23/08/2026
ভোরের আলো ফুটতেই চারপাশে এখন অন্য রকম এক স্নিগ্ধতা। আকাশে রবিউল আউয়ালের একফালি চাঁদ যেন নীরব এক আগমনী বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। এই মাসটি এলেই আশেকের হৃদয়ে কেমন যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর অব্যক্ত ইশক দানা বাঁধে। বার বার মনে পড়ে যায় সেই জগত-জাহানের নূর-নবাবের কথা, যাঁর পরশে পৃথিবীর সমস্ত শুষ্কতা সজীব হয়ে উঠেছিল। তাঁর প্রতি এই যে অন্তরের গভীর টান, নিঃশর্ত প্রেম আর নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার আকুলতা, এখান থেকেই তো জন্ম নেয় আত্মশুদ্ধির এক নিভৃত পথ। যারা স্রষ্টা ও সৃষ্টির এই নিবিড় প্রেমের পথে হেঁটেছেন, নিজেদের সমর্পণ করেছেন পরম সত্তার ধ্যানে, তাঁরাই সুফি। আর তাঁদের এই যে পথচলা, অন্তরের সমস্ত মলিনতা ধুয়েমুছে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার যে নিরন্তর সাধনা, তা-ই হলো তাসাউফ।
কল্পনা করা যাক এক পুরনো খানকাহ। সন্ধ্যা নেমে এসেছে, প্রদীপের আলো দেয়ালে কাঁপছে। এক কোণে বসে আছেন কয়েকজন মানুষ, বৃত্তাকার হয়ে, মাঝখানে সাজানো কয়েকখানা পুরনো কেতাব। কারও পরনে সাদামাটা জোব্বা, কারও মাথায় পাগড়ি জড়ানো। বাইরের জগতের হিসেব-নিকেশ থেকে অনেকটাই দূরে বসে থাকা এই মানুষগুলো সুফি, তাসাউফপন্থী। তাঁদের আলোচনার বিষয় ধন-সম্পদ নয়, পদমর্যাদা নয়, বরং নিজের নফসের রোগ, অন্তরের মরিচা, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা। এই বৈঠকই তাঁদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সময়, কারণ এখানেই একজন মানুষ নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়।
তাসাউফ কী আর কেনই বা এর প্রয়োজন? এই প্রশ্নের উত্তরে আজকের আলোচনায় বইটির একটি চমৎকার লাইন ধার করে বলতে হয়, "তাসাউফের প্রয়োজন মানে একটি নতুন পরিচয় নেওয়ার প্রয়োজন নয়; বরং নিজের অদৃশ্য রোগগুলোর চিকিৎসার প্রয়োজন।" আমাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা অহংকার, রিয়া, বা লোকদেখানো প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে, ইমাম জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-এর ভাষায় কোরআন ও সুন্নাহর মূলনীতিতে নিজেকে সঁপে দেওয়াই হলো তাসাউফ।
এই আত্মশুদ্ধি আর সুফিবাদের অন্দরমহলের গল্প নিয়েই ইবনে আদম রচনা করেছেন নতুন বই, ‘তাসাউফের বৈঠক’। কুরআন-সুন্নাহ এবং সুফি মনীষীদের শিক্ষা ও স্বীকৃত পাঁচটি মৌলিক গ্রন্থের আলোকে লেখা এই বইটিতে তাসাউফ, সুফি, নফসের পরিশুদ্ধি, তাওয়াক্কুল, মুর্শিদ, খানকাহ ও সিলসিলার তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। তাসাউফ নিয়ে সমাজে যেসব ভুল ধারণা, অতিরঞ্জন আর অপব্যাখ্যা প্রচলিত আছে, গল্পময় এক সুদীর্ঘ বৈঠক ও প্রশ্নোত্তরের আবহে সেগুলোর চমৎকার নিরসন করা হয়েছে এখানে।
বই: তাসাউফের বৈঠক
লেখক: ইবনে আদম
প্রচ্ছদ: সাখাওয়াত সালেহীন
