লবঙ্গ লতিকা

লবঙ্গ লতিকা প্রতিটি গল্পের আড়ালে থাকে আরেকটি গল্প…
এসো, শব্দের সেই গোপন দরজাটা খুলে দেখি। 📖✨

01/11/2026

#মেয়ের_গোপন_রহস্য |

গল্প_ঘর

শেষ পর্ব

“তোমার জায়গা হাসপাতাল, আমার মেয়ের জীবন নয়! মীম এখনই আমার সঙ্গে যাবে। আর তার তালাকের কাগজ আমার ঢাকার বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। তা না হলে আল্লাহর কসম, আমি ইউনিয়ন পরিষদে যাব, থানায় অভিযোগ করব। আমার মেয়েকে যে মারধর আর গলা চেপে নির্যাতন করা হয়েছে, তার চিকিৎসার কাগজপত্রও আমার কাছে আছে। তোমরা যা করেছ, সবকিছু সবাইকে জানিয়ে দেব!”

আমার কথাগুলো যেন ধারালো ছুরির মতো গিয়ে বিঁধল কামাল, তার মা আর নীলার মনে। তিনজনই একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল।

আমি মীমের হাত শক্ত করে ধরলাম। মেঝে থেকে তাকে উঠিয়ে দাঁড় করালাম। মেয়েটা তখনও ভয় আর দ্বিধায় কাঁপছিল। কিন্তু আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হয়তো সে বুঝতে পেরেছিল—এবার তার মা তাকে আর কারও হাতে তুলে দেবে না।

মীম একবার কামালের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল কষ্ট, ভালোবাসা আর বিদায়ের ভারী অনুভূতি। তারপর নিজের ভেতরে থাকা সামান্য শক্তিটুকু জড়ো করে আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল।

কামাল দরজার কাছে এসে আমাদের পথ আটকানোর চেষ্টা করল।

আমি তার দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকালাম যে, সে সেখানেই থেমে গেল।

ঠান্ডা গলায় বললাম,

“এটা কখনো ভেবো না যে মীমের বাবা নেই বলে ওর পাশে কেউ নেই। তুমি হয়তো একজন মায়ের শক্তি দেখোনি। আমি একাই আমার মেয়ের জন্য হাজার মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি। আর তুমি যদি আর এক পা এগিয়ে আসো, তাহলে এই বাড়ির প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব আমি সবার সামনে তুলে ধরব।”

কামাল আর কোনো কথা বলল না।

আমি মীমের হাত ধরে সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম।

গ্রামের পথটা তখন অদ্ভুত শান্ত। দুপাশে সবুজ ধানক্ষেত, আঁকাবাঁকা পথ, দূরে গাছপালা—সবকিছু আগের মতোই ছিল। অথচ আমার কাছে সেই পথটা আর আগের মতো মনে হচ্ছিল না।

এই পথেই কিছুক্ষণ আগে আমি মেয়েকে নিয়ে ভয় আর অজানা আশঙ্কায় হাঁটছিলাম। আর এবার আমি হাঁটছিলাম দৃঢ় পায়ে। আমার পাশে ছিল আমার মেয়ে।

মীম পুরো পথ কাঁদছিল।

আমি তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলছিলাম,

“আর কাঁদিস না, মা। সব শেষ হয়ে গেছে। সেই দুঃস্বপ্ন থেকে তোকে আমি বের করে এনেছি। তোকে না জেনে যে আগুনের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিলাম, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করিস। কিন্তু তোর এই চোখের পানির কসম, তোর সম্মান আর অধিকার আমি ফিরিয়ে আনব।”

আমরা সেদিনই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম।

গাড়িতে মীম আমার পাশে বসেছিল। ক্লান্তিতে তার মাথাটা আমার কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে গেল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, কতদিন ধরে যেন ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি।

আমি চুপচাপ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ভাবছিলাম—একজন মা তার সন্তানের কষ্ট বুঝতে কত দেরি করে ফেলতে পারে!

ঢাকায় পৌঁছে মীমকে সরাসরি তার পুরোনো ঘরে নিয়ে গেলাম। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলাম। তারপর কপালে একটা চুমু খেলাম।

এক সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের বাড়িতে মীমের তালাকের কাগজ এসে পৌঁছাল। থানায় অভিযোগ আর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলতেই কামালদের পরিবার আর বিষয়টা টেনে নিতে পারেনি। মীম তার প্রাপ্য অধিকার ও জিনিসপত্রও ফিরে পেল।

পরে জানতে পারলাম, মীম চলে আসার পর কামালের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তার পরিবার তাকে চিকিৎসার জন্য একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করতে বাধ্য হয়েছিল।

একদিন বিকেলে আমি আর মীম ঢাকার বাসার বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম। আকাশে তখন নরম রোদ। সেই আলো মীমের মুখেও পড়ছিল।

অনেক দিন পর সেদিন মেয়েটাকে সত্যিকারের হাসতে দেখলাম।

মীম আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

“ধন্যবাদ, মা। তুমি যদি সেদিন আমাকে দেখতে না আসতে, তাহলে হয়তো আমি ওখানেই হারিয়ে যেতাম। কেউ হয়তো কোনো দিন জানতও না আমার সঙ্গে কী হয়েছিল।”

আমি মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বললাম,

“মায়ের মন অনেক কিছু আগেই বুঝে যায়, মা। তুই আমার মেয়ে। তোর জন্য এই পৃথিবীতে যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন আমি তোর পাশে আছি। কোনো শক্তিই আমার মেয়েকে আমার চোখের সামনে কষ্ট দিতে পারবে না।”

মীম চোখের পানি মুছে বলল,

“কিন্তু মা… আমি তো ওকে ভালোবাসতাম। ওর সঙ্গে এভাবে সব শেষ করে দিতে আমারও তো কষ্ট হয়।”

আমি মেয়ের মাথায় হাত রেখে মৃদু হেসে বললাম,

“আমরা ওকে ছেড়ে আসিনি, মা। আমরা শুধু তোর নিরাপত্তাকে আগে রেখেছি। কামাল যদি সত্যিই ভালো হতে চায়, তাহলে সে চিকিৎসা নেবে। আল্লাহ চাইলে একদিন সে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতেও পারে। তখন ভবিষ্যতে কী হবে, সেটা ভবিষ্যৎই বলবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত তোকে আমি আর সেই বিপদের মধ্যে ফিরিয়ে দেব না।”

আমি একটু থেমে আবার বললাম,

“তুই আমার মেয়ে। তোকে আর কোনো দিন আমার চোখের আড়ালে এমনভাবে হারিয়ে যেতে দেব না।”

মীম আর কিছু বলল না। শুধু আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

সেদিন তার চোখে ভয় ছিল না। ছিল স্বস্তি।

আর সেই দিন থেকে আমি একটা কথা খুব ভালোভাবে বুঝে গেলাম—

সম্পর্কের আসল মূল্য মিষ্টি কথা, হাসিমুখ কিংবা লোক দেখানো ভালোবাসায় নয়। আসল সম্পর্ক হলো বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আর যাকে ভালোবাসি তার নিরাপত্তাকে সবার আগে রাখা।

আর যে বাবা-মা শুধু মানুষের কথার ভয়ে নিজের সন্তানের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়, তারা শেষ পর্যন্ত সন্তানের কাছে শুধু বাবা-মা হওয়ার অধিকারই নয়, বিশ্বাসটাও হারিয়ে ফেলে।

29/10/2026

#মেয়ের_গোপন_রহস্য
গল্প ঘর

তৃতীয় পর্ব

মীম আমাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদছিল। বারবার হাঁপাতে হাঁপাতে বলছিল,

“মা! ও মা! তুমি চলে যাও… দয়া করে এখান থেকে চলে যাও!”

