07/10/2026
👻 আকা মান্তো — ৪র্থ পর্ব 🩸
আয়নার ভেতরের মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল।
আর আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিলা—
হঠাৎ আমার হাত ছেড়ে দিল।
আমি কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারলাম না।
"নাবিলা?"
সে কোনো উত্তর দিল না।
আমি তার দিকে তাকালাম।
তার চোখ স্থির।
একদম স্থির।
যেন সে আমার দিকে তাকিয়ে নেই।
তাকিয়ে আছে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো কিছুর দিকে। 😨
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
"নাবিলা... কী হয়েছে?"
সে এবার আমার দিকে তাকাল।
তার চোখে ভয় নেই।
বরং অদ্ভুত একটা শান্ত ভাব।
সে খুব আস্তে বলল,
"তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?"
আমি বললাম,
"অবশ্যই।"
সে একটু হাসল।
"তাহলে আমার হাত ধরো।"
আমি হাত বাড়াতে যাচ্ছিলাম।
ঠিক তখন আয়নার ভেতরের নাবিলা ফিসফিস করে বলল,
"ওর হাত ধরো না।"
আমার হাত মাঝপথে থেমে গেল।
আমি আয়নার দিকে তাকালাম।
আয়নার মেয়েটা আর হাসছে না।
তার চোখে পানি।
সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"ও আমি নই।"
আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আমি পাশে থাকা নাবিলার দিকে তাকালাম।
সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি বললাম,
"তুমি কি... সত্যি নাবিলা?"
সে মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
আয়নার ভেতরের মেয়েটা চিৎকার করে উঠল,
"মিথ্যা!"
😱
হঠাৎ ঘরের সব আলো নিভে গেল।
তিশা চিৎকার করে উঠল,
"ভাইয়া!"
আমি অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে নাবিলাকে খুঁজতে লাগলাম।
"নাবিলা!"
কেউ আমার হাত ধরল।
আমি শক্ত করে সেই হাত ধরে ফেললাম।
"আমি আছি।"
নাবিলার গলা।
কিন্তু ঠিক একই সময়ে—
আয়নার ভেতর থেকেও আরেকটা কণ্ঠ শোনা গেল।
"আমি এখানেও আছি।"
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। 🥶
দুটো নাবিলা।
একজন আমার পাশে।
আরেকজন আয়নার ভেতরে।
তিশা কাঁপতে কাঁপতে বলল,
"ভাইয়া... আলো জ্বালান।"
আমি মোবাইল বের করলাম।
স্ক্রিনে আলো জ্বালতেই দেখলাম—
আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিলার মুখ স্বাভাবিক।
কিন্তু আয়নার ভেতরের নাবিলার মুখ বদলে গেছে।
তার মুখের একপাশ কালো।
চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়।
আর ঠোঁটের কোণে সেই একই হাসি। 👁️
সে আমাকে দেখে বলল,
"তুমি ভুল মানুষকে ধরে আছো।"
আমি মোবাইলের আলো আয়নার ওপর ফেললাম।
হঠাৎ আয়নার ভেতরের মেয়েটা হাত বাড়িয়ে দিল।
কাচের ভেতর থেকে তার হাত বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
আমি পেছনে সরে গেলাম।
তিশা চিৎকার করে বলল,
"দৌড়ান!"
আমরা দরজার দিকে ছুটলাম।
কিন্তু দরজা বন্ধ।
আমি হাতল ঘুরালাম।
খুলল না।
পেছন থেকে কাচে—
টক্... টক্... টক্...
শব্দ।
আয়নার ভেতরের নাবিলা ধীরে ধীরে কাচের ওপর হাত রাখল।
তারপর বলল,
"একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।"
আমি চুপ।
"শুধু একটা।"
তিশা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"ভাইয়া, উত্তর দেবেন না।"
মেয়েটা হাসল।
"তোমার স্ত্রী কে?"
আমি কিছু বললাম না।
সে আবার প্রশ্ন করল,
"তোমার স্ত্রী কে?"
আমি এবারও চুপ।
হঠাৎ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিলা আমার হাত টেনে বলল,
"আমার দিকে তাকিও না।"
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
"কেন?"
সে বলল,
"কারণ ও চায় তুমি আমার মুখ দেখো।"
আমি বুঝতে পারলাম না।
"কী বলছো?"
নাবিলা ফিসফিস করে বলল,
"ও আমার মুখ নকল করেছে।"
আয়নার ভেতরের মেয়েটা তখন হেসে উঠল।
"অবশেষে বললে।"
আমি নাবিলার দিকে তাকালাম।
"তুমি কীভাবে জানো?"
সে উত্তর দিল না।
"নাবিলা?"
