28/12/2024
গরম দুপুরে, মিলন তার বন্ধুরা সঙ্গে বেড়াতে বের হয়েছিল। তাদের গন্তব্য ছিল এক পুরনো, পরিত্যক্ত জায়গা – এক abandoned হাসপাতাল। স্থানীয়রা এই হাসপাতালটিকে ‘ভূতের বাসস্থান’ বলত, কারণ সেখানে বহু বছর আগে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যার পর থেকে এই হাসপাতালের অভ্যন্তরে কোনো জীবন ছিল না।
“এখানে প্রবেশ করলে আমাদের অবশ্যই সাবধানে থাকতে হবে, কারণ এখানে অদ্ভুত কিছু ঘটছে,” মিলন তার বন্ধুকে সাবধান করে বলল।
হাসপাতালের প্রবেশদ্বারটি ধীরে ধীরে খুলে গেল। ভিতরে ঢুকতেই, চারপাশে মাটি ও ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। অনেক জায়গায় সেসব পুরনো যন্ত্রপাতি পড়ে ছিল, যা ব্যবহারযোগ্য ছিল না। এক নিঃশব্দ ভয়ার্ত পরিবেশ চারপাশে বিরাজমান ছিল।
যতটা এগিয়ে যায়, ততই অদ্ভুত কিছু ঘটতে থাকে। হঠাৎ এক কোণায় মেঝেতে পায়ের ছাপ দেখা যায়। তবে এই ছাপগুলি এক দিক থেকে অন্য দিকে চলে যাচ্ছিল, যেন কোনো কিছু চলতে থাকে কিন্তু কোন দৃশ্যমান শখা ছিল না। মিলন ও তার বন্ধুরা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যায়।
“এটা কি!?” এক বন্ধুর কণ্ঠে আতঙ্ক।
এই ছাপের পেছনে অনুসরণ করতে গিয়ে, তারা এক অন্ধকার কক্ষে পৌঁছায়, যেখানে বাতি পুরনো এবং মর্মান্তিকভাবে ঝিমিয়ে ছিল। একজন পুরনো নারীর কণ্ঠ ভেসে আসে।
“তোমরা কেন এসেছো? তোমরা কি জানো না, আমি এই জায়গায় বন্দি?”
মিলন তার বন্ধুকে দেখিয়ে বলল, “এটা সেই নারী হবে, যার কারণে হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
জানা যায়, একসময় এখানে একজন নার্স কাজ করতেন। তার নাম ছিল লাবণী। একদিন, অস্বাভাবিক এক দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তার আত্মা এখানেই আটকা পড়ে। এখন সে তার আত্মাকে মুক্ত করতে চায়, কিন্তু তার আত্মা নিষ্ঠুর হয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে, তার রূপ ধারণ করেছে এক ভয়ংকর দানবে, যা মানুষদের জীবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
মিলন ও তার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা এই রহস্যের সমাধান করবে এবং লাবণীর আত্মাকে শান্ত করবে। কিন্তু, তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে দেরি হয়নি যে, অতিরিক্ত কিছু অদৃশ্য শক্তি তাদের প্রতি আক্রমণ চালাতে শুরু করে। ফাঁকা হাসপাতালের মধ্যে এক বিশাল শোরগোল সৃষ্টি হয়। বাতি একে একে নিভে যেতে থাকে, জানালার কাঁচ ভেঙে পড়তে থাকে, এবং একটি ভয়ের মূর্তি তাদের সামনে চলে আসে।
“তোমরা চলে যাও, এখনই!” ভয়ের আওয়াজে মিলনের কানে পৌঁছায়।
রাত গভীর হতে থাকে এবং মিলন এবং তার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নেন যে, তারা পালাবেন না, বরং একে একে তারা এই অশুভ আত্মাকে শান্ত করার চেষ্টা করবে। তবে তারাও জানতো যে, এটি খুব বিপজ্জনক। একে একে বন্ধুরা অপরের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। প্রথমে, এক বন্ধুর নিঃশব্দে অদৃশ্য আক্রমণের শিকার হয়। তার পর, এক-এক করে সবাই একে একে অদৃশ্য হয়ে যায়।
মিলন একা বাকি থাকে, এবং সে বুঝতে পারে যে, এই হাসপাতাল কেবলমাত্র একটি জায়গা নয়, বরং এটি একটি বাস্তবিক অভিশাপ। এবং তাকে এই অভিশাপটি কাটানোর জন্য মৃত্যুর সাথে লড়াই করতে হবে।
এখন, মিলন একা। অদৃশ্য শক্তি তাকে চেপে ধরছে, বাতি নিভে গেছে, কেবল অন্ধকার। মিলন জানত, যদি সে এখানে বাঁচতে চায়, তাহলে তাকে লাবণীর আত্মাকে শান্ত করতে হবে। সে হাসপাতালে একটি পুরনো পুরোহিতের বই পায়, যার মধ্যে মন্ত্র ছিল যা আত্মাকে শান্ত করতে সাহায্য করবে।
যতই সময় এগিয়ে যায়, ততই মিলন অনুভব করতে থাকে যে, কোনো কিছু তার পিছু নিয়েছে। এক সময়, সে সাহস করে মন্ত্রটি উচ্চারণ শুরু করে। হাসপাতালের দেয়াল কেঁপে ওঠে, এক তীব্র শব্দে আঘাত আসে, যেন কিছু অদৃশ্য আছড়ে পড়েছে।
