04/06/2026
যে চায়, সে-ই একদিন চলে যায়।**
একটা ছেলে ছিল। সে সব সময় একা থাকতে পছন্দ করত। মানুষের ভিড়, অযথা কথা, কারও খোঁজ নেওয়া— এসব তার ভালো লাগত না। কেউ তার কাছে এসে "কেমন আছো?" জিজ্ঞেস করলেও তার বিরক্ত লাগত। তার মনে হতো, পৃথিবীতে কেউ তাকে বোঝে না, তাই কাউকে তারও দরকার নেই।
একদিন বিকেলে সে রাস্তার পাশে একটি বেঞ্চে একা বসে ছিল। আকাশে মেঘ জমেছিল, বাতাসে ছিল বৃষ্টির গন্ধ।
একজন লোক ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল।
— "মন খারাপ?"
ছেলেটা মাথা তুলে তাকাল।
— "না।"
লোকটি মৃদু হেসে বলল,
— "তবুও মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে।"
এই কথাটুকুতেই ছেলেটার রাগ উঠে গেল।
— "তোমার কী দরকার এখানে?"
লোকটি একটু থেমে বলল,
— "কিছু না। শুধু জানতে চেয়েছিলাম তুমি ভালো আছো কিনা।"
ছেলেটা এবার চিৎকার করে উঠল,
— "চলে যাও এখান থেকে! এখনই চলে যাও। না গেলে মাথা ফাটিয়ে দেব!"
লোকটির মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। সে আর কিছু বলল না। শুধু নীরবে চলে গেল।
সেদিনের পরও ছেলেটার জীবনে এমন ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। কেউ বন্ধুত্ব করতে এসেছে, সে ফিরিয়ে দিয়েছে। কেউ পাশে দাঁড়াতে চেয়েছে, সে অপমান করেছে। কেউ তার দুঃখের খবর নিতে এসেছে, সে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
ধীরে ধীরে মানুষ তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল।
একসময় এমন দিন এলো, যখন তার ফোনে আর কোনো খোঁজ নেওয়ার বার্তা আসত না। অসুস্থ হলেও কেউ জানতে চাইত না কেমন আছে। ঈদের দিনেও কেউ তাকে ডাকত না।
সে যা চেয়েছিল, ঠিক তাই পেয়েছিল—
একাকীত্ব।
কিন্তু একাকীত্বকে দূর থেকে যত সুন্দর লাগে, কাছ থেকে ততটাই ভয়ংকর।
এক রাতে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। ঘরের জানালার পাশে বসে সে বাইরে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই মানুষগুলোর কথা, যাদের সে একদিন তাড়িয়ে দিয়েছিল।
লোকটা তো শুধু জিজ্ঞেস করেছিল, "মন খারাপ?"
এতেই সে এত রেগে গিয়েছিল কেন?
কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষ সঙ্গে সঙ্গে পায় না। সময় তাকে উত্তর খুঁজে নিতে বাধ্য করে।
রাত গভীর হলো।
দূরের মসজিদ থেকে কুরআন তিলাওয়াতের শব্দ ভেসে এলো।
সে চুপচাপ শুনতে লাগল।
হঠাৎ তার মনে হলো, পৃথিবীর সবাই দূরে চলে গেলেও একজন আছেন, যিনি এখনো তার রব। তিনি এখনো তার তওবার অপেক্ষায় আছেন।
তার চোখ ভিজে উঠল।
সেই রাতে বহুদিন পর সে সিজদায় মাথা রাখল।
সিজদায় গিয়ে সে বুঝতে পারল, মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়ে সে আসলে নিজেকেই শাস্তি দিয়েছে। যে ভালোবাসাগুলোকে সে অবহেলা করেছে, সেগুলো হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো নিয়ামত ছিল।
সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"হে আল্লাহ, আমি অনেক হৃদয় ভেঙেছি। অনেক মানুষকে কষ্ট দিয়েছি। আমি ভেবেছিলাম আমার কাউকে দরকার নেই। অথচ আজ বুঝছি, আপনার রহমত ছাড়া আমি কিছুই না।"
সেদিন তার মনে পড়ল একটি হাদিসের কথা—
"যে মানুষের প্রতি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।"
তার বুকটা কেঁপে উঠল।
সে বুঝল, মানুষের প্রতি কঠোরতা কোনো শক্তি নয়। প্রকৃত শক্তি হলো ক্ষমা করা, নম্র হওয়া এবং মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা।
ভোর হতে শুরু করল।
বৃষ্টির শব্দ থেমে গেল।
আকাশে ফজরের আলো ফুটছিল।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, রাতের সবচেয়ে অন্ধকার সময়টাও শেষ হয়ে গেছে।
ঠিক তখন তার মনে হলো—
আল্লাহ কখনো কোনো মানুষকে তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত করেন না। মানুষ নিজেই অহংকারের দেয়াল তুলে সেই রহমত থেকে দূরে সরে যায়।
সেদিন থেকে সে বদলাতে শুরু করল।
সবাই তাকে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা করেনি। সবাই ফিরে আসেনি। কিন্তু সে জানত, আল্লাহর পথে ফেরার জন্য মানুষের প্রশংসা নয়, আন্তরিক তওবাই যথেষ্ট।
আর যখনই সে একা অনুভব করত, তখন সে মনে করত—
মানুষের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে,
কিন্তু আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
আর কিয়ামতের দিন, যখন সম্পদ থাকবে না, অহংকার থাকবে না, পরিচয় থাকবে না—
তখন শুধু সেই হৃদয়ই সফল হবে, যে হৃদয় বিনয়ের সঙ্গে নিজের রবের কাছে ফিরে এসেছিল।
✍️ Tashik Bhuiyan