07/06/2020
O±
#'o' পজিটিভ
#ঈপ্সিতা_মিত্র
রাত তখন প্রায় ১২টা | রাজারহাট এলাকার রাস্তাগুলো বেশ শুনশান | এই ফাঁকা রাস্তায় হার্দিকের গাড়ি ফুল স্পিড নিল | একটা একসিডেন্ট ওকে করতেই হবে আজ | ব্যাস,অনেক হয়েছে | অনেক বেঁচে নিয়েছে ও | আর না | চারিদিকে সবাই এত ফেক , এত মুখোশ পরা লোকজন ! এত কমপ্লিকেশন | হার্দিক আজ ক্লান্ত | খুব ক্লান্ত | আসলে যখন এই চেনা মানুষগুলোর অচেনা মুখ গুলো একের পর এক সামনে আসতে থাকে তখন চারিদিকটা এত ভয়ংকর হয়ে যায় ! তাই আজ ও এই ডিসিশনটা নিয়েছে | নিজেকে শেষ করে দেয়ার ডিসিশন | পয়জেন ,ঘুমের অসুধ ও খেতে পারত | কিন্তু বাড়িতে দুটো কাজের লোক আছে রাত দিনের , ওরা ঠিক হসপিটালে নিয়ে গিয়ে বাঁচিয়ে দেবে | আর অফিস বিল্ডিং থেকে ঝাঁপ মারবে না কারণ হাইট এ বেশ ভয় লাগে | তার থেকে এটাই বেস্ট | ড্রাইভ করতে এমনিতেও বেশ ভালো লাগে | তাই মরবেই যখন তখন পছন্দের একটা জিনিস করেই মরা যাক | এই সব ভাবতে ভাবতেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বট গাছটাকে ধাক্কা দিল | ইচ্ছে করেই | বেশ জোরে গাড়িটাকে নিয়ে গিয়ে ধাক্কাটা দিল | গাড়ির সামনের কাঁচটা এক সেকেন্ড এ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে এখন | হার্দিকের মাথাটা মনে হলো যন্ত্রনায় ছিঁড়ে যাচ্ছে , আসতে আসতে চারিদিকটা অন্ধকার হয়ে আসছে চোখের সামনে | হঠাৎ এই মুহূর্তে শেষ বারের মতন হার্দিকের মনটা যেন বলে উঠলো , ''যাক, মিশন একমপ্লিশড ..''
হার্দিকের চারিদিকটা আবছা থেকে পরিস্কার হচ্ছে , চোখ টা আসতে আসতে খুলছে ওর | মরার পরে যেখানে এলো সেই জায়গাটার দেয়াল গুলো সাদা ,আর পর্দা গুলো নীল না কি ! ও মনে হয় কোনো একটা ঘরে আছে, মাথায় এখনো বেশ যন্ত্রণা | যাঃ বাবা ! মরার পরও তার মানে ব্যথা যন্ত্রণা এই সব ফিল হয় ! এ কি , পাশে এটা কে দাঁড়িয়ে আবার ? বেশ মিষ্টি দেখতে তো মেয়েটাকে |
" হাই , আমি মিষ্টি | থ্যাঙ্ক গড আপনার সেন্স এসেছে | পুরো দু দিন পর জানেন | আপনি এখন লাইফ কেয়ার হসপিটালে আছেন | ডাক্তার বলেছে টেনশনের আর কোনো কারণ নেই | সো , ডোন্ট ওরি.. "
হ্যাঁ ! মানে এই সাদা ঘর আর নীল পর্দাটা একটা hospital এর কেবিন ! আরে , ওর হাতেও তো স্যালাইন চলছে | তার মানে এত কিছু করে যে এক্সিডেন্টটা করলো সেটা বিফলে গেল ! এইসব ভাবনার ভিড়েই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা আবার বলে উঠলো,
" কি হলো ? আপনি কিছু বলছেন না কেন ? শরীর খারাপ লাগছে ?"
না, এবার হার্দিক ডিরেক্টলিই কোয়েশ্চেনটা করেই ফেললো,
" আমি মরিনি ?"
" না | আমি বাঁচিয়েছি |" ---- মেয়েটা এক কথায় উত্তর |
হার্দিক এবার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললো , "মানে ?"
