11/10/2025
🇧🇩 আইনের উর্দ্ধে কে? সেনাবাহিনীর দায়বদ্ধতা ও বাংলাদেশের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
বাংলাদেশের সংবিধানে বলা আছে —
“সব নাগরিক আইন সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রাখে।”
কোনো নাগরিক, সরকারি কর্মকর্তা বা সেনাসদস্য কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
তবুও বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় এই মূলনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে যখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধে অভিযুক্ত হন — তখন দেখা যায়, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দ্বৈত আচরণ তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক গুম, খুনের ঘটনায়, যখন সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়, তখন সেনা দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়, “এতে সেনাবাহিনীর সম্মান ক্ষুন্ন হবে।”
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায় — ন্যায়বিচার কি কখনও কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্মান কমায়, নাকি সেটাকেই আরও উজ্জ্বল করে তোলে?
এতোই যদি সম্মান ক্ষুন্ন হয় তাহলে গত ১৫ বছরে অনেক সেনা সদস্যদেরও গুম, খুন বছরের পর বছর আয়না ঘরে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে তখন ত কেউ মুখ খুলেনি। বরং এই অপরাধকে এক প্রকার বৈধতা দিয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের গর্ব —
স্বাধীনতা যুদ্ধ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন, দুর্যোগ মোকাবিলা—সব ক্ষেত্রেই তাদের অবদান অসামান্য।
বাংলাদেশে সেনাসদস্যদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় Army Act, 1952 অনুযায়ী।
Section 69: সেনাসদস্য যদি এমন কোনো অপরাধে জড়িত হয় যা সাধারণ নাগরিক অপরাধ (যেমন হত্যা, ধর্ষণ, চুরি ইত্যাদি), তবে সে অপরাধ সিভিল আদালতেও বিচারযোগ্য।
Section 132: সেনাসদস্য যদি ডিউটির বাইরে কোনো অপরাধে জড়িত হয়, তবে তাকে দেওয়ানি আদালতে হস্তান্তর করা যায়।
Section 133: রাষ্ট্রপতি বা সরকার চাইলে যে কোনো মামলা সামরিক বা দেওয়ানি আদালতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অর্থাৎ, আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে —
সেনাসদস্য কোনো অপরাধ করলে, সেটি শুধুমাত্র সামরিক আদালতে সীমাবদ্ধ নয়; নাগরিক আদালতও বিচার করতে পারে।
Section 302, 364, 365, 330, 331 ইত্যাদি ধারায় হত্যা, গুম, নির্যাতন ইত্যাদি অপরাধের কঠোর শাস্তির বিধান আছে।
অতএব, কোনো সেনাসদস্য যদি এমন অপরাধে জড়িত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে Penal Code অনুযায়ী মামলা করা বৈধ এবং আদালত তাকে বিচার করতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, সাধারন জনগের সাথে এমন অন্যায়, অত্যাচার করলে তাহলে কোন আইনে বিচার হবে? নিশ্চই আদালতে, আর যেখানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এই নিয়ে তদন্ত করছে সেখানে বিচার হবে।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, বেশিরভাগ সময় এই অভিযোগগুলো “অভ্যন্তরীণ তদন্ত” হিসেবে নিষ্পত্তি হয়।
ফলে সাধারণ নাগরিকের মনে প্রশ্ন জাগে —
“তাহলে কি সেনাসদস্যরা সত্যিই আইনের ঊর্ধ্বে?”
আয়না ঘর থেকে বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন সময় গিয়েছে, যখন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে অসংখ্য মানুষকে আটক, গুম, বা নির্যাতন করা হয়েছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা যেমন Amnesty International, Human Rights Watch, এবং Odhikar এসব ঘটনার ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সেই প্রতিবেদনগুলোতে অনেক সময় সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের নাম উঠে এসেছে।
তখন প্রশ্ন উঠেছিল:
“এইসব কার্যক্রম কি সেনা নেতৃত্বের অজানা ছিল?”
যদি জানা থেকেও ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে সেটি প্রতিষ্ঠানগত দায়বদ্ধতার ঘাটতি নির্দেশ করে।
আর এভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “ভয়” ও “অবিশ্বাস” সমাজে শেকড় গেড়ে বসে।
অনেকে বলেন, সেনা কর্মকর্তার বিচার মানেই বাহিনীর সম্মানহানি।
কিন্তু ন্যায়বিচার কখনও সম্মানহানি ঘটায় না — বরং প্রকৃত সম্মান রক্ষা করে।
যদি কোনো অপরাধী সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটি প্রমাণ করে বাহিনী দায়বদ্ধ, স্বচ্ছ ও নৈতিকভাবে শক্তিশালী।
একজন সদস্যের অপরাধে পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়; বরং অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই বাহিনীর মর্যাদা রক্ষা করে।
High Court Division (Writ Petition No. 8245 of 2016): আদালত বলেছে, রাষ্ট্রীয় সংস্থার নামে নির্যাতন বা গুমের ঘটনা হলে সেটির বিচার বাধ্যতামূলক।
BNWLA vs Bangladesh (2009): আদালত উল্লেখ করে, “Rule of Law is the foundation of the Republic.”
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ: দায়বদ্ধতাই উন্নত বাহিনীর মূল শক্তি
বিশ্বের শক্তিশালী সেনাবাহিনীগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা।
যুক্তরাষ্ট্র: “Uniform Code of Military Justice” অনুযায়ী, সেনা সদস্যের অপরাধ সিভিল কোর্টেও বিচারযোগ্য।
ভারত: নাগরিক অপরাধের ক্ষেত্রে সেনাসদস্যদের সাধারণ আদালতে বিচার হয়।
যুক্তরাজ্য: পুলিশ ও সেনা উভয়ের ক্ষেত্রেই একই আইনি মানদণ্ড প্রযোজ্য।
এ কারণেই এসব দেশের নাগরিকরা জানে—
“সেনাবাহিনী শক্তিশালী কারণ তারা ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী।”
বাংলাদেশে ন্যায়বিচার ও সামরিক দায়বদ্ধতা জোরদার করতে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি:
দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা: সামরিক ও নাগরিক অপরাধের সীমারেখা স্পষ্ট করে যথাযথ আদালতে বিচার নিশ্চিত করা।
স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা।
মানবাধিকার রক্ষা: নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন না করে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা।
সেনাবাহিনী বাংলাদেশের গর্ব — কিন্তু ন্যায়বিচারহীন গর্ব দীর্ঘস্থায়ী নয়।
একজন অপরাধীর দায় তার নিজের, প্রতিষ্ঠানটির নয়।
তাই সেনাবাহিনীর প্রকৃত মর্যাদা রক্ষার একমাত্র উপায় হলো —
আইনের সমতা ও স্বচ্ছ ন্যায়বিচার।
তাই সেনাবাহিনীর উচিত অপরাধিদের সেফ এক্সিট না দিয়ে তাদের কে আইন শৃঙ্কলা বাহিনীর হতে তুলে দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা। এসে এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম আরো বেড়ে যাবে।
ন্যায়বিচার দুর্বলতার চিহ্ন নয় — এটি একটি রাষ্ট্র ও তার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
যে বাহিনী সত্য, দায়িত্ব ও শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী, সেই বাহিনীই প্রকৃত অর্থে জনগণের সেনাবাহিনী।
-----Alamin Rahaman
প্রতিকী ছবি