03/09/2026
তিনি ছিলেন আফরা বিনতে উবাইদ বিন সালাবা!
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহীয়সী নারী রয়েছেন, যাঁরা যুগান্তকারী বীর সন্তান জন্ম দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন। তাঁদেরই একজন হলেন মদিনার খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখার (রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর মাতুল বংশ) প্রখ্যাত সাহাবিয়া হজরত আফরা বিনতে উবাইদ বিন সালাবা (রা.)।
তাঁর আত্মত্যাগ ও বীরত্ব এতটাই সুমহান ছিল যে, ইতিহাসে তাঁর সাত বীর সন্তান বাবার বদলে মায়ের পরিচয়ে ‘বনু আফরা’ (আফরার সন্তান) হিসেবে অনন্য মর্যাদা লাভ করেন।
তিনি ছিলেন মদিনায় প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারী ও বাইয়াতকারী নারীদের অন্যতম। দুই স্বামীর সংসারে তাঁর গর্ভে জন্ম নেন সাতজন জানবাজ মুজাহিদ, যাঁদের প্রত্যেকেই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন:
✅ হারিস বিন রিফায়ার ঔরসে: মুআয, মুআউয়িয এবং আউফ (রা.)।
✅ বুকাইর বিন আবদ ইয়ালাইলের ঔরসে: আকিল, খালেদ, ইয়াস এবং আমের (রা.)।
হজরত মুআবিয়া (রা.) বুকাইরের এই চার পুত্র সম্পর্কে গর্ব করে বলতেন, "তাঁরা ছাড়া আর কোনো চার ভাই একসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।"
বদর যুদ্ধে কুফরের সর্দার আবু জাহলকে ধরাশায়ী করার বিরল কৃতিত্ব লাভ করেন আফরার দুই তরুণ সন্তান মুআয ও মুআউয়িয। যুদ্ধ শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের শাহাদাতস্থলে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “আল্লাহ আফরার দুই ছেলের ওপর রহম করুন, তারা এই উম্মতের ফেরাউন ও কুফরের সর্দারকে হত্যার ক্ষেত্রে অংশীদার।”
বদরের যুদ্ধে মুআয, মুআউয়িয ও আকিল (রা.) শহীদ হওয়ার পর হজরত আফরা (রা.)-এর ঈমানি দৃঢ়তার এক অভাবনীয় দৃশ্য ফুটে ওঠে। সন্তানদের মৃত্যুতে শোকাহত না হয়ে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ছুটে এসে আকুল হয়ে জানতে চান, “হে আল্লাহর রাসুল! আমার সন্তানদের মধ্যে নিকৃষ্টতম জন কি এখনো বেঁচে আছে?”
অর্থাৎ, তাঁর যে সন্তান শাহাদাতের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুনিয়ায় রয়ে গেছে, তিনি তাকেই ‘নিকৃষ্ট’ ভাবছিলেন! রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে আশ্বস্ত করলে তাঁর হৃদয় প্রশান্ত হয়। শহীদদের এই মহীয়সী মাকে সান্ত্বনা দিতে উম্মুল মুমিনিন হজরত সাওদা বিনতে জামআ (রা.) স্বয়ং তাঁর বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন।
মা আফরা (রা.)-এর হাতে গড়া এই বীর সন্তানেরা ইসলামের বিভিন্ন যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।
বদর যুদ্ধ: মুআয, মুআউয়িয ও আকিল (রা.)।
রজি-এর ঘটনা: খালেদ (রা.)।
বিরে মাউনার ঘটনা: আমের (রা.)।
ইয়ামামার যুদ্ধ: ইয়াস (রা.)।
একমাত্র আউফ (রা.) জীবিত ছিলেন, যাঁর মাধ্যমে এই মহীয়সী মায়ের বংশধারা অব্যাহত থাকে।
ইসলামের সুরক্ষায় নিজের নাড়িছেঁড়া ধনদের হাসিমুখে উৎসর্গ করে হজরত আফরা (রা.) আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
(আহমাদ খলিল জাময়াহ,নিসাউন মিন আসরিন নুবুয়াহ : ১/২৭৩-২৭৮, ইবনুল জাওযী,সিফাতুস সাফওয়াহ: ১/৩৪১, আল ওয়াকিদি,কিতাবুল মাগাজী : ১/১০৯)