31/01/2026
একদিন হযরত বাহলুল রহ. বসরার পথে হাঁটছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল—কয়েকজন শিশু বাদাম আর আখরোট নিয়ে খেলছে। তাদের একটু দূরে এক ছোট ছেলে একা দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
বাহলুল রহ. মনে করলেন, হয়তো খেলনার অভাবে তার মন খারাপ। কাছে গিয়ে স্নেহভরে বললেন, 'বাবা, চাইলে আমি তোমার জন্য বাদাম–আখরোট কিনে দিই। তুমিও ওদের সঙ্গে খেলতে পারবে।'
ছেলেটি বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'আরে বোকা মানুষ! আমরা কি শুধু খেলতেই দুনিয়ায় এসেছি?'
বাহলুল রহ. থমকে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে কী করার জন্য এসেছো?'
ছেলেটি দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল, 'জ্ঞান অর্জন আর আল্লাহর ইবাদত করার জন্য।'
বাহলুল রহ. অবাক হয়ে বললেন, 'বাহ! এ কথা তুমি কোথা থেকে শিখলে?'
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করল—
اَفَحَسِبۡتُمۡ اَنَّمَا خَلَقۡنٰكُمۡ عَبَثًا وَّ اَنَّكُمۡ اِلَیۡنَا لَا تُرۡجَعُوۡنَ
'তোমরা কি ভেবেছিলে, আমি তোমাদের অর্থহীনভাবে সৃষ্টি করেছি? আর তোমাদেরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?'
বাহলুল রহ. গভীরভাবে মুগ্ধ হলেন। বললেন, 'বাবা, তুমি তো জ্ঞানীর মতো কথা বলছো। আমাকেও কিছু উপদেশ দাও।'
ছেলেটি তখন চারটি কবিতা আবৃত্তি করল—
أَرى الدُّنْيا تُجَهِّزُ بانطِلاقٍ
مُشَمَّرَةً على قَدَمٍ وساقِ
فَلا الدُّنْيا بِباقِيَةٍ لِحَيٍّ
وَلا حَيٌّ على الدُّنْيا بِباقِ
كَأَنَّ المَوْتَ وَالحَدَثانَ فيها
إِلى نَفْسِ الفَتى فَرَسا سِباقِ
فَيا مَغْرورَ بِالدُّنْيا رُوَيْداً
وَمِنها خُذْ لِنَفْسِكَ بِالوِثاقِ
অর্থ—
আমি দেখি—দুনিয়া যেন বিদায়ের প্রস্তুতি নিয়ে ছুটে চলেছে,
সমস্ত শক্তি আর তৎপরতা নিয়ে।
না দুনিয়া কোনো জীবিতের জন্য স্থায়ী,
না কোনো জীবিত দুনিয়ায় চিরস্থায়ী।
মনে হয়—মৃত্যু আর বিপদ যেন
তরুণের প্রাণের দিকে ছুটে আসা প্রতিযোগী দুই ঘোড়া।
হে দুনিয়ায় মোহগ্রস্ত মানুষ! একটু থামো,
এই দুনিয়া থেকেই নিজের পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করো।
এরপর ছেলেটি আকাশের দিকে মুখ তুলে দুই হাত উঠাল। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে গাল ভিজিয়ে দিল। কাঁপা কণ্ঠে সে আরও দুটি পংক্তি পড়ল—
يَا مَنْ إِلَيْهِ الْمُبْتَهِلُ
يَا مَنْ عَلَيْهِ الْمُتَّكِلُ
يَا مَنْ إِذَا مَا آمِلٌ
يَرْجُوهُ لَمْ يَخِبِ الْأَمَلُ
অর্থ—
হে সেই সত্তা—যাঁর দিকে প্রার্থনাকারীরা হাত তোলে,
হে সেই সত্তা—যাঁর ওপর ভরসাকারীরা নির্ভর করে,
হে সেই সত্তা—যাঁর কাছে আশা নিয়ে চাইলে
কখনোই সেই আশা ব্যর্থ হয় না।
কবিতা শেষ করেই হঠাৎ ছেলেটি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
বাহলুল রহ. বলেন, 'আমি দ্রুত তার মাথা কোলে তুলে নিলাম। জামার হাতা দিয়ে মুখের মাটি পরিষ্কার করলাম। কিছুক্ষণ পর সে চোখ খুলল।'
আমি স্নেহভরে বললাম, 'বাবা! এত অল্প বয়সে তোমার এত ভয় কেন? তুমি তো এখনো শিশু। তোমার আমলনামায় তো কোনো গুনাহই লেখা হয়নি।'
ছেলেটি চোখ মুছে শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'হে বাহলুল! আমি ঘরে দেখি, মা যখন চুলায় আগুন জ্বালান—তখন বড় বড় কাঠ সহজে জ্বলে না। তাই তিনি আগে ছোট ছোট কাঠ দেন। সেগুলো দ্রুত আগুন ধরে, তারপর বড় কাঠগুলো জ্বলে ওঠে।'
এ কথা মনে হলেই আমার বুক কেঁপে ওঠে—যদি কিয়ামতের দিন আল্লাহও এমন ফয়সালা করেন! যদি বলেন—জাহান্নামের আগুন আগে শিশুদের দিয়ে জ্বালানো হবে, তারপর বড়দের পালা আসবে…!
এই ভেবেই আমি ভয় পাই…
[তাফসির রুহুল বয়ান, সূরা মুমিনূন : ১১৫]
আল্লাহু আকবার! এমনও এক সময় ছিল—যখন ছোট ছোট বাচ্চারাও বসে বসে জাহান্নামের আগুনকে ভয় করত…
#খুতুবাত