09/09/2026
তাওয়াক্কুল মানে কি সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকা?
নাকি নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের দায়িত্ব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া?
জীবনে আমরা অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। চাকরি, ব্যবসা, সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ, এমনকি কখন কী ঘটবে সেটাও। কিন্তু জীবনের কিছু পরিস্থিতি এমন আসে, যেখানে আমাদের হাতে আর কিছুই থাকে না।
আপনজনের মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ, ব্যবসায় বড় ক্ষতি কিংবা মিথ্যা কোনো মামলায় জড়িয়ে পড়া, এসব পরিস্থিতিতে তখন আসল পরীক্ষা হয় আমাদের তাওয়াক্কুলের।
সেই সময় পরিস্থিতির দিকে শুধু মানুষের চোখে তাকালে ভয় আর হতাশা আসতে পারে। কিন্তু একজন মুমিন চেষ্টা করবে ‘ওয়াকিলের দিক’ থেকে বিষয়টাকে দেখতে।
যিনি আমাকে এই পরিস্থিতিতে ফেলেছেন, তিনিই আমার অভিভাবক। তিনিই জানেন কেন এটা ঘটেছে এবং তিনিই জানেন কীভাবে আমাকে এখান থেকে বের করে আনতে হবে।
ইউসুফ (আ.) নিজের ইচ্ছায় কারাগারে যাননি। ইব্রাহিম (আ.) নিজের ইচ্ছায় আগুনে নিক্ষিপ্ত হননি। ইউনুস (আ.)-ও নিজের ইচ্ছায় মাছের পেটে যাননি।
কিন্তু তাদের জীবনের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতির পেছনে আল্লাহর হিকমাহ ছিল। তাই এমন কোনো অবস্থায় পড়ে গেলে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তখন অস্থির না হয়ে বিশ্বাস রাখতে হবে যে আল্লাহর পরিকল্পনার ভেতরেও কল্যাণ রয়েছে।
তাওয়াক্কুলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারা। আমরা অনেক সময় মনে করি, সবকিছু আমাদের পরিকল্পনা, বুদ্ধি আর পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আল্লাহ চাইলে এমন জায়গা থেকেও রিযিক বা সাহায্য দিতে পারেন, যার কোনো বাহ্যিক কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
মরিয়ম (আ.)-এর কাছে রিযিক আসার ঘটনা কিংবা ইব্রাহিম (আ.)-এর স্ত্রীকে সন্তান দান করার মতো ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহ কোনো মাধ্যম ছাড়াও চাইলে তাঁর বান্দাকে দিতে পারেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তাওয়াক্কুল করে আমরা কোনো কাজই করব না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন দেখুন। যুদ্ধের আগে তিনি প্রস্তুতি নিয়েছেন, সৈন্যদের সাজিয়েছেন, কৌশল নির্ধারণ করেছেন এবং প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন।
পাখিদের কথাও রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের তাওয়াক্কুলের সুন্দর একটি উদাহরণ হিসেবে শিখিয়েছেন। তারা সকালে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফিরে আসে।
পাখিরা বসে থেকে রিযিকের অপেক্ষা করে না। তারা বের হয়, চেষ্টা করে, খাবার খোঁজে। কিন্তু তারা আগামীকাল কী খাবে, সেটা নিয়ে আজ অস্থির হয়ে পড়ে না।
আমাদের জীবনেও ঠিক এমনটাই দরকার। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে, প্রয়োজনীয় সব মাধ্যম গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু মনে রাখতে হবে, কোনো মাধ্যমই নিজে থেকে আমাকে সফল করতে পারে না।
আমার সিভি, আমার ব্যবসা, আমার চাকরি, আমার পরিচিত মানুষ কিংবা আমার পরিকল্পনা, কোনোটিই ফলাফল দেওয়ার মালিক নয়। এগুলো শুধু মাধ্যম। ফলাফল দেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে।
অনেক সময় আমরা মানুষ বা কোনো মাধ্যমের ওপর এত বেশি নির্ভর করতে শুরু করি যে, অজান্তেই আল্লাহর চেয়ে সেটাকেই বেশি ভরসার জায়গা বানিয়ে ফেলি।
তখন কোনো কোনো সময় সেই মাধ্যমই আমাদের হতাশ করে। যেন আল্লাহ আমাদের বুঝিয়ে দেন, আসল ভরসার জায়গা মানুষ নয়, কোনো ব্যবস্থা নয়, একমাত্র তিনিই।
তাই তাওয়াক্কুল হলো চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর নিজের হৃদয়কে ফলাফলের দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
কারণ যে বিপদ আপনার জন্য নির্ধারিত, তা আপনাকে এড়িয়ে যাবে না। আর যা আপনার জন্য নির্ধারিত নয়, আপনি যতই চেষ্টা করুন, তা আপনার কাছে আসবে না।
সুতরাং চেষ্টা আপনার দায়িত্ব। ফলাফল আল্লাহর দায়িত্ব।
আর প্রকৃত সুখ তখনই আসে, যখন মানুষ নিজের সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে এবং তারপর আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকতে শেখে।
(লেখাটি 'How To Truly Have Tawakkul — Trusting Allah Through Every Test' লেকচার অবলম্বনে)
©আরিফুল ইসলাম