04/11/2025
বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও আইটি খাত: বৈষম্যের অতীত থেকে সাম্যের নতুন সম্ভাবনা
লেখক: বিন্দুটেক ব্লগ
বিগত প্রায় দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাত দ্রুত বিকাশের পথে থাকলেও এর বিকাশ ছিল অসম ও আংশিক। উন্নয়ন ও অগ্রগতির আলোয় আলোকিত হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল নানামাত্রিক বৈষম্য, যেখানে কিছু প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে, আর অধিকাংশ উদ্যোক্তা পিছিয়ে পড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও ন্যায্য সুযোগের অভাবে।
অসম বিকাশের শেকড়
২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়কালটি বাংলাদেশের আইটি খাতের গঠন ও সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু এই সময়ের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন—অল্প কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান সরকারি প্রকল্প ও কর্পোরেট কনট্রাক্টের প্রধান সুবিধাভোগী হয়ে ওঠে। নীতিগত স্বচ্ছতার অভাব, টেন্ডার প্রক্রিয়ার জটিলতা, এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন বা পৃষ্ঠপোষকতার অভাব—সব মিলিয়ে খাতে একধরনের একচেটিয়া পরিবেশ তৈরি হয়।
ফলে প্রকৃত উদ্ভাবন বা মেধা মূল্যায়নের বদলে, পরিচিতি ও প্রভাবই হয়ে ওঠে ব্যবসার মাপকাঠি। ফলে দেশের আইটি ইকোসিস্টেমে একটি ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়—যেখানে বড়রা আরও বড় হয়েছে, ছোটরা ক্রমে হারিয়ে গেছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা সৃজনশীল ধারণা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও টিকে থাকতে পারেননি। বিনিয়োগ, সরকারি সুযোগ কিংবা বাজারে প্রবেশাধিকার না পাওয়ায় অসংখ্য প্রতিশ্রুতিশীল উদ্যোগ অকালেই বিলীন হয়ে যায়।
পরিবর্তনের সূচনা: ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী বাস্তবতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়কে বাংলাদেশের আইটি খাতের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলা যায়। এই সময়ের পর থেকে খাতে নীতিগত ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি আইটি কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি, এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ—এসব পদক্ষেপ খাতটিকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
বিশেষত ওপেন টেন্ডারিং প্রক্রিয়া, ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে ন্যায়সংগত অংশগ্রহণ, এবং স্থানীয় উদ্ভাবনের প্রতি নীতিগত অগ্রাধিকার—এসব উদ্যোগের ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নতুন করে আশা দেখছেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: আত্মবিশ্বাস ও পুনর্জাগরণের সময়
আজ বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও আইটি খাত এক ধরনের পুনর্জাগরণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় এখন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব সার্ভিস, এবং মোবাইল অ্যাপ উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া তরুণরা আর চাকরির অপেক্ষায় নয়—তারা নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে ইনোভেশন ফান্ড, স্টার্টআপ গ্রান্ট, আইটি প্রশিক্ষণ প্রকল্প, এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা সহায়তা কর্মসূচি নতুন উদ্যোক্তাদের প্রেরণা যোগাচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে ডিজিটাল সেবার চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এখন টিকে থাকার জায়গা তৈরি হচ্ছে।
আগামীর সম্ভাবনা: ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি
বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও আইটি শিল্প এখন এমন এক সময়ের মুখোমুখি, যেখানে “ন্যায্য প্রতিযোগিতা”ই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি। যদি বর্তমান নীতিগত পরিবর্তনগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী পাঁচ বছরে এ খাত থেকে দেশের রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ আসতে পারে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো আঞ্চলিক পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং দৃঢ় মনোবল—এই তিন উপাদানই আগামী দিনের সফটওয়্যার শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম।
শেষ কথা
বাংলাদেশের সফটওয়্যার খাতের ইতিহাস যেমন বৈষম্য ও চ্যালেঞ্জে ভরা, তেমনি ভবিষ্যৎটি সম্ভাবনা ও আশায় পরিপূর্ণ। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা ন্যায়ভিত্তিক নীতি, স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা এবং উদ্ভাবনকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতে পারি, তাহলে আইটি খাত শুধু অর্থনীতির একটি অংশ নয়—বরং “ডিজিটাল বাংলাদেশ”-এর বাস্তব রূপ হয়ে উঠবে।
🔹 লেখক পরিচিতি:
লেখক তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ দুই দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন পেশাজীবী ও উদ্যোক্তা।