আমি যেন নিজের জায়গাতেই পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল। আমি যা দেখছিলাম, আমার মস্তিষ্ক যেন কিছুতেই সেটা মেনে নিতে পারছিল না।

আমি পাগলের মতো মেয়ের কাছে ছুটে গেলাম। মেঝেতে বসে তার দুটো হাত শক্ত করে ধরে ফেললাম। হাত দুটো এমনভাবে কাঁপছিল, যেন প্রচণ্ড শীতের মধ্যে বসে আছে।

কষ্ট করে তার মুখটা ওপরে তুললাম। আমার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, দুশ্চিন্তা আর অসহায়তা তখন আর ধরে রাখতে পারলাম না। পুরো ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলাম,

“এ কী হয়েছে?! কী হয়েছে তোর, মীম?! কে করেছে এসব তোর সঙ্গে? বল! মুখ খুলে বল, মা!”

মীম কোনো উত্তর দিল না।

সে শুধু আতঙ্কে বারবার কামাল আর তার বোন নীলার দিকে তাকাচ্ছিল। ওদের দুজনকে দেখলেই যেন তার চোখে ভয় আরও গভীর হয়ে উঠছিল। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিল না, শুধু কান্না আর কান্না। আর আমাকে অনুরোধ করছিল এখান থেকে চলে যেতে।

এর মধ্যেই কামাল দ্রুত ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। নীলা সঙ্গে সঙ্গে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

কামাল আমার কাছে এসে অস্থির ও চাপা গলায় বলল,

“শান্ত হন, মা। একটু শান্ত হন। আল্লাহর কসম, কেউ মীমের গায়ে হাত দেয়নি। আগে আমার কথাটা বুঝুন!”

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললাম,

“কী বুঝব আমি? কী বুঝব, বলো! তোমরা কি আমার মেয়েকে বেঁধে রেখেছিলে? মারধর করেছ? এটাই কি তোমাদের পরিবারের সেই ভালো ব্যবহার? এটাই কি সেই আলাদা বাড়ি, যেখানে আমার মেয়েকে নিরাপদে রাখবে বলেছিলে? তাহলে মীম এখানে কেন? আর ওর শরীরে এই আঘাতের দাগগুলো কীসের?!”

আমার চিৎকারে ঘরটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।

ঠিক তখনই বিছানায় শুয়ে থাকা কামালের মা অনেক কষ্টে উঠে বসলেন। তাঁর শরীর তখনও দুর্বল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কাঁপা গলায় তিনি বললেন,

“আমাকে ক্ষমা করো, রওশন আপা… যে সত্যটা এতদিন তোমার কাছ থেকে লুকিয়েছি, সেটা তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়। আমরা ভেবেছিলাম, আমাদের পরিবারকে বাঁচানোর জন্যই এটা গোপন রাখা দরকার। কিন্তু আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এখন তোমাকে আমাদের সেই ভয়ংকর সত্যটা জানাতেই হবে।”

আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম। মীমকে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। চোখ দিয়ে তখন অঝোরে পানি ঝরছে।

কামালের মা কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করলেন,

“কামাল… আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই একটা ভয়ংকর অসুখে ভুগছে। মাঝে মাঝেই তার এমন খিঁচুনি আর প্রচণ্ড উত্তেজনার আক্রমণ হয়, তখন সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সে তখন বুঝতে পারে না সামনে কে আছে—বাবা, মা, এমনকি নিজের স্ত্রীকেও চিনতে পারে না। তখন সামনে যাকে পায়, তাকে ধাক্কা দেয়, মারধর করে, জিনিসপত্র ভাঙচুর করে… নিজের কী করছে, তখন সে কিছুই বুঝতে পারে না।”

আমি স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম।

তিনি আবার বললেন,

“এই কারণেই আমরা ওদের গ্রামের অন্য প্রান্তে আলাদা বাড়িতে রেখেছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম, দূরে থাকলে হয়তো পরিস্থিতি সামলানো সহজ হবে…”

আমার বুকের ভেতরটা যেন কেউ ছিঁড়ে ফেলল।

আমি ধীরে ধীরে কামালের দিকে তাকালাম। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, নীলা কেন বিয়ের দিন অদ্ভুতভাবে হেসেছিল। কেন মীম আমার সঙ্গে কথা বলার সময় বারবার ভয় পেত। কেন সে আমাকে কিছু বলতে চাইতেও থেমে যেত।

আমি কাঁপা গলায় বললাম,

“তাহলে তোমরা আমার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলে এই অসুস্থ ছেলের সঙ্গে? শুধু ওর এই অবস্থাটা সামলানোর জন্য? আমার মেয়েকে কি তোমরা ওর রাগ আর অসুস্থতার শিকার বানিয়েছ? আমাকে বোকা বানিয়েছ, কারণ তোমরা জানত আমি একা… আমার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই?”

কামাল আর কিছু বলতে পারল না।

সে হঠাৎ আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। চোখ দিয়ে সত্যিকারের কান্না ঝরছিল।

“আল্লাহর কসম, মা… আমি মীমকে ভালোবাসি। ডাক্তাররা আমাকে বলেছিলেন, বিয়ে করে সংসারে স্থির হলে হয়তো আমার এই আক্রমণগুলো কমে যাবে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে আমার অবস্থাটা আরও খারাপ হয়ে গেছে। আক্রমণ যখন আসে, তখন আমি কিছুই বুঝতে পারি না। পরে যখন স্বাভাবিক হই আর দেখি আমি মীমকে আঘাত করেছি, তখন নিজের ওপরই ঘৃণা হয়। মনে হয়, নিজেকেই শেষ করে দিই।”

সে কাঁদতে কাঁদতে মাথা নিচু করল।

“আজ সকালে আমার আবার সেই আক্রমণ হয়েছিল। আমি মীমকে খুব মারধর করেছি। ওর শরীরে যে দাগগুলো দেখছেন, সেগুলো তখনই হয়েছে। তাই ওকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। এমনকি মা-ও তখন আমাদের বাড়িতে ছিলেন। তিনি আমাকে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি তাঁকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিই। তাঁর মাথায় আঘাত লাগে, চোখেও চোট লাগে…”

