27/02/2021
ক্যারিয়ার বিষয়ক কিছু কথা (কিছু উপলব্ধি)
১.
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে আরএফএলে জয়েন করি। প্রথম চাকরি সেটা নয়, কিন্তু আগের মাত্র ২ মাসে ২টা কোম্পানি ট্রাই করে ফেলায় আরএফএল এর জব তখনো আমার কাছে একদম নতুনের মতই।
জয়েনের ২দিন পরেই আমার বস বললেন আপনি রামপুর থেকে কুড়িল একটা হাঁটা দেন, আশে পাশে যত দরজার দোকান পড়বে সব ভিজিট করবেন, কি বলে শুনবেন। ফাঁকি দিবেন না, আমি কিন্তু এই এলাকার সব দোকান চিনি।
উনি প্রচন্ড জাঁদরেল লোক, নতুন বলেই সেটা সবাই জানিয়ে দিয়েছিল আমাকে। ফাঁকি দেবার প্রশ্নই আসে না। তবে আমি ভাবছিলাম যে না হেঁটে কি হবে না? যদি রিকশা বা বাসে যাই। পরে ভেবে দেখলাম যে এটা আসলে বুদ্ধিমানের কাজ হবেনা, কারণ কোন পাশে কি দোকান আছে বুঝবো কিভাবে।
শেষ ফাগুনের ঠাডা রোদে হাঁটা শুরু হলো। সকাল থেকে সন্ধ্যা, ভিজিট করলাম, কথা বললাম, কাজ শেষ করলাম। পরদিন যখন বললাম বস রিপোর্ট কিভাবে দিব? উনি বললেন রিপোর্ট দিয়ে কি করবো, এটা তো আপনার লার্নিং এর জন্য ছিল! খুব রাগ হলো, এটা কোন কথা? এভাবে হাঁটায় মারলো, এটা লার্নিং?
২.
মাস দুয়েক পরের কথা। বস চেঞ্জ হয়েছে। আরএফএল তখন রিকশার রিম, স্পোক এসব বের করবে। একটা নাম দিতে হবে সেই ব্র্যান্ডের জন্য। গুগল নিয়ে বসে পড়লাম, আর নিজের প্রতিভা। কিছু অপশান বের হলো - দুরন্ত, দুর্বার, দুর্জয়। এসব অপশান দেখে শুনে বস বললেন, আপনি এক কাজ করেন, রিকশার গ্যারেজে চলে যান, ওদেরকে জিজ্ঞাসা করেন যে এর মধ্যে থেকে ওদের কাছে কি পছন্দ, কোনটার অর্থ ওরা বুঝে, কোনটা উচ্চারণ করতে সহজ হয়। এটার ইউজার ওরা, আমার-আপনার পছন্দ আর ওদের পছন্দ তো এক হবেই না।
আরে মহা মুসিবত, রিকশার গ্যারেজে যাব! এটা কোন কথা! আমি বিবিএ-এমবিএ হোল্ডার, আমার একটা স্ট্যাটাস আছে না। বস মানবেনা, যেতেই হবে।
তো গেলাম। আগের ভিজিটের অভিজ্ঞতা কাজে লাগলো, কিছু লোকেশন চেনা ছিল। উত্তর বাড্ডার পিছনে, রামপুরা, মালিবাগের এদিকে কয়েকটা গ্যারেজে গেলাম। ওদের সাথে কথা বললাম। ওরা দুর্বার আর দুরন্ত দুইটা বলেছিল। আরো নানা রকম প্রোডাক্ট ফিডব্যাক দিল। ততক্ষণে আগের বস আর নতুন বস কারো উপরেই রাগ নেই কারণ বুঝে গেছি এই এক্সপেরিয়েন্স আসলে অফিসে বসে হবেনা।
৩-৪টার দিকে সার্ভের ভার্সিটিকালিন অভিজ্ঞতাকে (!) কাজে লাগিয়ে বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন বসকে সব বললাম যে ৩০জনের মত সার্ভে করেছি। উনি ১৫জন বাদ দিয়ে বললেন তুমিও জানো, আমিও জানে যে তুমি এতজনের সাথে কথা বলোনাই, তবে যা বলেছ তাতেই চলবে। শেষ পর্যন্ত ম্যানেজমেন্ট দুরন্ত নামটাকে নিল। এই নামটাই আজকের 'দুরন্ত' বাইসাইকেলের ব্র্যান্ড যার জন্মস্থান বলা যায় রিকশার গ্যারেজ!!!