" মানে আপনার এক্সিডেন্টটা যা হয়েছিল ! যদি ঠিক সময়ে আমি হসপিটালে না নিয়ে আসতাম তাহলে তো আর কিছু করাই যেত না | শুধু কি তাই !আপনার ব্লাড গ্রূপ 'বি' পজিটিভ | এখানকার ব্লাড ব্যাংকে ছিলই না | তারপর আমি বললাম 'কোই বাত নেহি' | আমার ব্লাড আছে কি করতে ! দিয়ে দিলাম , দু বোতল | আসলে 'ও' পজিটিভ তো, খুব কাজে লাগে | ব্যাস আপনি বেঁচে গেলেন |"
মিষ্টি এক গাল হেসে কথাগুলো বলে গেল | বেশ প্রাউডলি | একজনের জীবন বাঁচিয়েছে বলে কথা ! কিন্তু হার্দিকের এই সব শুনে মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠলো | গলার আওয়াজ সপ্তকে চড়িয়ে বললো,
"আপনাকে কে বলেছে শুনি এত কিছু করতে ! কোথাকার সমাজ সেবিকা আপনি ? নিজের রক্ত নিজের কাছে রাখুন | আমাকে দান করার কি ছিল !. আমি চেয়েছিলাম কি ?"
"এই.. আপনি চেঁচাচ্ছেন কেন ? অদ্ভুত তো ! কোথায় আমাকে থ্যাংকস বলবেন | অত বড় একটা এক্সিডেন্ট থেকে বাঁচালাম ! ত়া না !"
"ওটা এক্সিডেন্ট ছিল না, সুইসাইড ছিল | আর আমি বাঁচতে না , মরতে চেয়েছিলাম | আর আপনি সব কিছুতে জল, ওহ সরি ,আপনার 'ও' পজিটিভ রক্ত ঢেলে দিলেন | "
মিষ্টি যেন আকাশ থেকে পড়ল...
"কি ? আপনি সুইসাইড করতে গিয়েছিলেন ? সে কি ! আপনি জানেন না আত্মহত্যা মহাপাপ | আর সেটার থেকেও বড় কথা, যদি ধরুন পুরোপুরি মরতেনও না , আবার পুরোপুরি বাঁচতেন ও না ! কোমায় টোমায় চলে যেতেন ? তখন কি হত ! আর আপনার মা বাবা, ফ্যামিলির কথা তো ভাবুন |"
এবার হার্দিকের মাথাটা একটু ঠান্ডা হয়েছে | আসলে ওই কোমায় চলে যাওয়ার কথাটা শুনে সত্যিই ভয় লেগে গেছে একটু | তাই গলার ভয়েজটা নিচে নামিয়ে বললো , -------
" আমার মা বাবা নেই | আমি যখন ছোট ছিলাম, তখনি একটা প্লেন ক্র্যাশ এ ; "
" ওহ , রিয়ালি সরি ... কিন্তু আপনার আর কেউ তো থাকবে ? ওয়াইফ , গার্লফ্রেন্ড ! তার কথা তো ভাববেন ?"
এই কথাটা শুনে হার্দিক আবার উত্তেজিত হয়ে গেলো , " আরে , ওটার জন্যই তো সব ! "
" ওহ, বুঝেছি | প্রেম ঘটিত ব্যাপার | ত়া ত্রিকোণ প্রেম না কি পরকিয়া ?"
" আমার চার বছরের একটা রিলেশন ছিল | নেক্সট মন্থ - এ বিয়ে | আর সেদিন জানতে পারলাম এত দিন ধরে আমাকে ইউজ করছিল | ওর মডেলিং কেরিয়ার এর জন্য | আমার বিজনেস এর থ্রু দিয়ে অনেক কন্ট্যাক্টস , সেই গুলো ইউজ করছিল | ব্যাস |"
" ওহ , এটা খুব বাজে | সত্যি | কিন্তু এই একটা ব্রেক আপ এর জন্য আপনি বোকার মতন সুইসাইড করছিলেন ? এই যে দেখুন আমি , আমার সেই কলেজ লাইফ থেকে আজ অব্দি দশটা ব্রেক আপ হলো | কোনো বয় ফ্রেন্ড টেকেই না ! লাস্ট-টার সাথে তো বিয়ের কথাও চলছিল | তারপর হঠাৎ একদিন বললো বিয়েতে ওকে টু বিএইচকে ফ্ল্যাট গিফ্ট করতে হবে | ভাবুন একবার ! আমিও মুখের ওপর বললাম গেট আউট .."