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

আমার বুকের সঙ্গে মুখ লুকিয়ে মীম তখন এমনভাবে কাঁদছিল যে তার কান্না শুনলে পাথরের হৃদয়ও গলে যেত।

কিছুক্ষণ পর সে কাঁপা গলায় বলল,

“মা… ও যখন স্বাভাবিক থাকে, তখন সত্যিই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো স্বামী। কিন্তু যখন ওই অবস্থাটা আসে, তখন সে যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ হয়ে যায়। সে আমাকে ধরে ফেলে, কখনো গলা চেপে ধরে, কখনো ঘরের মধ্যে আটকে রাখে। সেদিন তুমি যখন ভিডিও কলে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলে, তার একটু আগেই ওর ওই আক্রমণ হয়েছিল। আমাকে মেরেছিল। কিন্তু আমি তোমাকে কিছু বলিনি…”

মীমের কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল।

“আমি চাইনি আমার সংসারটা ভেঙে যাক। আর তোমার ওপরও এমন একটা ধাক্কা দিতে ভয় পেয়েছিলাম। আজ সকালেও আবার ওর সেই অবস্থা হয়েছিল। তাই তুমি যখন এসেছিলে, তখন আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম না…”

মীমের কথাগুলো আমার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধছিল।

এতদিন যে সত্যটা তারা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল, সেটা শুধু কামালের অসুস্থতার সত্য ছিল না।

সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য ছিল—তারা আমার মেয়ের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তারা জানত কামালের সমস্যা আছে, তবুও আমার মেয়েকে সেই সংসারে পাঠিয়েছিল। আমার একাকিত্ব আর অসহায়তাকে তারা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছিল। মীম যেন তাদের কাছে একজন মানুষ নয়, বরং কামালের অসুস্থতার আঘাত সহ্য করার জন্য একজন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আমার চোখে তখন আর কোনো ভয় ছিল না। শুধু রাগ।

আমি মীমের হাত শক্ত করে ধরে কামাল আর তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,

“তোমরা মানুষ নও! মানুষের চেহারার আড়ালে তোমরা নিষ্ঠুর! নিজের ছেলেকে ঠিক করার জন্য আমার এতিম মেয়ের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছ! ডাক্তার যদি বলে থাকে বিয়ে করলে ওর অবস্থা ভালো হবে, তাহলে আমাকে সত্যিটা বলতে পারতে। আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতাম। কিন্তু তোমরা সত্য গোপন করে আমার মেয়েকে এই বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছ!”

কামালের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“রওশন আপা, আমাদের ক্ষমা করে দাও। আমরা ভুল করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমরা সত্যিই আশা করেছিলাম কামাল একদিন ভালো হয়ে যাবে…”

আমি আর্তনাদ করে বললাম,

“আমার মেয়ের জীবন দিয়ে? ধরো, কোনো একদিন ওর আক্রমণের সময় কামাল মীমের গলা চেপে ধরল আর আমার মেয়েটা মারা গেল! তখন কী বলতে? বলতেই কি—‘এটা ভাগ্যের লিখন’?”

কামাল উঠে দাঁড়াল। চোখে পানি নিয়ে আমার কাছে এসে কাঁপা গলায় বলল,

“মা, আমি চিকিৎসা করাব। আমি কথা দিচ্ছি। ঢাকার সবচেয়ে ভালো ডাক্তারদের কাছে যাব। শুধু মীমকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবেন না। আমি সত্যিই ওকে ভালোবাসি…”

আমি ঘৃণা আর ক্ষোভে তার দিকে তাকালাম।

তারপর দৃঢ় গলায় বললাম,

“তুমি ওকে ভালোবাসো, নাকি ওকে তোমার অসুস্থতার শিকার বানাচ্ছ—সেটা আর আমার জানার দরকার নেই। আমার মেয়ে আর এক মুহূর্তও তোমার সঙ্গে থাকবে না। তুমি অসুস্থ—এটা তোমার অপরাধ নয়। কিন্তু সেই অসুস্থতার কথা জেনেও আমার মেয়েকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া তোমাদের অপরাধ। আর সেই অপরাধের জন্য আমি আমার মেয়েকে আর তোমাদের হাতে তুলে দেব না।”

29/10/2026

#মেয়ের_গোপন_রহস্য
গল্প ঘর

পর্ব ২

মেয়ের কী এমন হয়েছে? আর এই গ্রামে আমার কাছ থেকে কী এমন গোপন করা হচ্ছে? কী এমন রহস্য লুকিয়ে রেখেছে ওরা, যা আমাকে জানতে দিতে চায় না?

কামালের মায়ের বাড়িতে পৌঁছালাম। পুরোনো মাটির বাড়িটা চারপাশে গাছপালায় ঘেরা। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কামালকে কেমন যেন অস্থির লাগছিল। সে উদ্বিগ্নভাবে বড় কাঠের দরজায় কড়া নাড়ল।

দরজা খুলতেই আমার সামনে এমন এক দৃশ্য উন্মোচিত হলো, যা দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। এতক্ষণ ধরে ওরা যে সত্যটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল, মুহূর্তেই তা আমার চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেল। সত্যিটা জানার জন্য এতটা পথ পাড়ি দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল, ইশ্! যদি কোনো দিন এই সত্য জানতে না হতো!

দরজা খুলে বেরিয়ে এল কামালের বোন নীলা। কিন্তু ওর মুখটা ছিল ভীষণ ফ্যাকাশে, যেন শরীর থেকে সমস্ত রক্ত শুষে নেওয়া হয়েছে। ওর চোখ বারবার আমার মুখ থেকে কামালের মুখে ছুটে যাচ্ছিল। চোখেমুখে এমন আতঙ্ক, যেন হঠাৎ কোনো ভয়ংকর বিপদ ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

নীলাকে দেখে কামাল খুব হালকাভাবে মাথা নাড়ল। তারপর চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল,

“মা কেমন আছে?”

নীলা কোনো কথা বলল না। শুধু মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, মা ভালো নেই। ওর চোখের কোণে তখন টলমল করছিল অশ্রু।

আমি আর এক মুহূর্তও বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। বুকের ভেতরটা ধকধক করছিল, পা দুটোও যেন ঠিকমতো চলছিল না। তবু মেয়ের খোঁজে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লাম।

ভেতরে ঢুকতেই নাকে এল এক অদ্ভুত গন্ধ। তীব্র ধূপের ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে ছিল কোনো অচেনা ভেষজের গন্ধ। দম বন্ধ হয়ে আসছিল আমার। বাইরে তখন দুপুরের ঝলমলে আলো, অথচ বাড়ির ভেতরটা কেমন অন্ধকার আর গুমোট হয়ে ছিল।

ঠিক সেই সময় বাড়ির ভেতরের দিক থেকে ভেসে এল কারও গোঙানির শব্দ। শব্দটা আসছিল করিডরের শেষ প্রান্ত থেকে। প্রথমে বুঝতে পারিনি কে কাঁদছে বা কষ্টে এমন শব্দ করছে। কিন্তু একটু মন দিয়ে শুনতেই বুঝলাম, এটা কামালের মায়ের কণ্ঠস্বর।

তবে সেটা সাধারণ অসুস্থ মানুষের গোঙানি ছিল না। সেই শব্দের মধ্যে এমন এক তীব্র যন্ত্রণা মিশে ছিল, যা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল।

আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললাম,

“আল্লাহ! মীম কোথায়, কামাল? তোমার মা কোথায়?”

