ফাহমিনা আফরোজ প্রমি

ফাহমিনা আফরোজ প্রমি শব্দে গড়া অনুভূতি, গল্পে লুকানো জীবন।
কলমে লিখি ভালোবাসা, কষ্ট আর অসমাপ্ত কিছু অনুভবের গল্প। ✨🖤

22/06/2026

নীরার পাশে দাঁড়িয়ে আবরারের কণ্ঠে ভেসে আসা সেই গান—হাসপাতালের সেই মুহূর্ত যেন ভালোবাসার এক নীরব স্বীকারোক্তি।💙

 #নির্বাসিত_ভালোবাসা  #লেখনীতে_ফাহমিনা_আফরোজ_প্রমি  #পর্ব_২৭দরজা খোলার পর আব্রার এক মুহূর্তও নষ্ট করল না।হাঁপাতে হাঁপাতে...
21/06/2026

#নির্বাসিত_ভালোবাসা
#লেখনীতে_ফাহমিনা_আফরোজ_প্রমি
#পর্ব_২৭

দরজা খোলার পর আব্রার এক মুহূর্তও নষ্ট করল না।
হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের ভেতরে ঢুকেই তার চোখ চারপাশে কাউকে খুঁজতে লাগল।

নীরা কিছু বলার আগেই আব্রার তাড়াহুড়ো করে জিজ্ঞেস করল,
— "সাফা কোথায়?"

তার কণ্ঠে এমন উদ্বেগ ছিল যে নীরা কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল।
— "ভেতরের রুমে..."

কথা শেষ হওয়ার আগেই আব্রার দ্রুত পায়ে ভেতরের রুমের দিকে চলে গেল। নীরা আর মৌসুমি পেছন পেছন তাকিয়ে রইল। রুমে ঢুকেই আব্রার দেখল সাফা বিছানায় শুয়ে আছে। জ্বরে ছোট্ট মুখটা লাল হয়ে আছে। কপাল ঘামে ভিজে গেছে। ঘুমের মধ্যেও কষ্টে ছোট্ট ভ্রুগুলো কুঁচকে আছে। আব্রারের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে সাফার কপালে হাত রাখল।
হাত রাখতেই তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

জ্বর সত্যিই অনেক। আব্রার আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সাবধানে সাফাকে কোলে তুলে নিল। জ্বরের ঘোরে সাফা চোখ না খুলেই আব্রারের শার্ট আঁকড়ে ধরল।
মৃদু স্বরে বলল,
— "আংকেল..."

শব্দটা শুনে আব্রারের বুকটা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে সাফার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর ঘুরে দাঁড়াল। নীরা তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। আব্রার যেন তাকে দেখলই না। তার সমস্ত মনোযোগ এখন সাফার দিকে।
— "হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।"
— "এখনই।"

কথাটা বলেই সে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে এল। নীরা হতবাক হয়ে তার পেছনে তাকিয়ে রইল। মৌসুমিও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। আব্রার ড্রয়িংরুম পেরিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুধু বলল,
— "নীরা, চলো।"
— "সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।"

নীরা আর কোনো প্রশ্ন করল না। সে দ্রুত নিজের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। মৌসুমি এগিয়ে এসে বলল,
— "আমি যাব?"

আব্রার মাথা নাড়ল।
— "না ।"
— "আপনি বাসায় থাকুন।"
— "মারওয়া আর শুপ্ত আছে।"

মৌসুমি পেছনে তাকাল। ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে শুপ্ত খেলছে। আর মারওয়া অবুঝ চোখে সবার দিকে তাকিয়ে আছে। মৌসুমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।
— "ঠিক আছে।"

এরপর আব্রার সাফাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। নীরা তার পেছন পেছন চলল।
কিছুক্ষণ পর বাইকের ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো। সন্ধ্যার আলো তখন আরও ম্লান হয়ে এসেছে। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মৌসুমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল— আব্রার এক হাতে সাফাকে শক্ত করে ধরে আছে। নীরা তাড়াহুড়ো করে বাইকে উঠছে। তারপর মুহূর্তের মধ্যেই বাইকটা হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটে গেল। আর বাড়িতে রয়ে গেল শুধু—
মৌসুমি,
শুপ্ত,
আর ছোট্ট মারওয়া। তিনজনই অপেক্ষা করতে লাগল সাফার খবরের জন্য।

হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে এসেছে। জরুরি বিভাগের সামনে বাইক থামাতেই আব্রার আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে দ্রুত সাফাকে কোলে নিয়ে ইমার্জেন্সি বিভাগের ভেতরে ঢুকে গেল। নীরা পেছন পেছন দৌড়ে আসল। ভেতরে ঢুকেই কর্তব্যরত ডাক্তার আর নার্সরা সাফাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে নিল। তারপর শুরু হলো একের পর এক পরীক্ষা।তাপমাত্রা মাপা হলো। রক্তচাপ দেখা হলো। রক্তের নমুনা নেওয়া হলো। ডাক্তাররা জ্বরের কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও কিছু টেস্ট লিখে দিলেন।

নীরা এক কোণে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে। তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে আছে। মায়ের মন বারবার খারাপ কিছু ভাবতে চাইছে। অন্যদিকে আব্রারও অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর হয়ে আছে। ডাক্তারদের প্রতিটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। কোথাও কোনো কাগজে সই লাগলে সে করছে। কোথাও টাকা জমা দিতে হলে সেদিকে যাচ্ছে। যেন সাফার দায়িত্ব সম্পূর্ণ তার নিজের। প্রায় এক ঘণ্টার ব্যস্ততার পর একজন ডাক্তার তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নীরা উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "ডাক্তার, আমার মেয়ে ঠিক আছে তো?"

ডাক্তার আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,
— "এই মুহূর্তে ভয়ের কিছু নেই।"
— "তবে জ্বরটা অনেক বেশি।"
— "আমরা কিছু টেস্ট দিয়েছি।"
— "রিপোর্টগুলো না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।"

নীরা উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার আবার বললেন,
— "আজ রাতটা রোগীকে অবজারভেশনে রাখতে হবে।"
— "আমরা নিয়মিত মনিটর করব।"
— "যদি অবস্থার উন্নতি হয়, তাহলে কাল পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।"

ডাক্তারের কথা শুনে নীরা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। অন্তত আপাতত বিপদের কিছু নেই শুনে তার বুকের চাপা কষ্টটা একটু কমল। ডাক্তার চলে গেলে করিডোরে নীরবতা নেমে এলো। কাচের ওপাশে সাফাকে দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট মেয়েটা সাদা বিছানায় শুয়ে আছে। হাতে ক্যানোলা লাগানো। জ্বরের ঘোরে চোখ বন্ধ। সেই দৃশ্য দেখে নীরার চোখ ভিজে উঠল। সে নিঃশব্দে কাচের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ানো আব্রার ধীরে ধীরে বলল,
— "কিছু হবে না সাফার।"
— "ও ঠিক হয়ে যাবে।"

নীরা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। আর হাসপাতালের উজ্জ্বল সাদা আলোয় দুজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল—
সাফার জ্বর কমার, আর রাতটা শান্তিতে কেটে যাওয়ার।

নীরা ফাঁকে মৌসুমিকে ফোন করে সব জানিয়ে দিল।
— "আজ রাতে আমি হাসপাতালেই থাকব।"
— "সাফাকে একা রেখে কোথাও যেতে পারব না।"

ওপাশ থেকে মৌসুমি শান্ত গলায় বলল,
— "চিন্তা করিস না।"
— "মারওয়ার দায়িত্ব আমার।"
— "তুই শুধু সাফার পাশে থাক।"
— "কোনো কিছুর দরকার হলে আমাকে ফোন দিবি।"

নীরা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
— "আচ্ছা।"

ফোন কেটে গেল। ফোন রাখার পর নীরা করিডোরের বড় কাঁচের জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। হাসপাতালের সাদা আলোয় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আরও স্পষ্ট দেখাচ্ছে। একটার পর একটা ফোঁটা এসে কাঁচে আঘাত করছে। তারপর ধীরে ধীরে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। নীরা চুপচাপ বৃষ্টি দেখতে লাগল। কেন জানি আজ তার মনটাও ঠিক এই আকাশটার মতোই ভারী লাগছে।

কিছুক্ষণ পর পাশে কারও উপস্থিতি অনুভব করল সে।
ঘুরে না তাকিয়েও বুঝে গেল— আব্রার। আব্রার এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। দুজনেই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ কোনো কথা বলল না। হাসপাতালের করিডোরে শুধু বৃষ্টির শব্দ আর দূরে কোথাও নার্সদের চলাফেরার আওয়াজ ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ পর নীরাই নীরবতা ভাঙল।
— "আপনার এখন বাসায় যাওয়া উচিত।"

আব্রার জানালার বাইরের দিকে তাকিয়েই বলল,
— "না।"
— "আজ রাত আমি সাফা আর তোমার সাথেই থাকব।
"
নীরা বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাল।
— "সাফা আর আমি আপনার দায়িত্ব না।"
— "যে সারাদিন আমাদের সাথে থাকবেন, আমাদের দায়িত্ব পালন করবেন।"

আব্রার চুপ করে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর নিচু স্বরে বলল,
— "দায়িত্ব মন থেকে আসে।"
— "রক্তের সম্পর্ক থাকলেই যে দায়িত্ব পালন করা যায়, এটা কে বলেছে?"

নীরা কিছু বলল না। আব্রার এবার ধীরে ধীরে বলল,
— "সাফাকে আমি আমার মেয়ের মতো দেখি।"
— "সাফা আমার মেয়ে।"
— "আর আমি ওর সাথে থাকব।"

কথাগুলো শুনেই নীরার ভেতরের রাগটা যেন হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে আব্রারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
— "সাফা শুধু আমার মেয়ে।"
— "আর কারও না।"
— "সাফা আপনার মেয়ে হতে যাবে কেন?"
— "কীভাবে আপনি ওকে নিজের মেয়ে বলছেন?"

আব্রারের চোখে মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত এক অনুভূতি ফুটে উঠল। কষ্ট? অভিমান? নাকি বহু বছরের চাপা কোনো সত্য? সে নীরার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
— "সময় আসলেই বুঝবে..."
— "কীভাবে ও আমার মেয়ে।"

কথাটা বলেই আব্রার আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে ঘুরে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল। নীরা হতভম্ব হয়ে তার চলে যাওয়া দেখল। তার বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা অস্বস্তি জন্ম নিল।
"সময় আসলেই বুঝবে..."