এইসব শুনে হার্দিক শুকনো মুখে বললো , --- "ওহ .. ভালো করেছেন |"
এতে মিষ্টি আরোও উৎসাহিত হয়ে বললো , " তাহলে আপনিও এই ভালো কাজটা করুন | যারা আপনাকে হার্ট করেছে , ঠকিয়েছে ,তাদের জন্য বেকার বেকার মরতে কেন যাবেন ! বরং আই সাজেস্ট খুব হ্যাপিলি বেঁচে তাদের দেখিয়ে দিন যে তাদের ছাড়াও আপনি ব্যাপক আছেন |."
"আপনি কি সাইকোলজিস্ট ? মানে আপনার কথা দেখে মনে হচ্ছে ! আপনি কি আমার কাউন্সিলিং করছেন ? আর আমার কিন্তু বেশ ভালো লাগছে |"---হার্দিক এবার চোখগুলো গোল গোল করে জিজ্ঞেস করলো |
এই কমপ্লিমেন্টটা শুনে মিষ্টির মুখে হাসি , ---- " থ্যাংকস ফর দ্যা সম্মান... কিন্তু আমি রিপোর্টার | আর এই সব জ্ঞান দেয়া আমার বর্ন ট্যালেন্ট | আপনার আর লাগলে বলবেন , ফ্রি সার্ভিস .. এটা আমার কার্ড | মনে হলে ফোন করবেন | আজ আসি |."
কথাটা শেষ করেই হার্দিকের হাতে অফিস থেকে পাওয়া নিজের ভিজিটিং কার্ডটা দিয়ে মিষ্টি চলে গেলো | এর মধ্যে হার্দিকের মাথার যন্ত্রণাটাও এখন অনেকটা কম | আর সঙ্গে মনের যন্ত্রনাটাও | .ধুর ! শুধু শুধু এক্সিডেন্ট টা করতে গেল | আগে যদি কার্ডটা থাকত ! তাহলে একটা কল করলেই হয়তো কাজ মিটে যেত !
সেইদিনের পর হার্দিক ফোন করেছিল | আসলে একটা কাউন্সিলিং এ কি আর হবে ! চার পাঁচটা কাউন্সিলিং, বেশ কিছু জ্ঞানের বাণী তো চাই | ডিপ্রেসন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য | এই যেমন সেদিন, অফিস এ সন্ধ্যেবেলা মিটিং টা শেষ করে মনে হলো, কাজ ছাড়া তো ওর লাইফ এ আর কিছুই নেই | একটা নিজের লোকও না | এই লোনলি লাইফে ও কি করবে ! তখনি মন উত্তর দিয়ে দিল, "মিষ্টি কে কল.."
"হ্যালো, দেখা করা যাবে ?"
"ওকে ,আমারও অফিস শেষ | প্রিন্সেপ ঘাটে চলে এসো | " ,---- মিষ্টির এক কথায় উত্তর |
হ্যাঁ ,এখন আর আপনি আজ্ঞে না | হালকা একটা বন্ধুত্ব তো হয়েইছে | তাই নো ফর্মালিটি | আর মিষ্টিকে হার্দিকের খুব আলাদা লাগে | মানে ওর কথাগুলো ! এই রকম কথা এর আগে কখনো কোথাও কারোর কাছে শোনেনি | আসলে হার্দিকের এত বড় বিজনেস ! তার জন্য যাদের সাথেই ওর আলাপ হয় তারাই ওকে বেশ মন যুগিয়ে কথা বলে | একটু এক্সট্রা সুনাম | এক্সট্রা ভদ্রতা | কিন্তু মিষ্টি ওই সব পাঠ্বেলাতেই নেই ! এই যেমন সেইদিন প্রিন্সেপ ঘাটেই বলছিল,
"তোমার আর কি ! সারাদিন এসি রুমে বসে লোকজনকে অর্ডার দেয়া | তুমি জানো তোমার একটা ইন্টারভিউ পাওয়ার জন্য তোমার পি.এ কে কত তেল মেরেছি ? ওই এক্সিডেন্টের দিন যদি জানতাম তুমিই কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড এর নতুন শাইনিং ষ্টার সেই হার্দিক সেন ! তাহলে দু মিলিমিটার রক্ত কম দিতাম |"
সত্যি ! এর কি উত্তর দেবে হার্দিক ! .কি ই বা বলার থাকতে পারে এরপর | তা ও কিছু কথা সাজিয়ে বললো , ---
" সরি ,আমি কি জানতাম তখন যে তুমি আমার লাইফ বাঁচাবে ! তাহলে একটার জায়গায় দশটা ইন্টারভিউ দিতাম | আর এটাও ভুল যে আমি সারাক্ষণ এ.সি রুম এ বসে অর্ডার দিই | অফিসের সবাইকে দিয়ে কাজটা আমাকে ঠিক সময়ে কমপ্লিট করিয়ে নিতে হয় | এতো এতো প্রজেক্টস হ্যান্ডেল করা থেকে ডেডলাইন ম্যানেজ করা , সব আমাকেই দেখতে হয় , বুঝলে | বস হওয়া অতো সহজ কাজ না | "
