06/04/2026
চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের কান্না
দুইটি দুরন্ত প্রাণ। একটি আট বছরের, অপরটি মাত্র ছয় বছরের। পুকুরের পানিতে গোসল করতে নেমেছিল তারা—নেইমত্থিত দেহে গ্রীষ্মের আমেজ মেটাতে। পুকুরটিই যেন হয়ে উঠল চিরনিদ্রার বাসর_ঘর।
ইয়াসিন ও রাসেল। নাম দুটো আজ শুধুই স্মৃতি।
রবিবারের দুপুরটা কুতুবপুর গ্রামের জন্য হয়ে উঠল কালো অধ্যায়। বাড়ির পুকুর—যেখানে প্রতিদিনই ডুব দিত ছেলেরা, যেখানে মা ডেকে ডেকে সাবধান করত—সেই পুকুরটাই আজ নিল দুই সন্তানকে।
আমি ভাবি মায়ের কথা। তিনি কি এখনো পুকুর পারের জানালায় বসে ডাকবেন—"ইয়াসিন, রাসেল, খেতে ডেকেছি"? নাকি বসে বসে দেখবেন পানির বুদবুদগুলো? কিভাবে তিনি ঘুমাবেন? রাতে যখন ছেলেরা ফিরবে না, খালি দুইটি বালিশ পড়ে থাকবে—সেই শূন্যতা তাকে কখনো ছাড়বে না।
বাবার কথা ভাবি। যে মানুষটি সকালে বাজার করে এনে দিয়েছিল ছেলেদের জন্য চানাচুর। সেই চানাচুর এখন পড়ে আছে, অপেক্ষায়। বাবা হয়তো আজ থেকে আর কখনো পুকুরের দিকে তাকাতে পারবেন না।
প্রতিবেশীরা—যাদের বাড়ির আঙিনায় ছেলেরা দৌড়াদৌড়ি করত, যাদের কাছে চলে যেত চুরি করা আম কুড়াতে—তারা এখন কীভাবে সেই ফাঁকা গলিপথ পার হবে? সহপাঠীরা কাল স্কুলে গিয়ে দেখবে দুইটি খালি বেঞ্চ। শিক্ষকেরা যখন রোল কল করবেন—"ইয়াসিন, রাসেল?"—কী উত্তর দেবে ক্লাসরুম?
একজন সাংবাদিক হয়ে আমি অজস্র সংবাদ লিখি। ঘটনা দেখি, শব্দ বাছি, লাইন সাজাই। কিন্তু এই ঘটনা... চোখের পানি থামে না। কলম নামে না। মনে হয়, সংবাদ নয়, কোনো ব্যক্তিগত ক্ষতি হলো।
এই দুই শিশুর বিদায় শুধু একটি খবর নয়—একটি পরিবারের নিঃশব্দ চিৎকার, একটি গ্রামের বুকে চাপা বেদনা।
আমি জানি না সময় কীভাবে তাদের মা-বাবাকে সামলাবে। কীভাবে তারা পুকুরের পাড়ে বসে ছেলেদের স্মৃতি নিয়ে বাঁচবে। ভয় লাগে, প্রচণ্ড ভয় লাগে—জীবনের এই নিষ্ঠুর হিসাব দেখে।
ইয়াসিন, রাসেল—
তোমাদের জন্য আজ শুধু অশ্রু। আর এই লেখাটুকু মায়ের মতো করে যত্নে, বেদনায়, অভিমানে।
পানির বুদবুদে মিলিয়ে যাওয়া দুইটি ফুলের গল্প এটুকুই।