সে শুধু বলল,
"আমার একটা কথা মনে পড়েছে।"
"কী?"
"জাপানে যাওয়ার আগের একটা ঘটনা।"
আমি চুপ করে শুনতে লাগলাম।
"তখন আমি আর ইউকি একই স্কুলে পড়তাম।"
"হুম।"
"একদিন স্কুলের বাথরুমের আয়নায় আমি একটা মেয়েকে দেখেছিলাম।"
"মায়ুমি?"
নাবিলা মাথা নাড়ল।
"না।"
"তাহলে?"
"মেয়েটা আমার মতো দেখতে ছিল।"
আমার বুক কেঁপে উঠল।
"কী?"
"হ্যাঁ।"
নাবিলা বলল,
"তখন আমার বয়স ছিল ষোল। আয়নার মেয়েটাকেও ষোল বছরের মতোই লাগছিল।"
"তারপর?"
"আমি ভেবেছিলাম ও আমার প্রতিচ্ছবি।"
"কিন্তু?"
"ও আমার মতো নড়ছিল না।"
"তাহলে?"
"আমি হাত তুললে ও হাত তুলত না।"
"তারপর কী হয়েছিল?"
"আমি ভয় পেয়ে বাথরুম থেকে বের হয়ে যাই।"
"ইউকি?"
"ও বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।"
"তুমি ইউকিকে বলেছিলে?"
"হ্যাঁ।"
"ও কী বলেছিল?"
নাবিলা চোখ বন্ধ করল।
"ইউকি বলেছিল—কোনো আয়নায় নিজের মুখের দিকে বেশি সময় তাকাতে নেই।"
"কেন?"
"কারণ কিছু আয়না তোমার প্রতিচ্ছবি দেখায় না।"
😨
ঘর নিস্তব্ধ।
নাবিলা বলতে থাকল,
"এই আয়না অনেক পুরোনো।"
আমি আয়নার দিকে তাকালাম।
"এটা আগে কোথায় ছিল?"
নাবিলা উত্তর দিল,
"আমি জানি না।"
ঠিক তখন আয়নার ভেতরের মেয়েটা বলল,
"আমি জানি।"
আমরা তিনজনই তার দিকে তাকালাম।
সে বলল,
"এই আয়না স্কুলে ছিল না।"
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
"তাহলে?"
"এটা ছিল মায়ুমির বাড়িতে।"
নাবিলা কেঁপে উঠল।
"তুমি মায়ুমি নও।"
মেয়েটা হাসল।
"আমি কখনো বলিনি আমি মায়ুমি।"
"তাহলে তুমি কে?"
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"আমি সেই মেয়ে, যে মায়ুমির জায়গায় দাঁড়িয়েছিল।"
তিশা ফিসফিস করে বলল,
"মানে?"
মেয়েটা আয়নার ভেতর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
"মায়ুমি প্রথমে আমাকে দেখেছিল।"
"কোথায়?"
"আয়নায়।"
"তারপর?"
"সে ভেবেছিল আমি তার বন্ধু।"
"কিন্তু?"
"আমি তার বন্ধু ছিলাম না।"
হঠাৎ ঘরের দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।
বাইরে অন্ধকার করিডোর।
আমি তিশাকে বললাম,
"চলো।"
আমরা বেরিয়ে এলাম।
কিন্তু নাবিলা দাঁড়িয়ে রইল।
"নাবিলা!"
সে আমার দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
"আমার একটা জিনিস এখানে আছে।"
"কী?"
"মায়ুমির লাল কাপড়।"
আমি থমকে গেলাম।
"ওটা তো নেই।"
"আছে।"
"কোথায়?"
সে তৃতীয় তলার করিডোরের শেষের দিকে তাকাল।
"ওই ঘরে।"
আমরা তিনজন আবার সেই অন্ধকার ঘরের দিকে গেলাম।
ঘরের ভেতর কাঠের চেয়ারটা এখনও পড়ে আছে।
কিন্তু লাল কাপড় নেই।
তিশা বলল,
"এখানে তো কিছু নেই।"
নাবিলা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল,
"ওটা সরানো হয়েছে।"
"কে সরিয়েছে?"
সে আমার দিকে তাকাল।
"আমি।"
আমি হতভম্ব।
"তুমি?"
"হ্যাঁ।"
"কবে?"
"পাঁচ বছর আগে।"
আমার মাথা ঘুরে গেল।
"কিন্তু তুমি তো তখন জাপানে!"
নাবিলা চুপ করে রইল।
আমি আবার বললাম,
"নাবিলা, তুমি কী লুকাচ্ছো?"
