Philosophy to Change Us #
জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে! বাংলাদেশি জাতীয়তা নিয়ে যারা জন্মগ্রহন করেছেন এরকম শব্দ গুলোর সাথে তারা ওতপ্রতভাবে জড়িত। খুব ছোটবেলায় ইউনিয়ন পরিযদ/জাতীয় নির্বাচনের সময় আনন্দে দৌড়ে যেতাম রাজপথের মিছিলে । সংগে খেলার সাথীরাও যোগ দিত । বুঝতাম না কোন দলের বা কিসের মিছিল । আনন্দই সই! অসচেতন বাবা মা হয়তোবা খোজই রাখতেন না আমার ।
তাতে মনে হয় ভালই হয়েছে । আর যাই হোক অভিযোজন ক্ষমতাটা ভালোভাবেই অর্জন করেছি। মূল্যবোধের কথাটা না হয় নাই বললাম । অজপাড়াগায়ের মানুষতো, মূল্যবোধ সম্পর্কে কমই বুঝি। তাছারা ডিজিটাল যুগ বলে কথা। আজকালকার মা বাবারা তো ডিজিটাল মূল্যবোধ শেখান ! যে যাই ভাবুক , আমি আমি অন্তত সৌভাগ্য মনেকরি এই ভেবে যে আমার বাবা মা ডিজিটাল প্রজন্মের ছিলেন না।
আচ্ছা সে যাই হোক; আমার দূরদর্শী বাবা মা হয়তো জানতেন দেশ ডিজিটাল হয়ে যাবে তাই একটু বড় হওয়ার পর উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে আমাকে শহরে পাঠিয়ে দিল যাতে করে ডিজিটাল হয়ে যাই । শহরে এসে একই জিনিস দেখলাম পল্টন, প্রেসক্লাব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। “জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে! ” কিন্তু অবাক হয়ে একই জিনিস দেখলাম যে যারা সক্রিয়ভাবে “জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে!” কথাগুলো চিৎকার করে বলছে তারাও আমার ছোটবেলার মত না বুঝে বা বিচার বিবেচনা না করেই বলছে। এটা অবশ্য সে সময় আমার অনুমান ছিল।
যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বা পড়েন তারা হয়তো প্রত্যক্ষভাবে “জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে! ” বলেননি কিন্তু দেশের জন্মের ইতিহাস থেকে আজ পর্যনÍ যে প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে তাতে বাংলাদেশি হিসেবে আপনাদেরও এব্যাপারে ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে আশাকরি। যদি আমি ভূল না বুঝে থাকি, যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বা পড়েন তারা তো “জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে! ” এর উপর স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং কর্মমূখী শিক্ষা নিয়ে ফেলেছেন নিশ্চই। এখানেও দেখেছি একই জিনিসের একটু উন্নত রূপ, না বুঝে না, বুঝেই, কিন্তু বিচার বিবেচনা ছারাই বলছে “জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে! ” । আর যাই হোক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরকে বলা যাবে না যে তারা না বুঝে বলেছে, বরং ভালোভাবে বললে বলা যাবে তারা বিচার বিবেচনা না করে বলেছে। আবার কেউ বা বাধ্য হয়েই বলেছে কিন্তু প্রতিবাদ করে নাই। করেই বা লাভ কি অত বড় জন স্রোতের মধ্যে দু একজনের প্রতিবাদ শোনা যায় না ।তবুও কেউ করতে চাইলে সেটাকে ম্লান করে দেয়া হয়।
