15/10/2017
"বকুল-৪র্থ পর্ব"
•••
বকুলকে মনের কথাটি বলে যেন আরও বিপদে
পড়ে গেলাম। কোনো কিছুতেই মন স্থির
রাখতে পারছিনা..! সবকিছুতেই কেমন যেন
আনমনা ভাব। জুম্মার নামাজ পড়ে যখন
দুপুরের খাবার খেতে বসলাম, মা হঠাৎ করে
বলে উঠলো...
-- কিরে..! তুই ভাত খাইতে বইছিস সেই কত
আগে..! তোর আব্বার খাওয়া হইয়া গেলো.!
আর তোর থালার ভাত তো দেহি অর্ধেকও
খালি হয়নাই..!
-- খাইতাছি তো মা..!
আসলে খাইতেও ভাল লাগছিলোনা। যে
আমি মায়ের হাতে রান্না করা মাংসের
শুধু ঝোল দিয়েই দুই তিন প্লেট ভাত খেয়ে
ফেলতাম, সেই আমি আজ এক প্লেট ভাতও
শেষ করতে পারলামনা। অর্ধেক খেয়েই উঠে
গেলাম। আচ্ছা প্রেমে পড়লে কি খাওয়া
দাওয়াও কমে যায়..!? অদ্ভুত তো..!
রাতে ঘুমও আসলোনা। আগে ঘুম হতোনা এই
ভেবে যে, কবে বকুলের মুখে শুনবো
ভালবাসার কথা..! কিংবা আমি কবে
বলবো..!? আর আজ আনন্দে যেন দিশেহারা
আমি..! মনটা যেন নতুনভাবে চঞ্চলতা ফিরে
পেয়েছে। মনের মধ্যে সারাক্ষণ একটি
উত্তেজনা কাজ করছে। আনন্দের ঠ্যালায়
যে ঘুমও হারাম হয়ে যায় সেটা
জানতামনা। আচ্ছা এত রাতে আমার মতো
কি বকুলেরও ঘুম আসছেনা!? বকুলও কি ভাবছে
আমার কথা..!? নাকি নাক ডেকে ঘুম
দিচ্ছে..!? কি জানি! হয়তো ভাবছে! হয়তো
বা না..!
তারপরের দিনই বকুল আমার কাছে পড়তে
আসলো। আমি ভেবেছিলাম বকুল হয়তো
পড়তে আসবেনা লজ্জায়..! কিন্তু না উল্টো
আমারই লজ্জা লাগছে বকুলে দেখে..! বকুল
আমার সামনে বসে আছে। আমি ওর সামনে।
কেউ কোনো কথা বলছিনা..! কিছুক্ষণ পর
আমি বললাম...
-- কিরে চুপচাপ বইসা আচিস ক্যান..?
পড়বিনা..!?
বকুল কোনো কথা না বলে বইখাতা খুলে
মাতা নিচু করে খাতায় লিখতে লাগলো..!
আর আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বকুলকে
দেখতে লাগলাম..! বকুল পড়া শেষ করে চলে
গেল..। কোনো কথাই বললোনা..! আচ্ছা
আমি তো বলে দিয়েছি মনের কথাটি।
কিন্তু ও যে কিছুই বললোনা..! বকুল কি
বলবেনা আমাকেও ও ভালবাসে..!?
জিজ্ঞাসাও তো করলামনা!?
প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যায় পড়তে বসলাম।
ভাবলাম আজ পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসটা
পড়ি..! ওটা এখনো পড়া হয়নি। বইটা খুলেই
আমি অবাক হয়ে গেলাম..! বইয়ের ভাঁজের
মধ্যে একটি চিঠি..! বুকের মধ্যে ধকধক করছে
আমার..! আমি দেখেই টের পেয়েছি এটা
বকুলের লেখা..! হাতের লেখা দেখে
নিশ্চিত হলাম। আমার সারা শরীর যেন
ঠান্ডা হয়ে গেল..! জীবনে এই প্রথম কোনো
প্রেমপত্র হাতে পেলাম..!
আমি হারিকেনের আলোটা একটু বাড়িয়ে
দিয়ে মনযোগ সহকারে পড়তে লাগলাম...
"প্রিয় মিলন ভাই, চিঠিটা যখন লিখছি,
তখন রাত প্রায় দুইটা বাজে। জানিনা তুমি
এখন কি করছো..! হয়তো ঘুমাচ্ছো, না হয়
জেগে আছো..! আমার মন বলছে তুমি এখন
আমার কথাই ভাবছো। তোমাকে কি বলে
সম্বোধন করবো সেটা ভাবতে ভাবতেই
রাতের অনেকটা পার হয়ে গেছে। জীবনে
প্রথমবার কোনো প্রেমপত্র লিখছি। এখন
পর্যন্ত ৩৪টি কাগজ নষ্ট করে ফেলেছি। এটা
দিয়ে ৩৫টা। তুমি হয়তো ভেবেছিলে আমি
হয়তো আগে তোমাকে বলবো ভালবাসার
কথা। জানো কতবার বলতে চেষ্টা করেছি..!