সে চোখ নামিয়ে বলল,
"আমি নিজেও জানি না।"
ঠিক তখন তিশা দেয়ালের একটা অংশে হাত রাখল।
টক্।
ভেতর থেকে ফাঁপা শব্দ হলো।
সে বলল,
"ভাইয়া, এখানে কিছু আছে।"
আমি কাছে গেলাম।
দেয়ালের প্লাস্টার ভাঙা।
একটা ছোটো ফাঁক।
আমি হাত ঢুকিয়ে একটা ধাতব বাক্স বের করলাম।
বাক্সটা মরিচা ধরা।
উপরে লেখা—
M.S.
তিশা বলল,
"মায়ুমি সাটো?"
আমি বাক্সটা খুললাম।
ভেতরে পুরোনো ছবি।
একটা লাল কাপড়ের টুকরো।
আর একটা ছোটো ক্যাসেট।
ক্যাসেট প্লেয়ারের মতো কিছুই ছিল না।
কিন্তু বাক্সের নিচে একটা পুরোনো ছোটো রেকর্ডার পাওয়া গেল।
আমি সেটার ব্যাটারি লাগিয়ে দেখলাম।
অবিশ্বাস্যভাবে সেটা চালু হলো।
কিছুক্ষণ শুধু শোঁ শোঁ শব্দ।
তারপর একটা মেয়ের কণ্ঠ।
খুব ছোটো।
"আজ ১৭ জুন।"
তিশা আমার হাত ধরে ফেলল।
মেয়েটা বলছে,
"আমার নাম মায়ুমি।"
তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।
"আজ আবার ওকে দেখেছি।"
একটা শিশুর মতো কাঁপা গলা।
"আয়নায়।"
তারপর একটা শব্দ।
কেউ যেন দরজায় টোকা দিচ্ছে।
টক্।
টক্।
টক্।
মায়ুমি বলছে,
"ও আমাকে প্রশ্ন করেছে।"
তারপর—
"লাল না নীল?"
রেকর্ডিংয়ে হঠাৎ মায়ুমির কান্নার শব্দ।
"আমি উত্তর দিইনি।"
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর সে বলল,
"কিন্তু ও বলেছে, একদিন আমাকে উত্তর দিতেই হবে।"
রেকর্ডিং হঠাৎ বন্ধ।
আমি প্লে বোতাম চাপলাম।
আবার শব্দ।
এবার মায়ুমির গলা আরও নিচু।
"আমি একটা কথা জেনেছি।"
"আকা মান্তো একা নয়।"
"ওর সঙ্গে আরও একজন আছে।"
তিশা ফিসফিস করে বলল,
"আরও একজন?"
রেকর্ডিং চলতে থাকে।
"ওর নাম..."
তারপর প্রচণ্ড শব্দ।
ক্যাসেট থেমে গেল।
আমি বারবার চেষ্টা করলাম।
চলল না।
নাবিলা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"ওই নামটাই আমাদের দরকার।"
"কিন্তু শুনতে পেলাম না।"
তিশা বলল,
"ভাইয়া, ক্যাসেটটা আবার চালু করুন।"
"চালু হচ্ছে না।"
"তাহলে?"
আমি বাক্সের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেখি একটা ছোট্ট কাগজ।
কাগজে লেখা—
"যে নামটা শুনতে পাওনি, সেটা দেয়ালে লেখা আছে।"
আমরা তিনজন দেয়ালের দিকে তাকালাম।
সেখানে শত শত নাম।
কিন্তু আগের চেয়ে একটা নাম নতুন করে দেখা যাচ্ছে।
কালো কালিতে লেখা।
YUKI.
নাবিলা পিছিয়ে গেল।
"না..."
আমি বললাম,
"কী হয়েছে?"
"ইউকি এখানে কেন?"
"হয়তো ওর নামও..."
"না!"
নাবিলা চিৎকার করে উঠল।
"ইউকি কখনো বাংলাদেশে আসেনি।"
আমি বললাম,
"তাহলে ওর নাম এখানে কীভাবে?"
কেউ উত্তর দিল না।
হঠাৎ তিশার ফোন বেজে উঠল।
রাত তখন প্রায় সাড়ে তিনটা।
অচেনা নম্বর।
তিশা ফোন ধরল না।
ফোন আবার বাজল।
সে কাঁপতে কাঁপতে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
"ভাইয়া..."
"কী?"
"এটা আমার মায়ের নম্বর।"
"ধরো।"
"মা তো ঘুমাচ্ছে।"
ফোন আবার বাজল।
তিশা কাঁপা হাতে রিসিভ করল।
"হ্যালো?"
ওপাশে কোনো কথা নেই।
তারপর একটা মেয়ের গলা।
"তিশা..."
তিশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"কে?"
"তুমি কি লাল পছন্দ করো?"
তিশা ফোনটা হাত থেকে ফেলে দিল।
ফোনের স্পিকার থেকে তখনও শব্দ আসছে।
"তিশা..."
"তিশা..."
"তিশা..."
আমি ফোনটা তুলে বন্ধ করতে গেলাম।
স্ক্রিনে একটা ছবি ভেসে উঠল।
আমাদের তৃতীয় তলার বাথরুম।
আর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আছে তিশা।
কিন্তু ছবিটা তোলা হয়েছে পাঁচ বছর আগে।
তিশা তখন বয়সে অনেক ছোট।
আমি ছবিটা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
"তিশা..."
সে আমার দিকে তাকাল।
"আমি এখানে কখনো আসিনি।"
"তাহলে ছবিতে তুমি?"
সে কাঁদতে শুরু করল।
"আমি জানি না।"
নাবিলা এবার খুব আস্তে বলল,
"আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছি।"
আমি বললাম,
"মানে?"
"আকা মান্তো আমাদের বাড়িতে আসেনি।"
"তাহলে?"
"আমরাই ওর জায়গায় চলে এসেছি।"
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
"কীভাবে?"
নাবিলা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এই বাড়িটা আসলে বাড়ি নয়।"
তিশা বলল,
"তাহলে?"
নাবিলা বলল,
"এটা সেই স্কুলের একটা অংশ।"
আমি বললাম,
"অসম্ভব।"
"না।"
সে বলল,
"বাড়িওয়ালা আমাদের মিথ্যা বলেছে।"
"কী মিথ্যা?"
"স্কুল ভাঙা হয়নি।"
আমার বুক কেঁপে উঠল।
"তাহলে?"
"স্কুলটা শুধু বদলে দেওয়া হয়েছে।"
"মানে?"
"দেয়ালগুলো একই। সিঁড়িগুলো একই। বাথরুমগুলো একই।"
"কিন্তু স্কুল তো ছিল পাঁচ বছর আগে।"
নাবিলা আমার দিকে তাকাল।
"পাঁচ বছর আগে স্কুল বন্ধ হয়েছে।"
"হ্যাঁ।"
"তারপর এখানে যে বাড়ি তৈরি হয়েছে..."
সে থেমে গেল।
"ওটা স্কুলের ওপরেই তৈরি।"
আমার মাথায় যেন সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে লাগল।
আমাদের ঘরের অবস্থান।
তৃতীয় তলার পুরোনো করিডোর।
বাথরুম।
ভেন্টিলেটর।
আয়না।
সবকিছু যেন একই জায়গার অংশ।
আমি বললাম,
"তাহলে মায়ুমি?"
নাবিলা বলল,
"সে কোথাও যায়নি।"
"মানে?"
"সে এই বাড়ির মধ্যেই আছে।"
ঠিক তখন নিচতলা থেকে একটা শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে এলো।
আমরা তিনজনই থেমে গেলাম।
"কে কাঁদছে?"
তিশা বলল,
"কেউ নেই তো।"
আবার কান্না।
"আপু..."
"আমাকে বের করে দাও..."
নাবিলা আমার দিকে তাকাল।
"মায়ুমি।"
আমি বললাম,
"চলো।"
আমরা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম।
দ্বিতীয় তলা।
কেউ নেই।
প্রথম তলা।
কেউ নেই।
তারপর নিচতলার পুরোনো স্টোররুমের সামনে এসে কান্নার শব্দটা স্পষ্ট হলো।
"আপু..."
"আপু..."
নাবিলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।
"এখানে।"
আমি দরজা খুলতে গেলাম।
নাবিলা আমার হাত আটকাল।
"এক মিনিট।"
"কী?"
"মায়ুমি কখনো আমাকে 'আপু' বলে ডাকেনি।"
আমি থেমে গেলাম।
"তাহলে কে?"
ভেতর থেকে এবার একটা পুরুষ কণ্ঠ।
"দরজা খোলো।"
আমরা তিনজন পিছিয়ে গেলাম।
কণ্ঠটা আবার বলল,
"আমি তোমাদের সাহায্য করতে এসেছি।"
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
"কে?"
উত্তর এল,
"ইউকি।"
নাবিলা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল।
"না।"
আমি বললাম,
"কেন?"
"ইউকি বাংলাদেশে নেই।"
"তাহলে?"
নাবিলা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"ইউকি পাঁচ বছর আগে মারা গেছে।"
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
"কী?"
তিশা আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
নাবিলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"আমি তোমাকে বলিনি।"
"কেন?"
"কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।"
"ইউকি মারা গেছে?"
"হ্যাঁ।"
"কীভাবে?"
নাবিলা বলল,
"জাপানে আমাদের শেষ রাতের পরের দিন।"
"তুমি আমাকে বলেছিলে তোমরা দুজন বেঁচে গিয়েছিলে।"
"আমি বেঁচে গিয়েছিলাম।"
"ইউকি?"