৩.
উপরের যে দুইটা ঘটনা বললাম সেটা চাকরির একদম প্রথম ২-৩ মাসের মধ্যে ঘটা ঘটনা। পথ যে একজন মার্কেটারকে পথ দেখিয়ে দেয় সেটা আমার বসেরা একদম শুরুতেই আমাদের ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাতে উনারা সফল। ইনিশিয়ালি আমরা মনে করি যে বস রাগী, কিচ্ছু বুঝেনা, খালি চাপ দেই। আসলে এর সবই যে ভুল ধারণা সেটা একবার মার্কেটে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতাকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করলে বোঝা যায়।
মাঠে মাঠে আমাদের অনেক সময় গিয়েছে। তখন বসেরাও আমাদের চাপ দিয়ে আনন্দ পেতেন কারণ আউটপুটগুলোও হয়ত উনারা ভালো পেতেন।
কেন যেন মনে হয় এখন বসের চেয়ারে বসার পরে সেই আনন্দের জায়গাটায় একটা কমতি পড়ছে আমাদের। যারা এখন নতুন আসছেন, তাদেরকে ঠিক ধরতে পারিনা। এখন প্রত্যেকের কিছু আলাদা প্রায়োরিটি থাকে। অল্প সময়ে ৬ডিজিট, দেশের বাইরে যাওয়া, আমি তো ভাই ব্র্যান্ড ম্যানেজার - আমি কেন প্রোডাক্টের কার্টন ধরবো এই টাইপ একটা এটিটিউড তাদের মাঝে যেটা নিজের চোখ দিয়ে দেখেছি। আইফোন হাতে নিয়ে যার চাকরি শুরু তাকে রিকশার গ্যারেজে যেতে বললে সে কি আজ যেত? নাকি আসলে সে আইডিয়া দিত বস, আমাদের আসলে এসব সার্ভের জন্য ইন্টার্ন নেয়া প্রয়োজন?!
এই প্রজন্ম অস্থির, এই প্রজন্মের সাথে গ্রামের সম্পর্ক কম, পাবলিক বাসের সম্পর্ক কম। আমার তৎকালিন বস একটা কথা সবসময় বলতেন যারা পাবলিক বাসে ঝুলেনাই, তারা আসলে কখনো ব্র্যান্ডে জব করতে পারবে না। এটা শুধু একটা বাক্য না, বরং এখানে অনেকগুলো ডিপ মিনিং আছে। কালারফুল এই প্রজন্ম কি শুধু লাইফের তাদের অংশটুকুই জানে, আর বাকি সব কি তাদের কল্পনা কিনা এইটুকু নিয়ে মাঝে মাঝে সংশয় কাজ করে।
আমি বহুদিন কোন বিজ্ঞাপনে গ্রাম দেখিনা, খুব বেশি মফস্বল ও দেখিনা। আমরা কি একটা বড় কনজিউমার গ্রুপ থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছি? এর পিছনে কি এই সময়ের ব্র্যান্ড ম্যানেজারদের কালচারাল ওরিয়েন্টেশন দায়ী?
আমি জানিনা। হয়ত সবই আমার এজাম্পশান। আবার কিছুটা সত্যি। সবাই এক রকম অবশ্যই না। তবে একটা সংশয় কিন্তু দিন দিন বাড়ছে।
সবশেষে এইটুকু বলতে চাই, নবীন মার্কেটার যারা এই লেখা পড়ছেন, তারা যেন ফাগুনের এই কড়া রোদেই মার্কেটে যান। একটা ডাব ওয়ালার কাছে গিয়ে একটা ডাব নিয়ে খান, দুইটা প্রশ্ন করেন, কাস্টমারদের সাথে তার কিছু কথোপকথন শুনেন। দেখবেন তার বলার মত অনেক কিছু আছে, যা আপনার ব্র্যান্ড স্টোরিটেলিং এ আজ অথবা কাল সাহায্য করবেই।
ব্র্যান্ড মার্কেটিং একটা সাইকোলজিক্যাল গেম ছাড়া আর কিছুই নয়। এবং এই খেলার বিজয়ী নির্ধারণের নিয়ামক সব থাকে পথে ঘাটে।
সবাই ভালো থাকবেন।