কামাল যেন আমার প্রশ্নে আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। সে তাড়াতাড়ি আমার হাত ধরে সামনে এগোনো থেকে আটকানোর চেষ্টা করল।

“একটু দাঁড়ান, মা। আমার মা ভেতরের ঘরে আছেন। খুব অসুস্থ। এখন সেখানে গেলে—”

কামালকে কথা শেষ করতে দিলাম না। এতক্ষণ ধরে তার অস্বাভাবিক আচরণ, নীলার ভয়ার্ত চোখ আর ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসা সেই কষ্টের শব্দ আমার সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

আমি ঝটকা দিয়ে কামালের হাত ছাড়িয়ে নিলাম। তারপর যেদিক থেকে গোঙানির শব্দ আসছিল, সেদিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ঘরের দরজাটা ঠেলে খুলে দিলাম।

আর দরজা খুলতেই আমার চোখের সামনে এমন এক দৃশ্য ভেসে উঠল, যা দেখে মনে হলো বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা বুঝি থেমে যাবে। পায়ের নিচের মাটি সরে গেল, হাঁটু দুটো দুর্বল হয়ে এল।

বিছানায় শুয়ে ছিলেন কামালের মা। কিন্তু বিয়ের দিন যে মহিলাকে দেখেছিলাম, তাঁর সঙ্গে এই মানুষটিকে যেন মেলানোই যাচ্ছিল না। মুখটা বিবর্ণ, প্রায় মৃত মানুষের মতো ফ্যাকাশে। কপালজুড়ে সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা, আর চোখদুটো কাপড়ে ঢাকা।

কিন্তু বিছানার পাশে যা দেখলাম, তাতেই আমার পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল।

সেখানে মেঝেতে বসে ছিল আমার মীম!

আমার একমাত্র মেয়ে, আমার জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, আমার বুকের ধন—সে মেঝেতে বসে থরথর করে কাঁপছিল। তার পরনের জামাটা কাঁধের কাছে ছেঁড়া। দুই হাত আর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নীলচে ও লালচে আঘাতের দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে ছিল।

মীমের হাতে ছিল এক বাটি কুসুম গরম পানি। সেই পানি দিয়ে সে তার শাশুড়ির কপালে সেঁক দিচ্ছিল।

আমি ঘরে ঢুকে তার দিকে তাকাতেই মেয়েটা মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল।

এক মুহূর্তের জন্য আমাদের চোখে চোখ পড়ল।

তারপরই মীমের মুখ থেকে চাপা একটা চিৎকার বেরিয়ে এল। সে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। পরক্ষণেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কান্নার দমকে তার বুক কেঁপে উঠছিল, শ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছিল।

কাঁদতে কাঁদতে সে শুধু বলতে লাগল,

“মা! ও মা! তুমি চলে যাও! এখান থেকে চলে যাও, মা! তোমাকে বলছি, দয়া করে এখান থেকে চলে যাও!”

ঢাকার শহর থেকে মেয়েকে দেখতে গ্রামে গিয়েছিলাম। কিন্তু জামাই আমাকে বলল, আমার মেয়ে নাকি তার অসুস্থ শাশুড়িকে দেখতে গেছে। কথা...
27/10/2026

ঢাকার শহর থেকে মেয়েকে দেখতে গ্রামে গিয়েছিলাম। কিন্তু জামাই আমাকে বলল, আমার মেয়ে নাকি তার অসুস্থ শাশুড়িকে দেখতে গেছে। কথাটা শুনে আমার বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল। কারণ আগের রাতেই আমি মেয়েকে ফোন করে জানিয়েছিলাম—আমি ঢাকা থেকে এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে শুধু ওকে দেখতে আসছি।

আমি বললাম, “তাহলে তোমার মায়ের বাড়িতেই যাই, মেয়েকেও দেখে আসব।”

আমার কথা শুনেই জামাই যেন পাথর হয়ে গেল। মুখের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন সামনে আমাকে নয়, কোনো ভয়ংকর ভূত দেখেছে!

সেদিন ওর মায়ের বাড়িতে গিয়ে যা দেখেছিলাম, তাতেই এমন এক সত্য আমার সামনে বেরিয়ে এসেছিল—যে সত্যটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে তারা অসম্ভব চেষ্টা করেছিল!

আমি রওশন আরা। আমার একমাত্র মেয়ে মীম। মীম শুধু আমার মেয়ে নয়, ও-ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সঞ্চয়, আমার সমস্ত সুখের জায়গা।

ওর বাবা মারা যাওয়ার পর আমি একাই ওকে বড় করেছি। স্বামীকে হারানোর পর আমাদের ছোট্ট সংসারটা যেন হঠাৎ করেই নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মীম ছিল বলেই আমি বেঁচে থাকার সাহস পেয়েছিলাম।

চোখের সামনে মেয়েটা বড় হলো। একসময় বিয়ের বয়সও হলো।

ঠিক তখনই আমাদের পরিচিত পরিবারের ছেলে কামাল মীমকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। ওদের বাড়ি গ্রামের দিকে। মীমও কামালকে আগে থেকেই চিনত এবং ছেলেটাকে পছন্দও করত।

আমারও আপত্তি ছিল না। বরং মনে মনে খুশিই হয়েছিলাম। ভাবছিলাম, এবার আমার মেয়েটা নিজের সংসার পাবে, আর আমি নিশ্চিন্ত মনে ওকে দেখতে যেতে পারব।

বিয়ের দিন মেয়েকে লাল শাড়ি আর গয়নায় সাজানো দেখে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। মনে হচ্ছিল, এতদিনের কষ্ট বুঝি আজ সার্থক হলো।

ঠিক তখনই কামালের মা আমার কাছে এসে খুব আপন করে বললেন,

“রওশন, তুমি একদম চিন্তা করো না। তোমার মেয়েকে আমরা নিজের মেয়ের মতোই রাখব। ওদের আলাদা ঘর থাকবে, আমাদের ঘর থেকে একটু দূরে। কেউ ওকে বিরক্ত করবে না।”

