26/06/2025
"একটি ধরা খাওয়ার গল্প!"
ফেসবুক খুললে ব্যবসায়ীদের সাকসেস স্টোরি দিয়ে ভরপুর। খুব বড় বড় শিরোনাম এ দেয়
"আলহামদুলিল্লাহ, গত মাসে বিক্রয় **** লক্ষ টাকা" এর পরে তাকে ঘিরে চলতে থাকে বিভিন্ন মার্কেটিং। বিভিন্ন কোর্স ব্যবসায়ী তার সেই স্ক্রিনশট নিয়েই নিজের ব্যবসায়ের এড চালায়। সেটা দেখে অমুক অমুক এবং অমুকে মনে করে আজ আমি এইখানে কোর্স করে ব্যবসায় শুরু করলেই আগামীকাল থেকে কোটিপতি। এর পরে শুরু হলো তাকে নিয়ে বিভিন্ন রিপোর্ট। কখনো অমুক টিভি তো কখনো অমুক প্ল্যাটফর্ম। এর সাথে আরো যুক্ত হলো বিভিন্ন সাজেশন চাওয়া।
নিজের ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা এক বছর যেতে না যেতেই এত কিছু পেয়ে এবং খ্যাতির বিড়ম্বনাতে পরে নিজের ব্যবসায়ের দিক থেকে ফোকাস হারিয়ে অন্যদিকে চলে যেতে লাগলো।
এখন এগুলো করে কি কি ক্ষতি হয়, সেগুলো নিয়েই আজ বলবো।
হাভার্ড এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান এর রিসার্চ এর মতে।
পুরাও পৃথিবীর উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় শুরুর বছর থেকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ে লস করে গুটিয়ে যাওয়ার হার -
১. প্রথম বছর - ২০%
২. দ্বিতীয় বছরে - ৩০-৩৫%
৩. তৃতীয় বছরে - ৪৫-৫০%
৪. চতুর্থ বছর - ৫৫%
৫. পঞ্চম বছর - ৬০-৬৫%
৬. ষষ্ঠ বছর - ৬৮-৭০%
৭. সপ্তম বছর - ৭২-৭৫%
৮. অষ্টম বছর - ৭৮-৮০%
৯. নবম বছর -৮৫%
১০. দশম বছর - ৯০-৯৫%
অর্থাৎ শুরু করার প্রথম বছরেই ২০% ব্যবসায় বন্ধ হয়ে যায়। আর পাঁচ বছরের মাথায় প্রায় ৬০-৬৫% ব্যবসায় বন্ধ হয়ে যায়। দশ বছর যেতে না যেতে ৯০-৯৫% বন্ধ হয়ে যায়।
তাহলে আপনাদের যাদের ব্যবসায়ের বয়স এক অথবা দুই বছরের মাঝে বেশ কিছু টাকা বিক্রয় করেই নিজেদের সাকসেসফুল হিসেবে দাবি করে নিজের কি কি ক্ষতি করছেন সেটা একটু দেখি।
আপনি যখন আপনার সাকসেস স্টোরি অন্যদের সাথে শেয়ার করবেন, তখন যারা শুধু রেজাল্ট দেখবে তারা আপনার স্ট্রাগল গুলো না দেখে আপনার ব্যবসায়ে ঝাপিয়ে পড়বে। আপনি যখন আপনার ব্যবসায়িক গুরুর কাছে শেয়ার করবেন, তখন আপনার ব্যবসায়িক গুরু নিজের ব্যবসায় ফুলে ফেঁপে বড় বানানোর জন্যে আপনাকে নিয়ে পডকাস্ট করবে। নিয়মিত পোস্ট করবে। আপনার স্ট্রাগল গুলো বাদ দিয়ে কয়েকটা কি পয়েন্ট হাইলাইট করবে। আপনার প্রফিটাবিলিটি নিয়ে কথা না বলে আপনার সেলসকেই প্রাধাণ্য দিয়ে স্টোরি বানাবে। আপনাকে সবাই বাহ বা দিবে। আপনার গুরু ও খুশি আপনিও খুশি।
এগুলোর পরে যেটা হবে, আপনার ঘটনা দেখে আরো একশ বা হাজার মানুষ আপনার ব্যবসায়ে আকৃষ্ট হবে। আপনি যদি বুঝে ব্যবসায় নামেন, যারা নতুন আপনার গল্প দেখে নামছে তারা শুধু আপনার সাকসেস স্টোরি দেখে নামছে। তারা আপনার কাস্টমারকে টার্গেট করবে। সে প্রপার ক্যালকুলেশন না করে পন্য বিক্রয় করা আরম্ভ করবে। সে চিন্তা করবে অমুকে এইটা একশতে কিনে ২০০ টাকা বিক্রয় করছে, আমি ১১০ এ বিক্রি করলেই তো লাভ থাকছে। তাই আমি ১১০ এই এইটা বিক্রি করা শুরু করি। অথচ সে ক্যালকুলেট করে নাই, এইটা আনার সময় যাতায়াত ভাড়া ছিলো, লেবার কস্ট ছিলো, প্যাকেজিং এর খরচ ছিলো, এড খরচ ছিলো, কুরিয়ার কোম্পানী এর খরচের ভর্তুকির এমাউন্ট ছিলো, ক্যাশ আউট চার্জ ছিলো, ক্যাশ হ্যনাডলিং কস্ট (COD %) ছিলো। ড্যামেজ ছিলো, গোডাউন এর ভাড়া ছিলো, কর্মচারীর বেতন ছিলো, ইউটিলিটি বিল ছিলো, সরকারী খরচ ছিলো, ভ্যাট ছিলো, রিস্ক প্রভিশন ছিলো, প্রোডাক্ট ড্যামেজ ছিলো, প্রফিট/ইন্টারেস্ট এক্সপেন্স ছিলো, প্রোডাক্ট ক্যানসেলেশন চার্জ ছিলো, কলসেন্টার হ্যান্ডলিং চার্জ ছিলো। আরো কত কি!!