আব্রারের বলা কথাটা বারবার তার কানে বাজতে লাগল।
করিডোরের ওপাশে আব্রার গিয়ে কাচের ভেতর ঘুমন্ত সাফার দিকে তাকিয়ে দাঁড়াল। আর এপাশে বৃষ্টিভেজা রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নীরা ভাবতে লাগল—
আব্রার আসলে কী বলতে চেয়েছিল?

আব্রার একপাশে গিয়ে কয়েকবার মুনিয়াকে কল দিল।
একবার...
দুইবার...
তিনবার...
কিন্তু প্রতিবারই রিং হয়ে কল কেটে গেল। মুনিয়া কল ধরল না। আব্রারের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে এবার মুনিয়ার মাকে কল দিল। সেখানেও একই অবস্থা। কেউ ফোন ধরছে না। আব্রারের বুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি জন্ম নিল। যতই নিজেকে বোঝাক যে মুনিয়ার কিছু হয়নি, তবুও অদ্ভুত এক দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সে ফোনটা পকেটে রেখে দিল। মনে মনে ঠিক করল, সকালে একবার সরাসরি মুনিয়াদের বাসায় গিয়ে খোঁজ নেবে।

তারপর হাসপাতালের ক্যান্টিন থেকে দুই কাপ গরম কফি নিয়ে ফিরে এলো। দূর থেকেই দেখতে পেল নীরা এখনও সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচের ওপাশে ঝুম বৃষ্টি। আর কাঁচের এপাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী। মনে হচ্ছে অনেক দূরের কোনো চিন্তায় হারিয়ে গেছে। আব্রার ধীরে ধীরে হেঁটে নীরার পেছনে এসে দাঁড়াল। নীরা খেয়ালই করল না। দুজনের মাঝখানে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্ব। আব্রারের উষ্ণ নিঃশ্বাস এসে নীরার পিঠ ছুঁয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের ঠান্ডা এসির বাতাসের মধ্যেও সেই উষ্ণতা আলাদা করে অনুভব করল নীরা। তার শরীর হালকা কেঁপে উঠল। তবুও সে পেছনে তাকাল না। আব্রার কফির এক কাপ সামনে বাড়িয়ে দিল।
— কফি।

নীরা চমকে উঠে পেছনে তাকাল। তারপর কাপটা নিল।
— ধন্যবাদ।

আব্রার কিছু বলল না। সে আবার বৃষ্টির দিকে তাকাল।
বাইরে অন্ধকার আকাশ। ঝাপসা আলো। টুপটাপ নয়, যেন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা রইল। আব্রার হঠাৎ মনে মনে ভাবল, আজ অনেকদিন পর একটা গান গাইতে ইচ্ছে করছে। কোনো বিশেষ কারণ নেই। হয়তো এই বৃষ্টি। হয়তো এই রাত। হয়তো বহু বছর পর আবার নীরার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। সে খুব আস্তে আস্তে একটা সুর ভাঁজতে শুরু করল। এতটাই আস্তে যে আশেপাশের কেউ শুনতে পাবে না। কিন্তু নীরা শুনতে পেল। আর সেই সুর কানে যেতেই নীরার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন করে উঠল। কারণ এই সুরটা তার খুব চেনা।

তুমহারে সাঙ্গ রাতোঁ মে জাগ কে
দেখুঁ তুমহে বাস সোনা নাহি হ্যায় মুঝে
তুম হো তো সাব আচ্ছা হ্যায়
তুম হো তো ওয়াক্ত থামা হ্যায়
তুম হো তো ইয়ে লামহা হ্যায়
হাঁ ইসমে হি তো সদা হ্যায়
তুম হো তো... ❤️

অনেক বছরের পুরোনো এক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই সুরের সঙ্গে। নীরা ধীরে ধীরে কফির কাপে চুমুক দিল।
আর বাইরে ঝরে পড়তে থাকা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
দুজনের মাঝখানে এখনও হাজারটা অভিমান। হাজারটা না বলা কথা। তবুও এই মুহূর্তে তারা একই জানালার সামনে দাঁড়িয়ে একই বৃষ্টি দেখছে।

সকালটা শুরু হলো একরাশ স্বস্তির খবর দিয়ে। রাতভর পর্যবেক্ষণে রাখার পর সাফার সব রিপোর্ট চলে এলো।
নীরা রিপোর্ট হাতে নিয়ে উৎকণ্ঠিত চোখে ডাক্তারের সামনে বসে ছিল। আব্রারও পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ডাক্তার রিপোর্টগুলো কয়েকবার দেখে হালকা হেসে বললেন,
— "চিন্তার কিছু নেই।"
— "ভাইরাল ফিভার ছিল।"
— "এখন জ্বর অনেকটাই কমে এসেছে।"
— "কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি।"
— "বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।"

কথাটা শুনেই নীরা যেন বুক ভরে শ্বাস নিল। সারারাতের দুশ্চিন্তা এক নিমিষে অনেকটা কমে গেল। আব্রারও স্বস্তির হাসি দিল। এরপর হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সাফাকে রিলিজ দেওয়া হলো। জ্বর কমে যাওয়ায় সাফাও আগের চেয়ে অনেকটা স্বাভাবিক। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় সাফা আব্রারের কোলে উঠতে চাইল। আব্রারও কিছু না বলে তাকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট মেয়েটা মাথা রেখে শান্ত হয়ে বসে রইল। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে নীরা কিছু বলল না।শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল।

কিছুক্ষণ পর তারা নীরাদের বাসায় পৌঁছাল। মৌসুমি দরজা খুলতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। মারওয়া দৌড়ে এসে সাফাকে জড়িয়ে ধরল। বাড়ির ভেতর মুহূর্তেই আবার প্রাণ ফিরে এলো। আব্রার সাফার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— "ওষুধগুলো সময়মতো খাওয়াবেন।"

মৌসুমি মাথা নাড়ল। নীরা ধীরে ধীরে বলল,
— "ধন্যবাদ।"

আব্রার তার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড দুজনের চোখে চোখ আটকে রইল। তারপর আব্রার দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
— "আমি চলি।"

এর বেশি কিছু বলল না। সে ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইকের কাছে এসে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে পড়ল— মুনিয়া। গতকাল রাত থেকে মুনিয়ার কোনো খবর সে পায়নি। না মুনিয়া ফোন ধরেছে। না তার মা। বুকের ভেতর আবার অস্বস্তি জন্ম নিল। আব্রার দ্রুত বাইকে উঠল। ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। আজ অফিস নয়। আজ অন্য কোথাও নয়। তার প্রথম গন্তব্য— মুনিয়াদের বাসা।

বাইকটা ধীরে ধীরে রাস্তা ছেড়ে সামনে এগিয়ে গেল।
আর আব্রারের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল—
মুনিয়া কি সত্যিই ঠিক আছে? আব্রার মুনিয়াদের বাসার সামনে এসে বাইক থামাল। সকাল গড়িয়ে তখন প্রায় দুপুর। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি কাজ করতে লাগল। গত রাতের পর থেকে মুনিয়ার কোনো খবর সে পায়নি। ফোনও বন্ধ। কোনো যোগাযোগ নেই। আব্রার কয়েকবার কলিং বেল চাপল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন মুনিয়ার মা। আব্রার সালাম দিল।
— "আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।"

মুনিয়ার মা গম্ভীর মুখে সালামের উত্তর দিলেন।
— "ওয়ালাইকুম আসসালাম।"

তারপর সরে দাঁড়ালেন।
— "ভেতরে আসো।"

আব্রার ভেতরে ঢুকল। কিন্তু ঢুকেই তার মনে হলো কিছু একটা অস্বাভাবিক। মুনিয়ার মায়ের মুখটা ভার হয়ে আছে। চোখেমুখেও অদ্ভুত একটা কঠোরতা। যেটা আগে কখনো দেখেনি সে। আব্রার সোফায় বসে বলল,
— "আন্টি, কাল হাসপাতালে গিয়েছিলেন?"
— "মুনিয়ার কি সিরিয়াস কিছু হয়েছিল?"

মুনিয়ার মা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন,
— "না।"
— "মুনিয়ার কোনো অ্যাক্সিডেন্টই হয়নি।"

আব্রার হতভম্ব হয়ে গেল।
— "কি?"
— "অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি?"

মুনিয়ার মা শান্ত গলায় বললেন,
— "না।"
— "একদম ঠিক আছে।"

আব্রার বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
— "কিন্তু কাল তো মুনিয়া আমাকে কল করে বলল ওর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।"
— "স্কয়ার হাসপাতালে নিতে হবে বলেছিল।"

মুনিয়ার মা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললেন,
— "ও বলেছে হয়তো কেউ প্র্যাঙ্ক করেছে।"
— "ভয়েস ফিশিং না কী যেন বলে আজকাল।"
— "হয়তো সেই ধরনের কিছু হয়েছে।"

আব্রার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কথাগুলো তার কাছে ঠিক বিশ্বাসযোগ্য লাগল না। তবুও আর কিছু বলল না।
শুধু মাথা নেড়ে বলল,
— "ওহ... আচ্ছা।"

তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— "মুনিয়া কোথায়?"

মুনিয়ার মা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন,
— "উপরে।"
— "নিজের রুমে আছে।"

কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,
— "যাও, কথা বলো।"

আব্রার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হতে লাগল— মুনিয়ার মা যেন ইচ্ছে করেই কিছু লুকাচ্ছেন। আর মুনিয়াও। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ পেরোনোর সাথে সাথে তার বুকের ভেতরের অস্বস্তিটা আরও বাড়তে লাগল। অবশেষে সে মুনিয়ার রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। আব্রার কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দরজায় নক করল।
— "মুনিয়া..."
— "আমি... আব্রার।"

দরজার ওপাশে নিস্তব্ধতা। আর সেই নিস্তব্ধতার মধ্যেই আব্রার অপেক্ষা করতে লাগল মুনিয়ার উত্তর শোনার জন্য।

মুনিয়ার রুমের ভেতর থেকে শান্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,
— "আসো।"

আব্রার ধীরে ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। রুমটা পরিপাটি। তবে অদ্ভুত রকম নিরব। ঘরে ঢুকেই সে দেখতে পেল মুনিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত রেলিংয়ের উপর রাখা। দৃষ্টি দূরের আকাশে। সকালের রোদ আর হালকা বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে। আব্রার কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুনিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে রইল। শেষ পর্যন্ত আব্রারই কথা শুরু করল।
— "তোমার সাথে নাকি কালকে প্র্যাঙ্ক হয়েছে?"
— "আমার ফোনে কল এসেছিল তোমার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।"
— "কিন্তু আন্টির কাছে শুনলাম ওটা নাকি কেউ প্র্যাঙ্ক করেছে।"

মুনিয়া বাইরে তাকিয়েই রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— "হ্যাঁ।"
— "ঠিকই শুনেছ।"

আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "যখন শুনলে আমার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে..."
— "তখন আমার কাছে না এসে কোথায় গিয়েছিলে, আব্রার?"