থাক সে সব কথা । লেখার মূল উদ্দেশ্য রাজনীতি নয়, উদ্দেশ্য হল দুঃখ প্রকাশ করে বুকটাকে হালকা করা। আমার বাবা মায়ের ডিজিটাল বানানোর সপ্ন পুরন হয় নাই । আমি ডিজিটাল হইতে পারি নাই। নিশ্চিন্ত জীবন হবে, অনেক সম্মান পাওয়া যাবে, চ্যালেন্জ নিতে হবে না এই ভেবে সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সামর্থ্য হয় নাই। অবশ্য সরকারি কর্মকর্তারা কর্মজীবনে প্রবেশের আগে দুঃর্সাধ্য চ্যালেন্জ নিয়ে বিজয়ী হয় বলে বাস্তব কাজে চ্যালেন্জ নিতে বলা বড়ই অন্যায়। সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সামর্থ বা ইচ্ছা হয়নাই জন্য বাবা মা কাছে মাফ চাচ্ছি। অবুঝ বাবা মা তো মাফ করে দিবে। অবশ্য আমি একজন সম্মানিত ঘুসখোর/দুর্নীতিবাজ হলে আমার বাবা কখনই গর্ববোধ করতেন না । যদিও আমাদের বেশিরভাগ বাবা এবং শশুর বাবারা সেটাই করে থাকেন। শশুড় বাবার কথা বললাম একারনে যে ভালো পাত্র বলতে উপড়ি ইনকাম থাকা পাত্রদিগকে বোঝেন তো তাই।
অতঃপর কর্মজীবন। সে এক বিস্ময়! আমি একটি নামিদামী গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির ছোটখাট কর্মকর্তা । যা কোনদিন বাবা মা দুঃসপ্নতেও দেখেন নাই। আমার জব সিলেকসন দেখে তারা বিস্মিত। তবে নিজের সম্পর্কে যা বলা তা হল চ্যালেন্জ কি জিনিস তা আমি হাড়ে হাড়ে জানি। বেশিরভাগ সময় জিতে যাই আর গড়ে প্রতি দুইমাসে একটা হেরে যাই।আমি হয়তো উচ্চ শিক্ষিত না তবে এখানে এসে যে শিক্ষা হয়েছে তাতে পি.এইচ. ডি হয়ে গেছে। বয়স বেড়েছে আর শিক্ষিত ও উচ্চ শ্রেনীর মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা কমে গেছে। আরও পড়াশোনা দূরে থাক, মনে হয়েছে যে আমি এতটুকু পড়াশোনা করেই ভুল করেছি। যদিও পরিবার আরও আশাকরে। ঢাকা শহরের বেশিরভাগ মানুষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যে ভাবে কাজকরে আমিও সেভাবেই করি কিন্তু তারা যেভাবে তাদের জীবনটাকে উপভোগ করে আমি সেভাবে করি না। তাই আমার জীবন কিছুটা দুর্বিসহ। রাতে চাঁদ তারা দেখার চেয়ে উপুর হয়ে ঘুমানো আমার কাছে সবচেয়ে উপভোগের জিনিস। সারাদিন কাজ করে রাতের খাওয়া শেষে একটু টেলিভিশন দেখা আর দৈনিক পত্রিকা পড়াই আমার বিনোদন। কিন্তু সেখানেও একই সমস্যা ! টকশো। রাজনীতিবিদ দের কথা নাই বললাম কারন আমরা বেছে বেছে সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ঠ লোককে নেতা বানাই। নিজের হাতে ভোট দিয়ে আবার গালিও দেই। এজন্য রাজনীতিবিদরা অনৈতিক কিছু বললে মনে হয় এটাই আমাদের প্রাপ্য। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে দেখি দলের দালালী করতে তখন ছোট বেলার কথা মনে হয় , তখন আমি যেমন নির্বোধ বালকের মত বলেছি “জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে! ” ওরা কি সেই বালক আমার মতই বলে কিনা। অন্তত একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের তো বিচার বিবেচনা নাই একথা বলা যাবে না। তাহলে নির্বোধ বলা যাবে! প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়ীত্বে নিয়োজিত চ্যালেন্জ বিজয়ীদের ও তাদের গর্বিত বাবা মায়ের কথা নাই বা বললাম।
দৈনিক পত্রিকাতে প্রায়ই দেখি কৃষকেরা আলু, টমেটো ইত্যাদি কৃষি ফসলের দাম পায়না বলে ডি.সি. অফিসের সামনে ফসল গুলো ছিটিয়ে আন্দোলনরত। “জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে! ” আরে অবুঝ কৃষক, পন্য তোমার আর বাজারজাত করে মুনাফা দিবে ডি.সি.! সেটা তারা কি বিচার বিবেচনা করে একথা বলে সেটা ভাবতে আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। তথাকথিত নির্বোধ, বিচার বিবেচনা করতে অক্ষম কৃষকের কথা মেনে নিলাম কিন্তু তার উচ্চ শিক্ষিত ছেলে তারা কেন ফসলের মূল্য সংযোজন (Value Addition) করতে অক্ষম । তারা কেন একবারও কৃষি ফসলকে কৃষি পন্যে রুপান্তর করে সেই ফসলের মূল্যায়ন বৃদ্ধি করে না? মূল্যায়ন বাড়লে মূল্য এমনিতেই বাড়বে; এই স্বাভাবিক ব্যাপারটা নির্বোধ কৃষক নাও বুঝতে পারে কিন্তু তার উচ্চ শিক্ষিত ছেলে যদি না বুঝে তাহলে কে করবে কৃষকের প্রকৃত মূল্যায়ন ।
