19/08/2020
👩🏻⚕️ভ্যাকসিন ( vaccine ) বা টিকা -
মানবদেহে কোন জীবাণু প্রবেশ করলে এর বিরুদ্ধে ইম্যুনিটি(নিরাপত্তা) সৃষ্টি করার জন্য কৃত্রিমভাবে যা প্রদান করা হয় তাই ভ্যাকসিন (Vaccine)। পৃথিবীজুড়ে স্মলপক্স (Smallpox) রোগ সম্পূর্ণ নির্মূল এবং পোলিও (Poleomyelitis), হাম (Measles) বা ধনুষ্টংকার (Tetanus)-এর মত রোগের প্রায় নির্মূলকরণ সম্ভব হয়েছে ভ্যাক্সিনেশন (Vaccination) বা টিকাপ্রদানের মাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তথ্যমতে ২৫ টি রোগ আছে যাদেরকে ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
👩🏻⚕️🔬ভ্যাকসিনের ইতিহাস:
৪২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডেস (Thucydides) লক্ষ্য করেন যে এথেন্স শহরে যেসব রোগী স্মলপক্স আক্রান্ত হবার পর বেঁচে যাচ্ছে তাদের পুনরায় আর এই রোগটি হচ্ছে না। পরবর্তীতে চীনারা সর্বপ্রথম ১০ম শতাব্দীর শুরুতে ভ্যাক্সিনেশন এর আদিরূপ ভ্যারিওলেশন (Variolation) আবিষ্কার করে। এই প্রক্রিয়ায় স্মলপক্স রোগে আক্রান্তদের দেহের পাঁচড়া (Scrab) হতে টিস্যু নিয়ে সুস্থ মানুষদেরকে এর সংস্পর্শে আনা হত। ধীরে ধীরে তুরস্ক এবং ইংল্যান্ডেও ভ্যারিওলেশন বিস্তার লাভ করে। ১৭৯৬ সালে বৃটিশ চিকিৎসক ডাঃ এডওয়ার্ড জেনার আধুনিক ভ্যাক্সিনেশন আবিষ্কার করেন, এজন্যে তাঁকে “ফাদার অব ইম্যুনিলোজি” বলা হয়। শিক্ষানবীশকালে জেনার লক্ষ্য করেন যে গ্রাম্য এলাকায় গোয়ালাদের স্মলপক্স হয় না কারণ ইতোমধ্যেই তারা কাউপক্স আক্রান্ত হয়ে আছে। ১৭৯৬ সালে তিনি এক গোয়ালিনীর হাত হতে পুঁজ নিয়ে ৮ বছর বয়সী এক ছেলের বাহুতে আঁচড়ে দেন এবং ৬ সপ্তাহ পর তার শরীরে স্মলপক্স জীবাণু প্রবেশ করান। সৌভাগ্যবশত বাচ্চাটির স্মলপক্স হলনা। জেনার আরো গবেষণা করতে থাকেন এবং ১৭৯৮ সালে তিনি ঘোষণা করেন যে স্মলপক্স ভ্যাক্সিন বাচ্চা-ছেলে-বুড়ো সবার জন্য নিরাপদ। পরবর্তীতে ১৮৮০ সালে লুই পাস্তুর জলাতঙ্কের(Rabies) ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন এবং ভ্যাক্সিন জগতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসেন। সময়ের সাথে সাথে বিজ্ঞানীরা যখন বিভিন্ন রোগের কার্যকারণ আবিষ্কার করতে থাকেন তখন ভ্যাক্সিন তৈরীর পথও সুগম হয়ে যায়। জার্মান বিজ্ঞানী এমিল ভন বেহরিং ডিপথেরিয়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিরাম থেরাপি (Serum therapy) আবিষ্কারের জন্য ১৯০১ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনিই প্রথম নোবেল পুরস্কার পান। জাপানী চিকিৎসক শিবাসাবুরো কিতাসাতো ডিপথেরিয়া এবং ধনুষ্টংকারের ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করেন।
👩🏻⚕️🔬এডওয়ার্ড জেনার:
১৯২০ সালের শেষদিকে ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার এবং যক্ষার ভ্যাক্সিন সহজলভ্য হয়ে যায়। পুরো পৃথিবীজুড়ে ভ্যাক্সিনেশন বা টিকাদান কর্মসূচী ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম পোলিও ভ্যক্সিনেশন কর্মসূচী জাদুকরী ফল দেয়। ১৯৫৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা স্মলপক্স নির্মূলের জন্য বিশ্বব্যপী ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচীর উদ্যোগ নেয়। অস্ট্রেলিয়ান বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ফেনার এই প্রকল্পের প্রধান ছিলেন। ১৯৮০ সালে সমগ্র পৃথিবীকে স্মলপক্স মুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যেটা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এযাবতকালের সেরা অর্জন বলে বিবেচিত। প্রফেসর হ্যারল্ড জার হাউজেন আবিষ্কার করেন যে একটিমাত্র ভাইরাস জরায়ুর ক্যান্সারের জন্য দায়ী এবং এর বিরুদ্ধে ভ্যাক্সিন প্রস্তুত করা সম্ভব। পরবর্তীতে এই ভ্যাক্সিন তৈরী করা হয়(HPV Vaccine) যা এখনো পর্যন্ত লাখ লাখ নারীর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করছে।
👩🏻⚕️🔬ভ্যাক্সিন কিভাবে কাজ করে?
জীবাণু থেকেই তার দ্বারা সৃষ্ট রোগের ভ্যাক্সিন প্রস্তুত করা হয়। যেকোন জীবাণুর আছে দুইটি বৈশিষ্ট্য- একটি হল রোগ সৃষ্টি করা (Pathogenecity)। অন্যটি দেহের অভ্যন্তরে ঐ একই রোগের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য কিছু পদার্থ (Antibody) তৈরী করা। ভ্যাক্সিন তৈরীর সময় রোগ সৃষ্টির ক্ষমতাটিকে নষ্ট করে দেয়া হয়। কিন্তু অন্য বৈশিষ্ট্যটি ঠিক রাখা হয়। সোজা বাংলায় রোগ সৃষ্টির ক্ষমতাহীন জীবাণুকেই ভ্যাক্সিন হিসেবে দেহে প্রবেশ করানো হয়। ফলশ্রুতিতে এই জীবাণু দেহে রোগের কারণ হয় না, উল্টো রোগটি যেন না হয় তার জন্য বিশেষ পদার্থ(Antibody) তৈরী করতে থাকে। আরেকটি সুবিধা হল এই জীবাণুগুলো মেমরি সেল গঠন করে ফলে পরবর্তীতে একই জীবাণু পুনরায় প্রবেশ করলে সহজে সনাক্ত করতে পারে। এভাবে ভ্যাক্সিন শরীরের ইম্যুনিটি-কে বাড়িয়ে দেয়। ইঞ্জেকশন বা মুখে খাওয়ার মাধ্যমে ভ্যাক্সিন দেয়া যায়। ভ্যাক্সিনেশন দুই প্রকার- রোগ হবার আগেই ভ্যাক্সিন দেয়া (Active) আর রোগ হবার পরে দেয়া(Passive)।
👩🏻⚕️🔬কোভিড - ১৯ ভ্যাকসিন / Covid -19 vaccine
🦠🦠🦠🦠🦠🦠🦠🦠🦠🦠🦠🦠
👩🏻⚕️🔬কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন করোনা রোগ ২০১৯/ (কোভিড-১৯) এর বিরুদ্ধে কাজ করবে। vaccine আবিষ্কারের জন্য বেশ কিছু প্রচেষ্টা চলছে, তবে কোনও ভ্যাকসিন এখনও নিদানতাত্ত্বিক পরীক্ষণীতে (ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল) উত্তীর্ণ হয়নি। ২০২০-এর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে যে তারা গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস ২-এর (SARS-CoV-2) বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য কোনও vaccine আগামী ১৮ মাসের মধ্যে (অর্থাৎ ২০২১ সালের দ্বিতীয়ার্ধের আগে) সবার জন্য সহজলভ্য হবে বলে আশা করছে না।২০২০ সালের মার্চের প্রথম দিকে আলাদাভাবে প্রায় ৩০টি সম্ভাব্য vaccine এর উপরে কাজ চলছিল।