প্রশ্নটা শুনে আব্রারের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর দিতে পারল না। মুনিয়া এবার তার দিকে তাকাল। চোখে কোনো রাগ নেই। কোনো অভিযোগও নেই। শুধু একটা শান্ত অপেক্ষা। যেন সে উত্তরটা আগেই জানে। তবুও আব্রারের মুখ থেকে শুনতে চায়। আব্রার অস্বস্তিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তারপর বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। অনেকদিন ধরে জমে থাকা কথাগুলো যেন গলায় এসে আটকে আছে। সে ধীরে ধীরে মুনিয়ার দিকে ফিরল। চোখে স্পষ্ট অপরাধবোধ। কণ্ঠেও ভার।
— "আজ..."
— "আজ এই বিষয়েই কথা বলতে এসেছি আমি, মুনিয়া।"

মুনিয়া স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। আব্রার নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আমি মিথ্যা বলতে পারতাম।"
— "হাজারটা অজুহাত দিতে পারতাম।"
— "কিন্তু আজ আর সেটা করতে চাই না।"

হাওয়ায় বারান্দার পর্দা দুলে উঠল। দুজনের মাঝখানে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এলো। আব্রার ধীরে ধীরে বলল,
— "কাল তোমার কথা শুনে আমি চিন্তা করেছিলাম।"
— "এখনও করছি।"
— "কিন্তু..."

সে থেমে গেল। মুনিয়া নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল।
আব্রার চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত সাহস সঞ্চয় করল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
— "সাফার কথা শোনার পর..."
— "আমি ওদের কাছেই গিয়েছিলাম।"

কথাটা বলেই সে মুনিয়ার দিকে তাকাল। তার চোখে লজ্জা, অপরাধবোধ আর অসহায়তা একসাথে মিশে আছে। কারণ সে জানে— এই স্বীকারোক্তির পর হয়তো তাদের সম্পর্কের শেষ অধ্যায়টা শুরু হতে যাচ্ছে।

আব্রার আরও কিছু বলতে যাবে— ঠিক তখনই মুনিয়া হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। তার মুখে ছিল শান্ত একটা হাসি। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য না বলা কষ্ট। মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "আর কিছু বলতে হবে না, আব্রার।"
— "আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম তুমি সত্যি বলার সাহস রাখো নাকি আমাকে অন্ধকারে রাখো।"

সে কয়েক সেকেন্ড আব্রারের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— "তুমি পাশ হয়ে গিয়েছ, আব্রার।"

আব্রার হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
— "কিন্তু মুনিয়া..."
— "আমার আরও কথা আছে।"

মুনিয়া মাথা নাড়ল।
— "না।"
— "আর কিছু বলতে হবে না।"

একটু থেমে সে জিজ্ঞেস করল,
— "নিচে থেকে আসার সময় কি খেয়াল করেছো আম্মুর মুখটা গোমড়া ছিল?"

আব্রার ভ্রু কুঁচকে বলল,
— "হ্যাঁ।"
— "কিন্তু কী হয়েছে আন্টির?"

মুনিয়া জানালার বাইরে তাকাল। দূরে আকাশে সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
— "আমি তোমার আর আমার বিয়েটা ক্যানসেল করে দিয়েছি।"

আব্রার স্থির হয়ে গেল। মুনিয়া যেন থামল না। এক নিঃশ্বাসে বলে গেল,
— "কার্ড ছাপানো বন্ধ করে দিয়েছি।"
— "ভেন্যু বুকিং ক্যানসেল করে দিয়েছি।"
— "ডেকোরেশনওয়ালাদের মানা করে দিয়েছি।"
— "আমার লেহেঙ্গার অর্ডারও বাতিল করে দিয়েছি।"

কথাগুলো বলে মুনিয়া চুপ করে গেল। বারান্দায় হঠাৎ যেন সব শব্দ থেমে গেল। শুধু দূরে কোথাও একটা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। আব্রার অবিশ্বাস নিয়ে মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ বড় হয়ে গেছে। মুখ খুলল। কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সে যেন বুঝতেই পারছে না কী শুনল। কয়েক সেকেন্ড আগে পর্যন্ত যে বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল— সেই বিয়ে আজ নেই?
সব শেষ?

আব্রারের গলা শুকিয়ে এলো। অবশেষে সে কষ্ট করে বলল,
— "মুনিয়া... তুমি..."

বাকিটুকু আর বলতে পারল না। কারণ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার চোখে জল চিকচিক করছে।
তবুও সে হাসছে। আর সেই হাসিটাই আব্রারের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভার তৈরি করল। মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "এত অবাক হওয়ার কিছু নেই।"
— "অনেকদিন ধরেই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিলাম।"
— "আজ শুধু বাস্তবে রূপ দিলাম।"

আব্রার নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আর তার জীবনে সম্ভবত প্রথমবারের মতো— সে বুঝতে পারল, কাউকে হারানোর কষ্ট শুধু প্রেমে নয়, ত্যাগের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।

মুনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বারান্দার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— "আমি অনেকদিন ধরেই তোমার আচরণ লক্ষ্য করছিলাম, আব্রার।"
— "নীরা তোমার জীবনে আসার পর তুমি কেমন বদলে গিয়েছো।"

সে ধীরে ধীরে আব্রারের দিকে তাকাল। চোখে জল থাকলেও কণ্ঠটা স্থির।
— "এই পরিবর্তনটা আমি তোমার মাঝে অনেক বছর ধরে আনার চেষ্টা করেছি।"
— "তোমার থেরাপিস্ট হিসেবে।"
— "তোমার বন্ধু হিসেবে।"
— "তোমার প্রেমিকা হিসেবে।"
— "তোমার ফিয়ান্সি হিসেবে।"
— "কিন্তু আমি পারিনি।"

মুনিয়া হালকা হেসে মাথা নাড়ল।
— "আর নীরা?"
— "ও কিছুই করল না।"
— "শুধু আবার এক কদম রাখল তোমার জীবনে।"
— "আর তুমি পুরোপুরি বদলে গেলে।"

আব্রার চুপচাপ শুনতে লাগল। মুনিয়া আবার বলল,
— "এটাই তো আসল ভালোবাসা, তাই না আব্রার?"
— "যে ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়।"
— "বাঁচতে শেখায়।"
— "হাসতে শেখায়।"
— "অপেক্ষা করতে শেখায়।"

তারপর নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বলল,
— "আর এই ভালোবাসা তুমি শুধু নীরার জন্যই অনুভব করো।"
— "আমার জন্য কখনো করোনি।"
— "তাই আমি জোর করে তোমাকে বিয়ের বন্ধনে বাঁধতে চাই না।"

কথাগুলো শুনে আব্রারের বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি বলল,
— "মুনিয়া, তুমি এমন ভাবো না যে আমি তোমাকে ঠকিয়েছি।"
— "আমি আজ এই বিষয়েই কথা বলতে এসেছিলাম।"
— "আমি সবকিছু খুলে বলতে চেয়েছিলাম।"
— "তোমাকে অন্ধকারে রেখে বিয়ে করতে চাইনি।"

মুনিয়া মাথা নাড়ল। তার ঠোঁটে ক্লান্ত একটা হাসি ফুটে উঠল।
— "জানি।"
— "তুমি একটা সৎ ছেলে, আব্রার।"
— "এই কারণেই তো তোমার ওপর রাগ করতে পারি না।"
একটু থেমে সে বলল,
— "যদি তুমি খারাপ মানুষ হতে, তাহলে হয়তো আমার জন্য সহজ হতো।"
— "আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারতাম।"
— "দোষ দিতে পারতাম।"
— "কিন্তু সমস্যা হলো, তুমি আমাকে কখনো মিথ্যে স্বপ্ন দেখাওনি।"

আব্রার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মুনিয়া মৃদু স্বরে বলল,
— "ভুলটা আমার ছিল।"
— "আমি ভেবেছিলাম সময়ের সাথে সাথে তুমি আমাকে ভালোবেসে ফেলবে।"
— "আমি ভেবেছিলাম ধৈর্য ধরলে একদিন তোমার চোখে আমার জন্যও সেই আলো দেখতে পাব।"

তার কণ্ঠটা এবার একটু কেঁপে উঠল।
— "কিন্তু কিছু মানুষকে যতই ভালোবাসো না কেন..."
— "তাদের হৃদয়ে তোমার জন্য জায়গা তৈরি হয় না।"
— "কারণ সেই জায়গাটা অনেক আগেই অন্য কেউ নিয়ে নিয়েছে।"

বারান্দায় নীরবতা নেমে এলো। দুজনেই চুপ। দূরে বাতাসে গাছের পাতা দুলছে। আর সেই নীরবতার মাঝেই মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "তোমাকে আমি মুক্তি দিলাম, আব্রার।"
— "এবার তুমি নিজের মন যেদিকে টানে সেদিকেই যাও।"
— "আর একটা কথা..."

আব্রার মাথা তুলে তাকাল। মুনিয়া চোখের কোণের জল মুছে হেসে বলল,
— "এই জীবনে যদি কখনো সত্যি সুখী হও, তাহলে একদিন আমাকে জানিয়ো।"
— "তখন মনে হবে, আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম, সে অন্তত সুখে আছে।"

মুনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হালকা হেসে মাথা নিচু করল। সেই হাসির মধ্যে আনন্দের চেয়ে কষ্টই বেশি ছিল।
— "জানো আব্রার..."
— "আমি থেরাপিস্ট হিসেবেও ফেইলিউর।"
— "আর ভালোবাসার মানুষ হিসেবেও ফেইলিউর।"

আব্রার ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "কারণ আমি তোমাকে আমার থেরাপির মাধ্যমেও আগের সেই হাসিখুশি জীবন ফিরিয়ে দিতে পারিনি।"
— "আর ভালোবাসার মাধ্যমেও পারিনি।"
— "এত বছর চেষ্টা করেও পারিনি।"

কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ ভিজে উঠল। তবুও সে কাঁদল না। আব্রার কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "না মুনিয়া।"
— "এভাবে বলো না।"
— "তুমি তোমার জায়গায় একদম ঠিক।"
— "একদম পারফেক্ট একটা মেয়ে।"

মুনিয়া মৃদু হেসে তার দিকে তাকাল। আব্রার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "সমস্যাটা তোমার না।"
— "সমস্যাটা আমার।"
— "আমার মনটাই খুব বেহায়া।"

সে নিজের বুকের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "যেটা শুধু একদিকেই যায়।"
— "এই মনকে আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি।"
— "অনেকবার বলেছি সামনে এগিয়ে যেতে।"
— "নতুন করে শুরু করতে।"
— "কিন্তু কিছুতেই এই মন আমার কথা শোনেনি।"

