীব্র উত্যাচারে জর্জরিত হতে হবে না বিলালের মতো। আরাম-আয়েশ সব ছেড়ে দিয়ে রাস্তায় নেমে যেতে হবে না মুসআবের মতো। না, এমনটা করতে হবে না। শুধু একটু সৎ হতে হবে। সত্যকে আপন করে নেওয়ার স্পৃহা জাগাতে হবে হৃদয়ে। আর সত্যের ওপর অটল থাকার দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে। ইবনুল কাইয়িম বলেন,
“আল্লাহর কাছে তাঁর পাশে দারুস সালামে যেতে এগিয়ে এসো। সেখানে যেতে অত বেশি কষ্ট-ক্লেশ, দুঃখ-বেদনা, পরিশ্রম করতে হবে না। এটি তো সংক্ষিপ্ত ও সহজ পথ।... আর এ কাজ করতে তোমাকে খুব বেশি কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করতে হবে না। আর এটি কোনো কঠিন কাজও না... এটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ নয় যে, কষ্টকর হবে। কাজটি শুধু দৃঢ় সংকল্প ও চূড়ান্ত নিয়তের—যা তোমার শরীর, মন ও গোপনীয় কাজকে আরাম দেবে। অতএব, যা-কিছু ছুটে গেছে তাওবার দ্বারা তা সংশোধন করবে এবং ভবিষ্যৎ জীবনে সে কাজ করা থেকে বিরত থাকবে—এ ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প ও নিয়ত করো।... পরকালের তুলনায় এ ক্ষুদ্র সময়ে যদি তুমি তোমার রবের পথে চলো, তা হলে তুমি মহাসাফল্য ও মহাবিজয় অর্জন করবে। আর যদি প্রবৃত্তি, আরাম-আয়েশ, হাসি-তামাশায় জীবন কাটিয়ে দাও, তা হলে পরকালে তোমাকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব পেতে হবে। (মনে রেখো) হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্যধারণ করা ও প্রবৃত্তির বিপরীত কাজ করার তুলনায় সে আযাবের দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা ও বেদনা অত্যধিক কঠিন, শক্ত ও সর্বদা বিদ্যমান।” [02]
–––––––––––––––––––––––––––
1. ইবরাহীম আলি, সীরাতুন নবি ﷺ; পৃষ্টা: ৬০-৬৬।
2. ইবনুল কাইয়িম, মুখতাসার আল-ফাওয়ায়িদ; পৃষ্ঠা: ২৮।