সে মাথা নিচু করল।
"ইউকি বাঁচেনি।"
আমার মাথা ঘুরে উঠল।
"তাহলে এতদিন ফোনে..."
নাবিলা বলল,
"ওর নম্বর থেকে আমি কোনোদিন ফোন পাইনি।"
আমি বাকরুদ্ধ।
"কিন্তু আজ তো ফোনে কথা হলো।"
নাবিলা আমার দিকে তাকাল।
"তুমি ইউকির সঙ্গে কথা বলোনি।"
স্টোররুমের ভেতর থেকে তখন হাসির শব্দ।
ধীরে ধীরে।
খুব নিচু।
তারপর—
"নাবিলা..."
নাবিলা কেঁপে উঠল।
"তুই আমাকে চিনতে পারিস না?"
আমি দরজার দিকে তাকালাম।
"ইউকি?"
ভেতর থেকে উত্তর—
"হ্যাঁ।"
তারপর দরজায় একটা হাতের ছাপ ফুটে উঠল।
লাল রঙের হাতের ছাপ।
তার পাশে নীল।
আর মাঝখানে সাদা।
নাবিলা আমার হাত ধরে বলল,
"ও আমাদের ভয় দেখাচ্ছে না।"
"তাহলে?"
"ও কাউকে খুঁজছে।"
"কাকে?"
নাবিলা বলল,
"যে প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।"
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
"কে উত্তর দিয়েছিল?"
নাবিলা আমার দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
"আমি।"
"কী উত্তর?"
"লাল।"
আমি স্তব্ধ।
"কিন্তু তুমি তো বলেছিলে তুমি কোনো রং পছন্দ করো না।"
"আমি মিথ্যা বলেছিলাম।"
"কেন?"
"কারণ সেদিন আমি ভয় পেয়েছিলাম।"
"তুমি কী বলেছিলে?"
নাবিলা চোখ বন্ধ করল।
"আমি বলেছিলাম..."
সে ফিসফিস করে বলল,
"লাল।"
ঠিক তখন স্টোররুমের দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।
ভেতরে অন্ধকার।
আমরা আলো ফেললাম।
কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে একটা পুরোনো স্কুলব্যাগ।
ব্যাগের ওপর নাম লেখা—
NABILA.
নাবিলা ব্যাগটা দেখে পিছিয়ে গেল।
"এটা আমার।"
আমি বললাম,
"তোমার স্কুলব্যাগ?"
সে মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"এটা এখানে কীভাবে?"
নাবিলা ব্যাগটা খুলল।
ভেতরে পুরোনো খাতা।
একটা কলম।
একটা লাল ফিতা।
আর একটা ছবি।
ছবিটা বের করতেই আমার বুক কেঁপে উঠল।
ছবিতে নাবিলা।
তার পাশে ইউকি।
আর তাদের মাঝখানে মায়ুমি।
তিনজনই হাসছে।
ছবির পেছনে লেখা—
"FIRST ANSWER ACCEPTED."
তার নিচে আরেকটা লাইন—
"SECOND ANSWER REQUIRED."
আমি বললাম,
"দ্বিতীয় উত্তর কী?"
কেউ উত্তর দিল না।
হঠাৎ ছবির ভেতর মায়ুমির মুখ বদলে গেল।
ছোট্ট মেয়েটা যেন আমাদের দিকে তাকাল।
তারপর ছবির কাগজের ভেতর থেকে একটা ফিসফিস শব্দ এল।
"সে আসছে।"
নাবিলা বলল,
"কে?"
মায়ুমি বলল,
"যে মানুষ ছিল।"
আমি বললাম,
"আকা মান্তো?"
মায়ুমি মাথা নাড়ল।
"না।"
"তাহলে কে?"
সে বলল,
"যে আকা মান্তোকে বানিয়েছিল।"
আমাদের চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
আমি বললাম,
"কে তাকে বানিয়েছিল?"
মায়ুমি কোনো উত্তর দিল না।
ছবিটা হঠাৎ আগুনের মতো গরম হয়ে উঠল।
আমি হাত থেকে ফেলে দিলাম।
ছবির কাগজে আগুন ধরেনি।
কিন্তু ছবির মধ্যে একটা নতুন মানুষ দেখা গেল।
একজন পুরুষ।
কালো পোশাক।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
সে মায়ুমির পেছনে দাঁড়িয়ে।
তার হাতে একটা সাদা মুখোশ।
আর মুখোশে লেখা—
A. MANTO
তিশা ফিসফিস করে বলল,
"আকা মান্তো..."
নাবিলা বলল,
"না।"
"কেন?"
