28/06/2026
NDTV কে দেয়া বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারটির বঙ্গানুবাদ (উল্লেখ্য অনুবাদটি আমি আমার কন্ঠে ইউটিউবেও আপলোড করেছি):
“এই বছরই আমি আমার দেশে ফিরব”: শেখ হাসিনার একান্ত সাক্ষাৎকার
বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো আক্রমণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ, এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে বলেছেন শেখ হাসিনা।
তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমান যে দেশটি যুদ্ধংদেহী পাকিস্তানের বুক চিরে সৃষ্টি করেছিলেন, সেই দেশ থেকেই শেখ হাসিনাকে দেশছাড়া করার প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি, আর তার দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জন্য পরিস্থিতি এর চেয়ে কঠিন হওয়া দুষ্কর।
তবু তিনি অবিচল, ঠিক পদকপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের মতো। নির্বাসন থেকে আওয়ামী লীগ নেত্রী ঘোষণা করলেন, “এই বছরই আমি দেশে ফিরব।” তিনি বলেন, তার দল কেবল একটি সংগঠন নয়, একটি “শক্তি”। সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো আক্রমণ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ, তিনি জোর দিয়ে বলেন।
গত মঙ্গলবার, ২৩ জুন, দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ তার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দলের বহু কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নির্বাসিত এই নেত্রী এনডিটিভিকে দেওয়া একান্ত ইমেইল সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ নিয়ে নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারের প্রতিলিপি নিচে দেওয়া হলো:
প্রশ্ন 1: আপনি প্রায়ই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এবং আপনার সমর্থকরাও আশাবাদী, যে আপনি শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। কিছু নেতা বলছেন, তা এই বছরের মধ্যেই হতে পারে। আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকা অবস্থায় এটি কতটা বাস্তবসম্মত?
হাসিনা: আমার প্রত্যাবর্তন ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি অনেক বড় একটি প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত: বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য।
আমার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। এমন চেষ্টা আগেও হয়েছে। তখন ব্যর্থ হয়েছে, এবারও ব্যর্থ হবে।
আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার মা-বাবা, ভাইদের এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট আমাকে গ্রেনেড হামলায় হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের প্রতিটি জাল ছিন্ন করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি এবং দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি। আমার প্রায় পুরো জীবন বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই: প্রতিটি বাধা ও প্রতিটি ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে, এই বছরই আমি আমার দেশে ফিরব।
প্রশ্ন2: বাংলাদেশ সরকারের দৃশ্যমান ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ আবার সমর্থন ফিরে পাচ্ছে বলে কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দলটির কি এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি আছে?
হাসিনা: আওয়ামী লীগ কোনো কাগুজে সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের মধ্যে শিকড় গেড়ে থাকা একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের যাত্রায় আওয়ামী লীগ বহুবার আক্রমণের শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অন্য কারও ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে। জনসমর্থন সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই শক্তি নিয়েই আমরা সরকারে থাকা অবস্থায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছি। বাংলাদেশবিরোধী শক্তি জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে ষড়যন্ত্রমূলক ও নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। কিন্তু তাদের সব চেষ্টা সত্ত্বেও তারা মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে, এবং এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনে, মানুষ বাস্তবতা নিজের চোখে দেখছে। গণতন্ত্র নেই। আইনের শাসন নেই। নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। সংখ্যালঘুরা আক্রমণের শিকার। উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখোমুখি। মানুষ তুলনা করতে জানে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকে।
সাংগঠনিক শক্তির কথা বলতে গেলে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিটি গলি-অলিগলি হাতের তালুর মতো চেনে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দল বাংলাদেশকে জন্ম দিয়েছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমরা নেতৃত্ব দিয়েছি। মানুষের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবে পরিণত করার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের ডিএনএ-তে আছে। আগুনে সোনা আরও খাঁটি হয়। একইভাবে শাসকদের দমন-পীড়ন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করছে।
দলের ৭৭তম বছরে আমাদের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আমার বার্তা সহজ: ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান। প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি পাড়া, প্রতিটি ওয়ার্ড এবং প্রতিটি ইউনিয়নে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ান। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ, দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন থাকুন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়। এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ মানুষের সঙ্গে ছিল, মানুষের সঙ্গে আছে, এবং মানুষের সঙ্গেই থাকবে। জনগণের শক্তিতে আওয়ামী লীগ আবার উঠে দাঁড়াবে।
প্রশ্ন3: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল, আর দলটির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। নিকট ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক পুনরুদ্ধার কতটা সম্ভব?
হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুদ্ধার কোনো সরকারের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে না। এটি জনগণের ওপর নির্ভর করে। অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে একটি সাজানো নির্বাচনের বাইরে রেখেছে। হয়তো দলীয় কার্যালয় বন্ধ করেছে। হয়তো সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম দমন করেছে। কিন্তু তারা মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। সে কারণেই আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যেই আবার উঠে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব নির্যাতন ও দমন-পীড়ন সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব মিছিলে যোগ দিচ্ছেন। মায়েরা তাঁদের সন্তানদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সাহস ও সমর্থন দিচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগ আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে।
বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে যে তারা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে ভয় পায়। সে কারণেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে তারা সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি, এবং পুলিশ মোতায়েন করেছে। এটি তাদের দুর্বলতার লক্ষণ। শক্তি দিয়ে আওয়ামী লীগকে দমন করা যায় না। যে দল জনগণের জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয় ও ভীতি দেখিয়ে থামানো যায় না। ইতিহাস আমাদের শেখায়, আওয়ামী লীগ কখনও শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না। সে রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই বিজয়ের পতাকা তুলে ধরে।
বাংলাদেশে যথাযথ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু যারা এখন ক্ষমতা দখল করে আছে তারা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথটুকুও বন্ধ করে রাখে, তাহলে মানুষের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ, বেদনা এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা আওয়ামী লীগের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।
প্রশ্ন4: আপনি বলেছেন, ক্ষমতা থেকে আপনাকে সরিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশ তার প্রতিষ্ঠাকালীন চরিত্র হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের মতো একটি মডেলের দিকে এগিয়েছে। এই রূপান্তর বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন?
হাসিনা: কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের আমি কখনও বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময় স্পষ্ট: সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়। কিন্তু সেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অক্ষুণ্ণ রেখে।
বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল সামরিক শাসন, বৈষম্য, দমন-পীড়ন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং গণতন্ত্র অস্বীকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলাম, তার ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করা মানে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয়ের ওপর আঘাত করা।
৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রমণের শিকার হয়েছে। মন্দির ভাঙচুর হয়েছে। সুফি মাজার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে নিশানা করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করা হয়েছে, ফলে উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ার জায়গা তৈরি হয়েছে। অন্য কথায়, বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব আয়োজন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারে থাকাকালে আমরা স্থিতিশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিমাপযোগ্য অগ্রগতির বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় পৌঁছেছিল ২,৭৯৩ মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল, ২৯ ধাপ এগিয়ে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বেড়েছিল। জিডিপির অংশ হিসেবে বিনিয়োগ পৌঁছেছিল ৩২.০৫ শতাংশে। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ৩.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল।
আমরা দারিদ্র্য কমিয়ে ১৮.৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্য কমিয়ে ৫.৬ শতাংশে নামিয়েছিলাম। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বেড়েছিল। শিশুমৃত্যু চার গুণ কমেছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আট গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, এবং শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেয়েছিল। সাক্ষরতার হার পৌঁছেছিল ৭৮.৫ শতাংশে। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে হয়েছিল ৪৩.৪৪ শতাংশ। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা ১৪,৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছি।
আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসিত করেছি। প্রায় ৪২,৮০,১১৫ মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ ঘরের মালিকানা দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, বাঙালি জাতি সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পেলে নিজের শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
৫ আগস্টের পর যেভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রা ধ্বংস করা হয়েছে, এবং যেভাবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে পারে একমাত্র আওয়ামী লীগ। মানুষ এটি বুঝে গেছে। অবাধ, সুষ্ঠু এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হলে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে। ইউনূস এবং বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এটি খুব ভালোভাবেই জানে। সে কারণেই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার জেনে-শুনে ও পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, দলটিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে, এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে এই ব্যর্থ রাষ্ট্রের মডেলই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রশ্ন5: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে আপনার পর্দার আড়ালের আলোচনার খবর এসেছে। এসব দাবির কোনো সত্যতা আছে কি?