দেশের মোট আয়ের বেশিরভাগ কৃষি নির্ভর যা কিনা রপ্তানি আয়ের থেকে অনেকগুন বেশি এবং গার্মেন্টস শিল্প হল রপ্তানি আয়ের ৮৫% । অথচ জল্পনা কল্পনা দেখে মনেহয় দেশের মোট আয়ের ৮৫% গার্মেন্টস শিল্প বহন করে । তাদের জন্য কত প্রনোদনা প্যাকেজ, কত পরিকল্পনা । ভবিষ্যতে এ শিল্প ধংস হলে কি করবেন তাও ভাবা শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞ মহল । অপরদিকে কৃষি খাতে ভর্তুকি নিয়ে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের কথা শুনে মনে হয় বাপের ঘর থেকে দিচ্ছে। সম্রাজ্যবাদীদের পুজা করা নিয়ে না হয় নাই বললাম। গরিব দেশ বলে কথা। বেসরকারি চাকরীজীবি আর শ্রমিকদের মধ্যে চেয়ার ছাড়া কোন পার্থক্য নাই। মিল হচ্ছে এরা সবাই উৎপাদন ও আমদানি রপ্তানিতে ভুমিকা রাখছে। শিল্পপতি ও ব্যাবসায়ী এদেরকে দিয়ে যেভাবে কাজ করায় তাতে মনে হয় তাদের শখের গাড়ির ইন্জিটাকেও তেল মবিল দিয়ে এভাবে কাজ করায় না। আমাদের নিজস্ব উৎস নির্ভর শিল্প কুটির শিল্পে পরিনত হয়েছে এবং প্রায় ধংসের দিকে অপর দিকে বৃহৎ শিল্প হয়েছে আমদানি নির্ভর। দেশীয় শিল্প উদ্দোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যদি নিজস্ব উৎস ও ব্যবহারযোগ্য সম্পদকে মূল্য সংযোজন (Value Addition) করার ব্যাপারে বুঝতে না পারে তাহলে সম্রাজ্যবাদীরা কি সেটা বুঝতে পারবে? আশ্চর্য হলেও সত্য সম্রাজ্যবাদীরা ঠিকই বুঝতে পারে কিন্তু নিজেদের মত করে পরিচালনা করে আর আমরাও তাতে সায় দিয়ে থাকি। সম্রাজ্যবাদীরা কিছু না দিলে (যেমন জি.এস. পি.) সেখানে আমরা বলতে অক্ষম “জ্বালো! জ্বালো! আগুন জ্বালো!, আমাদের দাবি! আমাদের দাবি!, মানতে হবে! মানতে হবে! ”
তাহলে প্রকৃত নির্বোধ ও অবিবেচক কে? হয় আমাদের অবুঝ বাবারা, না হয় আমাদের শিক্ষকেরা, নাকি রাজনীতিবিদ ও ব্যাবসায়ীরা, নাকি সবচেয়ে বেশি আমরা নিজেরা! নির্মম হলেও সত্য আসলে আমরা সবাই। এই হল আমাদের উন্নয়নের দুস্টচক্র।
লেখার বাইরে কিছু কথা : লেখার চরিত্রগুলোর সাথে বাস্তবে কারও মিলে গেলে সেটা অনঅভিপ্রেত কাকতাল মাত্র, তার জন্য লেখক দায়ি না। অ্যাটেনশন তাদের ঘৃণা সহকারে, যাদের চরিত্র লেখার সাথে মিলে যায় ‘ভালোকরে ভেবে দেখেন আপনার বাবা, না হয় দাদা, না হয় তার বাবা এই কৃষকই ছিল; তারা হয়তো মূল্যায়নের অভাবে নিষ্পেসিত ছিল। আর আপনি রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, ব্যাবসায়ী, সরকারি চাকুরে অথবা সুশীল সমাজ’ যারা আম জনতাকে কুশীল মনে করেন এবং খেটে খাওয়া মানুষদের অবমূল্যায়ন করেন। এ সব চরিত্রের বাইরে সমাজে যারা আছেন তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা । সাবাশ তাদের প্রতি যারা নিজেদের উৎস ও ব্যবহারযোগ্য সম্পদকে কাজে লাগায় ও মূল্যায়ন(Evaluation) বৃদ্ধি করে।
আজ আর্বোভাইরাস এর ‘জ্বালো! আগুন জ্বালো!’ এবং অর্থহীনের ‘মা’ গান টা শুনে লেখার প্রয়াস পেলাম ।
“দেখিনি আমরা বায়ান্ন, দেখিনি আমরা উনসত্তর ।
দেখিনি আমরা একাত্তর, দেখেছি তোর চোখের অশ্রু।
আর নয় আর নয় মোরা চুপ, দেখছে সবাই আজ নতুন রুপ।
করবো বিচার তাদের এবার, হাসাবো এবার তোর মুখ”
# #ধন্যবাদ আর্বোভাইরাস, ধন্যবাদ অর্থহীন।
লিখা: ০১-০৫-২০১৪