👩🏻⚕️🔬করোনাভাইরাসের vaccine আবিষ্কারের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টা
প্রাণীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার্য বেশ কিছু করোনাভাইরাস vaccine উদ্ভাবিত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পাখিদের সংক্রামক ক্লোমনালীপ্রদাহ ভাইরাস, কুকুরের করোনাভাইরাস এবং বিড়ালের করোনাভাইরাসে।
করোনাভিরিডি গোত্রের যেসব ভাইরাস মানুষকে আক্রমণ করে থাকে তাদের মধ্যে গুরুতর তীব্র শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস (সার্স) এবং শ্বাসযন্ত্রীয় রোগলক্ষণসমষ্টি সৃষ্টিকারী করোনাভাইরাস (মার্স) রোগকে লক্ষ্য করেই ভ্যাকসিন তৈরির পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলো হয়েছিল। সার্সের বিরুদ্ধে vaccine এবং মার্সের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন মানুষ ব্যতীত প্রাণীদের মধ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত এমন কোনো ভ্যাকসিন এবং ঔষধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি যা মানুষের উপর কার্যকর এবং নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে! ২০০৫ এবং ২০০৬ সালে বের হওয়া গবেষণাপত্র অনুযায়ী সার্সের জন্য ভ্যাকসিন এবং ঔষুধ আবিষ্কার করা বিশ্বের বিভিন্ন সরকার এবং স্বাস্থ্য সংস্থার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল !
মার্স রোগের জন্য কোনো প্রমাণিত ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।মার্স রোগের যখন প্রভাব বেড়ে যায়, তখন ভাবা হয়েছিল সার্সের জন্য বিদ্যমান গবেষণাগুলো মার্স সংক্রমণের বিরুদ্ধে vaccine এবং রোগচিকিৎসাবিজ্ঞান আবিষ্কারে সাহায্যকারী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত কেবল একটি (ডিএনএ ভিত্তিক) মার্স vaccine আবিষ্কৃত হয়েছে যা মানুষের উপর পরীক্ষার প্রথম ধাপ উত্তীর্ণ করেছে এবং আরো তিনটি গবেষণা চলমান আছে, যাদের মধ্যে সবাই ভাইরাসীয় বাহক ভ্যাকসিন এদের মধ্যে দুইটি এডেনোভাইরাসীয় বাহক ভ্যাকসিন ( ChAdOx1-MERS, BVRS-GamVac) এবং বাকী একটি এমভিএ বাহক vaccine ( MVA-MERS-S)।
👩🏻⚕️🔬 2020 .........🦠💉
সার্স-কোভ-২ (SARS-CoV-2) ২০১৯ সালের পহেলা ডিসেম্বর শনাক্ত করা হয়, যার দ্বারা সৃষ্ট রোগটিকে পরবর্তীতে ২০১৯ করোনাভাইরাস ব্যাধি (কোভিড-১৯) নাম দেওয়া ! ১০ই মার্চ ২০২০ তারিখের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাবিশ্বে প্রায় ৩০০টি এরকম গবেষণাকর্ম প্রাথমিক পর্যায়ে আছে !