তারা যখন ১১০ এ বিক্রয় করলো, দেখলো তার সেল প্রচুর হচ্ছে। এভাবে এক বছর যাওয়ার পরে সে দেখে বিক্রয় হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার দেনার পরিমান বাড়ছে, সাপ্লায়ারের কাছে বাকি, প্যাকেজিং কোম্পানীর বাকি, কুরিয়ার কোম্পানীতে পাওনা টাকা বাকি, কিছু মাল বাকিতে দিয়েছে সেটা আর পাওয়া যাচ্ছে না, ইনভেন্টরিতে কিছু মাল আটকিয়ে গেছে যা আর বিক্রি করতে পারছে না। ইদুরে কিছু মাল।নষ্ট করেছে, সেগুলো বিক্রয় হচ্ছে না।
আবার এর মাঝে নিজের বিক্রয় বেশি দেখে, সে নিজের টাকা আর ব্যবসায়ের টাকা আলাদা করে নাই, তাই ইচ্ছা মতন খরচ করেছে এখন সে আর হিসাবো মিলতেছে না। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ধার নিয়েছে, সেইটাও মিটাতে পারছে না। তারা এর পরে একদিন লাপাত্তা।
আর আপনি সাকসেস স্টোরি প্লাবলিশ হওয়ার পরে বেশ কিছুদিন উড়তে ছিলেন, আপনার গল্প দেখে যে নতুন কম্পিটিটর এসেছে, তাদের জন্যে আপনার সেলস একটা সময় পরে কমতে শুরু করেছে। আপনার ফিক্সড খরচ আগে বাড়িয়ে ফেলেছিলেন, সেটা চাইলেও এখন কমাতে পারছেন না। বাজারে কম দামে পণ্য বিক্রয় হচ্ছে বলে আপনি এখন আপনার পণ্য কম দামে দেওয়া শুরু কিরেছেন। এখন আপনার লাভের পরিবর্তে লোকসান শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনি আপনার এক্সিস্টিং সেলস বাড়াতে মরিয়া হয়ে গিয়েছেন, আর এদিকে আপনার পরে যারা এসেছে তাদের দুই একটা সাকসেস স্টোরি অলরেডি মার্কেটে ছড়য়ে গিয়েছে, এদিকে এন্ট্রি ব্যারিয়ার কম।হওয়ার কারণে আরো লোক এই ব্যবসায়ে ঝাপিয়ে পড়ছে। আপনি দোষ দিচ্ছেন ফেসবুকের, আপনার ফলোয়ার (যে আপনার ব্যবসায়ের সাকসেস স্টোরি দেখে নেমেছে - প্রথম দিকের কম্পিটটর) দোষ দিচ্ছে ফেসবুকের। এই ব্লেম গেইম চলতেই আছে।
এদিকে আপনার ব্যবসায় শেষ, আপনার পরে যারা এসেছে তাদের ব্যবসায় শেষ। মাঝখান থেকে কোর্স বিক্রয় করা মানুষের লাভ। তাদের কাছে ১০০০ জন আসলে ১০-২০ বা ৫০ জন সাকসেস্ফুল হচ্ছে। এদের নিয়ে খেলা আরো চলছে।
এর মাঝখানে আপনি এখন পলাতক। আপনার নামে ডজন খানেক মামলা চলছে। আপনি নিজের পরিচয় গোপন করে কোথাও চাকরী অথবা অন্য কোন কাজ করছেন। আপনার ফ্যামিলি চলা মুশকিল। আপনি এখন দূর থেকে খেতে খেতে নিজের সোনালী দিন গুলোর কথা ভাবছেন
আপনার চোখে দু এক ফোঁটা পানি। গলা দিয়ে ভাত নামছে না। শুকনো ডাল আর আলু ভর্তা দিয়ে ভাত সব সময় গলা দিতে নামার কথাও না!
বি.দ্র: ছবিটি আমি নিজে ম্যানুপুলেট করেছি ক্যানভা দিয়ে। এখানের সব সেলস এবং সব গুলো এমাউন্ট নিজের বানানো। অনেকেই এটা দেখে ঝাপ দিবে। তাই মোম বাতির আলো দেখে পোকাদের মতন ঝাপ দিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করার আগে ভাবুন, দেখুন, শুনুন তার পরে নামুন। আর যদি নিজে পুড়তে চান, তাহলে ঝাপ দেন।
"একটি ধরা খাওয়ার গল্প!"
আবু সালেহীন
২৫-৬-২০২৫