আমি হেসে বলেছিলাম,

“আরে আপা, আপনাদের নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই। আপনারা ভালো মানুষ বলেই তো মেয়েকে আপনাদের হাতে তুলে দিলাম। একই ঘরে থাকলেও আমি চিন্তা করতাম না।”

আমার কথা শেষ হতেই কামালের বোন নীলা মুখে হাত দিয়ে হঠাৎ অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল।

হাসিটা স্বাভাবিক ছিল না।

মনে হলো, আমি যেন কোনো মজার কথা বলেছি আর সে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে।

কামালের মা সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের কোমরে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে চোখ রাঙালেন। নীলা সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে মাথা নিচু করে ফেলল।

আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি।

নিজেকে বোঝালাম, হয়তো মেয়েটা অন্য কোনো কারণে হেসেছে।

তারপর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে আমি ফিরে এলাম ঢাকার আমার সেই ফাঁকা বাসায়।

কিন্তু মায়ের মন তো আর এত সহজে শান্ত হয় না।

প্রতিদিন মীমকে ফোন করতাম। কখনো ভিডিও কল দিতাম।

আর প্রতিবারই আমার মনে হতো, মেয়েটা যেন আগের মীম নেই।

কথা বলার সময় বারবার গিলে ফেলত। অকারণে পেছনে তাকাত। যেন কেউ ওকে দেখছে কি না, সেটা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

একদিন ভিডিও কলে আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“কী হয়েছে রে মা? বারবার পেছনে তাকাচ্ছিস কেন? কেউ আছে নাকি?”

মীম তাড়াতাড়ি বলল,

“না মা, কেউ নেই। ভয় হচ্ছিল, কেউ দরজায় নক করলে যদি শুনতে না পাই!”

ওর কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।

মায়ের মন অনেক কিছু বুঝতে পারে, যা মুখে বলা হয় না।

বিয়ের ঠিক পনেরো দিন পর আবার মীমকে ভিডিও কল দিলাম।

মীম ফোন ধরতেই আমি আঁতকে উঠলাম।

ওর দুই চোখ লাল হয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, কিছুক্ষণ আগেই অনেক কেঁদেছে।

আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম,

“মা, তোর চোখ এমন লাল কেন? কামাল কিছু বলেছে? তোকে কষ্ট দিয়েছে?”

মীম তাড়াতাড়ি একটা জোর করে হাসি দিয়ে বলল,

“না মা, কিছু হয়নি। আমি একটু বেশি পেঁয়াজ কাটছিলাম। তাই চোখ জ্বালা করছে।”

আমি কিছু না বলে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

কেন জানি বিশ্বাস হলো না।

হঠাৎ মনে হলো, আর দূরে থাকা সম্ভব নয়।

আমি বললাম,

“শোন, আমি আর পারছি না। কালই তোকে দেখতে আসছি।”

আমার কথাটা শেষ হতে না হতেই মীমের হাত কেঁপে উঠল।

ওর হাতে থাকা প্লেটটা মেঝেতে পড়ে বিকট শব্দে ভেঙে গেল।

মেয়ের মুখের রং মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

সে কাঁপা গলায় বলল,

“কাল? কাল আসবে?”

আমি অবাক হয়ে বললাম,

“কী হয়েছে? আমি তোকে দেখতে আসব, এতে এত অবাক হওয়ার কী আছে? তুই কি আমাকে দেখতে চাস না?”

মীম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর হাত ঘষতে ঘষতে বলল,

“না মা, তা না... তুমি তো ফোনেই আমাকে দেখছ!”

ওর কথায় আমার বুকটা ভেঙে গেল।

আমি অভিমান করে চুপ করে থাকতেই মীম বুঝতে পারল আমি কষ্ট পেয়েছি।

তাড়াতাড়ি বলল,

“না মা, আমি সেভাবে বলিনি। তুমি আসবে, আমি অবশ্যই খুশি হব। আসলে তুমি যদি দু-একদিন আগে বলতে, তাহলে তোমার জন্য একটু ভালোভাবে আয়োজন করতে পারতাম।”

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,

“আমার কোনো আয়োজন চাই না মা। কোনো দাওয়াত, কোনো রান্নাবান্না, কিছুই চাই না। শুধু তোকে নিজের চোখের সামনে দেখতে চাই। তোকে জড়িয়ে ধরে একটু শান্তি পেতে চাই।”

মীম ম্লান একটা হাসি দিয়ে বলল,

“ঠিক আছে মা। তুমি এসো।”

আমি বললাম,

“তাহলে ঠিক হলো। কাল সকালেই রওনা দেব। কামালকে বলে রাখিস।”

ফোন কেটে দেওয়ার পর সারা রাত আমার চোখে ঘুম এলো না।

বারবার মীমের সেই ভীত মুখটা চোখের সামনে ভাসছিল।

নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছিলাম—হয়তো আমি অযথাই ভয় পাচ্ছি। মেয়ের নতুন সংসার, নতুন পরিবেশ। হয়তো এসব কারণেই ও একটু অস্বস্তিতে আছে।

পরদিন খুব ভোরে আমি ঢাকা থেকে গ্রামের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

রাস্তার প্রতিটা মুহূর্ত আমার কাছে যেন ঘণ্টার মতো লাগছিল।

শুধু মনে হচ্ছিল, কখন পৌঁছাব, কখন মেয়েটাকে সামনে পাব, কখন ওকে জড়িয়ে ধরব।

অবশেষে বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

দরজায় কড়া নাড়লাম।

দরজা খুলল কামাল।

মীম নয়।

আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

কামাল অবশ্য খুব হাসিমুখে আমাকে স্বাগত জানাল।

“আরে মা! আপনি এসেছেন! আসেন, আসেন। বাড়ি একেবারে আলোকিত হয়ে গেল।”

আমি ভেতরে ঢুকেই অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

“মীম কোথায়?”

কামাল খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

“ও তো আমার মায়ের কাছে গেছে। মা একটু অসুস্থ বোধ করছিলেন। ফোন করে ডেকেছেন, তাই মীম না করতে পারেনি।”

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।

“কিন্তু আমি তো গতরাতেই মীমকে বলেছিলাম যে আজ ঢাকা থেকে শুধু ওকে দেখতে আসব!”

কামাল হালকা হেসে বলল,

“আরে মা, আসা-যাওয়া তো হতেই পারে। এত চিন্তা করছেন কেন? আপনি বসুন, চা দিচ্ছি।”

ও রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

কিন্তু আমার ভেতরের অস্বস্তিটা আরও বেড়ে গেল।

মেয়ে জানত আমি আসছি।

তবুও সে আমাকে না জানিয়েই শাশুড়ির বাড়িতে চলে গেল?

আর ওর শাশুড়িও কি জানতেন না যে আমি আজ মেয়েকে দেখতে আসছি?