একজন ডিজাইনার হিসেবে প্রতিটি বইয়ের প্রচ্ছদ আমার কাছে একেকটি নতুন ক্যানভাস, নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণ। 'তাসাউফের বৈঠক' বইটির ডিজাইন নিয়েও রয়েছে আমার এক দীর্ঘ ভ্রমণ ও পেছনের গল্প। কাজটির শুরু থেকেই মুহাম্মদ সৈয়দুল হক ভাই তাঁর সুচিন্তিত তথ্য ও ধারণা দিয়ে আমাকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছেন। বইটি যেহেতু সুফিগ্রাফি-র, তাই তাদের মূল টিমের সাথেও তাঁর বেশ কয়েক দফা আলাপ চলে, কীভাবে এই আধ্যাত্মিক আবহটাকে মলাটে ফুটিয়ে তোলা যায়।
চূড়ান্ত এই ডিজাইনটি কিন্তু একবারে আসেনি; এসেছে তিনটি ধাপে। প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে প্রথম ধাপে আমরা ভেবেছিলাম একটি স্টিল-লাইফ কম্পোজিশন দাঁড় করাবো, টেবিলের ওপর রাখা পাঁচটি বই, পাশে দোয়াত আর কলম। কিন্তু ভিজ্যুয়ালি সেটি দাঁড় করানোর পর দেখলাম, বইয়ের নামে যে 'বৈঠক' বা সভার একটি প্রাণবন্ত আবহ রয়েছে, তা যেন ঠিক ফুটে উঠছে না। এরপর দ্বিতীয় ধাপে নতুন আরেকটি ভাবনার ওপর ভিত্তি করে ডিজাইন করা হলো। কিন্তু সেখানে বাঁধলো অন্য বিপত্তি, অন্য একটি বইয়ের ভেতরের ডিজাইনের সাথে এই ধারণার কিছুটা সাযুজ্য চলে আসে, যা স্বকীয়তা নষ্ট করতে পারে।
যথারীতি শেষ ধাপে এসে আমরা এই চূড়ান্ত ডিজাইনটিতে পৌঁছাই। প্রচ্ছদের দিকে তাকালেই দেখবেন, মাটির কাছাকাছি, শান্ত ও স্নিগ্ধ এক আবহে একদল জ্ঞানপিপাসু মানুষ গোল হয়ে বসে আছেন। তাদের মাঝে আছে মূল্যবান পাঁচটি বই। এ যেন বইয়ের ভেতরের সেই আধ্যাত্মিক বৈঠকেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সুফিগ্রাফির নিজস্ব ব্র্যান্ডিং অনুযায়ী বেছে নেওয়া হয়েছে মাটির রঙ, সবুজের প্রশান্ত ছায়া আর হালকা বাদামি-বেইজের সমন্বয়, যা এক ধরনের প্রাচীনতা আর নিরাভরণ সারল্যের আবহ তৈরি করে, ঠিক যেমন সরলতা তাসাউফের মূল কথা। কেবল সামনের অংশই নয়, বরং পুরো বইটির কভার এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন তা তাসাউফের নিজস্ব নিশের (Niche) সাথে পুরোপুরি মিশে যায়।
বইয়ের বিষয়বস্তুর সাথে ডিজাইনের এই যে একাত্মতা, এখানেই এই প্রচ্ছদটির সার্থকতা। একটি বই যখন আত্মশুদ্ধির কথা বলে, স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক গভীর করার কথা বলে, তার প্রচ্ছদকেও হতে হয় শান্ত, গভীর এবং কোলাহলমুক্ত। চরিত্রের আভিজাত্য আর রঙের স্নিগ্ধতা মিলিয়ে এই ডিজাইনটিই যে বইটির জন্য সেরা নির্বাচন, তা প্রচ্ছদটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই অনুভব করা যায়।
সবশেষে আপনাদের কাছেই ফিরে আসি। "তাসাউফের বৈঠক"-এর এই প্রচ্ছদ ও সামগ্রিক ডিজাইন আপনাদের কেমন লাগল? কোন জায়গাটা সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেল, আর কোথাও কি মনে হয় আরও কিছু যোগ করা যেত? পাঠক এবং দর্শক হিসেবে আপনাদের গঠনমূলক মতামত মন্তব্যের ঘরে দেখার অপেক্ষায় রইলাম। আপনাদের ভালোবাসাই আমার আগামী কাজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।