এই রকম টুকটাক, হিসেবী, বেহিসেবি অনেক কথা হয় মিষ্টির সাথে হার্দিকের | যেটা এর আগে আর কারোর সাথে কখনো হয়নি | এই রকম অনেক কাজও করেছে মিষ্টির সাথে যেটা এর আগে কখনো আর কারোর সাথে করা হয়নি | যেমন গঙ্গা বক্ষে নৌকা ভ্রমন, রাস্তার পাতি চায়ের দোকানে বসে প্লাস্টিকের কাপে চা খাওয়া, নিউ মার্কেট এ ঘুরে ঘুরে শপিং |
এইভাবে দেখতে দেখতে প্রায় নটা মাস কেটে গেছে | হার্দিকের মধ্যে ডিপ্রেশন এর ডি ও আর নেই | বরং কারোর মুড্ অফ দেখলে ও নিজে এগিয়ে গিয়ে জোকস শোনায় তাকে | এটাকে বলে 'সমাজ সেবা' | মিষ্টি শিখিয়েছে | আর ভালো টাইম পাস ও | তবে এর মধ্যে আরো একটা ব্যাপারও হয়েছে | যেটা যে কোনো রোমান্টিক স্টোরিতেই হয়ে থাকে | হার্দিক মিষ্টির প্রেমে পরেছে | বেশ ভালো মতন ভাবে | কি করে যে মিষ্টির লাইফ এ দশটা ব্রেক আপ হলো ! সত্যি , এই রকম একটা মিষ্টি মেয়ের প্রেমে না পরে থাকা যায় ! যদিও মিষ্টি হার্দিককে প্রেমের কোনো সাইনই দেখায়নি | কিন্তু তাতে কি ! এই যে এত ফোন কলস,এত দেখা, এত কাউন্সিলিং , এত জ্ঞান, এত গল্প , সবই কি এমনি ! নিশ্চয়ই মিষ্টি কিছু ফিল করে | আর বাকিটা হার্দিক করবে | প্রপোজ করে |
সেই দিন এই সব ভাবতে ভাবতেই মিষ্টির সাথে দেখা করেছিল | আর বলেও দিয়েছিল নিজের ফিলিংস এর ব্যাপারে | কিন্তু তারপরই সবটা কেমন উল্টে গেল | মিষ্টিকে এতটা গম্ভীর এর আগে কখনো দেখেনি ! ' আই লাভ ইউ টু ', বা ' আই সি ইউ এস এ ফ্রেন্ড ', বা ' আই এম নট ইন্টারেস্টেড ' এই সব চেনা লাইন কিছুই বললো না ও | শুধু বললো, 'এটা সম্ভব না..' | ব্যাস | কেন, কি বৃত্তান্ত এই সবের মধ্যেই গেল না | আর একটা এক্সট্রা ওয়ার্ডও খরচ করলো না |
এরপর সাত দিন কেটে গেছে | মিষ্টির না কোনো ফোন, না কোনো ম্যাসেজ | হার্দিক কল করেছে বহুবার | কিন্তু ফোন টা বেজে গেছে | .কেউ ধরেনি |আর হার্দিকের কাছে বাড়ির এড্রেস ও নেই যে গিয়ে জিজ্ঞাসা করবে ! এইভাবে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়ার মানেটা কি ! একটা উত্তর তো চাই | না, হার্দিক আর চুপচাপ বসে থাকবে না |.কিছু একটা করতেই হবে | হার্দিকের কাছে সেই হসপিটালে পাওয়া মিষ্টির কার্ড টা ছিল | ওখান থেকেই অর পত্রিকার অফিস এর নম্বর টা পেল, আর অফিস থেকে মিষ্টির বাড়ির ঠিকানা | আজ গিয়ে একটা হেস্ত নেস্ত করেই ছাড়বে |
প্রত্রিকার অফিস থেকে যে এড্রেসটা পেয়েছিলো সেটা অনুসরণ করে হার্দিক এখন বালিগঞ্জ প্লেস এর একটা একতলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে | কলিং বেলটা বাজাতে মিষ্টিই দরজাটা খুললো | একটু যেন অবাক হয়েছিল হার্দিককে সামনে দেখে ! একেবারে বাড়িতে চলে আসবে ভাবেনি | কিন্তু হার্দিকের মাথা এখন খুব গরম | ড্রয়িং রুমে ঢুকেই বেশ চেঁচিয়েই বললো , -------
" কি ভাবো কি নিজেকে ? মিস ইন্ডিয়া ? ফোন টা ধরতে কি হয় ?"