যেসকল টিকা তৈরির কাজ এখন চলছে সেসকল টিকা কার্যকর কিংবা নিরাপদ সবার জন্য কিনা তা সময় বলে দেবে ! একটি গবেষণায় পাওয়া গিয়েছে, ২০০৬ থেকে ২০১৫ এর মধ্যকার টিকাগুলির মধ্যে মাত্র ১১.৫% পরীক্ষার ধাপ-১ থেকে পরীক্ষার ধাপ-৩ এ যেতে পেরেছে।
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করেছে, তারা একটি আণবিক ক্ল্যাম্প টিকা তৈরির চেষ্টা করছে যা অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার জন্য ভাইরাসের প্রোটিনকে বংশাণুগতভাবে পরিবর্তন ঘটাতে পারবে।
👩🏻⚕️🔬
২০২০ সালের মার্চ মাসে মার্কিন সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের তথ্যগুলো একত্রিত করে আইবিএম কোম্পানির সুপারকম্পিউটার এবং আমাজন, মাইক্রোসফট, ও গুগল কোম্পানির ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের সাহায্য নিচ্ছে।কোভিড-১৯ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং কনসোর্টিয়াম (COVID-19 High Performance Computing Consortium) এর সাহায্যে রোগ ছড়ানোর পূর্বাভাস, টিকার সম্ভাব্য প্রতিমান (মডেল) এবং কোভিড-১৯-এর টিকা প্রস্তুতি ও চিকিৎসা প্রণয়নে এক হাজারের বেশি রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে !
🟥 জেনে রাখা ভালো তাহলে হতাশা হয়ত কিছু কমবে আসুন দেখে নিই বিগত ৫০ বছরের পরিসংখ্যান:
🔺জিকা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত = ১৯৪৭ সাল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার = গবেষণারত। সময়কাল = ৭৩ বছর গড়িয়ে গেছে, ফল শূন্য ।
🔺চিকেনপক্স প্রথম শনাক্ত = ১৯৫৩ সাল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার = ১৯৯৫ সাল। সময়কাল = ৪২ বছর।
🔺হেপাটাইটিস বি ভাইরাস প্রথম শনাক্ত = ১৯৬৫ সাল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার = ১৯৮১ সাল। সময়কাল = ১৬ বছর।
🔺ইবোলা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত = ১৯৭৬ সাল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার = ২০১৯ সাল। সময়কাল = ৪৩ বছর।
🔺এইডস প্রথম শনাক্ত = ১৯৮১ সাল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার = গবেষণারত। সময়কাল = ৩৯ বছর গড়িয়েছে, ফল শূন্য ।
🔺সার্স ভাইরাস প্রথম শনাক্ত = ২০০৩ সাল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার = গবেষণা ক্যানসেলড করা হয়েছে। সময়কাল = ১৭ বছর।
🔺মার্স ভাইরাস প্রথম শনাক্ত = ২০১২ সাল। ভ্যাকসিন আবিষ্কার = গবেষণারত। সময়কাল = ৮ বছর গড়িয়েছে, ফল শূন্য।
🔺কোভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) প্রথম শনাক্ত = ২০১৯ (ডিসেম্বর) ভ্যাকসিন আবিষ্কার = গবেষণারত সময়কাল = চিন্তা করতে থাকুন!
যত রকম ভাইরাস এ পর্যন্ত আক্রমণ করেছে তার মধ্যে সবচেয়ে ছোঁয়াচে ভাইরাস এই (Covid 19) করোনাভাইরাস। একটি ভ্যাকসিন ডেভেলপ করতে সচরাচর ৮ থেকে ২০ বছর সময়ের প্রয়োজন।
তাই সময় কে সময়ের হাতে ছেড়ে দিন ! ভ্যাকসিন কবে আসবে সেই আশায় না থেকে , এখনই যদি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা না হয়, কাশি শিষ্টাচার, খাদ্যাভাসে পরিবর্তন, বার বার হাত ধৌতকরণ- এগুলো না মানা হলে , তখন চারিদিকে থাকবে শুধু হাহাকার, লাশ নিয়ে যাওয়ার কোনো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। আসুন সচেতন হই । অন্যকে বার বার সচেতন করি ! করোনা অদৃশ্য ! তাই বোঝা কঠিন করোনা বিদায় নেবে কবে এবং কি করে ! Collected from the FB wall of Sugeon Dr Krishna Rupa Mujumder