মিলন মন্ত্রটি সম্পূর্ণ উচ্চারণ করতে পারলো। কিছুক্ষণ পর, এক গভীর নীরবতা বিরাজ করল। হাসপাতালের ভিতরে অদৃশ্য শক্তি এখন স্তব্ধ হয়ে গেছে। যখন মিলন কিছুটা সুস্থ বোধ করে, তখন সে বুঝতে পারে, হাসপাতালের চারপাশে একটি ভয়ানক শান্তি ফিরেছে। কিন্তু এ শান্তি ক্ষণস্থায়ী ছিল। লাবণীর আত্মা স্থির থাকতে চায় না। সে আবার ফিরে আসবে, আরও বড় ক্ষতি করতে।
মিলন এবং সুমন হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার পরও তাদের মনে শান্তি আসেনি। তারা জানতো, যে অদৃশ্য শক্তি তাদের পিছনে লেগেছিল, তা সহজে তাদের তাড়া ছেড়ে যাবে না। তারা এক অদ্ভুত দুঃস্বপ্নের মধ্যে পড়েছে, যেখানে আতঙ্কের কোনো শেষ নেই। তাদের একটাই লক্ষ্য— এই অভিশপ্ত হাসপাতাল থেকে মুক্তি পাওয়া।
"দেখ, এখানে কিছু একটা আছে। আমরা যদি ফিরে যাই, হয়তো আরো ভয়াবহ কিছু ঘটবে," সুমন পাগলের মতো বলল।
তবে মিলন জানতো, তাদের একমাত্র উপায় হলো পুরনো মন্দিরের দিকে যাওয়া, যেখানে পবিত্র মন্ত্র দ্বারা মৃত আত্মাদের শান্ত করা হয়।
মিলন এবং সুমন যখন পুরনো মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন চারপাশে গভীর নীরবতা বিরাজমান ছিল। এই মন্দিরের ইতিহাসও ভয়াবহ—অনেক বছর আগে, এখানে এক রাজকুমারীর আত্মা বন্দি হয়েছিল। রাজকুমারী তার পরিবারকে হত্যা করে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে মারা যায়। এরপর তার আত্মা অস্থির হয়ে ওঠে এবং মন্দিরের ভেতরে বন্দী হয়ে থাকে।
মিলন জানতো, এখান থেকে কেবল মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হল সেই আত্মাকে শান্ত করা।
মন্দিরের প্রবেশদ্বারে পৌঁছানোর পর, মিলন এবং সুমন বুঝতে পারে যে, তারা আর পেছনে ফিরতে পারবে না। মন্দিরের ভেতরে এক ভয়ঙ্কর শীতল বাতাস বইছিল। হঠাৎ করে একটি অশুভ ছায়া তাদের সামনে উপস্থিত হয়, এবং এর সাথে একটি ভয়াবহ গর্জন শোনা যায়।
"এটা কি!" সুমন চিৎকার করে ওঠে।
ছায়াটি ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসে, এবং তার মধ্যে একটি মুখমণ্ডল স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাজকুমারীর মুখ, কিন্তু সেটা এখন মৃত এবং বিকৃত হয়ে গেছে। "যতক্ষণ না আমার আত্মাকে মুক্তি দেবে, ততক্ষণ তোমরা পালাতে পারবে না!" তার গলা গর্জন করে ওঠে।
মিলন সুমনকে শক্ত করে ধরে বলল, "এই জায়গা থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায়, তাকে শান্ত করা।"
রাজকুমারীর আত্মা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, আর তার চোখ দুটি যেন আগুনের মত জ্বলছিল। সে বলল, "তোমরা কি মনে করো, তোমরা আমাকে পরাজিত করতে পারবে? আমি অভিশপ্ত, এবং আমার পিছু তোমরা ছাড়া কোনো মুক্তি পাবে না।"
মিলন জানতো, রাজকুমারীর আত্মাকে শান্ত করতে গেলে তাকে সেই পুরনো মন্দিরের পবিত্র মন্ত্র পড়তে হবে। সে তখন পুরনো বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো থেকে একটি মন্ত্র পড়া শুরু করে, যা শুধু সত্যিকারের সাহসী মানুষের মাধ্যমেই কার্যকরী হতে পারে।
তবে রাজকুমারী শান্ত হওয়ার বদলে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তার অগ্নিশিখা হয়ে ওঠে এবং চারপাশে এক তীব্র দম বন্ধ করা গরম বাতাস ছড়িয়ে পড়ে।
রাজকুমারীর আত্মা শক্তিশালী হয়ে উঠছিল, এবং মিলন বুঝতে পারে যে, কেবল মন্ত্র দিয়েই তাকে শান্ত করা যাবে না। হঠাৎ, মন্দিরের দেওয়ালগুলো কেঁপে উঠতে শুরু করে। বাতি নিভে গিয়ে অন্ধকারে ভরে যায়। কিছু অদৃশ্য শক্তি তাদের ওপর হামলা করতে থাকে।
সুমন অসহায়ভাবে চিৎকার করে ওঠে, "আমরা কি পারব না? এখানে কিছু থাকতে হবে, কোনো উপায়!"
চলবে :