07/06/2025
বিলপারের নৌকা-খোসা: তিন বন্ধুর এক বিকেল
করিমপুর দক্ষিণপাড়া। গ্রামের শেষপ্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সবুজ ধানক্ষেত, তার মাঝখানে বিস্তৃত এক বিল—যে বিলকে সবাই চেনে বিলপার নামে। এই বিল যেন জীবনের এক টুকরো আয়না, যেখানে গ্রামের ছেলেরা নিজেদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো ভাসিয়ে দেয়।
একদিন দুপুরে, গরম একটু কম, বাতাসে হালকা শীতলতা। তাইজুল ইসলাম, সাইফুল, আর তৈয়ব ইঞ্জিনিয়ার—তিন বন্ধু ঘুরতে বের হলো। মোবাইল, বাজার-সদাই, কাজ-কাম সব ভুলে শুধু একটু নিজের মতো সময় কাটানোর আশায়।
তাইজুল বলল,
“চলো রে ভাই, একটা নৌকা খোসা নিয়ে বিল ঘুরে আসি। মনটা ভরে না আর এই ঘরবন্দি জীবনে।”
সাইফুল মুচকি হেসে বলল, “তুই তো এখন দার্শনিক হয়ে গেছিস দেখি!”
তৈয়ব ইঞ্জিনিয়ার, যার সব কিছুতেই হিসাব, বলল,
“নৌকাটা কিন্তু সোজা রাখতে হবে, বেশি দুললে আমার ভারসাম্য যাবে ভাই।”
তারা তিনজন হাঁটতে হাঁটতে গেল দক্ষিণপাড়ার ঘাটে। সেখানেই বাঁধা ছিল একখানা পুরনো কিন্তু মজবুত নৌকা খোসা। তিনজন নেমে পড়ল নৌকায়। প্রথমে একটু দুলছিল, তাই তৈয়ব চিৎকার করে বলল,
“এই যে! আমি বলছিলাম! ধীরে ধীরে...!”
তাইজুল হাসতে হাসতে বলল, “ভয় পাইস না ভাই, নৌকা যেমনই হোক, আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরবে না।”
নৌকাটা ধীরে ধীরে বিলে ভাসে। চারপাশে শুধু জল আর আকাশ। পাশে দু-একটা পাখি উড়ছে, বিলের পাশে কচুরিপানা, আর দূরে এক পাকা ধানের ক্ষেত।
সাইফুল একটা গান ধরল —
"এই নাও ছাইড়া দিলাম, বন্ধু রে,
ঢেউয়ের ভিতর হারায় যদি, মন ফিরে পায় তরে..."
তিনজন একসাথে গেয়ে উঠল। নৌকা খোসা দুলছে হালকা হাওয়ায়। সময় যেন থেমে আছে। কোন ব্যস্ততা নেই, চিন্তা নেই, শুধু তিন বন্ধুর নিখাদ আনন্দ।
তৈয়ব বলল, “এই বিকেলটা ভুলব না কখনো। ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এত চাপ, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সব কিছু ছাই…”
তাইজুল গভীর গলায় বলল, “ভাই, জীবনের আসল শান্তি এইখানেই—বন্ধু, প্রকৃতি আর একটা নিরিবিলি নৌকা।”
সূর্যটা যখন পশ্চিমে হেলে পড়ল, বিলের জলে লাল রঙ ছড়িয়ে দিল, তারা ধীরে ধীরে ফিরল ঘাটে। নৌকা খোসা আবার বাঁধা হলো আগের জায়গায়।
সাইফুল একবার বিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই নৌকা, এই বিল, এই বিকেল—জীবনের আসল স্মৃতি এগুলাই।”
তিনজন হাঁটতে হাঁটতে ফিরতে লাগল দক্ষিণপাড়ার পথে, পেছনে রয়ে গেল তাদের হাসির আওয়াজ, গানের সুর, আর এক বিকেলের অমলিন স্মৃতি।
---
শেষ নয়, শুরু—স্মৃতির পাতায় একখানা সুন্দর বিকেল।