মুনিয়া চুপচাপ শুনতে লাগল। আব্রারের চোখে তখন অপরাধবোধ স্পষ্ট। মুনিয়া এবার ধীরে ধীরে বলল,
— "তাহলে এবার তোমার মন যা চায় তাই করো।"
— "সারা জীবন তো অন্যদের জন্য বেঁচেছ।"
— "একবার নিজের জন্যও বাঁচো।"

বারান্দার বাইরে বাতাস বয়ে গেল। মুনিয়া রেলিংয়ে হাত রেখে বলল,
— "আর একটা কথা।"
— "আমি বাসায় আম্মু-আব্বুকে বলেছি আমি আরও পড়াশোনা করতে চাই।"
— "আরও সার্টিফিকেট অর্জন করতে চাই।"
— "নিজের ক্যারিয়ারে আরও এগোতে চাই।"
— "আমি এখনও বিয়ের জন্য প্রস্তুত না।"

সে হালকা হেসে বলল,
— "এই কারণটাই সবাইকে বলেছি।"
— "তাই বিয়েটা ক্যানসেল করেছি।"

আব্রার চুপ করে তার কথা শুনল। মুনিয়া এবার তার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,
— "আমি তোমার কোনো দোষ দিইনি, আব্রার।"
— "আম্মু-আব্বুকেও দিইনি।"
— "কারও কাছে তোমার নামে একটা খারাপ কথাও বলিনি।"
— "কারণ আমি জানি তুমি ইচ্ছে করে আমাকে কষ্ট দিতে চাওনি।"

আব্রারের গলা ভারী হয়ে এলো। সে ধীরে ধীরে বলল,
— "তবুও আমি তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।"
— "হয়তো তোমার প্রাপ্যটা আমি দিতে পারিনি।"

মুনিয়া মাথা নাড়ল। তার চোখে জল চিকচিক করছে।
— "সব মানুষ আমাদের জীবনে থাকার জন্য আসে না, আব্রার।"
— "কিছু মানুষ আসে আমাদের কিছু শেখানোর জন্য।"
— "তুমি আমাকে শিখিয়েছ ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না।"
— "আর আমি আশা করি আমি তোমাকে শিখিয়েছি নিজের অনুভূতি থেকে পালিয়ে বাঁচা যায় না।"

কথাটা বলে মুনিয়া মুখ ফিরিয়ে বাইরে তাকাল। কারণ আর এক সেকেন্ড আব্রারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হয়তো তার চোখের জল আর আটকে রাখা সম্ভব হতো না।

মুনিয়ার কথা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ দুজনের মাঝেই নীরবতা নেমে এলো। মনে হচ্ছিল দুজনেই জানে— এটাই তাদের শেষ কথোপকথন। আব্রার ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "তাহলে আজ এখানেই আমাদের এই সুন্দর সম্পর্কটার সমাপ্তি, মুনিয়া।"
— "হয়তো নামটা প্রেম ছিল না।"
— "তবুও সম্পর্কটা সুন্দর ছিল।"

মুনিয়া মৃদু হেসে মাথা নিচু করল। আব্রার আবার বলল,
— "তুমি চাইলে মাঝে মাঝে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারো।"
— "অন্তত বন্ধু হিসেবে।"

মুনিয়া এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল। চোখ দুটো ভেজা। তবুও কণ্ঠে দৃঢ়তা।
— "না, আব্রার।"
— "আমি তোমার বন্ধু হতে চাইনি কখনো।"
— "আমি তোমার অর্ধাঙ্গিনী হতে চেয়েছিলাম।"
— "যেহেতু সেটা হতে পারলাম না..."

সে থামল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— "তাহলে আর কিছুই হতে চাই না।"

আব্রারের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু সে জানত— এই কথার কোনো উত্তর হয় না। সে শুধু মাথা নাড়ল। তারপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সরাসরি চলে গেল মুনিয়ার বাবার স্টাডি রুমে।

ভেতরে মুনিয়ার বাবা আর মা বসে ছিলেন। আব্রার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সাহস সঞ্চয় করে সব খুলে বলল। নীরার কথা। নিজের অনুভূতির কথা। মুনিয়াকে তার প্রাপ্য ভালোবাসা দিতে না পারার কথা। আর এই বিয়ে না করার সিদ্ধান্তের কথা। ঘরের ভেতর দীর্ঘ সময় নীরবতা রইল। সব কথা শোনার পর মুনিয়ার বাবা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর এগিয়ে এসে আব্রারের মাথায় স্নেহের হাত রাখলেন।
— "আমি জানতাম বাবা..."
— "তোমার জীবনে কোনো না কোনো অতীত আছে।"
— "তবুও মুনিয়া জোর করেই এই বিয়েটার ব্যাপারটা এগিয়ে নিয়েছিল।"

তিনি হালকা হেসে বললেন,
— "আমি শুরুতে একটু নারাজও ছিলাম।"
— "তবে মেয়ের জেদের কাছে হার মেনেছিলাম।"

কিছুক্ষণ থেমে তিনি আবার বললেন,
— "যাই হোক।"
— "তুমি আজ সত্যিটা বলেছ।"
— "এতেই আমি খুশি।"
— "মিথ্যার উপর একটা সংসার দাঁড় করানোর চেয়ে এই সিদ্ধান্ত অনেক ভালো।"

আব্রারের চোখ ভিজে উঠল। সে নিচু গলায় বলল,
— "আমাকে ক্ষমা করে দিবেন, আঙ্কেল।"

মুনিয়ার বাবা তার কাঁধে হাত রাখলেন।
— "ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই।"
— "ভালো থেকো।"

আব্রার এবার মুনিয়ার মায়ের দিকে তাকাল। তারপর নিচু হয়ে বলল,
— "আন্টি, আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।"

মুনিয়ার মা চুপ করে রইলেন। তার চোখে স্পষ্ট অভিমান।
হয়তো রাগও আছে। তবুও অনেকক্ষণ পর তিনি শুধু বললেন,
— "মেয়েটা অনেক কষ্ট পাবে।"
— "এই কষ্টটা যেন বৃথা না যায়, আব্রার।"

আব্রারের কাছে এই কথারও কোনো উত্তর ছিল না। সে শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর শেষবারের মতো সালাম দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। দরজার কাছে পৌঁছে হঠাৎ তার মনে হলো কেউ তাকে দেখছে। আব্রার পেছনে ফিরে তাকাল। সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মুনিয়া। সাদা পোশাকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। চোখ দুটি শুধু আব্রারের দিকেই নিবদ্ধ। দুজনের কেউ কোনো কথা বলল না। কোনো বিদায়ও নয়। কোনো প্রতিশ্রুতিও নয়। শুধু কয়েক সেকেন্ডের নীরব দৃষ্টিবিনিময়। হয়তো এটাই তাদের শেষ দেখা। হয়তো না। কিন্তু এই মুহূর্তে দুজনেই বুঝতে পারল— কিছু সম্পর্কের সমাপ্তি ঝগড়া দিয়ে হয় না। ঘৃণা দিয়ে হয় না। বরং হয় একরাশ ভালোবাসা, সম্মান আর না পাওয়ার বেদনা নিয়ে।

আব্রার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর বাড়ির গেট পেরিয়ে বাইকের দিকে হাঁটতে লাগল। আর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা মুনিয়া চুপচাপ তার চলে যাওয়া দেখতে লাগল। যতক্ষণ না মানুষটা চোখের আড়াল হয়ে যায়।

অন্যদিকে সাজ্জাদের জীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়েছে। অনেক চেষ্টা আর অপমান সহ্য করার পর অবশেষে সে একটা চাকরি পেয়েছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যায়। সারাদিন কাজ করে। রাতে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফেরে। কিন্তু বাসায় ফিরেই তার বিশ্রাম নেই। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সে ল্যাপটপ নিয়ে বসে যায়। অফিসের ফাইল খোলে। রিপোর্ট বানায়। ডাটা এন্ট্রি করে।

একটা ভুল ঠিক করতে গিয়ে আরেকটা ভুল করে বসে।
যতই মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করুক, তার মাথাটা যেন ঠিকমতো কাজ করে না। পরদিন অফিসে গেলেই নতুন কোনো ভুল ধরা পড়ে। বসের কড়া কথা শুনতে হয়। কখনো সহকর্মীদের বিরক্ত মুখ দেখতে হয়। ধীরে ধীরে সাজ্জাদের মনে ভয় জন্মাতে লাগল। এভাবে চলতে থাকলে এই চাকরিটাও বেশিদিন টিকবে না।

এক বিকেলে অফিস থেকে বের হয়ে সে অনেকক্ষণ রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটল। তারপর অজান্তেই পা চলে গেল সেই পুরোনো চিপা গলির দিকে। যে গলিতে সে এর আগেও গিয়েছিল। গলিটার পরিবেশ আগের মতোই। মলিন দেয়াল। অস্বস্তিকর নীরবতা। কিছু সন্দেহজনক মুখ।

সাজ্জাদ সেখানে গিয়ে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলল। কিছু টাকা দিয়ে কয়েকটি ইনজেকশন কিনল।
তারপর আরও কিছু টাকা দিয়ে গলির ভেতরের একটি ছোট রুমে ঢুকে গেল। রুমের ভেতরে ছিল এক তরুণী।
চোখেমুখে ক্লান্তি। মুখে জোর করে ধরে রাখা হাসি। সাজ্জাদ কোনো কথা বলল না। মেয়েটিও না। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলল। বাইরে সন্ধ্যা নেমে এলো। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সাজ্জাদ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। তার মুখে কোনো স্বস্তি নেই। কোনো তৃপ্তিও নেই। বরং আগের চেয়েও বেশি শূন্যতা। শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে সে ধীরে ধীরে গলি থেকে বেরিয়ে এল।

মনে হচ্ছিল সে নিজেও জানে না ঠিক কী থেকে পালানোর চেষ্টা করছে। নিজের ব্যর্থতা? অপরাধবোধ? নাকি জীবনের সমস্ত চাপ? রাত অনেক হয়ে গেছে। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। সাজ্জাদ মাথা নিচু করে নিজের বাসার দিকে হাঁটতে লাগল। আর দূর

 #নির্বাসিত_ভালোবাসা  #লেখনীতে_ফাহমিনা_আফরোজ_প্রমি  #পর্ব_২৬ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে আকাশের বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। সারা...
13/06/2026

#নির্বাসিত_ভালোবাসা
#লেখনীতে_ফাহমিনা_আফরোজ_প্রমি
#পর্ব_২৬

ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে আকাশের বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। সারারাতের বৃষ্টির পর প্রকৃতি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরের ফোঁটাগুলো সকালের কোমল রোদে মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। দূরে কোথাও নাম না জানা পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে নতুন দিনের আগমনী গান গাইছে। ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ বাতাসে মিশে চারপাশকে আরও স্নিগ্ধ করে তুলেছে।