কিছু একটা ঠিক নেই।

কিছু একটা আমার কাছ থেকে লুকানো হচ্ছে।

কামাল চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে ফিরে আসতেই আমি উঠে দাঁড়ালাম।

বললাম,

“চা তোমার মায়ের বাড়িতেই খাব। মীমও তো ওখানে আছে। তোমার মাকে দেখে আসি, আর মেয়েটাকেও নিয়ে আসি।”

আমার কথা শুনে কামালের হাত থেকে ট্রে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল।

কাপ-পিরিচ ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।

আমি স্তব্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

কামালও যেন বুঝতে পারল, তার ভয়টা আমার চোখে ধরা পড়ে গেছে।

সে কাঁপা গলায় বলল,

“মা... আপনি এখানেই থাকেন না? হয়তো মীম একটু পরেই চলে আসবে। অথবা অন্যদিন গিয়ে দেখে আসবেন। মা খুব অসুস্থ...”

আমি এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালাম।

“কামাল, তুমি কি চাও না আমি তোমার মায়ের বাড়িতে যাই?”

সে তাড়াতাড়ি বলল,

“না না! আপনি এমন কথা বলছেন কেন? আমি শুধু বলছি, ওদিকের রাস্তা খুব খারাপ। কাঁচা রাস্তা, জমির আল দিয়ে যেতে হয়। আপনার কষ্ট হবে।”

আমি আর কোনো কথা শুনলাম না।

ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে বললাম,

“কষ্ট হলেও যাব। তোমার মা অসুস্থ, আর আমি তাঁর বাড়ির সামনে এসে ফিরে যাব—এটা তো হতে পারে না।”

কামাল বাধ্য হয়ে আমার সঙ্গে বের হলো।

কিন্তু হাঁটার সময় ওর আচরণ দেখে আমার বুকের ভেতর ভয় আরও জমাট বাঁধতে লাগল।

কখনো এক পা এগোয়, আবার থেমে যায়।

কখনো চারপাশের দিকে তাকায়।

কখনো যেন কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করে।

আমি কিছু বললাম না।

শুধু মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম—

হে আল্লাহ, আমার মেয়েটার যেন কিছু না হয়ে থাকে।

অবশেষে আমরা কামালের মায়ের বাড়ির সামনে পৌঁছালাম।

পুরোনো মাটির বাড়ি। চারপাশে গাছপালা। সামনে কাঠের দরজা।

কামাল দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

তার হাত কাঁপছিল।

সে ধীরে ধীরে দরজায় কড়া নাড়ল।

আমি ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আমার বুকের ধুকপুকানি যেন পুরো শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।

দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।

আর ভেতরে পা রাখার পর—

আমি যা দেখলাম, তাতেই আমার পৃথিবী যেন মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল।

যে সত্যটা ওরা এতদিন আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল, সেই সত্য সেদিন আমার চোখের সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

আমি বুঝে গেলাম—

আমার মেয়েকে নিয়ে এতদিন যে ভয়টা আমার বুকের ভেতর কুরে কুরে খাচ্ছিল, সেটা কোনো মায়ের অকারণ সন্দেহ ছিল না।

কিন্তু সেই সত্যটা এত ভয়ংকর হবে, সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি!

চলবে…

মেয়ে শাশুড়ির বাড়িতে কেন গিয়েছিল?

#মেয়ের_গোপন_রহস্য

#গল্প_ঘর
প্রথম পর্ব

08/10/2026

অফিসের সি. ই. ও এর রুমে ঢুকেই ফারদিনার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। এই রুমে তমা কে ফারদিনা কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও ভাবে নাই।
তমা: আরে ফারদিনা কেমন আছো?
ফারদিনা: আমি ভালো আছি। তবে তোমাকে এইখানে দেখে আমি অনেক অবাক হয়েছি।
তমা: আমি নিজেও মাঝে মাঝে নিজেকে দেখলে অবাক হয়ে যাই।
ফারদিনা: তুমি কি বদলা নেবার জন্য আমাদের প্রজেক্ট টা রিজেক্ট করে দিয়েছো?
তমা: তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আর আমি এত টাও বিবেকহীন হয়ে যাই নি যে তোমাদের প্রজেক্ট ভালো হওয়ার পরেও আমি বদলা নেবার জন্য তোমাদের রিজেক্ট করে দিব।
ফারদিনা: যদি তাই হয়ে থাকে তবে প্রজেক্ট একসেপ্ট করে তোমার মানবতার প্রমাণ দাও।
তমা: তোমাদের এই প্রজেক্ট এ ইনভেস্ট করা মানে অনেক বড় বিপদ টেনে আনা। আমি আজ এত দূর এসেছি বিজনেস বিচক্ষণতার সাথে চালিয়ে। তুমি কি চাইছো এই প্রজেক্ট একসেপ্ট করে আমার অবস্থা ও তোমার মত হোক?
ফারদিনা: আমি খুব ভালো মতোই বুঝতে পারছি প্রজেক্ট যতই ভালো হোক তুমি কোনো দিনও আমাদের একসেপ্ট করবে না।
তমা: তোমার সাথে তর্ক করে আমি তোমাকে বুঝাতে পারব না তাই আমি আর সময় নষ্ট করতে চাই না। তুমি দয়া করে চলে যাও।
তমার কথা শুনে ফারদিনা রাগ করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। বাড়িতে গিয়ে দেখে আকাশ অন্যমনস্ক হয়ে বারান্দায় বসে আছে।
ফারদিনা: তুমি আমাকে গতকাল তমার কথা বলো নি কেন?
আকাশ: তোমার সাথে তো আজকাল শান্তি মত কোনো কথা বলাই যায় না।
ফারদিনা: তাই বলে তুমি এত বড় কথাটা গোপন রাখবে?
আকাশ: তুমি যখন জেনেই গেছো তাহলে তুমি নিশ্চয়ই ভাবছো তমা ইচ্ছা করে আমাদের আইডিয়া রিজেক্ট করেছে?
ফারদিনা: অবশ্যই।
আকাশ: আর আমি ভাবছি অন্য কথা। প্রতিটা পদে পদে আমি এখন তমার অনুপস্থিতি অনুভব করি। আমাকে ছাড়া ও ঠিকই এগিয়ে গেছে। কিন্তু ওকে ছাড়া আমি পিছিয়ে গেছি।
ফারদিনা: কি বলছো এসব? তোমার মাথা ঠিক আছে?
আকাশ: হ্যাঁ মাথা ঠিক আছে। তবে এত দিন মাথা ঠিক ছিল না।
ফারদিনা: তোমার জন্য যে আমি দিনের পর দিন আমার সব হারালাম? ঐটা কিছু না?
আকাশ: এই জন্য তো দিনের পর দিন আমাকে কম কথা শুনেও নি।
ফারদিনা: এত বড় কথা যেহেতু বলেই ফেললে তাহলে তো আমাদের ভেতর এখন যে লোক দেখানো ফারমাল বৈবাহিক সম্পর্ক আছে সেইটা ইতি টেনে দেওয়াই ভালো হবে।
আকাশ: আমিও ঐটাই ভাবছিলাম। আমিও মুক্তি পেতে চাই। জীবনে অনেক বড় একটি সম্পদ আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম, ঐটা ফেরত পাওয়ার একটা সুযোগ এসেছে। এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাই।
ফারদিনা: ঠিক আছে আকাশ। তুমি আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে। সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পর আর এত কিছুর হয়ে যাওয়ার পরেও আমি তোমার হাত ছাড়ি নাই। ধৈর্য ধরে ছিলাম, তোমার প্রতি মায়া করে, কারণ একসময় তোমাকে অনেক ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু এখন বুঝলাম তুমি লোভী। আমার সম্পত্তির লোভে আমাকে বিয়ে করেছো আর এখন তমার সফলতা দেখে তমার কাছে ছুটে যেতে চাইছো।
আকাশ: প্লীজ। লেকচার দেওয়া বন্ধ করো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে মুক্ত করে দাও। আর এখন থেকে তোমার কোনো কথা শুনতে বাধ্য নই আমি। ভালো থেকো। আমি গেলাম।
কথা শেষ করেই আকাশ বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। ফারদিনা হতবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। একটা মানুষ কীভাবে এত স্বার্থপর হয়?
(চলবে)