কিন্তু বলতে পারিনি। আসলে সাহসে
কুলায়নি। আমার কপাল ভাল তুমিই বলে
দিয়েছো। আজ যখন তুমি বললে তোমারও
একটি কথা বলার আছে, আমি বুঝতে
পেরেছিলাম তুমি কি বলতে চাইছো..! যখন
নৌকা নিয়ে বাড়ির কাছে চলে আসলাম,
আমি মনে মনে আল্লাহকে বলতেছিলাম
যেন তুমি কথাটি বলে দাও। কিন্তু যখন
নৌকা থেকে নেমে গেলাম তখন ভীষণ কষ্ট
হচ্ছিলো। ইচ্ছে হচ্ছিলো চিৎকার করে বলে
দিই মিলন ভাই আমি তোমাকে ভালবাসি।
ঠিক তখনই তুমি আমায় ডাক দিলে। তারপর
তো বলেই দিলে...!? জানো তখন আমি যেন
কোথাও হারিয়ে গিয়েছিলাম। আজ কেন
যেন মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ
আমি। তোমার মুখে কথাটি শুনার পর
আমার ইচ্ছে হচ্ছিল তোমাকে বলতে, আমিও
তোমাকে ভালবাসি। আমার প্রাণের
চাইতে বেশি ভালবাসি। কিন্তু তুমি তো
দাড়ালেইনা। যেন দৌড়িয়ে পালিয়ে
গেলে। আনন্দে আমি যেন দিশেহারা হয়ে
গেছি..! জানো আমার খুশিতে খাওয়া
দাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। মুখে কোনো রুচিই
নাই আমার। চোখে কোনো ঘুম নাই। তুমি
আমার সব কেড়ে নিয়েছো..! তবে এটা সত্যি
যে তোমাকে ভেবে সারাজীবন না খেয়ে
থাকা যায়। না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়া যায়
হাজারো নির্ঘুম রাত। জানিনা চিঠিতে
কি লিখতে হয়। মনে যা আসলো তাই
লিখলাম। তবে যা লিখেছি সবই সত্যি
লিখেছি। তোমাকে কোনোদিন সরাসরি
বলতে পারবো কিনা জানিনা, তাই
চিঠিতেই লিখে দিলাম.. তোমাকে আমি
ভালবাসি। সত্যিই পাগলের মতো
ভালবাসি। চিঠির উত্তরের অপেক্ষায়
থাকলাম। ভাল থেকো..।
ইতি-বকুল"
ঠিঠিটা আমি কতবার যে পড়েছি তার
হিসেবেই নেই। এইটুকু মেয়ে এত সুন্দর করে
চিঠি লিখতে পারে বকুলের সাথে প্রেম না
করলে হয়তো জানতেই পারতাম না। এইটুকু
মেয়ে..! হাহাহা...!
উপন্যাস পড়তে গিয়ে চিঠি পড়েই
কাটালাম। যতবার পড়ি ততবারই যেন
ভাললাগে। রাতে তাড়াহুড়ো করে খেয়ে
আসলাম আবার চিঠি পড়ার জন্য। চিঠির
উত্তরে কি লিখবো তাইই ভেবে পাচ্ছিনা।
ওর মতো হয়তো লিখতে পারবোনা। তারপরও
কয়েক লাইনের একটি ছোট চিঠি লিখে
ফেললাম।
"বকুল, আমি তোর মতো করে চিঠি লিখতে
পারিনা। তবে তোর কাছ থেকে আস্তে
আস্তে শিখে ফেলবো একদিন। তখন এত বড়
বড় চিঠি লিখবো যে পড়েই শেষ করতে
পারবিনা। তোর মতো আমারও একই অবস্থা
হয়েছেরে..! খাইতে ভাললাগেনা, ঘুম
আসেনা। গতরাতে তুই যখন চিঠি লিখিস,
তখন আমিও ঘুমাইনি। তোর কথাই
ভাবতেছিলাম। আর কি লিখবো..!? আর হ্যাঁ
আরেকটা কথা! চিঠিতে বললে হবেনা।
তোর মুখে সরাসরি শুনতে চাই ভালবাসার
কথাটি..! ভাল থাকিস। ভাল রাখিস।
ইতি তোরই মিলন"
তারপরেদিন পড়তে আসলে ওর বইয়ের মধ্যে
ছোট্ট চিঠিটা রেখে দিলাম। এভাবেই
কাটতে লাগলো আমাদের দিনগুলি। মনের
যত কথা সব চিঠিতেই প্রকাশ করতাম
আমরা। একদিন বকুলকে চিঠিতে বলে
দিলাম, আগামী শুক্রবার বিকেলে আমি
বড়সি নিয়ে মাছ ধরতে যাবো নদীতে।
সেখানে তুইও আসবি।
আসলে মাছ ধরা তো একটা অজুহাত মাত্র।
বকুলের চোখে চোখ রেখে কিছু কথা বলবো
বলেই মাছ ধরতে যাওয়া। আমি আগেভাগেই
ছিপ নিয়ে নদীতে চলে গেলাম। নদীর
পাড়ে বসে বকুলের পথ চেয়ে বসে আছি!
অপেক্ষার পালা যে কতটা কষ্টের, তা আমি
টের পাচ্ছি এখন।
সত্যি কথা বলতে আমি জুম্মার নামাজ
পড়ে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল হওয়ার
আগেই চলে এসেছি নদীর পাড়ে। আমার
মাথায়ই ছিলোনা যে এখনও বিকেল হওয়ার
অনেক দেরি..! আচ্ছা প্রেমে পড়লে কি
মানুষ জ্ঞানহীনও হয়ে যায়...!? হা..!হা..!হা...
!
চলবে.... (৫ম পর্ব আগামীকাল একই টাইমে)
••♣
Nizam uddin (স্লিপলেস বার্ড)