কথা গুলো বলতে বলতেই হঠাৎ ঘরের জানলার কাছে চোখটা চলে গেল হার্দিকের | হুইল চেয়ারে এক মহিলা বসে | মাঝারি বয়স্ক | মুখটা বেশ সুন্দর |কিন্তু চোখ দুটো স্থির | চোখের পলকও খুব একটা পরছে না | একভাবে জানলার দিকে তাকিয়ে | এইসব দেখে হার্দিকের মনে হঠাৎ একটা প্রশ্ন এসে উঁকি দিলো , এই মহিলা কে? তবে জিজ্ঞেস করার আগেই মিষ্টি বলে উঠলো ,
"ওই হুইল চেয়ারে যে বসে আছে , সেটা আমার মা | সাত বছর ধরেই এই রকম | আজ অব্দি একটা কথাও বলেনি কারোর সাথে | আমার যখন ক্লাস টুয়েলভ , তখন একদিন রাত্রিবেলা বাবা অফিস থেকে ফেরার পর মা বাবার মধ্যে হঠাৎ একটা ঝামেলা হয় | খুব সাধারণ ব্যাপার নিয়ে | মা মনে হয় বাবাকে কিছু বাজার করতে আনতে বলেছিলো সকালে , আর বাবা সেটা ভুলে গিয়েছিলো | ব্যাস , এই নিয়েই দুজনের মধ্যে রাগারাগি | বাবা সেইদিন রাগে কিছু খায়নি , আলাদা ঘরে ঘুমোতে গিয়েছিলো | আসলে বাবা প্রথম থেকেই খুব সেনসিটিভ ছিল, এটা আমি জানতাম | যাই হোক, এইসবের পর আমিও সেদিন ঘুমোতে চলে গিয়েছিলাম | কিন্তু পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম বাবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে দেয়া | দরজাটা কোনো রকমে আমি আর মা ভেঙেছিলাম | আর তারপর দেখলাম , বাবা ঝুলছে | ফ্যানের সাথে , মায়ের শাড়ি বেঁধেই | সুইসাইড নোট লিখেছিল একটা |অফিস এ ও না কি বাবার বস সেই দিন খুব অপমান করেছিল কাজের একটা ভুলের জন্য | সেই সব মিলিয়েই |"
এইসবের পর হার্দিকের প্রায় আর কিছুই বলার ছিল না | যা হয়েছে তার সত্যিই কোনো শান্তনা হয় না ! খুব অদ্ভুত লাগছিল | যার সাথে এত দিন এত কথা হয়েছে তার জীবন সম্পর্কে ও এক পার্সেন্ট ও জানত না ! ভাবেওনি যে তার নিজের জীবন সাত বছর ধরে একটা জায়গায় থেমে আছে | তাই আজ শুনছিল চুপ করে , মিষ্টির সব কথা | যেইগুলো এতদিন শোনা হয়নি | বোঝা হয়নি |
------ "মা ওই সব দেখে চুপ করে গেল কেমন | তারপর না কেঁদেছে, না হেসেছে | অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে | কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি | আমি হয়ত ওই জন্যই ভালো কাউন্সিলিং করতে পারি ! সাত বছর ধরে কত সাইকোলজিস্ট ,কত সাইকিয়াট্রিস্ট এর কত কথাই তো শুনলাম | ওই সব ব্রেক আপ ,হ্যান,ত্যান, আমি বানিয়ে বলেছিলাম | তোমাকে বোঝানোর জন্য | সুইসাইড ব্যাপার টা কি, কতটা ভয়ংকর ভুল. আর তার জন্য কত গুলো লাইফ শেষ হয় এটা আমি নিজের জীবন থেকে দেখেছি | জানি | আর মা কে মেন্টাল এসাইলাম এ দিয়ে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না | যাই হোক এত ঘটনা শোনার পর আর আমাদের যোগাযোগ না রাখাই ভালো | অল দা বেস্ট ফর ইওর লাইফ .."
