02/08/2022
যদি প্রশ্ন করেন একটি রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ ও রাষ্ট্র পরিচালকের মধ্যে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
তবে অবশ্যই উত্তরটি হবে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
কারণ সাধারণ জনগণ ও রাষ্ট্র পরিচালকের মাঝে সুসম্পর্ক থাকলে কেবলমাত্র তখনই একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘ মেয়াদি সরকার গঠন করা সম্ভব হয়। কারণ জনগণই হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের ব্লাড লাইন আর রাষ্ট্র পরিচালক হচ্ছে সেই দেশের হৃদপিণ্ড। যিনি সমগ্র দেশের মধ্যে জনগণের থেকে আয়কৃত অর্থ বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন নতুন কর্মস্থান তৈরি হয় এবং জনগণের আয় বৃদ্ধি পায়। আর জনগণের আয় বৃদ্ধি হলে রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়ে এবং সাথে রাষ্ট্র পরিচালকের ক্ষমতাও ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, ফলে সেই দেশ শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রে পরিনত হয়, একটা সময় যার ক্ষমতা নিজ দেশের বাইরেও বিস্তৃত হতে থাকে। যেমন চীন, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং ইরান যাদের কে ইউরোপ-আমেরিকাও ভয় পায়।
অথচ রাষ্ট্র পরিচালক ও জনগণের মাঝে সামান্য দূরত্ব, ভুল বুঝাবুঝি বা অনাস্থা তৈরি হলে সেখানে শয়তান ডুকে পড়ে। আর এই শয়তান হচ্ছে বিদেশি শক্তি এবং তার অনুসারী হলো সেই দেশেরই বিরোধী দল, প্রথম শ্রেণীর কিছু ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ঠিকাদার, অসৎ সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাবৃন্দ ও কিছু এমপি-মন্ত্রীরা। যাদের কাজ হচ্ছে সাধারণ জনগণের মাঝে সরকারের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সরকারকে দূর্বল ও অকার্যকর বানিয়ে নিজেদের হাতের মুঠে রেখে ফায়দা লুটা। তারা কলেস্টেরলের মত সরকার ও জনগণের মাঝে দূরত্ব বা বাধা সৃষ্টি করে রাখে।
কারণ একটি দেশের সরকারের রাজস্ব আয়ের তিনটি উৎস রয়েছে। যার
১.প্রথমটি হচ্ছে পরোক্ষ কর বা (Indirect tax) যেটা আদায় হয় সাধারণ জনগণের ক্রয় ক্ষমতার উপরে। যার পরিমাণ হতে পারে মোট রাজস্ব আয়ের ৪০-৬০ ভাগ।
২. দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রত্যক্ষ কর বা (Direct tax) যেটা আদায় হয় উচ্চবিত্তদের ইনকামের উপর ট্যাক্স আরোপ করে যা হতে পারে সরকারের মোট আয়ের ১৫-২০ পার্সেন্ট। এবং
৩. তৃতীয়টি হচ্ছে বিভিন্ন বন্দরের শুল্ক, ফি, কমিশন ও মাসুল আদায়ের মাধ্যমে।
এখন একটি দেশের সরকারের সবচেয়ে সহজ ও বড় ইনকামটাই আসে সেই দেশের সাধারণ জনগণের স্বচ্ছলতা বা স্বাভাবিক ক্রয় ক্ষমতা থেকে। অর্থাৎ একটি দেশের সাধারণ জনগণ যত বেশি ইনকাম করবে তখন তারা তত বেশি খরচও করবে, আর যত বেশি খরচ করবে বা কেনাকাটা করবে সেই দেশের সরকার তত বেশি রাজস্বও ইনকাম করতে পারবে, অর্থাৎ আমরা দোকান থেকে বা বাজার থেকে যে পণ্যই কিনি না কেন, সেখান থেকে সরকার কোন না কোন ভাবে ভ্যাট আদায় করে নিয়ে নেয়। আর এই ভ্যাট কেই indirect tax বা পরোক্ষ কর বলে। তাই জনগণ যতবেশি সচ্ছল হবে, ক্ষমতাসীন সরকার তত বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারবে ফলে অর্থনৈতিকভাবে সে দেশের সরকার তত বেশি শক্তিশালী হবে, কারণ সরকারের শক্তিই হচ্ছে তার দেশের স্বচ্ছল জনগণ। তাই উন্নত রাষ্ট্রের দিকে তাকালে দেখবেন তাদের জনগনের মাথাপিছু আয় অনেক বেশি ফলে তারা