"ওটা নাম নয়।"
"তাহলে?"
নাবিলা বলল,
"ওটা একটা পরিচয়।"
"মানে?"
"যে কেউ ওই মুখোশ পরে..."
সে থেমে গেল।
"আকা মান্তো হতে পারে।"
আমি বললাম,
"তাহলে আসল আকা মান্তো কে?"
নাবিলা আমার দিকে তাকাল।
"আমি জানি না।"
ঠিক তখন পেছনে কারও পায়ের শব্দ হলো।
ধীরে।
একটা।
দুইটা।
তিনটা।
আমরা ঘুরে দাঁড়ালাম।
করিডোরের শেষ প্রান্তে একজন দাঁড়িয়ে।
লাল পোশাক।
মুখে সাদা মুখোশ।
হাতে দুইটা কাপড়।
একটা লাল।
একটা নীল।
সে ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। 😨
তিশা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"ভাইয়া..."
আমি নাবিলাকে আমার পেছনে সরিয়ে দিলাম।
লোকটা থেমে গেল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
"লাল না নীল?"
আমি উত্তর দিলাম না।
সে আবার বলল,
"লাল না নীল?"
নাবিলা আমার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল,
"ওকে উত্তর দিও না।"
লোকটা এবার মাথা কাত করল।
"তুমি আবার একই ভুল করছো, নাবিলা।"
নাবিলা কেঁপে উঠল।
"তুমি আমাকে চেনো?"
লোকটা বলল,
"আমি তোমাকে পাঁচ বছর ধরে চিনি।"
"তুমি কে?"
সে মুখোশটা একটু তুলল।
আমি তার মুখ দেখতে পেলাম না।
শুধু কালো একটা ফাঁকা জায়গা।
তারপর সে বলল,
"তোমার প্রশ্নের উত্তর তুমি নিজেই জানো।"
নাবিলা হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
"ওকে আমার কাছে আসতে দিও না।"
আমি বললাম,
"নাবিলা, পেছনে যাও।"
সে আমার দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
"তুমি আমাকে বিশ্বাস করো তো?"
আমি বললাম,
"হ্যাঁ।"
সে হাসল।
"তাহলে চোখ বন্ধ করো।"
আমি চোখ বন্ধ করলাম না।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে—
তিশা চিৎকার করে উঠল।
"ভাইয়া!"
আমি তার দিকে তাকালাম।
তিশা দেয়ালের দিকে আঙুল দেখাচ্ছে।
দেয়ালে আমাদের তিনজনের ছায়া।
কিন্তু সেখানে চারজন দাঁড়িয়ে।
আমি।
তিশা।
নাবিলা।
আর—
একজন ছোটো মেয়ে।
মায়ুমি।
আমি পেছনে তাকালাম।
কেউ নেই।
আবার দেয়ালের দিকে তাকালাম।
ছোট্ট মেয়েটা আমাদের ছায়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে।
তারপর সে ধীরে ধীরে হাত তুলল।
আর দেয়ালে আঙুল দিয়ে লিখল—
"DON'T TRUST NABILA."
আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
আমি পাশে থাকা নাবিলার দিকে তাকালাম।
সে তখন কাঁদছে।
"ও মিথ্যা বলছে।"
আমি বললাম,
"তুমি সত্যি নাবিলা?"
সে বলল,
"হ্যাঁ।"
"তাহলে প্রমাণ দাও।"
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
"তুমি আমাকে প্রথম কোথায় দেখেছিলে মনে আছে?"
আমি বললাম,
"কলেজের সামনে।"
সে হাসল।
"ভুল।"
আমি থেমে গেলাম।
"তাহলে?"
"তুমি আমাকে প্রথম দেখেছিলে জাপানে।"
আমি স্থির।
"কিন্তু আমরা তো জাপানে..."
সে আমার কথা কেটে বলল,
"তুমি আমাকে দেখেছিলে।"
"কিন্তু আমি তো তোমাকে চিনতাম না।"
"চিনতে না।"
"তাহলে?"
সে বলল,
"আমি তখন আয়নার ভেতরে ছিলাম।"
আমার শরীর অবশ হয়ে গেল।
তিশা পিছিয়ে গেল।
নাবিলা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি তোমাকে তখন থেকেই চিনতাম।"
আমি মাথা নাড়লাম।
"অসম্ভব।"
সে বলল,
"তুমি যখন আমাকে প্রথমবার বাংলাদেশে দেখেছিলে, তখন আমি তোমাকে আগে থেকেই চিনতাম।"
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
হঠাৎ আমার মনে একটা দৃশ্য ফিরে এল।
বহু বছর আগে জাপানের একটা বিমানবন্দরে আমি সত্যিই একটা মেয়েকে দেখেছিলাম।
খুব অল্প সময়ের জন্য।
একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি তখন ভেবেছিলাম, সেটা শুধু কাকতালীয়।
কিন্তু—
মেয়েটার মুখ নাবিলার মতো ছিল।
আমি তখন তাকে চিনতাম না।
আমি কখনো কাউকে এই ঘটনা বলিনি।
নাবিলা বলল,
"তুমি এখন বুঝতে পারছো?"
আমি ফিসফিস করে বললাম,
"তুমি আমাকে তখন থেকেই অনুসরণ করছিলে?"
সে মাথা নাড়ল।
"না।"
"তাহলে?"
"আমি তোমাকে অনুসরণ করিনি।"
"কে করেছে?"
সে আয়নার দিকে তাকাল।
"ও।"
আমি আয়নার দিকে তাকালাম।
আয়নায় এখন কেউ নেই।
শুধু আমাদের প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু কিছু একটা ভুল।
আমার প্রতিচ্ছবি আমার সঙ্গে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
তিশারও।
কিন্তু নাবিলার প্রতিচ্ছবি—
হাসছে।
বাস্তবের নাবিলা কাঁদছে।
আয়নার নাবিলা হাসছে।
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
"তুমি..."
নাবিলা আমার দিকে তাকাল।
"কী?"
আমি আয়নার দিকে আঙুল তুললাম।
"তোমার প্রতিচ্ছবি হাসছে কেন?"
নাবিলা ঘুরে আয়নার দিকে তাকাল।
তার মুখ সাদা হয়ে গেল।
আয়নার ভেতরের নাবিলা এবার ঠোঁট নাড়ল।
কিন্তু শব্দ বের হলো না।
আমি কাছে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে শব্দ শোনা গেল।
"দৌড়াও।"
আমি চমকে উঠলাম।
"কী?"
আয়নার নাবিলা আবার বলল,
"দৌড়াও।"
তারপর আয়নার পেছনে কালো একটা ছায়া দেখা গেল।
সে ধীরে ধীরে আয়নার নাবিলার কাঁধে হাত রাখল।
আয়নার নাবিলা ভয় পেয়ে গেল।
"ও এসে গেছে।"
আমি বললাম,
"কে?"
সে বলল,
"যে আমাকে বানিয়েছে।"
আয়নার ভেতরের আলো নিভে গেল।
ঘর অন্ধকার।
তারপর—
একটা পুরুষ কণ্ঠ।
খুব নিচু।
খুব শান্ত।
"তোমার স্ত্রী কে?"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কণ্ঠটা আবার বলল,
"তোমার স্ত্রী কে?"
আমি নাবিলার হাত ধরলাম।
"চলো।"
আমরা দৌড়াতে শুরু করলাম।
তিশা আমাদের পেছনে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম।
দ্বিতীয় তলা।
প্রথম তলা।
তারপর দরজার কাছে এসে দেখি—
বাইরে সকাল।
সূর্যের আলো।
আমরা থেমে গেলাম।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বললাম না।
তিশা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"আমরা কি সত্যিই বের হয়ে এসেছি?"
আমি দরজার বাইরে তাকালাম।
রাস্তা।
মানুষ।
রিকশা।
সব স্বাভাবিক।
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
নাবিলা আমার পাশে দাঁড়িয়ে।
আমি তার হাত ধরলাম।
হাতটা ঠান্ডা।
বরফের মতো ঠান্ডা। 🥶
আমি বললাম,
"তুমি ঠিক আছো?"
সে মাথা নাড়ল।
"হ্যাঁ।"
"চলো, এখান থেকে চলে যাব।"
সে বলল,
"হ্যাঁ।"
আমরা রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগলাম।
কয়েক পা যাওয়ার পর তিশা হঠাৎ থেমে গেল।
"ভাইয়া..."
আমি ফিরে তাকালাম।
"কী?"
সে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে।
"ওই জানালায় কে দাঁড়িয়ে?"
আমি জানালার দিকে তাকালাম।
তৃতীয় তলার জানালায় একজন দাঁড়িয়ে।
লাল পোশাক।
সাদা মুখোশ।
আমার বুক কেঁপে উঠল।
আমি নাবিলার দিকে তাকালাম।
সে জানালার দিকে তাকাল না।
বরং আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
"চলো।"
আমি তার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলাম।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আমার মাথায় একটা প্রশ্ন এল।
আমি থেমে গেলাম।
"নাবিলা।"
"হুম?"
"তুমি কি তিশাকে চেনো?"
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
"না।"
আমার বুকের ভেতর যেন কেউ ছুরি চালিয়ে দিল।
"কী?"