মিষ্টি কথাগুলো বলে ভেবেছিল চ্যাপ্টার টা এখানেই শেষ | হার্দিক হয়তো কিছু শান্তনা বাক্য শুনিয়ে চলে যাবে | কিন্তু যা ভাবলো তার কিছুই মিললো না |
হার্দিক অন্য কথা বলে উঠলো , "আমি ইন্ডিয়ার বেস্ট সাইকোলজিস্টদের খুঁজে বার করব | তুমি এটা কেন ভাবছো যে কাকিমা কখনো ঠিক হবে না | মিরাকেল তো হয় | কাকিমা একেবারে ঠিক , আবার আগের মতন হয়েও তো যেতে পারে | আমাদের try তো করতেই হবে | "
এবার মিষ্টি অবাক হয়ে গেলো , পলকহীন ভাবে হার্দিকের দিকে তাকিয়ে বললো , ----- "আমাদের মানে ?"
হার্দিক আলতো হেসে উত্তর দিলো , "মানে আমাকে আর তোমাকে | এন্ড ডোন্ট ওরি , তোমার যদি কখনো মনে হয় আমি বিয়ে করার মতন কেউ , আমাকে সারা জীবন ভরসা করা যায় , তাহলেই আমাদের বিয়ে হবে | নইলে আমি কখনোই তোমাকে বিয়ের জন্য বলবো না | তবে হ্যাঁ , আজ থেকে তোমার লাইফের জার্নিতে ইউ আর নট এলোন .. তুমি চাও কি না চাও , আমি সঙ্গে থাকবোই | আর এতকিছু শুনে মনে হলো আমাদের 'আজ' টা খুব ইম্পরট্যান্ট | পরের টা ভাবতে গিয়ে আমি 'আজ' টা কে হারাতে চাই না | আর সাথে থাকার জন্য 'বিয়ে যে 'করতেই হবে এই রকম কোনো শর্তের দরকার নেই | কোনো condition তো কেউ লিখে দেয়নি | "
মিষ্টি সবটা শুনে ভেজা চোখে আবার বলে উঠলো , "কিন্তু এই ভাবে একটা আনপ্ল্যান্ড ফিউচার ! আমি আমার লাইফ আর সাথে কাউকে এই ভাবে জড়াতে চাই না | "
হার্দিক এবার মিষ্টির হাতটাকে শক্ত করে ধরে , ওর চোখের দিকে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে একটু হেসে বললো , --" জড়িয়ে তো আমি গিয়েছিই | যেই দিন তোমার দেয়া 'ও' পজিটিভ আমার 'বি' পজিটিভ এর সাথে মিশে গেল | আর আফটার অল আমি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক | তাই সব ব্যাপারে যে তোমার সব কথা শুনতে হবে এর তো কোনো মানে নেই | আমি আর তোমার লাইফ থেকে কোথাও যাচ্ছি না , এটাই ফাইনাল | "
এটা শুনে মিষ্টির মুখে একটা হালকা হাসি | হয়ত এই কথা গুলোই হার্দিকের কাছ থেকে শুনতে চেয়েছিল ও , অনেক দিন ধরে , মনে মনে | আসলে এই হঠাৎ আসা ছেলেটা যে কখন ওর মনে একটা পার্মানেন্ট জায়গা করে নিয়েছে , ও বুঝতেই পারেনি ! আর বিয়ে হবে কি হবে না জানা নেই | কিন্তু 'আজ' সাথে থাকুক | এটাই বা কম কি |
----------------------------