ইচ্ছেমতো খরচ করতে বা কেনাকাটা করতে পারে, যার ফলে তাদের সরকার বেশি বেশি রাজস্ব আদায় করে, আর এজন্যই তারা অর্থনৈতিকভাবে এত শক্তিশালী। অন্যদিকে যে দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় কম বা অস্বচ্ছল, সে দেশের জনগণের ক্রয়ক্ষমতাও স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়, যে কারণে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য বা সেবা ব্যবহার করতে পারে না, ফলে সরকারের তেমন কোন রাজস্ব আদায়ও হয় না, আর এ কারণেই সেই দেশ কে অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল ও গরীব রাষ্ট্র বলা হয়।
আর এর জন্য দায়ী সেই দেশেরই কিছু বড় বড় ব্যবসায়ী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারি- কর্মকর্তাবৃন্দ, ঠিকাদর ও কিছু এমপি-মন্ত্রীরা। যাদেরকে Direct tax বা প্রতক্ষ করদাত বলা হয়। আর এই Direct tax বা প্রতক্ষ করদাতা এবং শুল্ক ও কমিশনদাতা ব্যক্তিরা একই, যারা তাদের মোট আয়ের উপর সরকার নির্ধারিত কর আদায় তো দূরে থাক বরং শুভংকরের ফাঁকি দেওয়ার নানা ধরনের চেষ্টা করে থাকে। আর সরকার দূর্বল ও চাপে থাকলে তাদের এই কাজ আরও বেশি সহজ হয় তাই তারা সরকারকে চাপে রাখতে সেই দেশেরই বিরোধী দলকে সরকারের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়, ফলে বিরোধী দলও ক্ষমতা দখলের লোভে মরিয়া হয়ে জনগণের মাঝে সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিভ্রান্ত মূলক তথ্য ও প্রচারণা চালায়। এমনকি হরতাল অবরোধ দিয়ে যানবাহ ভাঙ্গচুর, সাধারণ জনগনের সম্পদ নষ্ট এবং কলকারখানার উৎপাদন ব্যহৃত করে অর্থনীতিকে ধংস্বের মুখে ঠেলে দেয়, ফলে রাষ্ট্র একটি দূর্বল ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিনিত হতে থাকে। আর তখনই ক্ষমতাসীন সরকার বিরোধী দলেকে দমানোর জন্য বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এরকম অবস্থায় স্বাভাবিক ভাবেই জনগণের দৃষ্টিও তখন দেশের সরকার ও বিরোধী দলের উপর চলে যায়। আর সেই সুযোগটাই তৃতীয় পক্ষ দেশের প্রথম শ্রেণীর কিছু বড় বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ, ঠিকাদার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সচিব-আমলা ও কিছু এমপি-মন্ত্রীরা নিয়ে থাকে অর্থাৎ এই Direct tax বা প্রতক্ষ করদাতারা নিয়ে থাকে।
এছাড়াও এরা দেশের প্রথম শ্রেণীর ব্যবসায়ি হওয়ায় বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় বিদেশি পণ্য তাদের মাধ্যমেই আমদানি হয়, ফলে তারা সুযোগ বুঝে শুল্ক ফাঁকি এমনকি আমদানি নিষিদ্ধ বিভিন্ন পণ্যও আমদানি করে থাকে এবং ইচ্ছে মত আমদানিকৃত বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেশীয় মুদ্রার মূল্যের পতন ঘটায়, ফলে মুদ্রাস্থিতি ঘটে। শুধু তা-ই নয় তারা তাদের ইনকামের উপর নির্ধারিত ট্যাক্সও সরকারকে প্রদান করতে চাই না। যেমন ধরেন যদি তাদের বছরে ২৫লাখ টাকা ইনকাম ট্যাক্স আসে তবে তারা ৩-৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে সরকারকে ট্যাক্স দিবে ২-৩ লাখ টাকা, আর এ কাজে তাদের সাহায্য করে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। এছাড়াও দেশের ক্রান্তিকালীন সময়ে এরা সুযোগ বুঝে দ্রব্য মূল্যের দাম বাড়িয়ে দেয় আর সরকার দূর্বল থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে সাধারণ জনগণ ব্যাপক ভোগান্তির স্বীকার হয় এবং সরকারি দল আরও বেশি চাপের মধ্যে পড়ে। যে কারণে এই শ্রেনীর ব্যক্তিবর্গের উপর বার্ষিক রাজস্ব আয়ের ৪০% টার্গেট এর ২০% ভাগও অনেক সময় আদায় করা সম্ভব হয় না। ফলে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক প্রকল্পের ঘাটতি অর্থ চড়া সুদে বিভিন্ন দেশ থেকে ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করতে হয়।