হাসিনা: ষড়যন্ত্রকারীরা প্রায়ই জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের অপপ্রচার ছড়ায়। আমার অবস্থান খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার গোপন দরকষাকষির বিষয় নয়। এগুলো জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। ন্যায়বিচারও দয়া নয়। এটি মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তা স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলতে হবে। রাজনৈতিক নির্দেশনায় পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা সাক্ষ্য, বা বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না।
আমি সবসময় রাজনৈতিক সমাধানকে সমর্থন করেছি। কিন্তু সেই সমাধান হতে হবে প্রকাশ্য, নীতিনিষ্ঠ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। তা গোপন চুক্তির ভিত্তিতে হতে পারে না। আওয়ামী লীগ কারও কাছে রাজনৈতিক করুণা চায় না। আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক অধিকার, জনসমর্থন এবং জনগণের শক্তির ভিত্তিতে রাজনীতি করবে।
প্রশ্ন6: মন্দির এবং হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার খবর, পাশাপাশি কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর বিক্ষোভ ও হুমকিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
হাসিনা: এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়। দুঃখজনক হলেও এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে যখনই মুক্তিযুদ্ধের শক্তি দুর্বল হয়েছে, যখনই সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে বা রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করেছে, তখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন নেমে এসেছে। তাদের বাড়িঘর, উপাসনালয়, ব্যবসা, জীবন এবং মর্যাদা সবকিছুই হুমকির মুখে পড়েছে।
৫ আগস্টের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী সম্প্রদায়, আহমদিয়া এবং সুফি মাজারের সঙ্গে যুক্ত মানুষ কেউই নিরাপদ নন। মন্দির ভাঙচুর হয়েছে। প্রতিমা ভাঙা হয়েছে। ঘরবাড়ি লুট হয়েছে। চাঁদাবাজি, নারীর ওপর সহিংসতা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বাধা অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও এসব ঘটনা অস্বীকার করেছে অথবা রাজনৈতিক অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছে। অস্বীকারের এই সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করেছে। সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বলা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এখনও মিথ্যা মামলায় কারাগারে আছেন। এটিই প্রমাণ করে, সরকার বদলালেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ভাগ্য বদলায়নি।
আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই: সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নয়। তারা সমান মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশের নাগরিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল। বঙ্গবন্ধু একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বাস করবে। সেই বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও উগ্রবাদের হাতে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না।
যারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে, মন্দির ভাঙচুর করে, বা ধর্মের নামে মানুষকে হুমকি দেয়, তারা শুধু একটি সম্প্রদায়ের শত্রু নয়। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু। কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ে বাস করলে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। আজ অনেক সংখ্যালঘু পরিবার সেই ভয় নিয়ে বেঁচে আছে। নিরাপত্তার দাবিতে তাদের প্রতিবাদ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য লজ্জার।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মন্দির ও উপাসনালয়ে হামলার বিচার করতে হবে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। যারা শান্তিপূর্ণভাবে সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বলেন, তাদের মিথ্যা মামলা বা হয়রানির মুখোমুখি করা উচিত নয়। তাদের কথা শোনা উচিত। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমান অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
প্রশ্ন7: ভারতে আপনার অবস্থান, ব্যক্তিগতভাবে এই সময়টি আপনি কীভাবে সামলাচ্ছেন? আপনার মেয়ের সঙ্গে কি নিয়মিত দেখা হয়, নাকি নির্বাসনের জীবন অনেকটাই সীমাবদ্ধ?
হাসিনা: বহুদিন ধরেই আমার ব্যক্তিগত জীবন বলতে তেমন কিছু নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। ১৯৭৫ সালে আমি সবকিছু হারিয়েছি। তখনও আমাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে কাটাতে হয়েছিল। পরে দেশে ফিরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছি। আজ বাংলাদেশ আবার এক কঠিন সময় পার করছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি সেখানে থাকতে পারিনি, এটি আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আমার স্বাভাবিক যোগাযোগ আছে। কিন্তু আমার হৃদয় রয়ে গেছে বাংলাদেশে: সেই মাটিতে, যেখানে আমার বাবা চিরনিদ্রায় শায়িত; সেই দেশে, যার মাটির সঙ্গে আমার পরিবারের রক্ত মিশে আছে; সেই দেশে, যার মানুষকে আমি সারাজীবন সেবা করেছি। আমার দেশের মানুষ থেকে দূরে থাকা, আমার মাটির গন্ধ থেকে দূরে থাকা, এবং প্রতিদিন আমার নেতা-কর্মীদের দুর্ভোগের কথা শোনা গভীর বেদনাদায়ক।
আজ বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দূরে থেকেও আমি প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতি অনুসরণ করি। আমাদের নেতা-কর্মীদের খোঁজ রাখি। নির্যাতিত পরিবারের গল্প শুনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমার সংগ্রাম থেমে যায়নি।
আমার শক্তি বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং জাতির পিতার আদর্শ। সেই শক্তি নিয়েই আমি প্রতিদিন বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ আবার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে। জনগণের শক্তিতে আওয়ামী লীগ আবার উঠে দাঁড়াবে। আমি সেই সংগ্রামের সঙ্গে আছি, এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকব।