17/08/2014
স্মার্টফোন আসার আগে আমরা ফোন কিনতাম ক্যামেরা, অডিও কোয়ালিটি, চার্জ কেমন থাকে এসব দেখে। কিন্তু এখন এসবের সাথে নতুন করে প্রসেসর, জিপিইউ এবং র্যামও যোগ হয়েছে,যা দেখে ফোন কেনা খুব জরুরি। কিন্তু যিনি প্রথমবার কিনছেন, তার জন্য দুর্বোধ্য! আপনি যেন কোন ভুল না করেন সে লক্ষ্যেই এই লেখা। চলুন দেখা নেয়া যাক নতুন অ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনার সময় হার্ডওয়্যারের কোন কোন বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
স্মার্টফোন ক্ষুদ্র কম্পিউটার_
প্রথম কথা হলো, অ্যান্ড্রয়েড ফোনকে ফোন না ভেবে একটি ছোট কম্পিউটার ভাবুন। একটি ভাল প্রসেসর আপনাকে অনেক দ্রুত কাজ করতে সাহায্য করবে। আর র্যাম যত বেশি হবে তত বেশি/বড় অ্যাপ্লিকেশন/গেমস চালাতে পারবেন। জিপিইউ হচ্ছে "গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট"- এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এর কাজ হল আপনার ডিসপ্লেতে যেসব জিনিস আসবে তা প্রসেস করা, কিছুটা বলতে পারেন আরেকটি প্রসেসর যার কাজ শুধু গ্রাফিক্স যেমন মুভি, গেম গ্রাফিক্স এসব প্রসেস করা। জিপিইউ শক্তিশালী হলে উন্নতমানের গেমস এবং এইচডি মুভি চালাতে কোন সমস্যা হবে না। প্রসেসর কম্পিউটারে বোঝা সহজ হলেও মোবাইলের ক্ষেত্রে বেশ ঝামেলার।
প্রসেসর_
প্রসেসরকে আপনি ভাবতে পারেন একটি মানুষ হিসাবে, যিনি অনেক কাজ করতে পারেন। কিন্তু তিনি সব রকমের কাজ করতে পারেন না, তাকে যা শেখানো হয়েছে কেবল সেগুলোই তিনি করতে সমর্থ। অনেক সময় আবার উনার মত আরো লোক থাকতে পারে, তখন একটি কাজ তারা ভাগ করে করে ফেলেন। এই একাধিক লোক বা প্রসেসর থাকাকেই মূলত ডুয়েল-কোর, কোয়াড-কোর ইত্যাদি বলা যেতে পারে। প্রসেসরের ক্ষেত্রে কি কি কাজ প্রসেসর করতে জানে তাকে বলা হয় ইন্সট্রাকশন সেট। একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনার সময় প্রথমেই দেখতে হবে ইন্সট্রাকশন সেট কোনটি। পুরাতন ফোনের প্রসেসরের থাকে ARMv6 বা ARMv11 ইন্সট্রাকশন সেট, যেটা এখনকার যুগে নতুন কোন বড়সড় প্রোগ্রাম/গেম চালাতে অক্ষম। এখন আর ARMv6 ফোন না কেনাই উত্তম। এই তথ্য আপনি ফোনের স্পিসিফিকেশন সাইটেই পাবেন। যদি ARMv7 বা এর পরের হয়, তাহলে প্রসেসরটি উন্নতমানের। এরপর হচ্ছে প্রসেসর গঠন বা আর্কিটেকচার। এখানেই হচ্ছে দ্বিতীয় দেখার বিষয়, আর্কিটেকচার কি???
প্রসেসর আর্কিটেকচার_
ARMv7-এর মধ্যে আর্কিটেকচার মুলত ৫ প্রকার। সেগুলো হলো Cortex A5, A7, A8, A9 ও A15. সব কোম্পানিই এই ৫ আর্কিটেকচার মেনে প্রসেসর তৈরি করে থাকে। করটেক্স A5 অনেক পুরাতন, বেশ দুর্বল; আর করটেক্স A15 হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী। যেহেতু এখনও A15 এর কোন ফোন বাজারে আসেনি। সম্প্রতি বাজারে আসা গ্যালাক্সি S4-এ ব্যবহৃত হয়েছে A15 এর সিপিইউ। সেহেতু অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে কেনার সময়ে সম্ভব হলে A9 নেয়া উচিৎ, না হলে A7; আর A5 না নেয়াই ভাল। কিন্তু অনেকেই আছেন যারা ফোনে বেশি এইচডি গেম খেলেন না কিংবা মুভি দেখেন না। তাদের জন্য আবার A5 নেওয়াই ভালো হবে। কেননা, Cortex A5 প্রসেসরগুলো খুবই কম ব্যাটারি ব্যবহার করে যার ফলে আপনি আপনার ফোনে দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ পেতে পারেন। প্রসেসরের আরেকটি ব্যাপার হলো NEON সাপোর্ট। এটি জটিল কিছু না। NEON থাকার অর্থ হলো আপনার প্রসেসর এইচডি মানের ভিডিও সরাসরি দেখাতে সক্ষম। এর পর ক্লকস্পীড বা প্রসেসর কাজের গতি। অবশ্যই যত বেশি হবে ততো ভাল। এবার প্রসেসরের শেষ ব্যাপার, মাল্টিকোর কিনা। প্রথমেই বলেছিলাম, ২জন থাকলে কাজ ভাগ করে করা যায়, ব্যাপারাটি ঠিক সেরকম। ডুয়াল কোর মানে ২টি প্রসেসর, কোয়াড-কোর মানে ৪টি। প্রসেসর কোয়াড-কোর মানেই যে এটি ভাল হবে- তাও আবার ঠিক নয়। কিন্তু কোর কয়টি না দেখে শুরুতে দেখা উচিৎ প্রসেসর ইন্সট্রাকশন সেট ও আর্কিটেকচার।
র্যাম (রেন্দম এক্সেস মেমোরি)_
প্রসেসরের পর র্যাম। আমাদের মেমোরি কার্ড বা ফোন মেমোরি প্রসেসর যে হারে কাজ করে সে হারে ডাটা পরে দিতে পারেনা। তাই ডাটা আগে র্যামে নেয়া হয়, যা অনেক দ্রুত কাজ করে। যত বেশি র্যাম, তত বেশি ডাটা দ্রুত প্রসেসরে যেতে পারে। তাই ফোন দ্রুত কাজ করে ফেলতে পারে। র্যামেরও স্পীড এবং আর্কিটেকচার আছে, কিন্তু অত মাথা ঘামানোর দরকার নেই। র্যাম মুলত লেখার সময় ৩ প্রকার, DDR1,2&3। 1 এর চেয়ে 2 উন্নত, একইভাবে 2 এর চেয়ে 3 উন্নত।
জিপিইউ (গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট)_
সর্বশেষে রয়েছে জিপিইউ। জিপিইউ নিয়ে অনেক অনেক অনেক তর্ক বিতর্ক আছে এবং সেগুলোর যথেস্ট কারণও আছে। তাই এত ঝামেলা না করে আমি কাছাকাছি সব জিপিইউ এক একটি শ্রেণীতে ভাগ করে একটি টেবিল দিয়ে দিচ্ছি। শ্রেনী নিচ থেকে উপরে, অর্থাৎ প্রথম শ্রেনী সবচেয়ে ভালো এবং বাকিগুলো তুলনামুলক কম শক্তিশালী।
১ম শ্রেণীঃ Adreno 320, Tegra 4/3, Mali T-series/ MPX series, powerVR 5XT/6.
২য় শ্রেণীঃ Adrino 305/225, Mali 400/450MPX, Tegra 2, PowerVR series 5.
৩য় শ্রেণীঃ Adrino 200/205, Mali 400, tegra, PowerVR 531 below.
কিন্তু শ্রেণী মানেই সব নয়, প্রায় সব গেমই ৩য় শ্রেণীতেও চলে। কিন্তু যত ভালও জিপিইউ তত ভালও পারফরম্যান্স পাওয়া যাবে। তাই যতদুর বাজেটে সম্ভব নতুন জিপিইউ'র ফোন কেনা উচিৎ। জিপিইউর সাথে সম্পর্কিত ব্যাপার হচ্ছে স্ক্রিন রেজুলেশন। রেজুলেশন বেশি হলে বেশি পিক্সেল, অর্থাৎ বেশি ডাটা জিপিইউতে প্রসেস করতে হয়। তাই বেশি রেজুলেশন থাকলে শক্তিশালী জিপিইউ থাকতেই হবে ফোনে নাহলে ফোন ধীরগতিতে কাজ করবে বলে মনে হবে। আর আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এইচডি ভিডিও এই তালিকার সব জিপিইউই চালাতে সক্ষম। কিন্তু 1080P এর জন্যে অন্তত ২য় শ্রেনীর থাকতে হবে, তবে 720P সব গুলোই পারবে।
ক্যামেরা ও জিপিইউ_
কিন্তু ঝামেলা এখানেই শেষ নয়, অনেকেই ধারনা করেন যে, ফোন বা ট্যাবের এইচডি ভিডিও রেকর্ডিং শুধু ক্যামেরার সেন্সরের উপর নির্ভর করে। কিন্তু স্মার্টফোনের 720P এবং 1080P ভিডিও রেকর্ডিং আসলে ভাল জিপিইউ ও সিপিইউ এর উপর নির্ভর করে। ক্যামেরা এর সেন্সর শুধু ছবি/ভিডিও রেকর্ড করে। পরবর্তী পর্যায়ে কিন্তু সেটি চলে যায় সিপিইউ এবং জিপিইউর কাছে প্রক্রিয়াকরণ (Rendering) এর জন্য। আর সেই প্রক্রিয়াকরণ শেষ হলেই সেটি ভিডিও আকারে আমাদের দেখার উপযুক্ত হয়।
এক নজরে_
লেখা শেষ করার আগে সবকিছু আরেকটু পরিস্কার করে দেই। সিপিইউ/জিপিইউ যতই ভাল হোক না কেন দু'টোর মধ্যে ঠিকমতো মিল বা combination থাকতে হবে। উদাহরণ হিসাবে Xperia Tipo-কে ধরুন। Tipo তে 512MB RAM, Qualcomm MSM7225AA 800 MHz Cortex-A5 wmwcBD এবং Adreno 200 জিপিইউ দেয়া হয়েছে। প্রথমেই এই ফোন এ 512MB র্যামের পুরোটা কাজে লাগানো যায় না। এটির সিপিইউ-এর এত র্যাম ব্যবহার করার ক্ষমতাই নেই। সে কারণে ফোনটি সাধারণ গেম যেমন Temple Run 2 ও smoothly চালাতে পারে না। অতএব, কেবল জিপিইউ বা সিপিইউ নয়, কম্পিউটারের কনফিগারেশনের মতোই স্মার্টফোন কেনার সময়ও আপনাকে পুরো কনফিগারেশনকেই বিচারে রাখতে হবে। আশা করি এই লেখা পড়ার পর ফোন কেনার সময় অনেক বিভ্রান্তিই দূর হয়ে যাবে। এখন আর বাকি সব ফিচার মিলিয়ে বাজেটের ভিতর সবচেয়ে সেরা ফোনটি বেছে নিন। স্পেসিফিকেশন দেখে আপনি কেবল প্রাথমিকভাবে আপনার পছন্দের ডিভাইসটি কিনবেন। সেটে আসলেই পারফরম্যান্স কেমন, বিল্ড কোয়ালিটি, ডিসপ্লে কোয়ালিটি ইত্যাদি বিষয়গুলো আপনাকে সেট হাতে নিয়ে দেখতে হবে। তাই নিজে নেড়েচেড়ে না দেখে কেবল স্পেসিফিকেশনের উপর ভিত্তি করে আবার ফোন কিনতে যাবেন না যেন!