এছাড়াও সরকার প্রধান দূর্বল থাকায় প্রভাবশালী এমপি-মন্ত্রীরা বিশাল অংকের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানিকে বিনা মূল্যে রাষ্ট্রের জায়গা, অবৈধ গ্যাস সংযোগ, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন সরবরাহের ব্যবস্থা করে দেয়। এছাড়াও তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে নদীর জায়গা, খালের জায়গা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রয়াত্ব জায়গা দখল করে অনুমোদনহীন বিভিন্ন কলকারখানা গড়ে তুলে এবং সেসব কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্র দিয়ে নদীনালার পানি ও পরিবেশ দূষণ করে। আর এসব নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকতে পারে না। কারণ তারা জানে একটি সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে সরকারের শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং তারা ইচ্ছে মত দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাট করতে পারবে না। তাই তারা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে দীর্ঘ মেয়াদি নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজ বা প্রকল্প গুলোও আলোর মুখ দেখতেই পায় না, এমনকি প্রকল্প সম্পূর্ণ না করেই অসাধু সরকারী কর্মচারীদের সাহায্য নিয়ে ঠিকাদারগণ প্রকল্পের সম্পূর্ণ টাকা তুলে নিয়ে বিদেশ বাড়ি গাড়ি করে সুখের জীবন শুরু করে। আর এই সব অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি খেসারত দেয় সেই সাধারণ জনগণ। যারা রাষ্ট্রীয় কোন সুযোগ সুবিধা তো পায়ই না বরং অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে দুর্বিসহ ভাবে জীবনযাপন করতে থাকে।
সুতরাং কলেস্টেরল যেমন হার্ট ব্লক করে রক্ত সঞ্চলন বন্ধ করে দিয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটায় ঠিক তেমনই এই শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ জনগণ ও রাষ্ট্র পরিচালকের মধ্যে দূরত্ব বা বাঁধা সৃষ্টি করে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দূর্বল করে নিজেদের ফায়দা লুটতে থাকতে।
তাহলে আপনারই বলুন একটি দেশের সরকার তার দেশের সাধারণ জনগণকে ছেড়ে দুধ কলা দিয়ে কেন এই সুবিধা ভোগী কাল সাপ বা প্রভাবশালী মহলকে পালবে বা সহায়তা দিবে। যারা তাদের স্বার্থের জন্য সরকারকে ব্যবহার করে এমনকি যে কোন সময় ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে বাধ্য করে। অথচ সাধারণ জনগণ রাষ্ট্র পরিচালকের প্রতি অনুগত থাকলে সরকারি দল শক্তিশালী হয় এবং সেইসব সুবিধা ভোগী শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, উচ্চবিত্ত, সরকারি কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারি, সচিব-আমলা ও এমপি-মন্ত্রীদের আইনের আওতা এবং জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে সহজ হয়। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়৷ দেশের উপর বিহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপ কমে, সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হয় এবং রাষ্ট্রের সম্পত্তি উদ্ধার ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বাড়ে।