08/01/2026
আজকে গল্পটা শুরু করি সোহেলের কথা দিয়ে।
সোহেল একজন সাধারণ চাকরিজীবী। বাসা ভাড়া, বাচ্চাদের স্কুল ফি, বাজার-সদাই—সব মিলিয়ে প্রতি মাসে হিসাব করে চলতে হয়। গত মাসে তার পুরনো ফোনটা একদম নষ্ট হয়ে গেল। অফিসের কাজ, বাচ্চাদের অনলাইন ক্লাস, নিজের একটু বিনোদন—সবকিছুর জন্য একটা ভালো ফোন দরকার। বাজেট ধরল ৫০ হাজার টাকার মধ্যে।
ধানমন্ডির বড় মোবাইল মার্কেটে গিয়ে দোকানে ঢুকতেই সেলসম্যান জিজ্ঞেস করল,
“ভাই, অফিসিয়াল নাকি আনঅফিসিয়াল?”
সোহেল ভাবল, “অফিসিয়ালই তো নিরাপদ, ওয়ারেন্টি থাকে।”
সেলসম্যান হেসে বলল, “একদম ঠিক ভাই, NEIR রেজিস্টার্ড, কোনো ঝামেলা নেই।”
শেষে সোহেল কিনে ফেলল **Infinix Note 50 Pro+**—দাম ৫৪,৯৯৯ টাকা। বড় ডিসপ্লে, ভালো ক্যামেরা, নতুন প্রসেসর—দেখতে সবই দারুণ। বাসায় নিয়ে বউ-বাচ্চাদের দেখাল, সবাই খুশি।
কিন্তু কয়েকদিন পরই সমস্যা শুরু। গেম খেলতে গেলে ফোন গরম, ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তবু সোহেল নিজেকে বোঝাল, “অফিসিয়াল তো, ঠিক আছে।”
এক সপ্তাহ পর কাজিন রাকিব এল বাড়িতে। রাকিব সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে। তার হাতে **iQOO Z9s 5G**। সোহেল ফোনটা হাতে নিয়ে অবাক—পারফরম্যান্স অনেক স্মুথ, ক্যামেরা খুব ভালো, ব্যাটারি লং লাস্টিং।
“কত দিয়ে কিনলি?”
রাকিব হাসল, “২৭-২৮ হাজার। আনঅফিসিয়াল, বিদেশ থেকে আনা।”
সোহেলের মনে ধাক্কা লাগল। দ্বিগুণ দাম দিয়ে সে কিনেছে, অথচ পারফরম্যান্সে এত পিছিয়ে!
রাকিব বলল, “ভাই, সব ফোনের প্রসেসর, ডিসপ্লে, ক্যামেরা সেন্সর—সবই চীন থেকে আসে। এখানে অফিসিয়াল বলে শুধু এসেম্বল করে একটা ট্যাগ লাগিয়ে দাম ডাবল করে দেওয়া হয়।”
তারপর মনে পড়ল অফিসের কলিগ আরিফের কথা। আরিফ অফিসিয়াল **Samsung Galaxy S25 Ultra** কিনেছে ২ লাখ ২৭ হাজার টাকায়। কিন্তু তার ভাই দুবাই থেকে একই ফোন এনেছে মাত্র ১ লাখ ১১ হাজারে। একই Snapdragon 8 Elite, একই ক্যামেরা, একই ডিসপ্লে—কোনো পার্থক্য নেই।
আরিফ এখন আফসোস করে, “এই বাড়তি ১ লাখ ১৬ হাজারে বাসার ফার্নিচার কিনতে পারতাম, বাচ্চাদের স্কুল ফি অনেকদিন চালাতে পারতাম, পুরো পরিবার নিয়ে একটা সুন্দর ট্রিপ হতো। শুধু একটা ‘অফিসিয়াল’ ট্যাগের জন্য টাকা উড়িয়ে দিলাম।”
পাশের বাসার রহিমাও একই ভুল করেছে। অফিসিয়াল **Itel** ফোন কিনেছে ১৮ হাজারে—পুরনো Unisoc T620 প্রসেসর, ফোন চলে খুব স্লো। একই দামে আনঅফিসিয়ালে অনেক ভালো স্পেক পাওয়া যেত। রহিমা এখন বলে, “নাম ছাড়া কিছুই পেলাম না।”
রিসেল ভ্যালুতে ধাক্কাটা আরও বড়।
সোহেলের ফোন ৬ মাস পর বেচলে পাবে ২৫-২৬ হাজার—লস প্রায় ২৯ হাজার।
রাকিবেরটা বেচলে ২২-২৩ হাজার—লস মাত্র ৫-৬ হাজার।
আরিফের লস তো লাখের ওপরে।
কারণ সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে অফিসিয়াল-আনঅফিসিয়াল দেখে না—দেখে কন্ডিশন আর মডেল।
খোঁজ নিয়ে সোহেল বুঝল, NEIR-এর নামে প্রতিযোগিতা কমিয়ে একটা মনোপলি তৈরি হচ্ছে। যারা বছরের পর বছর কম দামে ভালো ফোন এনে আমাদের উপকার করত, তারা এখন দোকান বন্ধ, হয়রানি আর মামলার শিকার। সাম্প্রতিক আন্দোলনে গ্রেপ্তার, লাঠিচার্জ—সবই হয়েছে।
প্রতিযোগিতা না থাকলে দাম আরও বাড়বে। ঠকবো আমরা—সাধারণ ক্রেতারা।
এখন সোহেল যখন কাউকে ফোন কেনার পরামর্শ দেয়, শুধু একটা কথাই বলে—
“স্পেক & কনফিগারেশন দেখো, পারফরম্যান্স দেখো, দাম দেখো। ট্যাগ দেখে টাকা নষ্ট কোরো না। সব ফোনই বাইরে থেকে আসে। যে কম দামে ভালো ভ্যালু দেয়, তার কাছ থেকে নাও।”
আর নিজেকে বলে,
“পরের বার স্মার্টলি কিনব। ট্যাগ না, ভ্যালু কিনবো।”
তুমি কী কিনবে—ট্যাগ নাকি ভ্যালু?
পছন্দ তোমার। 💭
বাকি সিদ্ধান্ত আপনার বিবেকের ওপর।