রাস্তার পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। পাতার ডগা থেকে টুপটাপ করে এখনো পানি পড়ছে। আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের ফাঁক গলে সূর্যের সোনালি আলো পৃথিবীর বুকে এসে পড়ছে। প্রকৃতি যেন আজ অদ্ভুত শান্ত। যেন গত রাতের সমস্ত ঝড়, সমস্ত অস্থিরতা, সমস্ত কান্না ধুয়ে-মুছে নিয়ে গেছে বৃষ্টি।

কিন্তু প্রকৃতির এই শান্ত সৌন্দর্যের বিপরীতে কিছু মানুষের জীবনে এখনো ঝড় থামেনি। কিছু হৃদয়ের ভেতর এখনো জমে আছে না বলা কথা, অপূর্ণ l ভালোবাসা, ভয়, অপরাধবোধ আর অপেক্ষা। নতুন দিনের সূচনা হলেও তাদের জীবনের গল্প যেন আরও জটিল এক মোড়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। আর সেই গল্পের নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে আজকের এই শান্ত, স্নিগ্ধ সকালকে সাক্ষী রেখে।

মুনিয়ার চোখে আজ রাতভর ঘুম ছিল না। গতকালের সেই দৃশ্যটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।
বৃষ্টিভেজা ছাদ। সাফা-মারওয়ার হাসি। নীরার মুখের প্রশান্তি। আর আব্রারের সেই হাসি... যে হাসিটা মুনিয়া গত কয়েক বছরে খুব কমই দেখেছে। রাতের পর রাত এপাশ-ওপাশ করতে করতে শেষমেশ ভোরের আলো ফুটতেই মুনিয়া একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। আজ সে আর পালিয়ে বেড়াবে না। আজ কিছু প্রশ্নের উত্তর তার চাই-ই চাই। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। দুপুর পেরিয়ে বিকেল নামতে শুরু করল।

মুনিয়া ধীরে ধীরে নিজের রুমের সামনে রাখা আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। আজ সে চেম্বারে যায়নি। কোনো রোগী দেখেনি। কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্টও নেয়নি। আজকের পুরো দিনটা সে নিজের জন্য রেখেছে। আলমারি খুলে অনেকক্ষণ ধরে কাপড় দেখল। শেষমেশ একটা সুন্দর গাঢ় সবুজ রঙের কাজ করা কামিজ বের করল। সাথে সাদা পালাজ্জো। হালকা মুক্তোর দুল।

হাতে একটা ঘড়ি। অতিরিক্ত কোনো গয়না নয়। খুব সাধারণ অথচ ভীষণ মার্জিত। চুলগুলো সুন্দর করে আচড়ে খোলা রাখল। হালকা কাজল টানল চোখে।
ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। সবকিছু শেষ করে আয়নায় নিজেকে দেখল মুনিয়া। যে কেউ দেখলে বলবে আজ তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

কিন্তু তার চোখের নিচের ক্লান্তি আর ভেতরের অস্থিরতা কোনো সাজ দিয়েই ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। মুনিয়া আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবিকে জিজ্ঞেস করল,
— "আজ কি সবকিছুর উত্তর পাবো আমি?"

উত্তর এলো না। শুধু বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠল। বিছানার ওপর রাখা ব্যাগটা হাতে তুলে নিল সে।
মোবাইলটা ব্যাগে রাখল। তারপর একবার গভীর শ্বাস নিল। আজকের এই পথচলা হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পথচলা হতে যাচ্ছে। হয়তো আজ তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নটার সমাপ্তি হবে। আবার হয়তো আজই সে সত্যিটা জানতে পারবে। যে সত্যি থেকে সে এতদিন নিজেকে দূরে রাখতে চেয়েছিল। মুনিয়া ধীরে ধীরে রুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।

বিকেলের নরম রোদ তখন শহরের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে।
দূরে কোথাও পাখিরা নীড়ে ফিরছে। আর মুনিয়া... নিজের বুকের ভেতর হাজারো অজানা অনুভূতি নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। কিছুক্ষণ পর মুনিয়ার গাড়ি এসে থামল নীরাদের বাড়ির সামনে। হ্যাঁ, ঠিকই। মুনিয়া আজ নীরাদের বাড়িতেই এসেছে। গাড়ি থামার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল সে। তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধুকপুক করছে। গত কালের সেই দৃশ্য এখনও তার চোখের সামনে ভাসছে। বৃষ্টিভেজা ছাদ। আব্রার। নীরা। সাফা-মারওয়ার হাসি। সবকিছু। কিন্তু আজ মুনিয়া কোনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে না। সারারাত জেগে সে ঠিক করেছে আজ কী করবে।

গভীর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে মুনিয়া গাড়ি থেকে নামল।
একবার মাথা তুলে নীরাদের বাড়িটার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে গেট খুলে ভেতরে ঢুকল। বিকেলের নরম আলো চারপাশে ছড়িয়ে আছে। মুনিয়ার পরনে সুন্দর একটা কামিজ। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। মুখে হালকা সাজ। দেখতে একদম বাঙালি মেয়ের মতো লাগছে তাকে। কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা সেই সাজের আড়ালে লুকানো। মুনিয়া ধীরে ধীরে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।

কয়েক সেকেন্ড স্থির থেকে কলিং বেলের সুইচে হাত রাখল। তারপর কলিং বেল টিপে অপেক্ষা করতে লাগল। আজ সে নীরাদের বাড়িতে এসেছে। আর এই আসার পেছনে একটা বিশেষ কারণ আছে।

কিছুক্ষণ পর দরজাটা খুলে দিল মৌসুমি। আজ দুপুরেই শুপ্তকে নিয়ে মৌসুমি নীরাদের বাসায় এসেছে সাফাকে দেখতে। কারণ গতকাল বৃষ্টিতে ভেজার পর রাতে সাফার অনেক জ্বর এসেছে। মৌসুমি দরজা খুলেই মুনিয়াকে দেখে চিনে ফেলল। ওইদিন শপিং মলে দেখা হয়েছিল তাদের। মুনিয়াকে এখানে দেখে মৌসুমি ভীষণ অবাক হলো। তবে নিজের অবাক ভাবটা যতটা সম্ভব লুকিয়ে ফেলল সে। মুখে একটা কষ্ট করে হাসি এনে বলল,
— "আসো, ভেতরে আসো।"

মুনিয়াও হালকা হাসল।
— "ধন্যবাদ।"

তারপর ভেতরে ঢুকে পড়ল। মৌসুমি দরজা বন্ধ করে মুনিয়ার দিকে তাকাল। মুনিয়া ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল,
— "কেমন আছেন?"

মৌসুমি মৃদু হেসে বলল,
— "ভালো। তুমি কেমন আছো?"
— "আমি ভালো আছি।"

মুনিয়াও হেসে উত্তর দিল। তারপর ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে বসল। বসে চারপাশে তাকাতে লাগল। ঘরটা খুব পরিপাটি। সবকিছু গুছিয়ে রাখা। চারদিকে একটা ঘরোয়া উষ্ণতার ছাপ। মুনিয়া চুপচাপ বসে থেকে পুরো বাসাটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। আর মৌসুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভাবতে লাগল— মুনিয়া হঠাৎ করে নীরাদের বাসায় কেন এসেছে? ঠিক তখনই ভেতরের রুম থেকে নীরার কণ্ঠ ভেসে এলো—
— "মৌসুমি, কে এসেছে?"

কথাটা বলতে বলতেই নীরা রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
কিন্তু ড্রয়িংরুমে এসে মুনিয়াকে দেখে সে একদম থমকে গেল। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠল। মুনিয়াকে এখানে দেখবে, সেটা সে কল্পনাও করেনি। অন্যদিকে মুনিয়াও নীরার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
মুখে ভদ্র একটা হাসি এনে বলল,
— "কেমন আছেন, আপু?"

নীরা এখনও কিছুটা হতবাক। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
— "ভালো।"

তারপর অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "আপনি?"

মুনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হলো কথাগুলো কীভাবে শুরু করবে সেটা গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "বসুন আপু।"
— "আপনার সাথেই কথা বলতে এসেছি।"

মুনিয়ার কথা শুনে নীরা আরও অবাক হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
— "আমার সাথে?"

মুনিয়া মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ।"
— "আগে বসুন, তারপর বলছি।"

নীরা কিছুটা ইতস্তত করল। একবার মৌসুমির দিকে তাকাল। মৌসুমিও বিষয়টা বুঝতে না পেরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। শেষমেশ নীরা ধীরে ধীরে এসে সোফায় বসল। তার পাশেই এসে বসল মৌসুমি। আর মুনিয়া তাদের সামনের সোফায় বসে দুই হাত একসাথে জড়িয়ে নিল। ড্রয়িংরুম জুড়ে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এলো। মনে হচ্ছে সবাই অপেক্ষা করছে— মুনিয়া ঠিক কী বলতে এসেছে সেটা শোনার জন্য।

মুনিয়া কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল। মুখে কোনো হাসি নেই। চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত। সে সরাসরি নীরার দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আমি আব্রারের সাথে বিয়ে ক্যানসেল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"

কথাটা বলেই মুনিয়া চুপ হয়ে গেল। ড্রয়িংরুমে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নীরা আর মৌসুমি দুজনেই যেন কথাটা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারল না। পরমুহূর্তেই মৌসুমি বিস্মিত হয়ে বলে উঠল,
— "কেন?"

নীরা সঙ্গে সঙ্গে মৌসুমির দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাল।
যেন তাকে আর কোনো কথা বলতে নিষেধ করছে। তারপর নিজের দৃষ্টি আবার মুনিয়ার দিকে ফিরিয়ে আনল। মুখে কোনো বাড়তি অভিব্যক্তি নেই। খুব শান্ত গলায় বলল,
— "এটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার।"
— "আপনি বিয়ে ক্যানসেল করবেন নাকি বিয়ে করবেন, সেটা আমাকে শোনাচ্ছেন কেন?"

মুনিয়া নীরার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মনে হলো সে এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল। তার ঠোঁটে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল। তবে সেই হাসির মধ্যে আনন্দের চেয়ে কষ্টই বেশি ছিল। ড্রয়িংরুমের পরিবেশ আবারও ভারী হয়ে উঠল। মৌসুমি একবার নীরার দিকে, একবার মুনিয়ার দিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু কেউই আর সঙ্গে সঙ্গে কোনো কথা বলল না। মুনিয়া যেন নিজের পরের কথাগুলো বলার জন্য সাহস সঞ্চয় করতে লাগল।

মুনিয়া নীরার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলতে শুরু করল,
— "আপনাকে শোনাচ্ছি কারণ আপনার কারণেই তো আমাদের সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল।"

কথাটা শুনে নীরা ভ্রু কুঁচকে ফেলল। তার মুখে স্পষ্ট বিস্ময়।
— "মানে?"

