15/09/2026
বেশি পানি পান করা কি সব সময় উপকারী?
পানি মানুষের জীবনের অন্যতম অপরিহার্য উপাদান। শরীরের প্রায় ৫০–৬০ শতাংশই পানি দিয়ে গঠিত এবং এটি রক্ত সঞ্চালন, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হজম, পুষ্টি পরিবহন, বর্জ্য অপসারণ এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই “প্রতিদিন যত বেশি পানি, তত বেশি উপকার” — এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই প্রচলিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেশি পানি পান করা সব সময় উপকারী নয়। শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত পানি গ্রহণ করলে কিছু ক্ষেত্রে তা ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই কতটা পানি প্রয়োজন, কখন বেশি পানি দরকার এবং কখন সতর্ক থাকতে হবে—এসব বিষয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের শরীরে পানির ভারসাম্য একটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। আমাদের কিডনি অতিরিক্ত পানি প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়, আবার শরীরে পানি কমে গেলে তা সংরক্ষণ করার চেষ্টা করে। তৃষ্ণা অনুভব করাও শরীরের একটি স্বাভাবিক সংকেত, যা জানিয়ে দেয় যে শরীরের পানি পুনরায় পূরণ করা দরকার। তাই সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে তৃষ্ণা একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। তবে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু বা কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত মানুষের তৃষ্ণার অনুভূতি কম হতে পারে, ফলে তাদের ক্ষেত্রে সচেতনভাবে পানি গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
অনেকেই মনে করেন প্রতিদিন সবার জন্য নির্দিষ্টভাবে ৮ গ্লাস পানি পান করা বাধ্যতামূলক। বাস্তবে পানির চাহিদা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়। একজন মানুষের বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস, গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদান—এসব বিষয় পানির প্রয়োজন নির্ধারণ করে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘামের মাধ্যমে বেশি পানি বের হয়ে যায়, ফলে তখন তুলনামূলক বেশি পানি দরকার হয়। আবার যিনি নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা বাইরে দীর্ঘ সময় কাজ করেন, তার চাহিদাও বেশি হতে পারে। অন্যদিকে অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বসে কাজ করা একজন মানুষের প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান করার অনেক উপকারিতা রয়েছে। এটি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে, কিডনির মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণে সহায়তা করে এবং শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং পানিশূন্যতার কিছু লক্ষণও কমতে পারে। এছাড়া ফল, সবজি, দুধ এবং অন্যান্য তরল খাবার থেকেও শরীর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি পায়। অর্থাৎ শুধু পানির গ্লাসই নয়, আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যও শরীরের জলীয় চাহিদা পূরণে অবদান রাখে।
তবে প্রশ্ন হলো—প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পানি পান করলে কী হয়? অতিরিক্ত পানি গ্রহণের ফলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে, যাকে হাইপোন্যাট্রেমিয়া বলা হয়। সোডিয়াম শরীরের তরলের ভারসাম্য এবং স্নায়ু ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন খুব অল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি পান করা হয়, তখন কিডনি সেই পানি দ্রুত বের করতে পারে না। ফলে রক্ত পাতলা হয়ে সোডিয়ামের ঘনত্ব কমে যায় এবং কোষে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি Brain-এর উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
হাইপোন্যাট্রেমিয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বমি বমি ভাব, মাথাব্যথা, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি। অবস্থা গুরুতর হলে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতাও দেখা দিতে পারে। যদিও এটি খুব সাধারণ নয়, তবে ম্যারাথন দৌড়বিদ, দীর্ঘ সময়ের ক্রীড়াবিদ অথবা স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত পানি পানকারীদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। তাই ব্যায়ামের সময় শুধু পানি নয়, দীর্ঘস্থায়ী ঘামের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যও বিবেচনা করা জরুরি।
অনেকেই ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে খাবারের আগে অতিরিক্ত পানি পান করেন। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের আগে মাঝারি পরিমাণ পানি পান করলে ক্ষুধা কিছুটা কমতে পারে এবং ক্যালরি গ্রহণ হ্রাসে সহায়ক হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সারাদিন অস্বাভাবিক পরিমাণ পানি পান করলে দ্রুত ওজন কমে যাবে। বরং অতিরিক্ত পানি শরীরের জন্য অস্বস্তি তৈরি করতে পারে এবং বারবার প্রস্রাবের কারণে দৈনন্দিন কাজেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।
কিডনির স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। পর্যাপ্ত পানি কিডনির স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়ক হলেও অতিরিক্ত পানি কিডনিকে “আরও পরিষ্কার” করে—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং যাদের কিডনি রোগ, Heart Failure বা লিভারের কিছু জটিলতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ তরল গ্রহণ করতে হয়। এসব রোগে অতিরিক্ত পানি শরীরে তরল জমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট বা ফোলা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ব্যক্তিগত চিকিৎসা নির্দেশনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কীভাবে বুঝবেন আপনি পর্যাপ্ত পানি পান করছেন? একটি সহজ উপায় হলো প্রস্রাবের রঙ পর্যবেক্ষণ করা। সাধারণত হালকা ফ্যাকাশে হলুদ রঙ পর্যাপ্ত হাইড্রেশনের ইঙ্গিত দেয়, আর গাঢ় হলুদ রঙ শরীরে পানির ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে। তবে কিছু ভিটামিন বা ওষুধ প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তন করতে পারে, তাই এটিকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ধরা উচিত নয়। তৃষ্ণা, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং নিজের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে পানি গ্রহণ করাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতি।
গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের ক্ষেত্রে পানির চাহিদা সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি হতে পারে, কারণ শরীরকে অতিরিক্ত তরল উৎপাদন ও শিশুর চাহিদা পূরণ করতে হয়। একইভাবে জ্বর, ডায়রিয়া বা বমির সময় শরীর দ্রুত পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট হারায়, ফলে তখন তরল গ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে। তবে গুরুতর পানিশূন্যতা বা দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকলে শুধুমাত্র পানি নয়, প্রয়োজনে ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা চিকিৎসা নেওয়াও জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, পানি অবশ্যই সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু “যত বেশি তত ভালো” — এই ধারণা সঠিক নয়। শরীরের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত ও পর্যাপ্ত পানি পান করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও উপকারী অভ্যাস। অতিরিক্ত পানি যেমন ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি পানিশূন্যতাও নানা শারীরিক জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই নিজের বয়স, জীবনযাপন, আবহাওয়া ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানি গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সুস্থ জীবনের মূলমন্ত্র হলো ভারসাম্য—আর পানির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
References: WHO, EFSA, IOM, CDC, NHS, KDIGO