#পৃথিবীটা_গোল
পর্ব: ৪

06/10/2026

ফারদিনা: তোমাকে বিয়ে করাই আমার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে। তোমার জীবন আমি সুন্দর মত সেট করে দিব ভেবেছিলাম। তোমাকে আমার সব সম্পত্তির মালিক বানাবো ভেবেছিলাম। কিন্তু তুমি দিন দিন এইসব কি করছো? আমার যা ছিল তোমার জন্য সব ডুবে যাচ্ছে।
আকাশ: এর জন্য কি তুমি সমানভাবে দায়ী নও?
ফারদিনা: কি বলতে চাইছো তুমি?
আকাশ: তুমি সারাদিন ব্যাস্ত থাকো। সারাদিন অফিস, মিটিং, বিজনেস ট্যুর নিয়েই থাকো। এইদিকে আমি একা থাকি।
ফারদিনা: বিয়ের আগে তো তোমার এইসব নিয়ে কোনো সমস্যা ছিল না। তুমি তো এইসব দেখেই আমাকে বিয়ে করেছিলে।
আকাশ: হ্যাঁ করেছি। বিয়ের আগের আর পরের হিসাব অনেক আলাদা।
ফারদিনা: তো এইটার সাথে তোমার বিজনেস পারফরমেন্স এর সম্পর্ক কি? তোমাকে একটা ভালো প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে বললে তুমি ভালো কোনো আইডিয়া ও দিতে পারো না। তাহলে বিয়ের আগে কীভাবে এত ভালো মত বিজনেস চালাতে?
আকাশ: সবটাই তমার কৃত্তিত্ব ছিল।
ফারদিনা: এতই যদি ওর কৃতিত্ব ছিল তাহলে ওকে ছেড়ে আমাকে বিয়ে করলে কেন?
আকাশ: আমি এই বিষয়ে কোনো তর্ক করতে চাইছি না।
ফারদিনা: তোমাকে দিয়ে কিছু হবেও না। যা করার আমার করা লাগবে, তোমার জন্য পথে বসতে পারব না।
কথা শেষ করে ফারদিনা রাগ করে নিজের শোবার ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। আকাশ সারা রাত ড্রইং রুমের সোফায় শুয়ে কাটিয়ে দিল। ফারদিনার সাথে বিয়ের পর প্রথম প্রথম সব কিছু অনেক বেশি সুখের মনে হলেও এখন প্রতিটা দিন কাটার মত লাগে। এতদিন তাও ভেবেছিল সুখী না হলেও, আগের মধ্যবিত্ত জীবনের থেকে রেহাই পেয়ে উচ্চবিত্ত জীবনে তো আছে। কিন্তু আজ তমা কে দেখে ওর আফসোস আরও বেশি বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে যাকে অবহেলা করে ফেলে এসেছে, সেই তমা আজ আকাশের চেয়েও ভালো অবস্থায় চলে গেছে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সকাল হয়ে গেছে আকাশ টের ও পায় নি।
আকাশ: কোথায় যাচ্ছো?
ফারদিনা: সেই কৈফিয়ত তোমাকে দিতে হবে?
আকাশ: আমি তোমার স্বামী, আমাকে তোমার বলা উচিত।
ফারদিনা: স্বামী হিসেবে কোন দায়িত্ব পালন করেছি? নিজে তো সব উলোট পালট করে আমার নাম ডুবিয়ে দিয়েছো, ব্যবসা, অর্থ সম্পদ সব কিছু ডুবে যাচ্ছে। সে দিকে খবর নেই অথচ কোথায় যাচ্ছি সেইটা না বললে তখন তোমার মনে হয় তুমি আমার স্বামী।
ফারদিনা কথাগুলো বলে আকাশ এর উত্তরের অপেক্ষা না করে চলে গেলো। ফারদিনা আসলে সব সামলাতে সামলাতে বিরক্ত। আগে একা সব করতো, সব ঠিক ছিল। তবে আকাশকে একটু একটু করে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। আকাশ এর করা ভুল গুলো শুধরাতে গিয়ে নতুন করে কিছু করতে পারছে না ফারদিনা। অথচ এই আকাশ এর ইউনিক বিজনেস আইডিয়া আর যে কোনো সমস্যা সমাধান করার বিচক্ষণতা এর উপর মুগ্ধ হয়ে ফারদিনা আকাশ কে জেদ করেই বিয়ে করেছিল। অথচ এই আকাশ আজ ওর গলার কাটা হয়ে গেছে।
(চলবে)

#পৃথিবীটা_গোল
পর্ব: ৩

আকাশ চলে যাওয়ার পর তমা বেশ চিন্তিত মনে মিটিং রুমেই বসে আছে। তমার ম্যানাজার সিফাত ব্যাপার টা লক্ষ্য করে এক কাপ গরম কফি ন...
05/10/2026