মুনিয়া মাথা নাড়ল।
— "মানে বুঝাচ্ছি।"

সে একটু থামল। মনে হলো কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে।
তারপর আবার বলা শুরু করল।
— "আমি পেশায় একজন সাইকোলজিস্ট।"
— "আব্রারের সাথে আমার বিয়ে পাকাপাকি বলতে গেলে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। কারণ ভালোবাসাটা এখানে শুধু আমি করেছি। আব্রার করেনি।"

মৌসুমি আর নীরা দুজনেই চুপ করে শুনছে। মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "আমি আপনাকে খুব ভালো মতো চিনি, আপু।"
— "আপনার সম্পর্কে এমন কোনো কথা নেই যা আমি জানি না।"

নীরা এবার অবাক চোখে তাকাল। মুনিয়া বলেই চলল,
— "আপনার বিয়ের পর কয়েক বছর আব্রার নিজেকে সামলে রাখতে পেরেছিল।"
— "কিন্তু পরে ওর অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে।"
— "প্যানিক অ্যাটাক হতো।"
— "হঠাৎ হঠাৎ ট্রমাটাইজড হয়ে পড়ত।"
— "রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারত না।"
— "নিজেকে গুটিয়ে ফেলত।"

মুনিয়ার কণ্ঠে তখন কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একরাশ ক্লান্তি।
— "প্রফেশনাল হেল্পের জন্যই আব্রার আমার কাছে আসে।"
— "প্রথম প্রথম কিছুই বলতে চাইত না।"
— "চুপচাপ বসে থাকত।"
— "কখনো কখনো পুরো সেশন পার হয়ে যেত একটা কথাও না বলে।"
— "কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের মনের দরজা খুলতে শুরু করে।"

মুনিয়া একবার নীরার দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
— "আর সেই মনের ভেতরে শুধু একজন মানুষই ছিল।"
— "আপনি।"

নীরা অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল। মুনিয়া আবার বলল,
— "ওর ভালো লাগা, খারাপ লাগা, রাগ, অভিমান, স্মৃতি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আপনি।"
— "যখন বলত নীরা বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালোবাসে..."
— "নীরা বৃষ্টির দিনে চা খেতে ভালোবাসে..."
— "নীরা রাগ করলে কী করত..."
— "নীরা হাসলে কেমন লাগত..."

তখন আব্রারের চোখ অন্যরকম হয়ে যেত। মনে হতো সে আর আমার সামনে নেই। সে যেন ফিরে গেছে বহু বছর আগের কোনো সময়ে। মৌসুমি নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মুনিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আপনাদের প্রেমের গল্প আমি পুরো জানি, আপু।"
— "বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় প্রতিটা মুহূর্ত।"
— "ক্যাম্পাসে প্রথম দেখা থেকে শুরু করে শেষ বিচ্ছেদ পর্যন্ত।"
— "সব।"

নীরা এবার সত্যিই হতবাক হয়ে গেল। মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "কারণ তখন আমি ওর থেরাপিস্ট ছিলাম।"
— "ওকে সাহায্য করার জন্য এসব জানা আমার প্রয়োজন ছিল।"
— "আমি যত গভীরে গেছি, তত বুঝেছি আব্রার কোনো স্মৃতি ভুলে যায়নি।"
— "সে শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল।"

ড্রয়িংরুমে নীরবতা নেমে এলো। মুনিয়ার চোখে তখন জল চিকচিক করছে। তবুও সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— "আর হয়তো সেই সময়টাতেই আমি ভুলটা করেছি।"
— "একজন রোগীকে বুঝতে বুঝতে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।"

কথাটা বলেই মুনিয়া চুপ হয়ে গেল। আর নীরা ও মৌসুমি নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

মুনিয়া আবার ধীরে ধীরে কথা বলা শুরু করল। তার কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা নেই। বরং একটা ক্লান্ত স্বীকারোক্তির সুর।
— "তারপর আস্তে আস্তে আমি আব্রারের থেরাপি শুরু করি।"
— "প্রয়োজন অনুযায়ী মেডিসিন, কাউন্সেলিং, বিভিন্ন থেরাপিউটিক টেকনিক—সবকিছু ব্যবহার করতাম।"
— "ওর মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতাম।"
— "নিজের ভেতরের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাতাম।"

মুনিয়া একটু থামল। তারপর বলল,
— "আব্রার আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করল।"

নীরা মাথা নিচু করে বসে আছে। তার চোখ দুটো তখন জলে ভরে উঠেছে। সে কোনো কথা বলছে না। শুধু মনে মনে ভাবছে— তার চলে যাওয়া একজন মানুষকে এতটা ভেঙে দিয়েছিল? সে কখনো জানতই না। মুনিয়া আবার বলল,
— "আব্রার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের সেশন চলত।"
— "তবে আগের মতো না।"
— "হয়তো মাসে একবার।"
— "কখনো দুবার।"
— "মূলত ফলো-আপ সেশন।"
— "ওর মানসিক অবস্থা ঠিক আছে কি না, সেটা দেখার জন্য।"

মৌসুমি চুপচাপ শুনছে। মুনিয়া হালকা হেসে বলল,
— "সেই সময়টায় আমাদের মধ্যে একটা ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।"
— "রোগী আর ডাক্তার সম্পর্কের বাইরেও আমরা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুরু করি।"
— "ওর কাজের কথা, জীবনের কথা..."
— "অনেক কিছুই শেয়ার করত।"
— "আর মাসে যে এক-দুইটা সেশন হতো, সেগুলোর জন্য আমি মাঝে মাঝে ওদের বাসায়ও যেতে শুরু করি।"
— "এভাবেই আন্টির সাথেও আমার খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়।"

মুনিয়ার মুখে তখন একটা বিষণ্ণ হাসি।
— "আন্টি আমাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখতেন।"
— "আমিও তাদের পরিবারের একজন হয়ে গিয়েছিলাম ধীরে ধীরে।"

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনে হলো পরের কথাগুলো বলা তার জন্য কঠিন। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "কিন্তু একটা জিনিস আমি কখনো পাইনি।"

নীরা আর মৌসুমি দুজনেই তার দিকে তাকাল। মুনিয়া মৃদু স্বরে বলল,
— "আব্রার কখনো আমাকে ভালোবাসার চোখে দেখেছে বলে আমার মনে হয়নি।"

কথাটা বলার সময় তার গলাটা কেঁপে উঠল। তবুও সে নিজেকে সামলে নিল।
— "সম্মান করত।"
— "বিশ্বাস করত।"
— "আমার যত্ন নিত।"
— "কিন্তু ভালোবাসা..."

মুনিয়া মৃদু হাসল। সেই হাসির ভেতরে লুকিয়ে ছিল অনেকটা কষ্ট।
— "ভালোবাসাটা ছিল শুধু আমার দিক থেকে।"
— "আমি নিজেই আব্রারকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।"

ড্রয়িংরুম আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নীরা মাথা নিচু করে বসে রইল। তার চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। আর মুনিয়া দূরে কোথাও তাকিয়ে নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যটা উচ্চারণ করল—
— "হয়তো একজন মানুষকে খুব কাছ থেকে বুঝতে গিয়েই আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।"

মুনিয়া আবার কথা বলা শুরু করল। তার চোখ দুটো তখনও শান্ত, কিন্তু কণ্ঠের ভেতর চাপা কষ্ট স্পষ্ট।
— "আমি নিজেই আগে বাড়িয়ে আমার বাসায় আব্রারের কথা জানাই।"
— "কারণ আমি আব্রারকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম।"
— "খুব বেশি।"

মুনিয়া মৃদু হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দের কোনো ছাপ ছিল না।
— "জানেন আপু, আপনার প্রতি আব্রারের ভালোবাসা দেখে আমার মনে হতো..."

সে কিছুক্ষণ থামল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "যে মানুষ এত সুন্দর করে কাউকে ভালোবাসতে পারে, সে একদিন না একদিন আমাকেও হয়তো একইভাবে ভালোবাসবে।"

নীরা চুপ করে শুনছে। মৌসুমিও কোনো কথা বলছে না।
মুনিয়া আবার বলতে লাগল,
— "তারপর একদিন আমি আমার পরিবারকে সব বলি।"
— "ওনারা আব্রার সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।"
— "সবকিছু জানার পর এক বিকেলে আমরা সবাই মিলে আব্রারদের বাসায় যাই।"
— "বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।"

মুনিয়ার চোখে তখন সেই দিনের স্মৃতি ভেসে উঠল।
— "সেদিন আব্রারও খুব অবাক হয়ে গিয়েছিল।"
— "আমার এমন কাণ্ডের জন্য হয়তো প্রস্তুত ছিল না।"
— "আমি স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলাম।"
— "ওর মুখে বিস্ময় ছিল।"
— "ও যেন বুঝতেই পারছিল না কীভাবে পরিস্থিতিটা সামলাবে।"

মুনিয়া একটু থামল। তারপর বলল,
— "এরপর আন্টি আব্রারকে ভেতরের রুমে নিয়ে যান।"
— "অনেকক্ষণ দুজন কথা বলেন।"
— "কী কথা হয়েছিল আমি জানি না।"
— "আজও জানি না।"
— "কিন্তু কিছুক্ষণ পর আব্রার ফিরে আসে।"
— "আর চুপচাপ বিয়েতে রাজি হয়ে যায়।"

ড্রয়িংরুমে নীরবতা নেমে এলো। মুনিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "সেদিনই আমাদের রিং সেরিমনি হয়।"

কথাটা বলেই সে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলল। মনে হলো বুকের ভেতরে জমে থাকা ভারী কষ্টটা বের করে দিতে চাইছে।
— "তবে আজ এত মাস পর দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়..."
— "হয়তো আন্টি সেদিন আব্রারকে বুঝিয়েছিলেন।"
— "হয়তো বলেছিলেন আর কতদিন একা থাকবে?"
— "হয়তো একজন মা হিসেবে ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছিলেন।"
— "আর সেই চিন্তা থেকেই আব্রার বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিল।"

মুনিয়ার গলাটা এবার একটু ভারী হয়ে এলো। সে ধীরে ধীরে বলল,
— "কারণ এখন ফিরে তাকালে আমি বুঝি..."
— "রাজি হওয়া আর ভালোবেসে রাজি হওয়া এক জিনিস নয়।"
— "আব্রার বিয়েতে রাজি হয়েছিল।"
— "কিন্তু কোনোদিন আমাকে ভালোবেসেছিল কি না..."

মুনিয়া কথাটা শেষ করল না। তার চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। আর নীরা মাথা নিচু করে বসে রইল। ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। মুনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আবার ধীরে ধীরে কথা বলা শুরু করল।
— "আমাদের এনগেজমেন্টের পরও আব্রার আমার সাথে আগের মতোই আচরণ করত।"
— "একদম বন্ধুসুলভ।"
— "ওর ব্যবহারে কোনো খারাপ কিছু ছিল না।"
— "বরং খুব ভদ্র ছিল।"
— "আমার খোঁজ নিত।"
— "সম্মান করত।"
— "প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়াত।"

মুনিয়া মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
— "কিন্তু ভালোবাসত না।"

ড্রয়িংরুমে আবার নীরবতা নেমে এলো। মুনিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারি আমি কোনোদিনও আপনার জায়গা আব্রারের মনে নিতে পারব না।"

নীরার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। মুনিয়া বলেই চলল,
— "প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো।"
— "খুব।"
— "তারপর আমি নিজেকেই বুঝ দিই।"
— "ভাবি আব্রার আমাকে ভালো না বাসলেও সমস্যা নেই।"
— "আমি ওকে সারাজীবন ভালোবেসে যাব।"

মুনিয়ার ঠোঁটে ফিকে একটা হাসি ফুটল।
— "আব্রার আমাকে সম্মান করত।"
— "আমার খেয়াল রাখত।"
— "কিন্তু আমার কাছে সবসময় মনে হতো ও যেন সবকিছু জোর করে করছে।"
— "মনের টান থেকে না।"
— "হয়তো দায়িত্ববোধ থেকে।"
— "হয়তো অপরাধবোধ থেকে।"
— "হয়তো আমাকে কষ্ট দিতে চায় না বলেই।"

কথাগুলো বলতে বলতে মুনিয়া নিজের ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। ফোন আনলক করে একটা স্ক্রিন দেখাল। তারপর ফোনটা নীরা আর মৌসুমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— "দেখুন।"

নীরা আর মৌসুমি ফোনের দিকে তাকাল। মুনিয়া মৃদু হেসে বলল,
— "আমি আব্রারের নাম আমার ফোনে সেভ করেছি— My Forever ❤️"

কথাটা বলেই সে কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
— "আর একইভাবে জোর করে ওর ফোনেও আমার নাম এই নামেই সেভ করিয়ে দিয়েছিলাম।"

মৌসুমির মুখটা ভারী হয়ে গেল। মুনিয়া ফোনটা নিজের হাতে ফিরিয়ে নিল। স্ক্রিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
— "আসলে এতদিন আমি ওকে জোর করেই এই সম্পর্কের মধ্যে বেঁধে রেখেছিলাম।"
— "নিজেকে বোঝাতাম সব ঠিক আছে।"
— "সময় গেলে আব্রার আমাকে ভালোবেসে ফেলবে।"
— "একদিন না একদিন ওর হৃদয়ে আমার জন্যও জায়গা হবে।"

তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। চোখের কোণে জল জমে উঠেছে।
— "কিন্তু সত্যিটা হলো..."
— "ও মন থেকে আমার জন্য এসব কিছুই করত না।"
— "ও শুধু চেষ্টা করত একজন ভালো মানুষ হতে।"
— "আর আমি সেই চেষ্টাটাকেই ভালোবাসা ভেবে ভুল করেছিলাম।"

কথাটা বলে মুনিয়া চুপ হয়ে গেল। নীরা মাথা নিচু করে বসে রইল। আর মৌসুমি নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘরজুড়ে তখন শুধু ভারী নীরবতা।

মুনিয়া আবার ধীরে ধীরে কথা বলা শুরু করল।
— "আপনার কেসটা আব্রারের হাতে আসার পর থেকেই আমি সব জানতাম।"
— "প্রথম শুনানির পরই আব্রার আমাকে আপনার কেসের কথা বলেছিল।"
— "ও আমার কাছ থেকে কিছু লুকাতে চায়নি।"
— "বরং নিজেই সব খুলে বলেছিল।"

মুনিয়া কিছুক্ষণ থামল। তারপর বলল,
— "আমি বিষয়টা খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম।"
— "কারণ আপনি ওর অতীত।"
— "একজন আইনজীবীর কাছে তার পুরোনো পরিচিত মানুষের কেস আসতেই পারে।"
— "তাই আমি তখন কোনো সমস্যা করিনি।"

নীরা চুপচাপ বসে শুনছে। মুনিয়া আবার বলল,
— "আমি আব্রারকে একটা প্রশ্ন করেছিলাম।"
— "জিজ্ঞেস করেছিলাম— নীরার আবার তোমার জীবনে ফিরে আসা কি তোমার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছে?"

মৌসুমি নিঃশব্দে মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মুনিয়া মৃদু হেসে বলল,
— "আব্রার উত্তর দিয়েছিল— না।"
— "কোনো প্রভাব ফেলেনি।"

কথাটা বলে মুনিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "কিন্তু আমি তো ওকে বহু বছর ধরে চিনি।"
— "ওর মুখের ভাষার চেয়ে ওর চোখের ভাষা বেশি পড়তে পারি।"
— "আর বহু বছর পর আমি আবার সেই একই ঝিলিক দেখতে পেলাম।"
— "যে ঝিলিক শুধু একটা নাম শুনলেই ওর চোখে আসত।"

মুনিয়ার দৃষ্টি এবার গিয়ে থামল নীরার মুখে।
— "নীরা।"

নীরা মাথা নিচু করে ফেলল। তার আঙুলগুলো একসাথে শক্ত করে জড়িয়ে আছে। মুনিয়া শান্ত গলায় বলল,
— "আপনার নাম শুনলেই আব্রারের চোখে একটা আলাদা আলো চলে আসত।"
— "আমি সেই আলো বহু বছর আগে দেখেছি।"
— "আর ভেবেছিলাম সময়ের সাথে সেটা নিভে গেছে।"
— "কিন্তু সেটা নিভেনি।"
— "শুধু চাপা পড়েছিল।"

ড্রয়িংরুমে নীরবতা নেমে এলো। মুনিয়া আবার বলল,
— "তবে এবার শুধু একজন না।"
— "আরও দুজন সেই ঝিলিকের কারণ হয়ে উঠেছে।"

মৌসুমি ধীরে ধীরে বলল,
— "কে?"

মুনিয়া উত্তর দিল,
— "সাফা আর মারওয়া।"

কথাটা বলেই তার ঠোঁটে ফিকে একটা হাসি ফুটল।
— "ওদের কথা বললেও আমি আব্রারের চোখে সেই একই আলো দেখি।"
— "যে আলো আমি আগে শুধু নীরার নাম শুনলেই দেখতাম।"
— "ওদের স্কুলের গল্প বলত।"
— "ওরা কী বলেছে, কী করেছে, কীভাবে হেসেছে— এসব বলতে বলতে ওর মুখ বদলে যেত।"
— "মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের কথা বলছে।"

মুনিয়া নিচের দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "সেদিনই প্রথম আমার মনে হয়েছিল..."
— "হয়তো আমি এমন একজন মানুষের হাত ধরে ভবিষ্যৎ গড়তে যাচ্ছি যার হৃদয়টা আজও অন্য কোথাও পড়ে আছে।"

কথাটা বলে মুনিয়া চুপ হয়ে গেল। আর নীরা নিঃশব্দে বসে রইল। তার চোখের কোণে জমে থাকা জল এবার আর লুকিয়ে রাখা গেল না।

মুনিয়া হালকা করে হাসল। তবে সেই হাসির ভেতর লুকিয়ে ছিল গভীর এক কষ্ট। সে কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— "জানেন আপু, এতদিন আমি একটা ভুল ধারণা নিয়ে বেঁচে ছিলাম।"
— "আমি ভাবতাম আমি আব্রারকে ওর অতীত থেকে বের করে এনেছি।"
— "আমি ওকে সুস্থ করে তুলেছি।"
— "আমি ওকে নতুন জীবন দিয়েছি।"

মুনিয়া মাথা নাড়ল।
— "কিন্তু এখন বুঝি এসব কথা আসলে মিথ্যা।"

নীরা নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুনিয়া শান্ত গলায় বলল,
— "আমি শুধু আব্রারকে একটা জীবন্ত লাশ হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।"

কথাটা শুনে নীরার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
মৌসুমিও চুপ করে গেল। মুনিয়া আবার বলল,
— "হ্যাঁ, ও বেঁচে ছিল।"
— "কাজ করত।"
— "হাসত।"
— "কথা বলত।"
— "মানুষের সাথে মিশত।"
— "কিন্তু ভেতর থেকে ও বাঁচত না।"
— "শুধু দিন পার করত।"

মুনিয়া এবার সরাসরি নীরার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো ভিজে উঠেছে।
— "কিন্তু আপনার আর সাফা-মারওয়ার আগমন..."

সে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলল।
— "ওর শরীরে যেন আবার রুহ ফুঁকে দেওয়ার মতো কাজ করেছে।"

ড্রয়িংরুমে কেউ কোনো কথা বলল না। মুনিয়া নিজের চোখের জল মুছে আবার বলল,
— "আমি আগে কখনো আব্রারকে এভাবে হাসতে দেখিনি।"
— "কখনো না।"
— "এত বছর ধরে ওর পাশে থেকেও না।"
— "আমি জানতামই না আব্রার রহমান দাঁত বের করে হাসতে পারে।"

কথাটা বলে সে ফিকে করে হাসল।
— "সেদিন ছাদে দাঁড়িয়ে আমি দেখছিলাম।"
— "সাফা আর মারওয়ার সাথে ও যেভাবে খেলছিল..."
— "যেভাবে হেসেছিল..."
— "যেভাবে আপনাদের দিকে তাকাচ্ছিল..."

মুনিয়া কিছুক্ষণ থেমে গেল। গলাটা ভারী হয়ে এসেছে।
— "সেদিন প্রথমবার আমি একজন সুখী আব্রার রহমানকে দেখেছি।"
— "একজন মানুষকে দেখেছি যে সত্যি সত্যি বেঁচে আছে।"

নীরার চোখ বেয়ে এবার নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ল।
আর মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "সেদিনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম..."
— "আব্রারকে আমি কখনো পাইনি।"
— "আমি শুধু ওর পাশে ছিলাম।"
— "কিন্তু ওর হৃদয়..."

মুনিয়া নীরার দিকে তাকাল।
— "সেটা কোনোদিনই আমার ছিল না।"

মুনিয়ার শেষ কথাগুলো শোনার পর নীরা স্পষ্টই একটু ইতস্তত বোধ করল। তার আঙুলগুলো অস্থিরভাবে একে অপরের সাথে জড়িয়ে গেল। মুখে অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। কারণ একটা বিষয় সে এতক্ষণ জানতই না। সে জানত না সেদিন মুনিয়া ছাদে উপস্থিত ছিল। জানত না মুনিয়া লুকিয়ে লুকিয়ে সবকিছু দেখেছিল। নীরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে বলল,
— "আপনি... ছাদে ছিলেন?"

মুনিয়া মৃদু মাথা নাড়ল।
— "হ্যাঁ।"
মৌসুমিও অবাক হয়ে তাকাল। নীরার চোখে বিস্ময় আরও গাঢ় হলো।
— "কিন্তু আমি তো আপনাকে দেখিনি।"

মুনিয়া ফিকে হেসে বলল,
— "দেখবেন কীভাবে?"
— "আমি নিজেকে আড়াল করেই রেখেছিলাম।"
— "প্রথমে নিচে দাঁড়িয়ে ছিলাম।"
— "তারপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠি।"
— "কিন্তু ছাদে গিয়ে নিজেকে আর সামনে আনতে পারিনি।"

মুনিয়া কিছুক্ষণ থামল। সেই দিনের কথা মনে পড়তেই তার চোখে আবার কষ্টের ছায়া নেমে এলো।
— "দরজার আড়াল থেকে সব দেখেছিলাম।"

নীরা মাথা নিচু করে ফেলল। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। মুনিয়া আবার বলল,
— "আপনাদের হাসি দেখেছি।"
— "সাফা-মারওয়ার আনন্দ দেখেছি।"
— "আব্রারের মুখের সেই হাসিটাও দেখেছি।"
— "আর দেখেছি ওর চোখ।"

ড্রয়িংরুমে আবার নীরবতা নেমে এলো। মুনিয়া নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
— "সত্যি বলতে, সেদিন আমি আব্রারকে দেখতে যাইনি।"
— "আমি গিয়েছিলাম আমার হবু স্বামীকে খুঁজতে।"
— "কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম..."

কথাটা শেষ করতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠল।
— "ও অন্য এক জীবনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে।"

নীরা নিঃশব্দে চোখ মুছে নিল। তার ভেতরে অপরাধবোধ, অস্বস্তি আর কষ্ট একসাথে জমতে লাগল। কারণ সে কল্পনাও করেনি— সেদিনের সেই মুহূর্তগুলোর একজন নীরব সাক্ষী ছিল মুনিয়া।

মুনিয়া নিজের চোখের কোণে জমে থাকা জলটা মুছে নিল। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে নীরার দিকে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত।
— "নীরা আপু, আপনাকে এত কথা বলার একটাই কারণ।"

নীরা নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইল। মৌসুমিও চুপচাপ বসে আছে। মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "আজ আমি আব্রারের সাথে দেখা করব।"
— "আর আমাদের বিয়েটা অফিসিয়ালি ক্যানসেল করে দেব।"

কথাটা শুনে নীরা মাথা তুলে তাকাল। কিন্তু কিছু বলল না। মুনিয়া আবার বলল,
— "শুধু বিয়ে না।"
— "আজকের পর থেকে আমার আর আব্রারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও থাকবে না।"

মৌসুমি অবাক হয়ে বলল,
— "কেন?"

মুনিয়া ফিকে করে হাসল।nসেই হাসিতে ছিল গভীর এক বিষাদ।
— "কারণ ভালোবাসার মানুষকে কখনো আবার বন্ধু বানানো যায় না।"
— "কমপক্ষে আমি পারব না।"
— "প্রতিদিন ওকে দেখে, ওর সাথে কথা বলে, জেনে যে ও অন্য কাউকে ভালোবাসে..."
— "সেভাবে বাঁচার মতো শক্তি আমার নেই।"

ড্রয়িংরুমে আবার নীরবতা নেমে এলো। মুনিয়া এবার সরাসরি নীরার চোখে চোখ রাখল।
— "আমি আপনাকে আজ এসব বললাম কারণ আজ বা কাল আপনি জেনে যাবেন যে আমার আর আব্রারের বিয়ে ভেঙে গেছে।"
— "আর আমি চাই না তখন আপনি নিজেকে দোষী ভাবুন।"

নীরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মুনিয়া শান্ত গলায় বলল,
— "এই সিদ্ধান্ত আমার।"
— "শুধু আমার।"
— "এখানে আপনার কোনো দোষ নেই।"
— "কোনো অপরাধ নেই।"

তারপর একটু থেমে আবার বলল,
— "আর একটা কারণ আছে।"

নীরা অজান্তেই শক্ত হয়ে বসল। মুনিয়া ধীরে ধীরে বলল,
— "যদি কোনোদিন আব্রার আপনার কাছে আসে..."
— "যদি আপনার পাশে দাঁড়াতে চায়..."
— "যদি আবার আপনার জীবনের অংশ হতে চায়..."

মুনিয়ার গলা কেঁপে উঠল। তবুও সে কথাগুলো শেষ করল।
— "তাহলে দয়া করে শুধু আমার জন্য তাকে দূরে ঠেলে দেবেন না।"

নীরার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ল। মুনিয়া বলল,
— "আমি আপনাদের এক করতে আসিনি।"
— "সেই অধিকার আমার নেই।"
— "আপনারা এক হবেন নাকি হবেন না, সেই সিদ্ধান্তও আমার না।"
— "কিন্তু আমি অন্তত চাই না আমার অস্তিত্ব আপনাদের মাঝখানে একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকুক।"

মুনিয়া গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল। তারপর খুব আস্তে বলল,
— "আমি আব্রারকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম, আপু।"
— "তাই আজ ওকে মুক্তি দিতে এসেছি।"

কথাটা বলেই মুনিয়া চুপ হয়ে গেল। আর নীরা, মৌসুমি—দুজনেই নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরজুড়ে তখন শুধু নীরবতা আর অদৃশ্য এক বেদনার ভার ছড়িয়ে আছে।

নীরা এবার নিজেকে সামলে নিল। চোখের কোণের জল মুছে সোজা হয়ে বসল। তার কণ্ঠস্বর শান্ত, কিন্তু দৃঢ়।
মুনিয়া বুঝতে পারল এবার নীরা নিজের মনের কথা বলবে। নীরা ধীরে ধীরে বলল,
— "মুনিয়া, তুমি যেহেতু আমাকে আপু বলে ডেকেছ, তাহলে আমিও তোমার সাথে ছোট বোন হিসেবেই কথা বলি।"

মুনিয়া চুপচাপ মাথা নাড়ল। নীরা আবার বলল,
— "তুমি নিশ্চয়ই আব্রারের কাছ থেকে আমাদের অতীতের কথা শুনেছ।"
— "আর আমার বর্তমান অবস্থার কথাও জানো।"
— "আমি এখন নিজের ডিভোর্স কেস লড়ছি।"
— "আমি দুই বাচ্চার মা।"
— "আর জীবনে আমি অনেক বড় একটা হোঁচট খেয়েছি।"

নীরা কিছুক্ষণ থামল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
— "আমার মনে আব্রারের জন্য এখন আর কোনো জায়গা নেই।"

কথাটা শুনে মুনিয়া স্থির হয়ে গেল। নীরা দৃঢ় স্বরে বলল,
— "ও চাইলে আমি ওকে আবার আপন করে নেব— এমন কিছু না।"
— "আমি শুরু থেকেই আব্রারকে একটা কথাই বলে আসছি।"
— "আমরা শুধু লয়ার আর ক্লায়েন্ট।"
— "এই কেস শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমাদের যোগাযোগও সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে।"

মৌসুমি চুপ করে দুজনের কথা শুনছে। নীরা এবার দূরে কোথাও তাকিয়ে বলল,
— "যেদিন আমি সাজ্জাদকে বিয়ে করে ওর সংসারে পা রেখেছিলাম..."
— "সেদিনই আমি আব্রারকে আমার জীবন থেকে মুছে দিয়েছিলাম।"

ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নীরা ধীরে ধীরে বলল,
— "আমি নতুন করে আমার জীবনে আর কাউকে জড়াতে চাই না।"
— "সে যে-ই হোক না কেন।"
— "আব্রার হলেও না।"

মুনিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। নীরা বলেই চলল,
— "আমার জীবনের এখন একটাই লক্ষ্য।"
— "সাফা আর মারওয়া।"
— "আমি বাকি জীবন আমার মেয়েদের নিয়ে শান্তিতে কাটাতে চাই।"
— "এটুকুই।"

তারপর নীরা মুনিয়ার দিকে তাকাল।
— "আর তুমি যদি সত্যিই আমাদের অতীতটা জেনে থাকো..."
— "তাহলে এটাও জানার কথা।"

মুনিয়া নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইল। নীরা ধীরে ধীরে বলল,
— "বিয়ের আগে আমি নিজে আব্রারের কাছে গিয়েছিলাম।"
— "আমি ওর কাছে এসেছিলাম।"
— "কিন্তু ও আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।"

কথাগুলো বলার সময় নীরার চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না। শুধু দীর্ঘদিনের জমে থাকা কষ্টের ছাপ।
— "সেই দিনের পর আমি আর পেছনে তাকাইনি।"
— "তাই আজ এত বছর পর যদি আব্রার আবার আমার হাত ধরতে আসে..."

নীরা মাথা নাড়ল। তার কণ্ঠস্বর এবার আরও দৃঢ় হয়ে উঠল।
— "তবুও আমি ওকে সায় দেব না।"
— "কোনোভাবেই না।"

কথাটা বলে নীরা চুপ হয়ে গেল। ঘরের ভেতর ভারী নীরবতা নেমে এলো। মুনিয়া নীরার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আর মৌসুমি বুঝতে পারল—নীরার কণ্ঠ যতই শক্ত শোনাক, সেই শক্ত কথাগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে বহু বছরের না-বলা ব্যথা।

মুনিয়া কিছুক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
— "আপু, আপনি হয়তো এখনও পুরো অতীতটা জানেন না।"
— "তাই হয়তো আব্রারের উপর আপনার অভিমান এখনও এতটা গভীর।"

নীরা ভ্রু কুঁচকে ফেলল। তার মুখে বিস্ময় আর অস্বস্তি একসাথে ফুটে উঠল।
— "কেমন অতীত?"

মুনিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মাথা নাড়ল।
— "সেটা বলার অধিকার আমার নেই।"
— "আমি চাইলে আজ সব বলতে পারতাম।"
— "কিন্তু সেটা আমার জায়গা না।"
— "হয়তো আব্রার একদিন নিজেই বলবে।"
— "অথবা অন্য কেউ।"
— "কিন্তু আমার মুখে সেই কথা শোভা পায় না।"

নীরা গভীরভাবে মুনিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মুনিয়া এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when ফাহমিনা আফরোজ প্রমি posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share