সে আবার বলল,
"আমি তিশাকে চিনি না।"
আমি তিশার দিকে তাকালাম।
তিশা আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।
"ভাইয়া..."
আমি আবার নাবিলার দিকে তাকালাম।
"তুমি তো তিশার সঙ্গে গতকাল রাতেও কথা বলেছো।"
সে মাথা নাড়ল।
"না।"
"তাহলে?"
নাবিলা আমার হাত ছেড়ে দিল।
"আমি গতকাল রাত থেকে তোমার সঙ্গে ছিলাম না।"
আমি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
"কী বলছো?"
সে খুব শান্ত গলায় বলল,
"তুমি যার সঙ্গে এতক্ষণ ছিলে..."
সে একটু হাসল।
"সে আমি নই।"
আমার মাথার ভেতর সবকিছু ঘুরতে লাগল।
আমি পেছনে তাকালাম।
যে নাবিলাকে এতক্ষণ পাশে নিয়ে হাঁটছিলাম—
সে আর নেই।
আমার হাতের মধ্যে শুধু একটা লাল কাপড়।
আমি কাপড়টা ফেলে দিলাম।
তিশা চিৎকার করে বলল,
"ভাইয়া!"
আমি তার দিকে তাকালাম।
"কী?"
সে আমার পেছনে তাকিয়ে আছে।
তার চোখ বড় হয়ে গেছে।
"ওখানে..."
আমি ধীরে ধীরে পেছনে ঘুরলাম।
রাস্তার ওপারে নাবিলা দাঁড়িয়ে।
সত্যিকারের নাবিলা।
তার পাশে—
আরেকজন নাবিলা।
দুজনেই আমার দিকে তাকিয়ে।
দুজনের মুখ একই।
দুজনের চোখ একই।
একজন কাঁদছে।
আরেকজন হাসছে।
তারপর দুজন একসঙ্গে বলল—
"তোমার স্ত্রী কে?" 😱
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।
দুজনের মাঝখানে হঠাৎ ছোট্ট মায়ুমি এসে দাঁড়াল।
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"এবার তোমার পালা।"
আমি বললাম,
"কীসের পালা?"
মায়ুমি খুব আস্তে বলল,
"উত্তর দেওয়ার।"
"কোন উত্তর?"
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"তোমার স্ত্রী কে—এই প্রশ্নের না।"
আমি থেমে গেলাম।
মায়ুমি ফিসফিস করে বলল,
"আসল প্রশ্ন হলো..."
সে আমার পেছনে তাকাল।
"তুমি নিজে কে?"
আমি ঘুরে তাকালাম।
রাস্তার ওপাশে বাড়িটা নেই।
সেখানে একটা পুরোনো স্কুল দাঁড়িয়ে।
শাপলা হাইস্কুল।
দরজার সামনে লেখা—
WELCOME STUDENTS
আর তৃতীয় তলার জানালায় দাঁড়িয়ে আছে একজন পুরুষ।
সাদা মুখোশ।
লাল পোশাক।
তার হাতে একটা সাদা কাগজ।
সে কাগজটা ধীরে ধীরে জানালা থেকে নিচে ফেলল।
কাগজটা বাতাসে ভেসে এসে আমার পায়ের কাছে পড়ল।
আমি কাগজটা তুললাম।
তাতে মাত্র একটা লাইন লেখা—
"তুমি পাঁচ বছর আগে মারা গিয়েছিলে।"
আমি স্থির হয়ে গেলাম।
তিশা আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
"ভাইয়া..."
আমি তার দিকে তাকালাম।
তার মুখ বদলে গেছে।
সে আর তিশা নয়।
সে মায়ুমি।
আমি পিছিয়ে গেলাম।
চারপাশের মানুষগুলোও থেমে গেছে।
সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।
সবাইয়ের মুখ একই।
নাবিলার মুখ।
মায়ুমির মুখ।
ইউকির মুখ।
আর তারপর—
সবাই একসঙ্গে বলল,
"লাল না নীল?"
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
কিন্তু চোখ বন্ধ করার আগের শেষ দৃশ্যটা এখনও আমার চোখে আটকে আছে।
রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা দুই নাবিলার একজন কাঁদছিল।
আর অন্যজন—
হাসছিল।
হাসতে হাসতে সে তার মুখের চামড়া খুলে ফেলল।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো—
একটা সাদা মুখোশ।
আর সেই মুখোশের ওপর লেখা—
A. MANTO 👻
চলবে...
#আকামান্তো #আকামান্তো৩ #ভৌতিকগল্প #ভয়েরগল্প #বাংলাভৌতিকগল্প #হররগল্প #ভূতেরগল্প #রহস্যগল্প #বাংলাগল্প #ভৌতিককাহিনী #হররস্টোরি #জাপানিহরর