আকাশ চলে যাওয়ার পর তমা বেশ চিন্তিত মনে মিটিং রুমেই বসে আছে। তমার ম্যানাজার সিফাত ব্যাপার টা লক্ষ্য করে এক কাপ গরম কফি নিয়ে তমার কাছে গেলো।
সিফাত: ম্যাডাম, আপনাকে অনেক চিন্তিত লাগছে। কোনো সমস্যা হয়েছে?
তমা: না, আসলে আমার আকাশ এর বিজনেস প্ল্যান টা ভালো লাগে নি। কি করব বুঝতে পারছি না। যদি আমি রিজেক্ট করে দেই তাহলে তো উনি অনেক বড় লস এ পরবে।
সিফাত: তা তো ঠিক আছে ম্যাডাম, কিন্তু এই কথা ভেবে তো আমরা আমাদের কোম্পানিকে রিস্ক এ ফেলতে পারব না। আপনি আবেগ দিয়ে ভাবল নিজে বিপদে পরে যাবেন ম্যাডাম। এর থেকে বাদ দিন।
তমা: হুম ঠিক বলেছো। এই পর্যায়ে আসতে গিয়েও আমাকে অনেক বার হোঁচট খেতে হয়েছে। আমার জন্য তো এত মায়া কেউ করে নি। ঠিক বলেছো তুমি। আকাশ কে ফোন দিয়ে তুমি জানিয়ে দিও উনার আইডিয়া আমাদের ভালো লাগে নি।
সিফাত: ঠিক আছে ম্যাডাম।
ফারদিনা আজ অনেক রেগে আছে। কারণ আকাশ আজকাল কোনো কাজ ঠিক মত করছে না। যা করছে তাতেই কিছু না কিছু ঝামেলা করছে। আজ আকাশ এর মিটিং ছিল, কে জানে মিটিং এ কি করে এসেছে।
এর ভিতরেই ফোন বেজে উঠল।
সিফাত: আমি সিফাত বলছি। আজ আপনি আমাদের অফিসে এসেছিলেন বিজনেস প্ল্যানিং নিয়ে, অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আপনাদের বিজনেস প্ল্যানিং এ প্রচুর ত্রুটি আছে, তাই এইখানে ইনভেস্ট করতে চাইছি না। ম্যাডাম অনেক চিন্তা ভাবনার পর রিজেক্ট করেছেন।
ফারদিনা: কি বলছেন আপনি এইসব? কোনো ভাবে কি আপনার ম্যাডাম এর ফোন নাম্বার টা দেওয়া যাবে? আজ তো আমার স্বামী গিয়েছিল মিটিং করতে, হয়ত কোনো ভুল হয়েছে। আমি নিজে সরাসরি ম্যাডাম এর সাথে কথা বলতে চাইছি।
আকাশ: কথা বলতে চাইলে অফিসে আসতে হবে। ম্যাডাম এর পার্সোনাল নাম্বার কাওকে দেওয়া হয় না।
ফারদিনা: ঠিক আছে। আমি আগামীকাল আসব।
ফোন রেখে ফারদিনা খুব রেগে গেলো। আকাশ অসহায় হয়ে ফারদিনার দিকে তাকিয়ে আছে।
(চলবে)

#পৃথিবীটা_গোল
পর্ব: ২

বেশ খুশি মনে তমা তার অফিসের চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছে। তার নিজের অফিস। তমা একজন সফল নারী। তবে এই সফলতার গল্প এতটা সহজ ছিল ন...
04/10/2026

বেশ খুশি মনে তমা তার অফিসের চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছে। তার নিজের অফিস। তমা একজন সফল নারী। তবে এই সফলতার গল্প এতটা সহজ ছিল না। অনেক চড়াই উৎরাই পার করে, দুই বছর অদম্য পরিশ্রম করে আজ তমা এই পজিশনে এসেছে। তমা আজ এতটাই সফল যে তার সাথে পার্টনারশিপে যাওয়ার জন্য আর ইনভেস্টমেন্ট এর জন্য বিভিন্ন কোম্পানিগুলো তমার সাথে মিটিং করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে।
হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল।
ম্যানেজার: ম্যাডাম, আপনার ক্লায়েন্ট মিস্টার আকাশ চলে এসেছে। মিটিং শুরু করার ব্যবস্থা করি?
আকাশ নাম শুনে তমার বুক টা ধুক করে উঠল। পরেই নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবল, নাহ আকাশ নামে তো দেশে হাজার হাজার মানুষ আছে।
তমা: ঠিক আছে, সিফাত। উনাকে বলো সব কিছু রেডি করে রাখতে। আমি পাঁচ মিনিটের ভিতর মিটিং শুরু করব।
ফোন রেখে তমা গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেলো। "আকাশ" যার জন্য তমা আজ এই অবস্থানে, যার জন্য একসময় তমা অনেক কেঁদেছে, যার প্রতি তমার এক রাশ অভিযোগ, ঘৃণা আবার কৃতজ্ঞতা ও।
মনে কিছুটা সন্দেহ নিয়েই তমা মিটিং রুমে ঢুকল।
মিটিং রুমে গিয়েই তমা থমকে দাঁড়ালো। যা ভেবে ভয় পাচ্ছিলো তাই হলো।
আকাশ তমার সামনে বসে আছে। তমা কে দেখে আকাশ ও খানিকটা বিব্রত হয়ে গেল।
আকাশ: তমা তুমি? কেমন আছো?
তমা: আমি ভালো আছি। তাহলে আজ তুমি আমার ক্লায়েন্ট? তোমার সাথেই আজ আমার মিটিং?
আকাশ: কি বলছো? তুমি এই কোম্পানির মালিক?
তমা: হ্যাঁ আকাশ।
আকাশ: আমি তো বিশ্বাস করতেই পারছি না। কিভাবে সম্ভব?
তমা: আমাদের জীবনে অনেক কিছুই ঘটে যা আমরা কোনো দিন কল্পনাও করতে পারি না। যেমন তোমার কথাই ধরো। কোনো দিন ভাবিনি তোমাকে ছাড়া থাকতে হবে, কোনো দিন ভাবি নি তুমি চলে গেলে আমার জীবনে এতটা পরিবর্তন আসবে। আবার কোনো দিন ভাবি নি তোমার সাথে আমার আজ দেখা হবে তাও আবার ক্লায়েন্ট হিসাবে।
আকাশ: তুমি কি এখনও আমার সাথে অভিমান করে আছো?
তমা: আমি অভিমান করার কে? আমার কি কোনো অধিকার আছে?
আকাশ: আমি আসলে অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছি। আমি এখন সেটা বুঝতে পারছি।
তমা: আচ্ছা, এইসব কথা থাক। মিটিং টা তাহলে শুরু করি?
বেশ কিছুক্ষণ মিটিং হলো। আকাশ এর ব্যবসার প্লানিং তমার কাছে খুব একটা ভালো লাগে নি। অন্য কেউ হলে হয়ত সরাসরি মানা করে দিত তমা। কিন্তু আকাশ কে মানা করতে পারছে না। কারণ তমা আগেই শুনেছিল যে কোম্পানির হয়ে আকাশ এসেছে সেই কোম্পানির অবস্থা খুব একটা ভালো না। আজ যদি তমা প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় তাহলে আকাশ এর কোম্পানি মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে।
তমা: ঠিক আছে আকাশ, আমি ভেবে জানাবো। আমার কিছুটা সময় দরকার।
আকাশ: ঠিক আছে। আজ তাহলে আসি।
(চলবে)

#পৃথিবীটা_গোল
পর্ব:১

Address

Boardbazar, Gazipur
Dhaka

Telephone

+8801969860854

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when লবঙ্গ লতিকা posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share